ক্যাম্পাস

পরিবার থেকে দূরে গোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের রমজান

Published

on

শাকিল আহমেদ, গোবিপ্রবি প্রতিনিধি 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ হলো বন্ধুত্বের ও সোনালি স্মৃতির আধার, যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষকে নস্টালজিক করে রাখে।” গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) ছুটি হলেও ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ভিড় যেন কমছেই না। পরিবার থেকে দূরে শিক্ষার্থীদের রমজান কাটছে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে। ফ্রেন্ড সার্কেলদের সঙ্গে ইফতার মাহফিল এবং নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে তাদের রমজান মাস যেন এক আনন্দঘন পরিবেশে কাটছে।

সেহরিতে একে অপরকে দাওয়াত দিয়ে প্রভাতকেও করে তুলেছে আনন্দের শামিল। এ যেন পরিবারেই বসবাস করছেন তারা।

বিকেল হলে ক্যাম্পাসের সেন্ট্রাল ফিল্ড, প্রশাসনিক ভবনের সামনের মাঠ এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে তারা।

রমজান যতই এগোচ্ছে, ততই যেন তাদের ইফতার মাহফিল বাড়ছে। সেই সঙ্গে রমজানের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ারও যেন শেষ নেই। বিকেলে ইফতার মাহফিলে তারা বিভিন্ন ধরনের ইসলামী সঙ্গীত ও কোরআন তেলাওয়াতসহ নানা আয়োজন করে থাকে। শুধু মুসলিম শিক্ষার্থী নয়, ইফতার মাহফিলে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদেরও অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়।

রমজানে ক্যাম্পাসে থাকার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাবিব বলেন, ‘ক্যাম্পাসে থাকার একটি উদ্দেশ্য হলো আমাদের ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের ইফতার মাহফিল ছিল। সব মিলিয়ে আরও কিছু কাজ আছে, যেমন বন্ধের পর সেমিস্টার পরীক্ষা শুরু হবে—সেজন্যও থেকে যাওয়া।’

“বন্ধুদের সাথে ইফতার-সেহরির আনন্দ”

বন্ধ ক্যাম্পাসে থাকার অনুভূতি প্রকাশ করেন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন,

‘ক্যাম্পাসে গত বছর থাকা হয়নি, কিন্তু এ বছর থাকার পর মনে হচ্ছে যত দিন যাচ্ছে ততই ভালো লাগছে। এখানে বন্ধুদের সঙ্গে এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে ইফতারের আয়োজন হয়। আমরা বিকেলে সবাই একসঙ্গে ইফতার মাহফিলে যোগ দিই। এলাকায় যেভাবে আনন্দের সঙ্গে ইফতার ও সেহরি করি, এখানেও যেন সেই আনন্দই বহমান রয়েছে। যত দিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে আরও কিছুদিন থেকে যাই। আমরা অনেকেই আছি, এজন্য দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে বড় ভাই, ছোট ভাই এবং অন্যান্য সঙ্গী-সাথীদের সঙ্গে থাকতে থাকতে বাসার কথা যেন ভুলেই গেছি। সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসে রমজান মাস ভালোই কাটছে। এখনো বেশ কিছুদিন থাকব, হয়তো ঈদের দু-এক দিন আগেই বাসায় যাব।’

“বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার-সেহরিতে কম মনে পড়ে বাড়ির কথা”

ক্যাম্পাসে থাকার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান হাওলাদার। তিনি বলেন,

‘আমাদের ছুটি যদিও অনেক আগেই হয়ে গেছে, তবুও আমরা এখানে আছি। অনেকে টিউশনের জন্য যেতে পারছি না। আবার বন্ধুদের সঙ্গে সেহরি ও ইফতার একসঙ্গে করতে পারায় খুব বেশি খারাপ লাগছে না এবং বাসার কথাও কম মনে পড়ছে। এখনো অনেকে থাকায় রমজানের পরিবেশ ভালোই লাগছে।’

“শূন্য ক্যাম্পাসে পূর্ণতার রমাদান”

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইমন ইসলামের অভিমতে, ‘শূন্য ক্যাম্পাসে পূর্ণতার রমাদান: এক টুকরো স্মৃতিকথা। বন্ধ ক্যাম্পাসে নিউমার্কেটের চেনা কোলাহল এখন নিস্তব্ধতার চাদরে ঢাকা। লাইব্রেরির টেবিলে জমেছে আলস্যের ধুলো। জনশূন্য এই করিডোরে ক্লাস-অ্যাসাইনমেন্টের দৌড়ঝাঁপ নেই ঠিকই, কিন্তু হলের প্রতিটি কোণে এক মায়াবী বসন্ত নেমেছে—পবিত্র রমজানের ছোঁয়ায়।

রাতের নিস্তব্ধতা, বসন্তের ফুলের সুগন্ধি মেশানো বাতাস সেহরির সময়টাকে করে তুলছে মায়াবী, স্মৃতিকাতর এবং অপার্থিব তৃপ্তিময়। ডাইনিংয়ের মামাদের হাঁকডাক, ছাতার দোকান কিংবা বালুর মাঠের মামাদের আমাদের জন্য অপেক্ষার প্রহর; এমনকি ক্যালিফোর্নিয়া এলাকায় হেঁটে বেড়িয়ে গল্পে মেতে বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে সেহরির অপেক্ষা—এই স্মৃতিগুলোই ক্যাম্পাসের দিনগুলোকে রঙিন করে তোলে।

তাছাড়া ইফতারে বাড়ির ডাইনিংয়ের সেই চেনা পরিপাটি আয়োজন হয়তো নেই, তবে ক্যাম্পাসের নিস্তব্ধতায় বন্ধুদের সঙ্গে মাদুর পেতে অথবা নরম ঘাসের কোমল আদরে বসা—এ যেন এক পশলা মায়ার গল্প। ছোলা-মুড়ি মাখানো আর বরফ-ঠান্ডা শরবতের খোঁজে যখন নিউমার্কেট এলাকায় ছোটাছুটি; সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত তৃপ্তি।

সূর্যাস্তের ঠিক আগমুহূর্তে আজানের প্রতীক্ষায় যখন আমরা সেন্ট্রাল ফিল্ডে গোল হয়ে বসি, বাড়ির শূন্যতাটুকু তখন বন্ধুদের হাসিমুখ আর এই ‘ভাগ করে খাওয়া’র আনন্দেই পূর্ণতা পায়। বিদায়লগ্নে দাঁড়িয়ে এই শূন্য ক্যাম্পাসটাই এখন আমার সবচেয়ে পূর্ণতার গল্প। হ্যাঁ, এটাই ক্যাম্পাসে শেষ রমাদান।

“এমন সুখের দিন তুমি আর নাও পেতে পারো

প্রতিটা ক্ষণ আঁকড়ে ধরো, গাফলতি ঘুম ছাড়ো

খুশবু যে তার ছড়িয়ে যাবে ফেরদাউসের দ্বারে

সুশোভিত হয়ে দেখো দাঁড়ায়ে রাইয়ান।”

এছাড়াও টানা ৪৫ দিন ছুটি দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা বাসায় যেতে বিলম্ব করছে। সেই সঙ্গে তারা রমজানের আনন্দ বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করার জন্য অনেকে ক্যাম্পাসেই রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে রমজানের গান তাদের ইফতারি ও বিভিন্ন আড্ডাকে আরও বেশি আনন্দমুখর করে তুলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Trending

Exit mobile version