“”

“”

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রনয়ণ।

লিখেছেন শিশির on জুন 25th, 2010 and filed under বাংলাদেশ, শিক্ষাঙ্গন. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

মালিকপক্ষের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিল চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ছাত্রবেতন নির্ধারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একক কর্তৃত্বও বহাল থাকছে।
প্রায় আট বছর ধরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির সুপারিশ শেষে বিলটি এখন পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে সংসদীয় কমিটির কিছু সুপারিশ নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বার্থের কথা বিবেচনা করলে আইনটি মালিকপক্ষের দিকেই গেছে। বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে আইনটির মূল চেতনা কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। তার পরও আইন চিরস্থায়ী নয়। প্রয়োজনে এটি সংশোধনের সুযোগ তো থাকছেই।’ আইনটি চূড়ান্ত এবং যেকোনো সময় সংসদে উঠবে বলে জানান তিনি।
জানতে চাইলে সংসদীয় কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মনে হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ হবে। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা লেখাপড়া না করিয়ে টাকার বিনিময়ে সনদ বিক্রি করছে। আবার মালিকপক্ষের অভিযোগ ছিল, সরকার কোনো আর্থিক সহায়তা না দিলেও ইউজিসি অহেতুক খবরদারি করছে। দুই পক্ষের বিভিন্ন দাবি ও বক্তব্য পর্যালোচনা করে বিলটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।’
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ঘিরে মূল অভিযোগ, ইচ্ছেমতো বেতন-ভাতা আদায় ও টাকার বিনিময়ে সনদ বিক্রি। মন্ত্রণালয়ের তৈরি খসড়া বিলে বলা হয়, ছাত্রবেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ইউজিসির কাছে অনুমোদন নিতে হবে। মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আইনের এ বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছিল। কিন্তু গত ৯ মার্চ সংসদে বিলটি উত্থাপনের পর তা পর্যালোচনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো হয়। কমিটির সদস্য মির্জা আজমকে আহ্বায়ক করে গঠিত তিন সদস্যের উপকমিটি বিলটি পরীক্ষা করে। এরপর স্থায়ী কমিটির ১৪ জুনের সভায় প্রতিবেদনটি সংসদে উত্থাপনের জন্য চূড়ান্ত করা হয়। কমিটির সুপারিশে বলা হয়, ছাত্রবেতন নির্ধারণে অনুমোদন নয়, ইউজিসিকে অবহিত করতে হবে। ইউজিসি অবহিত হওয়ার পর প্রয়োজনে পরামর্শ দিতে পারবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এর ফলে ছাত্রবেতন নির্ধারণে মন্ত্রণালয় বা ইউজিসির কোনো ভূমিকা থাকবে না।
অর্থ কমিটি হাতের মুঠোয়: বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটিও মালিকপক্ষের হাতের মুঠোয় থাকছে। মন্ত্রণালয়ের তৈরি বিলে অর্থ কমিটির প্রধান হিসেবে উপাচার্যকে রাখা হয়েছিল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকপক্ষ এর বিরোধিতা করে আসছিল। স্থায়ী কমিটি মালিকপক্ষের দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে উপাচার্যকে অর্থ কমিটির সভাপতি না করার পক্ষে সুপারিশ করেছে। মালিকপক্ষের দাবি অনুযায়ী বোর্ড অব ট্রাস্টিজের মনোনীত সদস্য অর্থ কমিটির সভাপতি হবেন।
খসড়া আইনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও অর্থ কমিটিতে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের একজন করে মনোনীত সদস্য দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংসদীয় কমিটি সিন্ডিকেট, অর্থ কমিটি ও একাডেমিক কাউন্সিলে একজনের পরিবর্তে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের তিনজন করে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রমের প্রধান হিসেবে উপাচার্যকে স্থান দেওয়ার বিষয়টি বহাল আছে।
সিন্ডিকেটে বাইরের প্রতিনিধি: নতুন বিলে বলা আছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির দুজন প্রতিনিধি সিন্ডিকেটের সদস্য হবেন। ইউজিসির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবেন এই দুই প্রতিনিধি। তবে তাঁরা তো আর নীতিনির্ধারণ বা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। বড়জোর কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে একমত না হলে লিখিত আপত্তি দিতে পারবেন।
সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না: অনুমোদন না থাকা কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিতে পারবে না। এ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার বা টিউটরিয়াল সেন্টারের বিজ্ঞাপন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া যাবে না। এমনকি অননুমোদিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী ভর্তি বা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো প্রসপেক্টাস বা প্রচারপত্র প্রকাশ বা প্রচার করতে পারবে না।
