আশরাফ উদ্দিন খান
কুরআনের সব বিধান একই ধরনের নয়। কিছু বিধান ثابت (সাবিত/অপরিবর্তনীয়)—যার মূল হুকুম সময়, স্থান ও পরিস্থিতি বদলালেও পরিবর্তিত হয় না। আর কিছু বিধান متغير বা পরিবর্তনশীল তবে একটি “متغير” বলতে কুরআনের কোনো আয়াতের হুকুমকে ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা বোঝায় না। বরং পরিবর্তনশীল হলো—প্রয়োগ, উপায়, শর্ত, পরিস্থিতিনির্ভর বিধান বা ইজতিহাদি সিদ্ধান্ত।
কিছু উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করি:
১. ثابت বিধান: যার মূল হুকুম স্থায়ী
ক. সালাত: আল্লাহ বলেন—وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ“তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর।”পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ফরজিয়ত কোনো যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে না। আধুনিক যুগে প্রযুক্তি এসেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে—কিন্তু ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব ও এশার সালাত ফরজ হওয়া পরিবর্তনশীল নয়।
খ. রমজানের রোজা: فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে রোজা রাখে।”রোজার ফরজিয়ত ثابت
গ. উত্তরাধিকার: আল্লাহ বলেন—يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন”। উত্তরাধিকারের নির্ধারিত অংশগুলো কুরআনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে এসেছে। এ ধরনের নির্ধারিত শরিয়তি অংশকে মানুষের সামাজিক পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায় না।
ঘ. সুদের নিষেধাজ্ঞা: وَحَرَّمَ الرِّبَا“এবং তিনি সুদ হারাম করেছেন।”ব্যাংকিং ব্যবস্থা বদলেছে, ডিজিটাল অর্থনীতি এসেছে, অনলাইন লেনদেন এসেছে—কিন্তু রিবা হারাম হওয়ার মূলনীতি পরিবর্তিত হয়নি।
২. متغير: পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র কোথায়?
এখানে সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ হলো শূরা ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। কুরআন বলে—وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ“তাদের কার্যাবলি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।”এখানে শূরা বা পরামর্শ করা —মূলনীতি। কিন্তু শূরা কীভাবে হবে? সরাসরি বৈঠকে? নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে? বিশেষজ্ঞ পরিষদের মাধ্যমে? সংসদীয় কাঠামোর মাধ্যমে? কোনো বিষয়ে জনমত গ্রহণের মাধ্যমে? এসব পদ্ধতি একই রকম হতে বাধ্য নয়। তাহলে মূলনীতি ثابت তবে প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি পরিবর্তনশীল হতে পারে।
ক. যুদ্ধের প্রস্তুতি: খুব গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণআল্লাহ বলেন—وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ“তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তুত রাখো।”এখানে প্রস্তুতি গ্রহণের মূলনীতি স্থায়ী। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর যুগে শক্তির যে উপকরণ ছিল, আজকের যুগে তা একই নয়। তখন ছিল— তলোয়ার, বর্শা, ঘোড়া, ঢাল ইত্যাদি। আজকের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
খ. পোশাকের ক্ষেত্রে একই বিষয়: কুরআন বলে—يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا“হে আদমসন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্যের উপকরণ। কুরআন মুসলিমদের জন্য একটি নির্দিষ্ট এক ধরনের পোশাক নির্ধারণ করেনি। তবে মূলনীতি হলো— সতর আবৃত করা, শালীনতা, সৌন্দর্য, অহংকার ও অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকা। কিন্তু কোন কাপড়? জুব্বা, পাঞ্জাবি, শার্ট, পায়জামা, প্যান্ট, লুঙ্গি, এসবের অনেকটাই عرف ও সংস্কৃতিনির্ভর।
গ. ব্যবসা-বাণিজ্য: আল্লাহ বলেন—وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন”। ব্যবসা হালাল—এটি একটি মূলনীতি। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর যুগের ব্যবসার মাধ্যম আর আজকের ব্যবসার মাধ্যম এক নয়। আজ আছে—অনলাইন শপ ই-কমার্স, ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এসবের প্রত্যেকটির নাম কুরআনে থাকবে—এমন নয়।
তাই মূলনীতি: أحل الله البيع স্থায়ী। কিন্তু নতুন ব্যবসায়িক পদ্ধতিকে সেই মূলনীতি ও শরিয়াহর অন্যান্য বিধানের আলোকে যাচাই করা হবে।
ঘ. পরিবারে “معروف” ধারণাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ: কুরআনে বারবার بالمعروف বা “প্রচলিত ন্যায়সংগত রীতি অনুযায়ী” কথাটি এসেছে।যেমন—وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ“তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।” এখানে সৎভাবে আচরণ করা—স্থায়ী নীতি। কিন্তু পরিবারের— বাসস্থানের ধরন, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, যোগাযোগের পদ্ধতি, পারিবারিক দায়িত্ব পালনের অনেক উপায় সামাজিক রীতি, দেশ, কাল ও সমাজভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। এখানে عرف ও معروف গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইসলামী ফিকহের বড় কাজ হলো: কোনটি نصٌّ قطعي ও ثابت, কোনটি اجتهادي, কোনটি عرف ও مصلحة-নির্ভর এবং কোনটির প্রয়োগ পরিস্থিতিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে—তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা। এক কথায়: الشريعة ثابتة في أصولها، مرنة في فروعها وتطبيقاتها المنضبطة.“শরিয়ত তার মৌলনীতিতে স্থির; আর তার বহু শাখা ও নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগে রয়েছে নমনীয়তা।”
এভাবে যুগ যুগ ধরে অপরিবর্তনীয় কোরআন পরিবর্তনশীল সংবিধানকে নিয়ন্ত্রণ করেছে ও পথ দেখিয়েছে। মানব-প্রণীত সংবিধানে সংশোধন হয় কিন্তু ইসলামে ওহির মূল বিধানে সংশোধন নয়—বরং পরিবর্তনশীল বাস্তবতার জন্য ওহির নীতির অধীনে ইজতিহাদ ও প্রয়োগের বিকাশ হয়।
লেখা: আশরাফ উদ্দিন খান
খতিব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) কেন্দ্রীয় মসজিদ