সারা দেশে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ, বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত—এই তিন দাবি আদায়ে এলপিজি ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর বৃহস্পতিবার বিকাল থেকেই আবার দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক শেষে এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সেলিম খান এ ঘোষণা দেন। ব্যবসায়ীদের দাবি—এলপিজি আমদানি ও সিলিন্ডারের ওপর ভ্যাট কমালে ভোক্তা পর্যায়ে দাম সহনীয় হবে এবং বাজারে সংকটও কাটবে।
ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আমদানি করা এলপিজির ওপর ভ্যাট ১৫% থেকে কমিয়ে ১০% এবং স্থানীয় পর্যায়ে ৭.৫% করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে—এর লক্ষ্য ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমানো এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, কমিশন বৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একমত হওয়া গেছে, আর বাকি দাবিগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
১০ দিনের সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন
ধর্মঘট ও কৃত্রিম সংকটের জেরে গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে গ্যাস সিলিন্ডারের তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়।– গৃহিণী, হোটেল মালিক, ফুড ভেন্ডর—সবাই পড়েন বিপাকে।– কোথাও রান্না বন্ধ, কোথাও উৎপাদন থমকে যায়।– সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়।
কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, অনেকে দোকান বন্ধ রেখে দিন কাটাচ্ছেন। খিচুড়ি বিক্রেতা রফিকউল্লাহ বলেন, “খুঁজেও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দামে কিনলে লাভ থাকে না—তাই দোকান বন্ধ।”হোটেল মালিক ইসমাইল মাহমুদ বলেন, “১০ বছরে এমন সংকট দেখিনি। আড়াই হাজার টাকায় সিলিন্ডার কিনে দোকান চালানো যায় না।”
খুচরা বিক্রেতারা জানাচ্ছেন—সরবরাহ বন্ধ থাকায় দোকান চালানোই কঠিন হয়ে গেছে। ১২ কেজি সিলিন্ডার ২,০০০ টাকার কাছাকাছি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
ভোক্তাদের ক্ষোভ
জোয়ার সাহারা এলাকার কুলসুম বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার চাইলে তো এসব বন্ধ করা সম্ভব। গ্যাস না থাকায় পরিবার নিয়ে ভোগান্তিতে আছি।”যাত্রাবাড়ির মিঠু মজুমদার বলেন, “দোকানে গ্যাস নাই, আর যেখানে আছে তারা ২,৫০০–৩,০০০ টাকা চাচ্ছে।”
ক্যাবের অভিযোগ: পরিকল্পিত বাজার কারসাজি
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন,“অভিযান দেখলেই তারা দোকান বন্ধ করে পালায়, এমনকি ধর্মঘট ডেকে বাজার জিম্মি করে রাখে। এটা স্পষ্ট বাজার কারসাজি।”তিনি আরও বলেন—শীত এলেই এলপিজি চাহিদা বাড়ার অজুহাতে বাজার থেকে সিলিন্ডার উধাও হয়ে যায়, যা ব্যবসায়ীদের যোগসাজশেরই প্রমাণ।
সরকারের অবস্থান: ‘ঘাটতি নয়, কারসাজি’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন,“দেশে সিলিন্ডারের কোনো ঘাটতি নেই। বাজারে যে সংকট—তা পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের পরিকল্পিত কারসাজির ফল।”তিনি জানান, এলপিজি বাজারের ৯৮% বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে, আর কিছু অপারেটর মূল্য সমন্বয়কে কেন্দ্র করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।