
ঢাকা-এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশ থেকে সিমানা অতিক্রম করে বাংলাদেশে অনায়াসে প্রবেশ করছে এইড্স’র জীবানু। উত্তরাঞ্চলের চেকপয়েন্টগুলোতে মরনব্যাধি এইড্স প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন ভারতসহ বিভিন্ন দেশ হতে শত শত নাগরিক ওই সব চেকপয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করলেও ওই সমস্ত ব্যক্তিরা এইচআইভি জীবানু বহন করছে। দেশে এইডসে চিকিৎসা এমনকি জীবানু পরীক্ষা-নিরিক্ষার জন্য কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল বা মেডিকেল ক্যাম্প গড়ে উঠেনি। ফলে পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতের ন্যায় বাংলাদেশেও এ রোগের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাওয়াসহ এ জীবানুর আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, দেশে বর্তমানে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৮৮ জন। তবে প্রাথমিক ধারণায় এর সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজার। মোট এইড্সের আক্রান্তের সংখ্যা ৮৫০ জন। তার মধ্যে প্রায় ২৪৫ জন এ রোগে মৃত্যুবরণ করেছে। গত ২০১০ সালে দেশে নতুন করে এইচআইভি ভাইরাসে ৩৪৩ জন আক্রান্ত হওয়ার মধ্যে ২৩১ জন এবং এইডসে ৩৭জন মৃত্যুবরণ করেছে। তাছাড়া চলতি সালে এ রোগে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া যায়নি। এদিকে উত্তর জনপদের চাপাইনবাবগঞ্জের বাংলাবন্দর, জয়পুরহাটের হিলি, দিনাজপুরের চিরির বন্দরসহ লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারী শুল্ক বন্দরের মাত্র ৩শ’ গজ অদূরে ভারতীয় চ্যাংরাবান্ধার প্রাচীন পতিতালয়টি শুধু ভারতে নয়, বাংলাদেশের জন্যও এইড্স ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ওই এলাকা থেকে প্রতিদিন ৩ থেকে সাড়ে ৩শ’ ভারতীয় ট্রাক ড্রাইভার বিভিন্ন পণ্যাদী নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কিন্তু এদের শরীরে এইচআইভি জীবানু আছে কি না তা পরীক্ষাগার না থাকায় জানার কোন উপায় নেই। এ অঞ্চলের ইমিগ্রেশন পয়েন্টগুলো দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের পাশাপাশি ভুটান, নেপালসহ পাশ্চাত্য বহু দেশের পর্যটক, ব্যবসায়ী ছাত্র-ছাত্রীরাও বাংলাদেশে এসে থাকে। এদের রক্ত পরীক্ষা করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোন কার্যক্রমতো নেই-ই বরং কেয়ার বাংলাদেশের আর্থিক সহযোগীতায় একটি এনজিও এইড্স প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম হাতে নিলেও ফান্ডের অভাবে তা দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে।
লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে এইড্স রোগ নির্ণয়ের জন্য প্যাথলজীতে যে কিটস ব্যবহার করা হত, সেটিও ঢাকা থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে এইচআইভি পরীক্ষা করানো যাচ্ছে না। স্থানীয় কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থা জানিয়েছে, প্রতিনিয়ত ভারত থেকে ট্রাক চালক, হেলপার ও খারাসিরা এদেশে এসে ঝুঁকিপূর্ণ যৌনাচারে লিপ্ত হচ্ছে। একই রকম আচরণে অংশ নেয় বাংলাদেশী শ্রমিকরাও। এসব আচরণের কারণে শুধু সীমান্তবর্তী বুড়িমারী নয়, সমগ্র বাংলাদেশে এইড্স বিস্তারের ঝুঁকি মারাত্বকভাবে বেড়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ভারতে এইচআইভি রোগের জীবানু বহন করছে অন্তত ৪২ লাখ মানুষ। গত বছর বিশ্ব এইড্স সম্মেলনে এ সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বিভিন্ন চোরাচালান কর্মকান্ডে বিপুল সংখ্যক নারী জড়িত রয়েছে। তারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা যৌন হয়রানীর শিকার হয় বলে নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে। কেয়ার বাংলাদেশ এইচআইভি প্রোগ্রাম এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার সূত্রে জানা গেছে, এদেশের ট্রাক শ্রমিকদের অধিকাংশই বুড়িমারী থেকে পণ্য নিতে এসে যৌন কর্মীদের সঙ্গে মিলিত হয়। সেখান থেকে তারা পণ্য গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে এরা বাড়ি ফিরে আবার তাদের স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়। ফলে এভাবেই অতি দ্রুত এইচআইভির জীবানু ছড়িয়ে পড়ার আশংকা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অন্যদিকে মরাত্বক ব্যাধী এইডস ও এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা বা পরীক্ষা-নিরিক্ষার জন্য সরকারী হাসপাতালগুলোতে বছরখানেক আগে আমদানিকৃত এইডস চিকিৎসার সিডিফোর যন্ত্রগুলো সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বর্তমানে অজ্ঞাত কারণে অব্যবহৃত রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এইডস বা এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার কাজে বেসরকারী সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশসহ আরো ২/১ সংস্থা বেসরকারী উদ্যোগে কিছুটা কাজ করে যাচ্ছে। তবে জাতীয় এইডস/এসটিডি প্রোগ্রাম (এনএএসপি) সারাদেশের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে এইডসের চিকিৎসার সাথে জড়িত এনজিওগুলোর কার্যক্রম ঠিকমতো মনিটরিং করছে না। এমনকি গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে ভারত থেকে আমদানিকৃত দাতাসংস্থাগুলোও সংশ্লিষ্ট এনজিওর সাথে সমন্বয়ের অভাবও রয়েছে।
| Tweet |