
আলেয়া বেগম স্বামীর সংসারে এসেছেন চৌদ্দ বছর হলো। তার শাশুড়ির কড়া মেজাজ। বাড়ির সব কাজেই খবরদারি। যেন পান থেকে চুন খসার উপায় নেই। শাশুড়ির ভাষ্যটা এমন যে ‘বউ মানুষ এত বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুম কিসের, উঠে রান্না ঘরে যাও।’ ‘বাড়ির বউদের আবার এত কথা কী?’ ‘বউ বউয়ের মতো থাক।’ সারাক্ষণ যেন বউয়ের পেছনে লেগে থাকা। আলেয়া বেগম খুব ভালো করে ভেবে দেখেছে। সংসারে কথা বললেও দোষ আবার না বললেও দোষ। গ্রামের বাড়ি তাই লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হয়। আলেয়া একটু তাড়াতাড়ি রেঁধে নিতে চায়, সেখানেও শাশুড়ির খবরদারি—এই লাকড়ি ধরলে কেন? এটা না সেটা? লাকড়ি কি তুমি কুড়িয়েছ নাকি? যেন হাজার দোষ। আবার কখনও যদি রাঁধতে একটু দেরি হয়—‘কি কর এত বেলা পর্যন্ত। নবাবজাদী বাড়ি এনেছি নাকি? কোন বাপের মেয়ে কাজকাম শেখায়নি? আলেয়া সমবয়সীদের সঙ্গে একটু গল্প করবে সে জো নেই। সেখানেও শাশুড়ির তীক্ষষ্ট দৃষ্টি ‘কি শ্বশুরবাড়ি তিনবেলা খাবে আর খোশগল্প করবে, বলি এই করতেই কি ছেলের বউ করে ঘরে এনেছি?’ যেন ছেলের বউয়ের হাজারো দোষ। আলেয়া বিয়ের পরপর ক’বছর মুখ বুজে সব সহ্য করেছেন। এখন আর করেন না, প্রতিবাদ করেন। শাশুড়ি দুটো বললে আলেয়া পাঁচটি শুনিয়ে দেয়।
আর বউ উচিত কথা বলা মানে তো সর্বনাশ। ব্যস লেগে গেল বউ-শাশুড়ির ঝগড়া। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। যেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, যেন চিরকালের শত্রু। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামী বেচারা না বউকে বলতে পারে, না মাকে বলতে পারে। ঝগড়া-বিবাদ এড়াতে একপর্যায়ে ভিন্ন হতে হয়। আলাদা খেতে হয়।
মমতাজ ইসলাম শহরে বসবাস করেন। উচ্চশিক্ষিত এবং চাকরিজীবী। শহরে যে বাড়িটিতে থাকেন তা তার নিজের নামে বরাদ্দ করা।
তিনি কথায় কথায় বলেন, ‘ছেলের বউদের পরোয়া করি না। চাকরি করি, পয়সার অভাব নেই, তাই কারও মুখাপেক্ষী নই। আমার পছন্দমত বউরা থাকলে থাকবে নয়তো ভিন্ন থাকগে।’
রাবেয়া খাতুন বিয়ে হয়েছে মাত্র তিন বছর। এক শাশুড়ি এবং স্বামী নিয়ে তার নিতান্তই ছোট্ট সংসার। তিনি বিয়ের পরপরই যা শুরু করলেন তা হলো এমন যে, এটা আমার, ওটা আমার। শাশুড়ি তাদের সঙ্গে থাকেন এটাও তার পছন্দ নয়। শাশুড়ির কোনো কাজ, কোনো কথা কোনোটাই যেন বউয়ের পছন্দ হয় না। শখ করে শাশুড়ি ছেলের জন্য রান্না করতে গেল—‘ওটা আপনাকে কে করতে বলেছে? বুড়ো মানুষ চুপ করে বসে থাকুন। এত মাতব্বরি কিসের? রান্না হলে তিন বেলা ঠিকমত খাবেন ব্যস।’ আর কথায় কথায়, এটা আমার স্বামী এনেছে। ওটা আমার স্বামীর রোজগার। রাবেয়ার শাশুড়ি একটু হিসেবি, গোছানো প্রকৃতির মানুষ। বউকে একটু হিসেবি হতে বলতেই—‘এত হিসাবের কী দরকার। খাবার দরকার খান। কী লাগবে বলুন। এই চিত্রটি একটু ভিন্ন। এখানে আবার বউয়ের অত্যাচারে শাশুড়ির জীবন অতিষ্ঠ। শাশুড়ি ছেলেকে বিয়ে করানোর কিছুদিন পরই বুঝতে পেরেছেন, এ তো বউ নয় যেন কোনো জল্লাদ, অভদ্র অসভ্য। মনের কথা মনে রেখে নীরবে শাশুড়ি কাঁদেন আর ভাবেন— স্বামী স্বামী বলে যে চেঁচাচ্ছে সে তো আমার হিসাব করা কষ্টের সংসারে তিল তিল করে গড়ে তোলা আমার সন্তান। তার প্রতি কি পুরোটাই বউয়ের অধিকার, মায়ের কি কোনো অধিকার নেই? শাশুড়ি কাঁদেন আর ভাবেন, বলেন না কিছুই। তবে তো উপায় নেই, জল্লাদ বউ চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুলে নেবে।
