শাহাদাৎ শাওন : দেশের শিশু শ্রমিকরা ভালো নেই। মূল্যস্ফীতির অব্যাহত ঊর্ধ্বগতির কশাঘাতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শ্রমিকরাই। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, টাকার মান ক
মছে_ এ দুইয়ে মিলে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে নাভিশ্বাস উঠেছে তাদের। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে যেখানে শ্রমের মূল্য বাড়ার কথা, সেখানে মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত হিসাবে শ্রমের মূল্য কমছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়া এবং মূল্যস্ফীতির কারণে গত এক বছরে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় না বাড়ায় চাহিদা ও বাস্তবতার মাঝখানে অমানবিক আপসের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণ ও অন্যান্য চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনীয়তা। অপুষ্টি আশঙ্কাজনকভাবে বিস্তার লাভ করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শ্রমিক পরিবারের ওপর।
আয়-ব্যয় : নারায়ণগঞ্জের ফতুলল্গা অ্যাপারেলসে কাজ করেন মুক্তা বেগম (২০)। মাসিক বেতন তার ১ হাজার ৭০০ টাকা তার স্বামী ইউনুস একই প্রতিষ্ঠানের ফিনিশিং বিভাগে ২ হাজার ৪০০ টাকা বেতনে কাজ করেন। দু’জনে মিলে মাসে দেড়শ’ টাকা হাজিরা বোনাস পান। ঘণ্টায় মুক্তা ১১ টাকা আর ইউনুস ১৫ টাকা ওভারটাইম পান। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নিয়মিত কাজ। এরপর ওভারটাইম। সবমিলে তারা যে আয় করেন তা থেকে নিজেদের খরচ মিটিয়ে গ্রামের বাড়িতে কিছু টাকা পাঠাতে হয়। এতে তাদের দিন চলে খুব কষ্টে। এ রকম প্রায় সব শ্রমিকেরই একই অবস্থা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার
স্টাডিসের (বিআইএলএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন শ্রমিক পরিবারের খাদ্য খাতে ব্যয় তাদের মোট ব্যয়ের ৪৪ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং পরিবারের অন্যান্য ব্যয় ৫৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ৪ সদস্যের একটি পরিবারের জন্য পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে কমপক্ষে প্রয়োজন ১৫ হাজার ৪৯৮ টাকা। পরিবারের একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি থাকলে তাকে ওই পরিমাণ অর্থ আয় করতে হবে। শ্রমিকদের বেশিরভাগের পক্ষেই ওই আয় সম্ভব হচ্ছে না। আর দু’জন কর্মক্ষম ব্যক্তি থাকলে তাদের খরচের জন্য মাসিক আয় করতে হবে জনপ্রতি কমপক্ষে ৭ হাজার ৭৪৯ টাকা। বাস্তবে চার সদস্যের পরিবারে দু’জন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকে না বললেই চলে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক পেশা হিসেবে স্বীকৃত রিকশাচালক, গৃহকর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নাপিত, ফেরিওয়ালা, ফুটপাতের হকার, মালী, ইলেকট্রিশিয়ান, কুলিসহ শহর অঞ্চলের শ্রমিক পরিবারগুলোর পক্ষে মাসে ওই পরিমাণ আয় করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রে মাসে আয় ৩ থেকে ৭ হাজার টাকা। ফলে শ্রমিকদের স্বাদ ও সাধ্যের মধ্যে থেকে যাচ্ছে বড় ব্যবধান।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী সমকালকে বলেন, মূল্যস্ফীতির হার সবসময়ই স্বল্প আয়ের লোকদের ওপর বেশি আঘাত হানে। আর স্বল্প আয়ের লোকদের বেতন কাঠামো দ্রুত বেশি হারে বাড়ে না। তারা সবসময় কাজও পায় না। ফলে তাদের আয়ের ধারাবাহিকতা থাকে না। তিনি বলেন, অনেক দেশে শ্রমিকদের বেতন প্রতিবছরের মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। বাংলাদেশেও এটা করা উচিত। তাহলে মূল্যস্ফীতির কশাঘাত থেকে অন্তত শ্রমিকরা বেঁচে যাবে।
