মাওলানা আশরাফ উদ্দিন খান
ইসলামে ইবাদতের ধারণা খুব স্পষ্ট ও বিস্তৃত। এখানে ইবাদত বলতে কোন সীমাবদ্ধ ধর্মীয় ধারণা বুঝানো হয় না। সাধারণ ধারণায় ইবাদত হতে পারে ব্যক্তিগত কোন ধর্মীয় কাজ-কর্ম, কিন্তু ইসলামে ইবাদতের ধারণা, অভ্যাস ও প্রভাব ব্যক্তির পরিধি অতিক্রম করে সমাজ ও জাতির সভ্যতা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কুরবানির শুরু একজন ব্যক্তির ইসতিসলাম বা আত্মসমার্পণ দিয়ে, আর পরবর্তীতে সেটা ধীরে ধীরে ব্যক্তি-পরিবারকে অতিক্রম করে সমাজ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে সমাজের মধ্য থেকে বৈষম্য দূর করার কৌশল প্রদান করে থাকে। কাজেই এটার শুরু ব্যক্তিগত ইবাদত হলেও এটা শেষ হয় সামাজিক সুফল অর্জনের মধ্য দিয়ে। কুরবানির মধ্যে এমন কিছু ভিত্তি বিদ্যমান রয়েছে যা একটি সভ্যতার সৃষ্টির জন্য অতি প্রয়োজনীয় ভিত্তি।
কুরবানির মধ্যে বিদ্যমান ভিত্তিসমূহ কি কি?
কুরবানির ভিত্তি ও স্তম্ভ কুরবানির আমলের মধ্যে চারটি ভিত্তি ও স্তম্ভ বিদ্যমান যেগুলো হচ্ছে-
1. তাকওয়া
2. ত্যাগ
3. বণ্টন
4. ঐক্য
—তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর ভয়। কুরআনের পরিভাষায় মানুষকে সভ্য মানুষে পরিণত করে এই তাকওয়া। কুরআন বলে ‘তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়ার অধিকারী’। এই তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়ের মাধ্যমে মানুষের ভিতরে দায়িত্ব বোধ ও জবাবদিহিতা তৈরি হয়। ফলে মানুষ দুর্নীতি মুক্ত হয়ে জীবনযাপন করতে শিখে। এভাবে সমাজের মধ্যে আল্লাহভীরু ও দুর্নীতিমুক্ত মানুষের সৃষ্টি হতে থাকে। এক এক করে কিছু আল্লাহভীরু মানুষের সমষ্টিতে একটি আল্লাহভীরু সমাজের বিকাশ করে।
কুরবানির দ্বিতীয় ভিত্তি ছিল ত্যাগ। মদিনাতে মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের মাধ্যমে মুসলিম সভ্যতার যে গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই সভ্যতার একটি উল্লেখযোগ্য ভিত্তি ও গুণ ছিল এই ত্যাগ। কুরআন বলছেঃ وَٱلَّذِينَ تَبَوَّءُو ٱلدَّارَ وَٱلۡإِيمَٰنَ مِن قَبۡلِهِمۡ يُحِبُّونَ مَنۡ هَاجَرَ إِلَيۡهِمۡ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمۡ حَاجَةٗ مِّمَّآ أُوتُواْ وَيُؤۡثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ وَلَوۡ كَانَ بِهِمۡ خَصَاصَةٞۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفۡسِهِۦ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ٩‘… এবং তারা তাদেরকে (অন্যদেরকে) নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় যদিও তাতে তাদের ভীষণ প্রয়োজন থাকে’। (সুরা হাশরঃ ০৯) ত্যাগ এমন একটি গুণ যা মানুষকে মহামানব এবং সভ্যতাকে মানবিক সভ্যতায় পরিণত করে। ত্যাগের বিপরীত ধারণা হচ্ছে দখলদারিত্বের মানসিকতা। যেই মানসিকতা থেকে মানুষের মুক্ত থাকা চেতনা ছাড়া সম্ভব নয়। কুরআনের দুটি আয়াতের দুটি অংশ উল্লেখ করা যাকঃ وَأُحۡضِرَتِ ٱلۡأَنفُسُ ٱلشُّحَّۚ وَإِن تُحۡسِنُواْ وَتَتَّقُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٗا١٢٨‘… মানুষকে কার্পণ্যের উপর সৃষ্টি করা হয়েছে, যদি সৎকর্মশীল হও এবং