সন্তানের দায়িত্বহীনতা এবং অতঃপর!
বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন পারভিন আক্তার। লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে ভিক্ষা করেন। সাথে ছোট একটা বস্তা। স্বামী ও সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞাস করায় বস্তাটা রেখে বসলেন।

যেন মনে হলো, মনের জমে থাকা কথাগুলো বলার সুযোগ পেয়েছেন। বললেন- এগুলারে (সন্তানদের) আমার কাছে রেখে, অনেক আগেই সে (স্বামী) মারা গেসে। ছেলেমেয়েরে বড় করসি, এখন আমার খবরও লয় না, কই থাকে আমিও জানি না। কাপাকাপা স্বর আর অশ্রুসিক্ত নয়নে অকপটে বলে গেলেন। থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে উত্তর দিলেন- মাইনষের বারান্দায় পইরা থাকি। আর বয়দের জন্য সব দিন ভিক্ষার জন্য বাইর হইতে পারি না। মাইনষের থেইকা চায়া খাই।

এটা ছিলো এক গরিব পরিবারের মায়ের অবস্থা। এবার একটু ধনী পরিবারের দিকে তাকাই। বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী বললেন- দাদী গ্রামে থাকে। ছোটবেলায়.. দেখেছিলাম। এরপর আর খেয়াল নেই। বাবা বছরে টাকা পাঠিয়ে দেয়, এই তো।

একদিকে অসচ্ছ্বল এবং অশিক্ষিত পরিবার, অপরদিকে সচ্ছ্বল ও শিক্ষিত পরিবার। এক পরিবারের সন্তানের কাছে, মা বেচে আছে কি নেই, সেই পরোওয়া নেই, অপর পরিবারে, সন্তান মনে করছে বছরে টাকা পাঠিয়ে দেয়াই বুঝি প্রধান কর্তব্য। তবে উভয় দিকে সমস্যা একই। বাড়ীর বয়স্ক সদস্যরা অবহেলিত, আপনজনের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত, নিঃসঙ্গ , অনেকটা সন্তানদের নজরে বোঝাস্বরূপ।

ধনী হোক কি গরিব, এসব সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে, আমাদের মাঝে প্রকৃত শিক্ষার অভাব। মনুষ্যত্ব, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাব। দিন দিন আমরা আত্মকেন্দ্রিক ও অসামাজিক হয়ে উঠছি। আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে- কিভাবে সমাজে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবো। আমরা এতই ব্যস্ত যে, নিজের জীবনের অসহায়ত্ব অবস্থা থেকে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত চিন্তা করারও সময় নেই। মা-বাবার নিঃস্বার্থ সংগ্রাম-সাধনা, অক্লান্ত পরিশ্রমকে আজ বড় হয়ে আমরা মূল্যায়ন করি না। সত্য হলো তারা আমাদের মুখ থেকে শুধু মূল্যায়নটাই শুনতে চায়। পরিবারের ঐক্যতা সে কামনা করে। অথচ আমরা লক্ষ্য করছি-যে বয়সে এদের যত্নের প্রয়োজন, পারিবারিক সহায়তা ও আন্তরিকতার প্রয়োজন, সেই বয়সেই জীবন বাচাতে কেউ ভিক্ষা করছে ও অন্যের বাড়িতে থাকছে। অপরদিকে কেউ টাকা পেলেও অসহায়,নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছে।

সুতরাং, বর্তমান পরিস্থিতির সুষ্ঠ সমাধান হচ্ছে- একটা শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তার পরিবার থেকে। তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। তাই পিতামাতার কর্তব্য, তারা যেন সন্তানদের সময় দেন, ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে নৈতিক শিক্ষা তথা মূল্যবোধ গড়ে তোলেন। যাতে পরবর্তীতে সন্তানদের থেকেই তার সুফল পেতে পারেন। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিশুশ্রেনী থেকে উচ্চতর ডিগ্রি পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিৎ। কেননা এর কোন বিকল্প নেই। নৈতিকতা গুলিয়ে খাইয়ে দেয়া যায় না। উপলব্ধি করে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করতে হয়। ন্যায়-অন্যায়, দায়িত্ব-কর্তব্য - এসব উপলব্ধী করার ক্ষমতা আমরা যার যার ধর্ম থেকে পাই। আর এমনটি হলেই আশাকরা যায়, আমরা নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবো।

তাছাড়া, যতদিন দেহে প্রাণ আছে ততদিন এই জীবন চলতেই থাকবে। কিন্তু এরই মাঝে আমরা আমাদের আপনজনের প্রতি দায়িত্ব ভুলে গেলে, নিজেদেরও সফল পরিণতি আশা করতে পারি না।
ফাতেমা মাহফুজ ::অল টাইম নিউজ::