মঞ্জু সাহেবের স্ত্রী সুমী। এমবিএ পাস করে একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করেন। বিয়ের পর থেকেই তিনি শাশুড়িকে আজ অবধি কাছে রেখেছেন। তাদের বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর নয় বরং সমঝোতার। সুমী অফিসে যাওয়ার আগে শাশুড়ির সব কাজ গুছিয়ে দিয়ে যান এবং কাজের মেয়েকে বলে যান, আম্মার যাতে কোনো অসুবিধা না হয়। আবার অফিস থেকে ফিরে আগে শাশুড়ির ঘরে খবর নেন, ওষুধপত্র ঠিকমত খেয়েছে কিনা। স্বাস্থ্য ভালো কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। ঠিক তেমনি শাশুড়িও বউয়ের জন্য অস্থির। এমনটিই হওয়া উচিত। বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর না হয়ে সমঝোতার হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে বউ-শাশুড়ি উভয়েরই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজন। বউয়ের উচিত শাশুড়িকে নিজের মায়ের মতো মনে করা ঠিক তেমনি শাশুড়িকে ও বউকে মেয়ের মতো দেখা উচিত। একজন শাশুড়ির সহমর্মিতা একজন বউকে সমঝোতা শেখায়। আমাদের দেশে বউ-শাশুড়ির মিষ্টিমধুর সম্পর্ক কদাচিত দেখা যায়। কোনো কোনো পরিবারে এমনই আনন্দঘন দৃশ্য দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক বিবাদের, যেন দা-কুমড়া সম্পর্ক। শাশুড়ির একচ্ছত্র আধিপত্য। বউকে বউ বলে সদা তাচ্ছিল্য করা, অপমান করা সংসারে অশান্তিই বয়ে নিয়ে আসে। শাশুড়ির বোঝা উচিত, তিনি নিজেও একদিন বউ ছিলেন। একটু স্বাধীনতার জন্য তার মনটাও উচাটন থাকত, তাই নিজের সে অভিজ্ঞতা থেকে বউকে একটু স্বাধীনতা দিন না। বউকেও মত প্রকাশ করার সুযোগ করে দিতে হবে। একদিন রান্নায় একটু দেরি হতেই পারে সেক্ষেত্রে কঠোর না হয়ে সহনশীল হলে ফলাফল ভালো হবে। দেখবেন বউটিও আপনাকে ভালোবাসতে শিখেছে। একজন বয়স্ক মানুষের জীবনকে আনন্দঘন করতে ছেলে-বউ-নাতি-নাতনী সবাইকে বড় বেশি দরকার। কেউ ফেলনা নয়।
অনেক শাশুড়ি আছেন কথায় কথায় বলেন, আমি ছেলের মা, ওজনে অবশ্য বেশি। কিন্তু ভুলে যাবেন না আপনারও পাঁচটি মেয়ে আছে। তারাও বউ হয়ে অন্যের ঘরে গেছে। তাহলে তো দেখা যায় ওজনে তো আপনি বেশি নন, বরং আপনার হীনমন্যতার জন্য ওজন আপনার কমে গেল। ছেলের মা, ছেলের মা বলে চেঁচামেচি করার কিছু নেই। আদর, ভালোবাসা, সহমর্মিতা দিয়ে পরের মেয়েটি আপন করে নিলে যে কোনো শাশুড়ি অবশ্যই জিতে যাবেন। আর জিতে যাওয়া মানেই হচ্ছে বউয়ের কাছে আদর আর সম্মান বহু গুণ বেড়ে যাওয়া। ঠিক তেমনি শাশুড়ি যদি হন চাকরিজীবী সেক্ষেত্রেও বউদের তাচ্ছিল্য করার কিছু নেই। বৃদ্ধ অবস্থায় বউদের সেবাযত্ন। অসুখে-বিসুখে পাশে বসা, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়া, বিপদে সাহস দেয়া সেটাও কি অর্থবিত্তের চেয়ে কোনো অংশে কম? সেই পরিবেশটিও বউ-শাশুড়ির ত্যাগ স্বীকারেই গড়ে তোলা সম্ভব। ছোটখাটো বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলে ঝগড়া-বিবাদ কম হবে।
এবার আসা যাক বউয়ের প্রসঙ্গে। যেসব বউ কথায় কথায় শাশুড়ির সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন—আমার স্বামীর রোজগার, আমার স্বামীর সম্পদ, এটা আমার, ওটা আমার এমনটিও কখনো উচিত নয়। শাশুড়ি তিল তিল করে এ সংসারটিকে গুছিয়ে রেখেছেন, ছেলেকে সুশিক্ষায় মানুষ করে উপার্জনক্ষম করে গড়ে তুলেছেন সেখানে কি তার অধিকার নেই। বৃদ্ধাবস্থায় তাকেও খুশি রাখতে তাকে সংসারের কম-বেশি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলে সেও খুশি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আজ যে বউ তাকেও যে একদিন শাশুড়ির আসনে বসতে হবে। তাই বউদেরও উচিত, শাশুড়িকে ভালোবাসা, সম্মান করা, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া, সেবা-যত্ন করা।
সৌজন্যঃ সোনার বাংলাদেশ ব্লগ
::অলটাইম নিউজ::
| Tweet |