“”

“”

৩৬ দফা নিয়ে সার্কের নতুন ফোরাম

লিখেছেন শাবুজ on এপ্রি 30th, 2010 and filed under Gallery. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

সার্ককে কার্যকর জোটে পরিণত করতে দক্ষিণ এশিয়া ফোরাম গঠন করা হবে। শুধু সদস্যদেশের সরকারই নয়, বিশিষ্ট নাগরিক ও অনাবাসী লোকজনও থাকবেন এই ফোরামে। এ ছাড়া এ অঞ্চলের দেড় শ কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন করতে হলে একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি গণতন্ত্র সুসংহত করে যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার করে নতুন দক্ষিণ এশীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। সার্কের রজতজয়ন্তী পূর্তির বছরে এ বিষয়গুলোতে ঐক্যবদ্ধ অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় শেষ হয়েছে ষোড়শ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন।
ভুটানের রাজধানী থিম্পুর গ্র্যান্ড অ্যাসেম্বলি হলে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা ৩৬ দফা ‘থিম্পু রজতজয়ন্তী ঘোষণা’ এবং প্রথমবারের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে একটি বিবৃতি অনুমোদন করেন। এ ছাড়া সম্মেলনে দুটি চুক্তিও সই হয়েছে।
রজতজয়ন্তী ঘোষণায় জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও ভবিষ্যত্ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের রূপরেখা তৈরিতে এক দার্শনিক কর্মপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। ঘোষণায় এ অঞ্চলের দেশগুলোতে গণতন্ত্র সুসংহত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো পর্যবেক্ষক দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানো্র হয়েছে। এবার পর্যবেক্ষক দেশগুলোর দেওয়া আর্থিক ও প্রকল্পভিত্তিক সাহায্যের বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
সার্কের পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন হবে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে। গতকাল সন্ধ্যায় ষোড়শ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন শেষে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১১ সালের আগস্টে মালদ্বীপে মিলিত হবেন দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মালদ্বীপ এর আগে ২০০৮ ও ২০০৯ সালে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনে অপারগতা প্রকাশ করেছিল।
সমাপনী অধিবেশন: সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে নেতারা সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত কারুশিল্প ও চিত্রকর্ম প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন।
সমাপনী অধিবেশনে প্রথমে থিম্পু রজতজয়ন্তী ঘোষণা অনুমোদন করা হয়। এরপর সার্কভুক্ত দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা পরিবেশ সহযোগিতাবিষয়ক সার্ক কনভেনশন (সার্ক কনভেশন অন এনভায়রনমেন্ট) ও্র সাফটায় সেবা বাণিজ্য চুক্তিতে (এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড ইন সার্ভিসেস) সই করেন। পরিবেশসংক্রান্ত চুক্তির আওতায় পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সদস্যদেশগুলো একযোগে কাজ করবে। আর সেবা বাণিজ্য চুক্তির আওতায় স্বাস্থ্য, সেবা খাত, যোগাযোগ, কম্পিউটিং, তথ্যপ্রবাহ এবং বিমান যোগাযোগ ও বিভিন্ন সেবা খাতে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি থাকছে। এ ছাড়া এসব খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একযোগে কাজ করবে সদস্যদেশগুলো। এ অধিবেশনে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী জিগমে ওয়াই থিনলে ও মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ বক্তব্য দেন।
রজতজয়ন্তী ঘোষণা: প্রত্যাশিত অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি সার্ক—এ কথাটি ঘুরেফিরেই এসেছে সার্ক নেতাদের মুখ থেকে। এ প্রেক্ষাপটে নেতারা একটি ভবিষ্যত্ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। তাই ভবিষ্যত্ উন্নয়নের স্বার্থে তাঁরা দক্ষিণ এশীয় ফোরাম গঠনের ব্যাপারে একমত হয়েছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে এ ফোরাম গঠন করা হবে, যার কাজ হবে সার্ককে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নির্দেশনা দেওয়া। এ অঞ্চলের উন্নয়নে সার্কের বর্তমান সংস্থাগুলোকেও অধিকতর কার্যকর করতে দিকনির্দেশনা দেবে ফোরাম। ভবিষ্যত্ দক্ষিণ এশিয়ার স্বার্থে সদস্যদেশগুলোর বাইরেও বহুমুখী অংশগ্রহণের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন বিকাশের স্বার্থে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণতন্ত্রকে কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন এ অঞ্চলের শীর্ষ নেতারা। তাঁরা গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ‘সার্ক গণতন্ত্র সনদ’ গ্রহণে ঢাকায় একটি আন্তরাষ্ট্রীয় বৈঠক হবে। বাংলাদেশ এ সনদের ধারণাপত্র তৈরি করে সবার মধ্যে বিতরণ করবে।
