বিনোদন

হিজাব ছাড়া গান গাওয়ায় শাস্তি পেলেন গায়িকা

Published

on

ইরানে হিজাব ছাড়া প্রকাশ্যে গান পরিবেশন করাকে কেন্দ্র করে আলোচিত গায়িকা পারাস্তু আহমাদি এবং তার প্রযোজনা দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ঘোষণা করেছে দেশটির একটি আদালত। আদালতের রায়ে শিল্পী ও সংশ্লিষ্ট আটজনকে ৭৪টি করে দোররা মারার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি আগামী দুই বছর বিদেশ সফর ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, কোয়ম প্রদেশের একটি ফৌজদারি আদালত এই রায় প্রদান করেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তারা অনলাইনে এমন কিছু কনটেন্ট প্রচার করেছেন যা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে সামাজিক মূল্যবোধ ও জনশৃঙ্খলার পরিপন্থী।

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ডিসেম্বরে। সে সময় ২৯ বছর বয়সী পারাস্তু আহমাদি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে একটি লাইভ কনসার্ট সম্প্রচার করেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি প্রচলিত হিজাববিধি অনুসরণ না করে উপস্থিত হন এবং দেশাত্মবোধক একটি গান পরিবেশন করেন। সম্প্রচারের পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিও প্রকাশের পরপরই শিল্পী ও তার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সংগীতশিল্পীকে অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল। পরে তারা মুক্তি পেলেও তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়। এদিকে ভিডিওটি অনলাইনে বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।

রায়ের পর মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, এই শাস্তি শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়; বরং সাংস্কৃতিক প্রকাশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ প্রয়োগের একটি উদাহরণ। অনেকের দাবি, সরকারবিরোধী বা স্বাধীন চিন্তার শিল্পীদের বিরুদ্ধে ইরানে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’-এর অ্যাডভোকেসি পরিচালক বাহার ঘান্দেহারি বলেন, কেবল গান গাওয়া ও হিজাব ছাড়া উপস্থিত হওয়ার কারণে একজন শিল্পীকে ৭৪ দোররা মারার সাজা দেওয়া অত্যন্ত কঠোর এবং উদ্বেগজনক। তার মতে, এ ধরনের শাস্তি মানবাধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

অন্যদিকে অধিকারভিত্তিক আইনি সহায়তা সংস্থা দাদবান-এর আইনজীবী মইন খাজায়েলি রায়ের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ইরানের বিদ্যমান আইনে নারীদের গান গাওয়া বা সংগীত পরিবেশনকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে এসব কর্মকাণ্ডকে ‘অশ্লীল কনটেন্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করা আইন প্রয়োগের বিতর্কিত উদাহরণ হতে পারে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, দোররা মারার মতো শাস্তি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা এ ধরনের শাস্তিকে অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

ইরানি-ব্রিটিশ অভিনেত্রী নাজানিন বোনিয়াদি এই রায়কে একটি ‘কঠোর বার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, ইরানে পরিবর্তনের আলোচনা থাকলেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির উপস্থিতি এখনও স্পষ্ট।

এদিকে নির্বাসিত ইরানি অভিনেত্রী সেতারেহ মালেকি বলেছেন, পারাস্তু আহমাদির কনসার্ট তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের অবস্থান প্রকাশের যে সাহস তিনি দেখিয়েছেন, তা অনেক নারীর সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় ইরানে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সীমারেখা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আলোচনার মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Trending

Exit mobile version