মতামত

ইবিতে ইসলামিক স্টাডিজ সংযুক্তি: ‘সাম্প্রদায়িক’ বনাম ‘সময়োপযোগী’

Published

on

তানভীর মাহমুদ মণ্ডল

সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইসলামিক স্টাডিজ ও বাংলাদেশ স্টাডিজ দুইটি কোর্সকে ক্রেডিট কোর্স হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো— বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, মূল দর্শন এবং একাডেমিক উদ্দেশ্য বিবেচনায় এটি একটি সময়োপযোগী, যৌক্তিক এবং প্রতিষ্ঠানের স্বকীয়তা পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ।

নানা সংগ্রামের পর ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল— আধুনিক জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানসমৃদ্ধ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা। অর্থাৎ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেবল আরেকটি সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি এমন একটি বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান—যার নাম, কাঠামো ও উদ্দেশ্যের মধ্যেই একটি আদর্শিক ভিত্তি নিহিত আছে। এই বাস্তবতায় ইসলামিক স্টাডিজ কোর্স চালু বা বাধ্যতামূলক করা কোনো সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একাডেমিক ব্যবস্থা।

বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে institutional identity অনুযায়ী foundational course বাধ্যতামূলক থাকেন। যেমন: কোনো প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে Ethics in Engineering, কোনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে Agricultural Studies, আবার ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে Religious or Moral Studies বাধ্যতামূলক থাকেন। এতে বৈষম্য নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বজায় থাকে।

অন্যদিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ইসলামিক স্টাডিজ কোর্সের উদ্দেশ্য ধর্মীয় আনুগত্য আরোপ করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের ইসলামী ইতিহাস, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও সভ্যতা সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান দেওয়া। একজন শিক্ষার্থী মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান যে ধর্মেরই হোক না কেন, এই কোর্স তাকে ইসলামী সভ্যতার মৌলিক ধারণা, নৈতিক শিক্ষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানাবে। এটি ধর্মান্তর বা বিশ্বাসের বিষয় নয়; এটি জ্ঞানার্জনের বিষয়। একইভাবে বাংলাদেশ স্টাডিজ কোর্স বাধ্যতামূলক করা আরও বেশি যৌক্তিক। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে ধারণা ছাড়া একজন শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ নাগরিক বিকাশ সম্ভব নয়। উচ্চশিক্ষা শুধু পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জায়গা নয়; বরং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রও। সে বিবেচনায় বাংলাদেশ স্টাডিজ কোর্স একটি জাতীয় প্রয়োজন।

কেউ কেউ বলছেন, ‘সকল ধর্মের শিক্ষার্থীদের ইসলামিক স্টাডিজ পড়া বাধ্যতামূলক করা সাম্প্রদায়িক আচরণ।’ এই বক্তব্য মূলত ‘পড়ানো’ ও ‘বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া’ এই দুই বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার ফল। বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন পড়ানো মানে সবাইকে দার্শনিক বানানো নয়; রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ানো মানে সবাইকে রাজনীতিবিদ বানানো নয়। একইভাবে ইসলামিক স্টাডিজ পড়ানো মানে কাউকে ধর্মীয় বিশ্বাসে বাধ্য করা নয়। এটি জ্ঞানের অংশ, পরিচয়ের অংশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শিক ভিত্তির অংশ। বরং বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন থেকে বিচ্যুতি ঘটেছিল। আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী জ্ঞানচর্চার যে সমন্বয় হওয়ার কথা ছিল, তা পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে তার একাডেমিক কাঠামোর একটি অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছিল। ইসলামিক স্টাডিজ-কে ক্রেডিট কোর্স করা সেই অসামঞ্জস্য দূর করার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ— একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা বৈষম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কাঠামো ও বাধ্যতামূলক কোর্স রয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েরও নিজস্ব আদর্শিক ভিত্তি থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে সেখানে ভর্তি হওয়া মানে সেই প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কাঠামো ও মূল্যবোধ মেনে নেওয়া। এটিকে সাম্প্রদায়িক বলা হলে প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্যকেই অস্বীকার করা হয়।সবচেয়ে বড় কথা, ইসলামিক স্টাডিজ ও বাংলাদেশ স্টাডিজ কোর্স চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নৈতিকতা, ইতিহাস, মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রচেতনার ভিত্তি পাবে, যা একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক গঠনে সহায়ক। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই কোর্স সেই ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।

অতএব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ ও বাংলাদেশ স্টাডিজ-কে ক্রেডিট কোর্স করা কোনো সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যুক্তিসঙ্গত এবং সময়োপযোগী একাডেমিক সংস্কার। যারা এটিকে সাম্প্রদায়িক বলছেন, তারা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, আদর্শিক ভিত্তি এবং একাডেমিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করছেন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিই তার প্রতিষ্ঠার দর্শন ‘আধুনিক শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধের সমন্বয়’ বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে এই সিদ্ধান্ত সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

মো. তানভীর মাহমুদ মন্ডল

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

সাবেক সহ-সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইবি শাখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Trending

Exit mobile version