এ অঞ্চলে সুখ-সমৃদ্ধি ছড়িয়ে দিতে ভুটানের প্রস্তাবিত ‘সবার জন্য সুখ সমৃদ্ধি’ ধারণাকে স্বাগত জানিয়েছে সদস্যদেশগুলো। দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে এ ধারণাপত্র নিয়ে ২০১০ সালে একটি কর্মশালার ব্যাপারে ভুটানের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঘোষণায় পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ জন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে পুনঃনবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া এ ব্যাপারে বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে।
সাফটায় সেবা বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে ঘোষণায় আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
সার্কের আওতায় আন্তরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বাড়াতে যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে যোগাযোগ বাড়াতে ২০১০—২০২০ পর্যন্ত এক দশককে ‘সার্ক যোগাযোগের দশক’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মোটরযান ও রেলযোগাযোগ বিষয়ে দুটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে আলোচনা ত্বরান্বিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শীর্ষ নেতারা সার্ক কৃষিমন্ত্রীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ব্যাপারেও নির্দেশনা দেন। কৃষি ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, কৌশল ও সরঞ্জামাদির ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিনিময়ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি আঞ্চলিক বীজভান্ডার স্থাপনের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বিবৃতি: ধারাবাহিকভাবে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার বৈচিত্র্যপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার ব্যাপারে এ অঞ্চলের নেতারা যে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন, সেটি জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এ অঞ্চলে দ্বৈত ঝুঁকি তৈরি করেছে। এটি একদিকে আবহাওয়ার ক্ষেত্রে যেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তেমনি উন্নয়নে বাধার সৃষ্টি করছে। এ প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা এ অঞ্চলকে সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণকারী অঞ্চল হিসেবে বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে চায়। এ লক্ষ্যে স্বল্প কার্বন প্রযুক্তি ও পুনঃনবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে বিবৃতিতে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে থিম্পু ঘোষণায় বলা হয়, ঢাকা ঘোষণা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সার্ক কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনে সার্ক কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী আঞ্চলিক সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে সব দেশ রাজি হয়েছে।
সার্ক সচিবালয়কে দুটি সমীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর একটি হবে কিয়োটো প্রটোকলের অধীনে সার্কের অভিযোজন তহবিলের আওতায় প্রকল্প গ্রহণ, অন্য সমীক্ষার লক্ষ্য হবে এ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কতটা তা যাচাই করা; পাশাপাশি সমন্বিতভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে ওই সমীক্ষায়।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ও সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণের দৃষ্টান্তের ব্যাপারে জনসচেতনতা তৈরির পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এক কোটি গাছের চারা রোপণের কর্মসূচি নেওয়া হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনে চার ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সমুদ্র, পাহাড়, মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপারে সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
বাংলাদেশের দুটি প্রস্তাব গৃহীত: থিম্পু ঘোষণায় বাংলাদেশের দুটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। একটি গণতন্ত্র সুসংহতকরণ, অন্যটি খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে বীজভান্ডার প্রতিষ্ঠা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বলেছিলেন, ‘ইতিহাস থেকে আমরা এ শিক্ষাই পেয়েছি, একমাত্র গণতন্ত্রই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে। গণতন্ত্রকে এখন আমাদের লালন-পালনের মাধ্যমে বিকশিত করতে হবে। আমার বিশ্বাস, বিষয়টি সার্কের গণতন্ত্রের সনদে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।’ তাঁর এই প্রস্তাব ঘোষণার অষ্টম দফা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য উত্পাদনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে—এ বিষয়টি মাথায় রেখে এই অঞ্চলে একটি শস্যভান্ডার গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।

Leave a Reply

Advertisement





বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন
০১৮১৮৩৫০৯৪৬
০১৯১১৭৯৬৩৬৩