শ্রমিকদের বেতন : ষাটোর্ধ্ব আলী আকাব্বর ইট ভাঙার কাজ করেন। পাশেই তার অষ্টাদশী মেয়ে ফরিদা। সেও ইট ভাঙার কাজ করে। সংসারে সচ্ছলতা আনতে আলী আকাব্বরের আরেক মেয়ে ফাতেমাও একই কাজ করে। বাপ-বেটি ৩ জনে মিলে মাসে হাজারতিনেক টাকা আয় করেন। ৬০০ টাকা ঘর ভাড়া দেন। বাকি টাকা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। এভাবে কাজ করে তারা কোনো স্বপ্ন দেখতে পারছেন না। ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই। তাদের সংসার অনেকটা দিন আনে দিন চলার মতো চলছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবমতে, সারাদেশে কর্মক্ষম ব্যক্তির সংখ্যা ৪ কোটি ৯৫ লাখ। এর মধ্যে শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। সবচেয়ে বেশি ৩০ থেকে ৩৫ লাখ শ্রমিক কাজ করে তৈরি পোশাক খাতে। এছাড়া বস্ত্র, চামড়া, নির্মাণ, পরিবহন খাতে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করে। তাদের হিসাবে তৈরি পোশাক খাতের একজন শ্রমিকের মাসিক গড় আয় ৩ হাজার ৮৮৮ টাকা। বস্ত্রকল শ্রমিকের মাসিক আয় গড়ে ৪ হাজার ১০৫ টাকা এবং পাটকলে ৩ হাজার ৬৪০ টাকা। ট্যানারি শ্রমিক মাসে আয় করেন গড়ে ৩ হাজার ৬৫০ টাকা। নির্মাণ শ্রমিক পান ৪ হাজার ২৯২ টাকা। পরিবহন শ্রমিকদের মাসিক গড় বেতন ৪ হাজার ২১৯ টাকা। এছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত রিকশাচালক, গৃহকর্মী, পরিচ্ছন্ন কর্মী, নাপিত, ফেরিওয়ালা, ফুটপাতের হকার, মালী, ইলেকট্রিশিয়ান, কুলি এদের বেতন আরও কম। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, গৃহকর্মীর দৈনিক গড় আয় সবচেয়ে কম। একজন গৃহকর্মীর দৈনিক আয় মাত্র ৬৫ টাকা। এ হিসাবে তার মাসিক আয় ১ হাজার ৯৫০ টাকা। একজন রিকশাচালকের দৈনিক ১৫১ টাকা করে গড়ে মাসে আয় করেন ৪ হাজার ৫৩০ টাকা। একজন কুলির দৈনিক আয় ১০৪ টাকা, এ হিসাবে মাসে তার আয় হচ্ছে ৩ হাজার ১২০ টাকা। অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক পেশাজীবীদের দৈনিক গড় আয়ের মধ্যে ফুটপাতের হকার ১৩৮ টাকা, ফেরিওয়ালা ১২৫ টাকা, এ হিসাবে তাদের মাসিক আয় গড়ে ৪ হাজার ১৪০ ও ৩ হাজার ৭৫০ টাকা। পরিচ্ছন্ন কর্মী দৈনিক আয় ১২৪ টাকা, সে হিসাবে তার মাসিক আয় ৩ হাজার ৭২০ টাকা। একজন নাপিত দৈনিক আয় করে ১২৫ টাকা, সে হিসাবে তার মাসিক আয় ৩৭৫০ টাকা। একজন মালীর দৈনিক আয় ৮৮ টাকা। চার সদস্যের পরিবারের মাসিক ব্যয় সাড়ে ১৫ হাজার টাকা হলে এদের সব শ্রেণীর আয় চাহিদার নিচে। ফলে তাদের জীবনযাত্রার মানকে কমাতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে অপুষ্টি, চিকিৎসা, শিক্ষার অভাব।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ টেক্সটাইল-গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহাবুবুর রহমান ইসমাইল সমকালকে বলেন, একজন মানুষকে প্রতিদিন ২২ কিলোক্যালরি খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। চারজনের পরিবারের ওই খাবার কিনতে ব্যয় হয় দিনে ২০০ টাকা। সে হিসেবেই নূ্যনতম মজুরি মাসে ৫ হাজার টাকা করার দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সহ-সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া দিপু বলেন, যখন শ্রমিকদের নূ্যনতম মজুরি ১ হাজার ৬৬২ টাকা ছিল তখন তা ওই সময়ের জন্য ন্যায়সঙ্গত ছিল। তবে মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য মজুরি কমিশন কাজ শুরু করেছে।