উপাচার্য হতে চাইলে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা: বিলে বলা হয়েছে, উপাচার্য হতে হলে ১০ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাসহ গবেষণা ও প্রশাসনিক কাজে মোট ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়া সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদের যোগ্যতা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ী, আমলা বা পরিবারের অযোগ্য কোনো সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না। বিদ্যমান আইনে এসব পদে নিয়োগ পেতে যোগ্যতার বিষয়টি উপেক্ষিত আছে।
সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতার কথা নতুনভাবে: সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি তৎপরতায় কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের নাম এসেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বিলে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতা বা এ জাতীয় কার্যকলাপে জড়িত কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা করা যাবে না। এ ছাড়া দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও শিক্ষার্থীর স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত হতে পারে এমন কোনো কাজে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিতে পারবে না।
শাখা ক্যাম্পাস ও দূরশিক্ষণ: এ মুহূর্তে সরকার শাখা ক্যাম্পাস বন্ধ রেখেছে। গুটিকয় প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয় গায়ের জোরে বা মামলা ঠুকে দিয়ে অবৈধভাবে শাখা ক্যাম্পাসে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। ইউজিসির চেয়ারম্যান বলেছেন, শাখা ক্যাম্পাস আগেও বৈধ ছিল না, এখনো বৈধ নয়। তবে প্রয়োজন হলে বিধি করে দূরশিক্ষণ দেওয়ার মতো সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শাখাই সরকার অনুমোদিত নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া বাংলাদেশের কোথাও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা এর নামে শাখা স্থাপন করতে বা কোনো ধরনের ডিগ্রি দিতে পারবে না। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের নামে ক্যাম্পাস স্থাপন বা কোর্স চালুর বিষয়টি প্রণীত বিধির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
শাস্তির মাত্রা বাড়বে: বিদ্যমান আইনে অপরাধের জন্য তিন বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। বিলে তা যথাক্রমে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনে নিয়ম না মানলে সরকার কর্তৃক ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে সাময়িক স্থাপন ও পরিচালনার অনুমতি বাতিলসহ বন্ধ ঘোষণার বিধান রাখা হয়েছে।
বিদ্যমান আইনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক সনদের মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ করা আছে। নতুন বিলে সাময়িক সনদের মেয়াদ সাত বছর করা হয়েছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে এক একর: বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, স্থায়ী সনদপ্রাপ্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পাঁচ একর জমি থাকতে হবে। নতুন আইনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ এক একর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হলে দুই একর জমি থাকলেই চলবে।
এলাকা ভিত্তিতে সংরক্ষিত তহবিল: বিদ্যমান আইনে দেশের যেকোনো স্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হলে পাঁচ কোটি টাকা সংরক্ষিত তহবিল থাকার বিধান রয়েছে। নতুন বিলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার জন্য পাঁচ কোটি টাকা এবং অন্যান্য মহানগরের জন্য তিন কোটি টাকার সংরক্ষিত তহবিল থাকার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য দেড় কোটি টাকা তফসিলি ব্যাংকে জমা রাখতে হবে।
বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান সি এম শফি সামি প্রথম আলোকে বলেন, সংসদীয় কমিটির সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় মনে হয়েছে, তাঁরা উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং নতুন প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা ও সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছেন। তিনি বলেন, কমিটির সুপারিশ হাতে না পেলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছিল, তাঁরা আইনটি ইতিবাচকভাবে দেখবেন।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণীত হয় এবং ’৯৮ সালে সংশোধন করা হয়। জোট সরকার ২০০২ সাল থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও মালিকপক্ষের চাপের কারণে বিষয়টি আটকে যায়। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করলেও তা বর্তমান সংসদ অনুমোদন করেনি। বর্তমানে ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দুই লাখ।

Leave a Reply

Advertisement





বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন
০১৮১৮৩৫০৯৪৬
০১৯১১৭৯৬৩৬৩