
(আফরোজা আদিতি)
শহর, গ্রাম, গঞ্জ জুড়ে ঈদের খুশি। সরু চিকন চাঁদ দেখা গিয়েছে আকাশে।
পুষ্পিতার বাবা-মা পুষ্পিতার জন্য সুন্দর সুন্দর তিনটা পোশাক কিনেছে ঈদে পরার জন্য। পুষ্পিতার
মা, সকালে ওকে গোসল করিয়ে ফিরনি সেমাই খাইয়ে নতুন পোশাক পরিয়ে দিয়েছে। বাবা-মায়ের
খুব আদরের মেয়ে পুষ্পিতা। বাবা-মায়ের চোখের মণি, পুষ্পিতা। পুষ্পিতার জন্য খুব ভালো একটা
চাকরি ছেড়ে দিয়েছে পুষ্পিতার মা।
ওর বাবা চাকরি ছাড়তে না করেছিলো, কিন্তু ওর মা, মুন্নি বলেছেন, আমাদের অতো টাকা-পয়সার
দরকার নেই। এই মেয়েই আমার টাকা। আমার কাছে পুষ্পিতার চেয়ে আর কোন কিছু বড়ো নয়।
ঈদের দিন।
এই আদরের পুষ্পিতার বান্ধবীরা এসেছে। মা, মুন্নি রান্নাঘরে ব্যস্ত ওদের খাবার দেওয়ার জন্য। খাবার
নিয়ে এ ঘরে আসতেই সকলে মিলে গল্প বলার বায়না ধরলো মায়ের কাছে।
আন্টি, আন্টি গল্প বলো। রাস্তার ওপাশের দোতলা বাড়ির মেয়ে, নন্দিনী বলে আদুরে কন্ঠে। নন্দিনীর
সঙ্গে পাশের ফ্ল্যাটের কৃষ্ণা, শিলা, জোনাকি,মিতিও সুর মেলায়।
মা বলেন, এখন কাজের সময় যে মামণিরা।
মায়ের কথায় ওরা চুপ করে না। আরও বেশী আদুরে কণ্ঠে বলে, না, না, আন্টি বলতেই হবে।
বলতেই হবে।
মা আর কী করে। বলেন, ঠিক আছে, তোমরা খাও আমি গল্প বলছি। কিন্তু শুধু একটা। একটার বেশি
নয়। ঠিক আছে।
মেয়েরা তাতেই রাজী।
মা, গল্প শুরু করেন।
আমাদের নবীজি, হযরত মুহম্মদ (সঃ) এক ঈদের দিন, নামাজ পড়তে ঈদ্গাহে যাচ্ছিলেন। যেতে
যেতে দেখেন, পথের পাশে একটি শিশুকে কাঁদছে। ঈদ্গাহে না গিয়ে শিশুটির কাছে গিয়ে আদর করে
জিজ্ঞাসা করেন, কাঁদছো কেন সোনামণি ?
শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমার জামা নেই। বাবার টাকা নেই, নতুন জামা কিনে দিতে পারে
নাই।
নবীজি, শিশুটিকে আদর করে কোলে করে বাড়ি নিয়ে আসেন। তাঁর স্ত্রী, বিবি খাদিজা (রাঃ) এর
কাছে শিশুটিকে দিয়ে বললেন, ওকে গোসল করিয়ে খাইয়ে দিতে। বিবি খাদিজা (রাঃ) শিশুটিকে
গোসল করাতে নিয়ে গেলেন আর নবীজি গেলেন বাজারে। বাজার থেকে নতুন জামা, পায়জামা, টুপি
কিনে এনে তাকে পরিয়ে নিয়ে গেলেন ঈদ্গাহ মাঠে।
শিশুটি নতুন জামা পেয়ে খুব খুশি। তার খুশিতে চকচকে মুখ দেখে নবীজির হৃদয়ও খুশি আনন্দে পূর্ণ
হয়ে গেলো।
গল্প শুনে পুষ্পিতা খুশিতে চোখ-মুখ ভরিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, তাই।
মা হেসে বললো, হ্যাঁ, আমাদের নবীজি খুবই ভালো মানুষ ছিলেন।
মায়ের গল্প শেষ। ওদের খাওয়াও শেষ। মা খাবারের বাটিগুলো আর এঁটো বাসনপত্র রান্নাঘরে নিয়ে
গেলন। নন্দিনী বললো, এখন তোরা সব আমাদের বাড়ি চল।
পুষ্পিতা, মাকে না বলে কোথাও যায় না। ও রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে বললো, মা, আমি নন্দিনীদের
বাড়ি যাই।
মা বললেন, যাও। কিন্তু বেশি দেরী করো না। বাবা, নামাজ পড়ে চলে আসবে।
