প্রারম্ভে আব্বুর উপদেশ
এইখানে, এই ব্লগে ফেসবুকে কিংবা বাস্তব পৃথিবীতে আমার বিচরণের উদ্দেশ্য কেবল একটি। তা হচ্ছে নিজেকে প্রকাশের মাধ্যমে শত শতাব্দী ধরে মানুষের মাঝে চিন্তা, কর্ম অথবা একটি সামান্য মুচকি হাসির মাধ্যমে বেঁচে থাকা, অথবা পরের প্রজন্ম এসে যখন খুঁজবে তার পূর্বসূরিরা কেমন ছিল, কিংবা কি ভাবতো- তখন যেন সহজেই খুঁজে পায়, ঠিক যেভাবে চাইলেই বাসার মোটা বইয়ের বিশাল আলমারির তাকে সাড়ি করে সাজানো আব্বুর ডায়রিগুলো দুর্বার আকর্ষণে খুঁটে খুঁটে পড়ি। আর সেই সাথে প্রিয় মানুষদের দোয়া ও ভালোবাসায় পরকালে বেহেস্তের কোনা-কাঞ্চিতে কিংবা কোন বস্তিতে সামান্য কুঁড়ের বারান্দায় নিজের জন্য একটু যায়গা করে নেয়াটাও উদ্দ্যেশ্য। কেবল শরীরটা কোনমতে রাখতে পারলেই হল। অনেক হিসেব নিকেশ এই সামান্য কদিনের জীবন নিয়ে। আমি তো এখানে এই দুনিয়ায় নতুন, আমার কদিন আগেই এসেছেন আব্বু। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক বেশি সমৃদ্ধ। তাই তার পরামর্শগুলোকে সাথে নিয়েই এগিয়ে চলি। চাকরী করবোনা, একেবারে একগুঁয়ে সিদ্ধান্ত। কিন্তু আব্বু বললেন আগে শিখে নাও তারপর শেখাও। আমি জানি এসব ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খোলা মাঠে আলোচনা না করাই ভালো, তবুও নিজের অবস্থানকে গোপন রেখে আহামরি ভাব ধরার মধ্যে খুব একটা কৃতিত্ব আছে বলে কোনদিনই আমার মনে হয়নি। আমি যা, তা প্রকাশ করে দিতেই পছন্দ। শুরু করলাম সম্পাদনার চাকরি। ফোন বাজছে, +৯৬৬... আসসালামু আলাইকুম আব্বু। কেমন আছেন? খুব নরম, একদম পোয়া মাছের মত হয়ে যায় আমার কণ্ঠস্বর, অটোমেটিক। পোয়া মাছের কণ্ঠ নেই, কিন্তু ঐ সময়ের নিজের ভয়েসটাকে বিশেষায়িত করতে আর কোন উপযুক্ত শব্দ পছন্দ হচ্ছেনা। সাধারণত আব্বুর ফোনের ব্যালেন্স শেষ হওয়ার আগে আমাদের কথা শেষ হয় না। প্রাচ্য পাশ্চাত্য, আর সময়ের বাধন সব কিছু ছাড়িয়ে মহাজাগতিক এই টকিং এক্সপ্রেস চলতেই থাকে। কখনো ধর্ম, কখনো রাজনীতি, কিংবা অর্থনীতি ও শিক্ষা, অথবা আমাদের মানবিকতা এসবই থাকে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। আরও একটু যখন ছোট ছিলাম তখন বিদ্যা বুদ্ধিতে কিংবা উচ্চতায় আব্বুর নাগাল পেতামনা বলে খুব লজ্জা লাগতো তাঁর সাথে কথা বলতে, কিন্তু দিন যেতে যেতে আমিও আব্বুর সমবয়সী হতে চলেছি। হয়তো একটু একটু নাগাল পাচ্ছি তার চিন্তার মহা সমুদ্রের লেজের। তাই কথাগুলো আর ফুরায়-না। যদিও আব্বু কারো অধীনে গোলাম হওয়ার শিক্ষা কোনদিনই দেননি, আর আমারও পয়সা না থাকলে কি হবে গরম কম না টাইপের একটা অবস্থা, তার পরেও অভিজ্ঞতার ঝুলি কিংবা জ্ঞানের ঝুলিকে প্রলম্বিত ও ভারি করতে নেমে পড়তেই হয়। ছেলে অফিস করতে যাবে, বাবার নিজের মধ্যেও হয়তো কিছুটা শিহরণ কাজ করে, তাকে কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে দেয়া উচিৎ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সামান্য কয়েকটি হচ্ছে: ১ যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবে সেই প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস আগেই জেনে নেবে, কেননা তোমার কষ্টার্জিত টাকা যদি কাউকে শোষণ করে কিংবা ঠকিয়ে অথবা ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে নেয়া হয় তবে তুমি সৎ হলেও সেই টাকায় সুখ থাকবেনা। মনে রাখবে টাকা কখনো সুখ দেয়না, বরং টাকার উৎসই সুখ অসুখের কারণ। আমরা সাধারণত বেতন পেলেই খুশি থাকি, সুতরাং সেই দিক থেকে এই উপদেশ আক্ষরিক অর্থে যাই মনে হোক না কেন, পৃথিবীর নিয়ম হচ্ছে আজ আমি যা করবো একদিন তা আমাকেই ভোগ করতে হবে। এটা এক ধরণের দার্শনিক বিষয়, এবং অনেকটা হাইপোথিসিস টাইপের। তাছাড়া সবার জন্য এটা সত্য নাও হতে পারে, কিন্তু এটা মেক্রো সত্য। ২ যে সময় তোমার থাকবে অফিসের জন্য বরাদ্ধ, সে সময়ে অবশ্যই প্রাপ্ত দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে হবে। কেননা ফাঁকিবাজি করলে বেতন হালাল হবেনা, আর যে টাকায় হালাল হারামের সংমিশ্রণ থাকে সে টাকায় ইবাদত কবুল হয়না এবং সংসারে সুখ শান্তি থাকেনা। আপাত দৃষ্টিতে এই উপদেশটি আমাদের কাছে সঠিক মনে নাও হতে পারে, কিন্তু খেয়াল করলে দেখবো, আজকে যারা সরকারী চাকুরীজীবী তারা যেভাবে তাদের কাজের ফাঁকি দেয় এবং টাকা উপার্জনে বৈধ অবৈধের ধার ধারেনা এসব করে তার নিজের দেশটাই যে ভয়াবহ সমস্যায় পড়ছে তা সে মোটেই টের পাচ্ছেনা। অথবা আমার কি? এরকম ভাবনা- তার অনেক টাকা হবে, কিন্তু সে কি ঠিক মত ঘুমোতে পাড়ছে? তার সন্তানকি মানুষের মত মানুষ হচ্ছে? ৩। অবশ্যই অফিসের সবার সাথে সু সম্পর্ক বজায় রাখবে, বিশেষ করে যারা নিন্মশ্রেণীর কর্মচারী আছে তাদের সাথে কখনোই খারাপ আচরণ করবেনা। কেননা তাদের সাথে ভালো আচরণ করা মানুষের সংখ্যা দুনিয়ায় কম। উপদেশটি অনেকের জন্য পালন করা খুবই কঠিন, অনেক এমডিকে দেখেছি ধমকি ধামকি দিয়েই তার পদস্থ সবাইকে তটস্থ রাখে, কিন্তু আন্তরিকতা ও ভালো ব্যাবহার, তবে সেই সাথে অবশ্যই নিয়ম শৃঙ্খলা সম্পর্কে সচেতনতা মেনে চললে কিন্তু তার চেয়েও ভালো ভাবে কাজ আদায় করে নেয়া যায়। আসর পড়ে চেয়ারটাতে এসে বসা মাত্রই অফিসের স্টাফ শাহিন এসে বলে স্যার চা দেব? বললাম দেও। অনেক দিন থেকেই লক্ষ্য করছি সে যখন তার জন্য বরাদ্দ যায়গায় বসে, তখন ওখান থেকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু জিজ্ঞেস করিনি, কিন্তু নিজের মধ্যে একটা অস্বস্তি কাজ করে। যখন কেউ আপনার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে আপনিও টের পাবেন অস্বস্তিটা। সেদিন যখন আমাদের ফ্লোরে কাজ করতে থাকা মিস্ত্রিটার পা কেটে অঝোরে রক্ত ঝরছিল অন্য সবাই যেন \"আমার কি?