
ঢাকা- বিগত বছরের শেষ মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স আসলেও ডলারের বিপরীতে টাকা যেভাবে মান হারাচ্ছে, তা নিয়ে শঙ্কিত অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি, আমদানি, বিনিয়োগসহ অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জানুয়ারি প্রতি ডলারের বিনিময়ে হাতবদল হয়েছে ৮২ টাকা, যদিও বিদেশি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে টাকা বিকিয়েছে আরো সস্তায়। অথচ গত বছরের ৪ জানুয়ারি প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ৭০ থেকে ৭০ টাকা ২৫ পয়সায়।
এই হিসাবে, গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ১৫ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান এতোটা কমেনি। ডলারের দর বৃদ্ধির কারণে সরকার বাধ্য হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে। এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন অর্থনীবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক অর্থনীতিবিদ জায়েদ বখত বলেন,টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার যেভাবে বাড়ছে তা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সমস্যা। এটা শুধু মূল্যস্ফীতিকেই উস্কে দিচ্ছে না, বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে শিল্পদ্যোক্তরা মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। এতে শিল্প উৎপাদন কমে যাবে, কমবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিনিয়োগে, অর্থনীতিতে।
এই ধারা চললে বাজেটে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অর্জিত নাও হতে পারে বলে মনে করেন বিআইডিএসের এই জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি ২০১১-১২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) শিল্প স্থাপনের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলার পমিাণ কমেছে ৩৮ শতাংশ।
অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছিলো ১০৫ শতাংশ। আর পুরো অর্থবছরে তা বেড়েছিলো ৪০ দশমিক ২০ শতাংশ হারে।
গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছিলো ৬৫ শতাংশ। এবার একই সময়ে তা ৮ শতাংশের মতো কমেছে। গত অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছিলো ৪৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসভিত্তিক) মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত ১০ মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি দুই অংকের ঘরে (ডাবল ডিজিট) অবস্থান করছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ডলারের দাম উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সা¤প্রতিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় এক টাকার মতো করে বেড়েছে। এই পরিস্থিতি অর্থনীতিকেও বেসামাল করে তুলেছে।
তিনি বলেন, ডলারের দাম বাড়ার কারণে সরকারকে বাধ্য হয়ে তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। ডিসেম্বরে সর্বশেষ তেলের দাম বাড়ানো সংক্রান্ত তথ্য বিবরণীতেও তা উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে দুুই দফা তেলের দাম বাড়িয়ে যে টাকা বেশি আয় হয়েছিল, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে তার পুরোটাই চলে গেছে।”
ডলারের দর অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর সভাপতি এ কে আজাদও। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ডলারের দর বৃদ্ধি অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।
সাওন ::অল টাইম নিউজ::
| Tweet |