খাদ্যপণ্যের দাম : পণ্যের দাম বাড়লে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের ওপর চাপ পড়ে সবচেয়ে বেশি। কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে ক্রমাগতভাবে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট (গত বছরের একই মাসের তুলনায় চলতি বছরের একই মাসে) ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। এর অর্থ হলো ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কোনো শ্রমিক যে পণ্য ১০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে তা কিনতে ব্যয় হয়েছে ১০৯ টাকা ৬ পয়সা। এক বছরের ব্যবধানে একই পণ্য কিনতে ৯ টাকার বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। এর মানে হলো এক বছরের ব্যবধানে শ্রমিকের বেতন না বাড়লে তাদের প্রকৃত আয় ৯ শতাংশের বেশি কমেছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই নিয়মিত বেতনভাতা বাড়ানো হয় না। এমনকি নিয়মিত বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তাটুকুও নেই।
সরকারি বাণিজ্য সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে ২৭ শতাংশ। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোটা চালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ২০/২১ টাকা। এখন এর দাম বেড়ে হয়েছে ২৪ থেকে ২৮ টাকা।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত সমকালকে বলেন, মূল্যস্ফীতি বেশি হলে সীমিত আয়ের শ্রমিকদের ওপর বেশি চাপ পড়ে। কেননা শহরাঞ্চলের অতি সীমিত আয়ের এসব শ্রমিকের পক্ষে বাড়তি আয় করা সম্ভব হয় না। বাজার থেকে বাড়তি দামে চাল, ডাল কিনতে হয় ঠিকই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের বেতন সহসাই বাড়ান না শিল্প মালিকরা। তাই পণ্যের দাম বাড়লে শ্রমিকদের প্রকৃতপক্ষে আয় কমে যায়। এজন্য মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বিদেশে : যেসব দেশে মূল্যস্ফীতির হার বেশি সেসব দেশে নূ্যনতম মজুরি সমন্বয় বিলম্বিত হলে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয়ের পাশাপাশি যুগের পরিবর্তনে নতুন নতুন চাহিদা ও পণ্যের আবির্ভাবের ফলে জীবনযাত্রার ধারা ও মান পরিবর্তনের বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে নূ্যনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হয়।
১৯৫২ সালে প্রথম দ্রব্যমূল্যের ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতি চালু হয়। অনেক দেশে নূ্যনতম মজুরি নির্দিষ্ট সময় পর পর পুনর্নির্ধারণ বা মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মরিশাস, মেক্সিকো, পর্তুগাল এবং স্পেনে প্রতিবছর নূ্যনতম মজুরি মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। কানাডায় করা হয় দুই বছর পরপর। নূ্যনতম মজুরি আইন প্রথম বিকাশ লাভ করে নিউজিল্যান্ডে ১৮৯৬ সালে। এরপর অস্ট্রেলিয়ায় ১৮৯৯ সালে এবং আরও পরে ব্রিটেনে ১৯০৯ সালে। শ্রীলংকায় নূ্যনতম মজুরি অধ্যাদেশ প্রবর্তন করা হয় ১৯৭২ সালে আর আর্জেন্টিনায় গৃহকর্মে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য নূ্যনতম জুরি আইন বা হোমওয়ার্ক অ্যাক্ট চালু হয় ১৯১৮ সালে।