\" টাইপের একটা ভাব নিয়ে কেটে পড়লো, গিয়ে আঙ্গুলটা চেপে ধরে শাহিনকে টাকা দিয়ে বললাম যাও তুলা স্যাভলন এসব নিয়ে আসো। সে দৌড়ে চলে গেলো, এসে অদ্ভুত ভাবে আমাকে দেখছে, আরে বাপু আমি কি আকাশ থেকে পড়লাম? মনে হল ও বুঝতে চাইছে যে স্যারকে এতো সম্মান করি তিনি ফ্লোরে বসে সামান্য দু পয়সার মিস্ত্রির রক্তাক্ত আঙ্গুলে হাত চেপে রেখেছেন!! নিজ হাতে ড্রেসিং করে দিচ্ছেন!! আমি জানি আমি কোন মহান কাজ করছিনা, যা করছি এটা কেবল আমার মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের প্রতি কর্তব্য কিন্তু অন্যরা তা করছেনা বলেই আমার প্রতি এই দৃষ্টি ওর। সবাই যদি করতো তাহলে এই দৃষ্টির জন্য আমাকে অস্বস্তিতে পড়তে হতোনা। সেই দিন থেকেই স্টার্ট তার পর্যবেক্ষণ। নিজেকে উদ্ভট লাগে, আমি যেগুলো করছি এগুলো বোধহয় করা উচিৎ না। আমি কি এখানে খুবই বেমানান? এখনো সে তাকিয়ে থাকে, আমাকে বলে স্যার আপনি নাকি আলাদা অফিসে বসবেন? আমি বলি হুম, পাশেই তো। স্যার আপনি আপনার অফিসে আমাকে নিয়া যাবেন? কেন? মন চাইলেই তো তুমি আসতে পারবা। না স্যার, আপনেরে আমার অনেক ভালো লাগে। ভালো লাগে শব্দটা শুনেই পুরো শরীরে একটা ঝিলিক লেগে গেলো। মাথার মধ্যে যেনো একটা ঝড় সৃষ্টি হচ্ছে, ব্লগে এতো মানুষ এতো নিক থেকে ঈর্ষান্বিত কিংবা ভুল ইনফরমেশোনের কারণে চরম ভাবে আমাকে অপমান করার সময়েও এরকম হয়নি। চোখের সাদা অংশে চতুর্দিক থেকে পানিরা এসে জমা হতে লাগলো। ভাগ্য ভালো ঠিক এসময়ই এমডি- শাহিন কে কল করেছে। নয়তো সে দেখত তার ভালোবাসা পেয়ে আমি কি কান্নাটাই না কেঁদেছি। সে আমাকে সেই ঘরে নিয়ে যাবে, যেখানে চারশো টাকা ভাড়ায় সে থাকে, বিদ্যুৎহীন সেই খুপড়ীতে গরমে রাতে সে কত কষ্টেই না থাকে। আমাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখাবে তার গ্রাম, সেই বাজার যেখানে তার দোকান ডাকাতিতে ১৮ হাজার টাকা লুট হয়ে যায়। দেখাবে সেই মেলা, যেখানে সে ক্যালেন্ডার ও সেই রঙ্গিন ব্যনার ফেস্টুন পোষ্টার বিক্রি করতো যেগুলোতে লেখা থাকে এমন জীবন তুমি করিও গঠন/ মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন আমার খুব শখ হয়, ওকে বলেও দিয়েছি, আমিও ওর সাথে একদিন কোন মেলার অজানা দোকানদার হয়ে একটা, কেবল একটা পোষ্টার বিক্রি করবো, যেখানে লেখা থাকবে- এমন জীবন তুমি করিও গঠন/ মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন শাহিন কেবল হাসে, লজ্জা পয় আমার কথা শুনে। আমি কল্পনার চোখে দেখি একটি ছোট্ট কিশোর আমার দোকানের সামনে এসে নতুন বানান করতে শেখা ছাত্রের মত করে পড়ছে এ...মন জী...ব...ন তু...উ...মি... খুব মরতে ইচ্ছে করছে, দেখতে ইচ্ছে করছে কেউ কি আমার জন্য কাঁদছে? গুনগুন করে... বহু দূরে কেউ? লাল বৃও