ওরা বের হয়ে গেলো। মায়ের হাতে যা টুকটাক কাজ ছিলো তা শেষ করে গোসল করে নতুন শাড়ি
পরে, খাবার টেবিল সাজিয়ে পুষ্পিতার বাবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। পুষ্পিতার বাবার সঙ্গে
মেহমানও আসবে। প্রতি ঈদেই আসে। অফিসের সহকর্মীরা, ফ্ল্যাটের পড়শিরা আসে। ঈদের দিন
পুষ্পিতার দাদা, দাদী, নানা, নানী, চাচা, চাচী, চাচাতো ভাই বোনেরা সবাই আসে। পুষ্পিতার মামা
থাকে রংপুর। ঈদের পরে ওরাও আসে। ফুফু দেশে থাকে না। সুইডেন প্রবাসী। বছরে একবার আসে,
তখন কিছুদিন ওদের সঙ্গে কাটিয়ে যায়।
ডোর বেলের শব্দ। দরোজা খুলে অবাক পুষ্পিতার মা। পুষ্পিতা এসেছে, সঙ্গে ৮/৯ বছরের এক মেয়ে।
মেয়েটার পরনে ছেঁড়া ময়লা কাপড়। ঘরে ঢুকেই পুষ্পিতা বলে, মা,এই দেখো, এর নাম নীলা। ও
আমার বন্ধু। আমার সঙ্গে থাকবে। বাবা, বাবা, তুমি কোথায়? বাবাকে ডাকে পুষ্পিতা।
বাবার সাড়া না পেয়ে মাকে বলে, বাবা আসে নি মা।
না। তুমি ওই মেয়েটাকে কেন এনেছো, আর ওই মেয়েটা কেন থাকবে আমাদের সঙ্গে ! ওর মা-বাবা
আছে না !
কার মা, বাবা আছে। বলতে বলতে বাবা ঘরে ঢোকে, সঙ্গে মেহমান।
মা মেহমানদের বসতে দিয়ে পুষ্পিতাদের ভেতরের ঘরে নিয়ে যান। মেয়েকে বলেন, ওকে যে নিয়ে
এসেছো, ওর মা-বাবা খুঁজবে তো ওকে।
কাতর কণ্ঠে পুষ্পিতা বলে, না, মা। কেউ খুঁজবে না ওকে, ওর মা, বাবা কেউ নেই। ওকে ফেলে
কোথায় চলে গেছে ওরা।
কেন যে এই সব বাবা মা সন্তানকে ছেড়ে চলে যায়। নিজের মনেই গজগজ করে মা। এইটুকু মেয়ে !
মায়ের বুকেও মেয়েটার জন্য দরদ। মেয়েটাকে কোথায় থাকে কি করে জিজ্ঞাসা করেন মা।
একটা নতুন জামা কিনে দাও না, মা ওকে। আদুরে কণ্ঠ পুষ্পিতার।
ঠিক আছে, মামণি। পুষ্পিতার মা পুষ্পিতার ছোট মনে কোন কষ্ট দিতে চান না। ওকে কাছে টেনে
নেন, কী করবেন বুঝতে পারেন না কিছুই।
মেহমান চলে যাওয়ার পর ভেতরের ঘরে আসেন বাবা। বলে, কী ব্যাপার তোমাদের ? কি হয়েছে ? এই
মেয়েটা কে ?
পুষ্পিতা দৌড়ে যায় বাবার কাছে। বলে, ও নীলা। ওর বাবা মা নেই, ও ফুল বিক্রি করে বাবা। ওর
জামা-কাপড় নেই। একটা নতুন জামা কিনে দাও না, বাবা।
এক দৌড়ে মায়ের কাছে এসে বলে, দাও না ওকে গোসল করিয়ে। তুমি না বললে আমাদের নবীজির
স্ত্রী বিবি খাদিজা (রাঃ) সেই ছোট বাচ্চাকে গোসল করিয়েছেন, আর নবীজি নতুন পোশাক কিনে
দিয়েছেন।
মা বললো, হ্যাঁ করিয়েছেন। কিন্তু ওই শিশুটির বাবা, মা তো ওকে নিয়ে গিয়েছেন।
মা, নীলাকে তো কেউ নেবে না। ওর তো কেউ নেই। ও আমাদের সঙ্গেই থাকবে। ও আমার বন্ধু
হবে, আমার বোন হবে। তোমাকে মা বলবে, আর বাবাকে বলবে বাবা। ও স্কুলে পড়বে, মা।
ঠিক আছে পুষ্পিতা।
পুষ্পিতা খুশি আনন্দে ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের বুকে। মা, পুষ্পিতাকে জড়িয়ে ধরে, জড়িয়ে ধরে নীলাকেও।
পুষ্পিতার চোখে পানি চলে আসে। ভেজা ভেজা কণ্ঠে বলে, মা তুমি খুব ভালো, খুব ভালো মা, তুমি।
| Tweet |