শাওন চৌধুরী : রাজশাহীতে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগের বিবদমান বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগ যে ছাত্রলীগেরই প্রতিপক্ষ, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে সংগঠনের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কোনো কমিটি না থাকায় ছাত্রলীগের কর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন পক্ষ তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবিরের হামলার পর ১৪টি মামলা হলে শিবিরের কর্মীরা ক্যাম্পাসছাড়া হয়। রাজশাহী মহানগরের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও শিবিরের নেতা-কর্মীরা সরে যান। কিন্তু গত দুই মাসে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পক্ষ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই একাধিকবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একই ঘটনা ঘটে রাজশাহী প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজেও।
সর্বশেষ রাজশাহী প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বুধবার রাতে ছাত্রলীগের আল আমিন ও হারুন অর রশিদের নেতৃত্বাধীন অংশ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন অংশের কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে গুরুতর জখম চারজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রেজাউলের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে আল আমিন ও হারুনের নেতৃত্বাধীন অংশের চাঁদাবাজিসহ অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করায় তাঁর কর্মীদের ওপরে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে ১০ বছর ধরে ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই। দল ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই ছাত্রলীগের পরিচয় দিয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে। তিনি অভিযোগ করেন, হারুন নিজেই ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি ছাত্রলীগ পরিচয়ে রাজনীতি শুরু করেন।
হারুন অর রশিদ পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, রেজাউল নিষ্ক্রিয় শিবির কর্মীদের নিয়ে নিজের দল ভারী করছেন। এসব নিয়ে তর্ক-বিতর্কের সূত্র ধরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। তিনি শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজে শাখা ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে মাসখানেক আগে। এই কমিটিতে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকই নির্বাচিত ছিল। পরে ৫১ সদস্যের একটি কমিটি মহানগরে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও তা অনুমোদন হয়নি। গত ১৯ এপ্রিল থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির পক্ষে-বিপক্ষে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর একটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন কমিটির সভাপতি অশোক কুমার। অপর অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন সংগঠনের ‘বঞ্চিত’ নেতা-কর্মীরা। গত বৃহস্পতিবার দুই পক্ষ ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি শোডাউন করে। এই অবস্থায় যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
অশোক কুমার অভিযোগ করেন, ছাত্রদল ও শিবির থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা ক্যাম্পাসে সমস্যা সৃষ্টি করছেন।
দীর্ঘ ছয় বছর পরে গত ২৭ জানুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ছয় সদস্যের কমিটি হয়েছে। এরই মধ্যে কমিটির সভাপতি মাজেদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আওয়াল কবিরের অনুসারীদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়। গত ১৮ মার্চ দুই পক্ষের সংঘর্ষে সাতজন আহত হয়।
সংঘর্ষের ব্যাপারে মাজেদুল বলেন, দল ক্ষমতায় আসার পরে সুবিধাভোগীরা ঢুকে সংগঠনের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের কোণঠাসা করেছে। এই সুবিধাভোগীদের ঠেকাতে গেলেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হচ্ছে। আওয়াল কবির বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এসব ঘটনা ঘটছে।
রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জেডু সরকার দাবি করেন, ছাত্রলীগের নেতারা আধিপত্য বিস্তারের জন্য ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের যে কর্মীদের সঙ্গে নিচ্ছেন, তাঁরাই ভেতরে ঢুকে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটাচ্ছেন।