মুত্তাকী হও তবে তোমরা যা করো নিশ্চয় আল্লাহ তার খবর রাখেন’। (সুরা নিসাঃ ১২৮) وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفۡسِهِۦ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ‘… যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে তারাই সফলকাম’। (সুরা হাশরঃ ০৯) কুরবানির ইবাদত মানুষকে আধুনিক ভোগবাদের ধারণাকে বাদ দিয়ে মানুষের কল্যাণের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করার শিক্ষা দান করে। কুরবানি মানুষকে শেখায় ‘আমি কম নিতে ও অপরকে বেশি দিতে অভ্যস্ত হব’। কুরবানির গোশত বণ্টনের মাধ্যমে নিজের সম্পদকে অন্যের সামনে পেশ করার সবক ও শিক্ষা রয়েছে। এই শিক্ষাকে ব্যাপকতার রুপ দান করতে পারলে সেটা সভ্যতার উপাদানে রুপান্তরিত হবে। এটাকে কুরবানির গোশত থেকে মসজিদে নামাজের জায়গা দখল করা, বাসের সিট দখল, পাবলিক লাইব্রেরীর চেয়ার দখল করা, নিজের গাড়ি দিয়ে কারো স্থান দখল করা থেকে আরো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
আর চতুর্থ ভিত্তি ছিল ঐক্য। অর্থাৎ সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একদিন, এক আমল ও এক অনুভুতির মাধ্যমে সারা দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান নিজেদের মধ্যে ঐক্যের অনুভতি অর্জন করতে সক্ষম হয়। আজক যেহেতু কুরবানি তাঁর যথাযত অর্থ ও মর্ম হারিয়ে নিছক একটি আচার ও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তাই প্রতিবছর কুরবানি আদায় করার পরেও কুরবানির এই ভিত্তিগুলো আমাদের সমাজে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে ইবাদত বা আমল আছে ঠিক কিন্তু তাঁর যথাযথ ফল আমরা অর্জন করতে পারছি না। আমরা আকৃতি গ্রহণ করেছি কিন্তু চেতনা হারিয়ে ফেলেছি, সুন্নত পালন করছি ঠিক কিন্তু সেই প্রেরণা আমাদের মাঝে ধরে রাখতে পারিনি। যে জাতি বা উম্মাহ কুরবানির মর্ম বুঝতে পারে, সেই উম্মাহ ইতিহাস রচনা করতে পারে। আর যে উম্মাহ কুরবানি ভুলে যায় সে তাঁর ইতিহাসকে হারিয়ে ফেলে। আজকে আমাদের কুরবানির মধ্যে হযরত ইবরাহীম আঃ এর আমলের বাহ্যিক রূপ আছে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু যেই ঈমান আর চেতনাকে সাথে নিয়ে তিনি কুরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন সেই ঈমান আর চেতনা থেকে আমাদের অবস্থান কত দূরে। কুরবানির চেতনা যদি আমরা আসলেই ধারণ করতে পারি, তাহলে সেই ধারণাকে আমরা অতি সহজে মুসলিম উম্মাহর সভ্যতার পুনঃনির্মাণে ব্যবহার করার সাহস ও সুযোগ পাবো ইনশা আল্লাহ। আর যদি আমরা প্রতি বছরে অভ্যাস অনুযায়ী কুরবানি করতে থাকি, এর চেতনা ধারণা করা ব্যতীত তাহলে সেটা হবে কুরবানির নিছক সাদৃশ্য গ্রহণ করা। ফলে কুরবানির সুদুর প্রসারি ফল আমরা অর্জন করতে পারব না। যেটা আমাদের প্রতিদিনের আমল প্রমাণ করে দিচ্ছে। আমাদের কুরবানির ভিত্তি হোক তাকওয়া, ত্যাগ, বণ্টন ও ঐক্যের সুতায় গাঁথা একটি সমন্বিত আমল, যা আমাদেরকে সুন্নতে ইবরাহীমের নিকটবর্তী করবে ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ উত্তম তাওফিকদাতা।
লেখক: মাওলানা আশরাফ উদ্দিন খান (খতিব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ)