তাছনিম আলম
প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। যা কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রতীক। আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি ইট-পাথরের পেছনে যে শ্রমিকের শক্তি, শ্রম ও ঘাম মিশে আছে, এই দিনটি সেই সংগ্রামের ইতিহাসকে সম্মানের সাথে স্মরণ করায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই জানেন না এই দিনের পেছনে লুকিয়ে থাকা রক্তাক্ত ইতিহাস ও শ্রমিকদের ত্যাগের গল্প। আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে যে আন্দোলন একদিন বিক্ষোভ থেকে বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছিল, যেখানে অসংখ্য শ্রমিককে জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়েছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর কথা— যখন ইউরোপ ও আমেরিকায় শিল্প বিপ্লবের ফলে কলকারখানা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চাপানো শ্রমব্যবস্থানুযায়ী শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত ছিল এবং তাদেরকে দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানবিকভাবে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। শিল্পকারখানাগুলোতে তখন নারী, পুরুষ; এমনকি শিশুশ্রমিকরাও একইভাবে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য হতো, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ছুটি, কর্মনিরাপত্তা বা ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা ছিল না। এরকম নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত হয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে শুরু করেন এবং পরবর্তীতে এ শোষণমূলক পরিস্থিতির প্রতিবাদেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দেন। যার প্রধান দাবি ছিল– দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ করা। ১৮৬৬ সালে আমেরিকার বাল্টিমোরে প্রথম জাতীয় শ্রম সম্মেলনে দিনে আট ঘণ্টা কাজের প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু তখনও পর্যন্ত শ্রমিকরা সেই অনুযায়ী সুবিধা পাচ্ছিল না। যা পরবর্তীতে শ্রমিক আন্দোলনকে আরও জোরদার করে তোলে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। আমেরিকার বিভিন্ন শহরে শ্রমিকরা দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ শুরু করেন। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিকাগো। যেখানে হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন। পহেলা মে থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কয়েকদিন ধরে চলতে থাকে। ৩ মে শিকাগোর ম্যাক কর্মিক হারভেস্টার কারখানায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন শ্রমিক নিহত হন। এর প্রতিবাদে পরদিন ৪ মে ‘হে মার্কেট’ চত্বরে আয়োজিত সমাবেশে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি পুলিশের দিকে বোমা নিক্ষেপ করে, প্রত্যুত্তরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। এই ঘটনায় কমপক্ষে সাত জন পুলিশ এবং বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিহত হয়। শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এটিই ‘হে মার্কেট গণহত্যা’। বোমাটি কে নিক্ষেপ করেছে তা কখনোই শনাক্ত করা যায়নি, তবুও ৮ জন নেতাকে ষড়যন্ত্রের দায়ে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তাদের মধ্যে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। এই রক্তাক্ত ও আত্মত্যাগময় ঘটনার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টায় ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ১লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যাতে হে মার্কেটের সেই আত্মত্যাগের স্মৃতি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।
১৮৯০ সালের পহেলা মে প্রথমবারের মতো ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে এই দিনটি পালিত হয়। ২০ শতাব্দীতে মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা এই দিনে সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের দাবি তুলে ধরে। অনেক দেশে এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালন করা হচ্ছে, যা শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও সম্মানের প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এক ধরনের আত্মসমালোচনা এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের দিন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রমিক উন্নয়ন ও শ্রমনীতির প্রশ্নে জিয়া পরিবারের ভূমিকা বিশেষভাবে সমাদৃত। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কঠিন সময়ে শহীদ জিয়াউর রহমান উন্নয়নকে কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে শ্রমিক ছিল কোনো সহায়তার পাত্র নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের মূল শক্তি। এই ভাবনা থেকেই তিনি গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যার মধ্যে খাল খনন কর্মসূচি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে তিনি নিজে কোদাল হাতে সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করে শ্রমের মর্যাদা ও নেতৃত্বের অংশগ্রহণমূলক ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেন। তিনি শুধু প্রতীকী অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি বরং কাজের বিনিময়ে খাদ্য তথা ‘কাবিখা’ কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। রাস্তা, বাঁধ ও খাল পুনরায় খননের মতো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শ্রমিকদের যুক্ত করে তিনি একদিকে তাদের জীবিকার পথ খুলে দেন, অন্যদিকে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও গতি আনেন। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে ছিল গ্রাম, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন গ্রাম শক্তিশালী না হলে রাষ্ট্রও শক্তিশালী হতে পারে না।পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সময় ২০০৬ সালে ‘বাংলাদেশ লেবার কোড’ প্রণয়ন করা হয়। যেখানে দীর্ঘদিনের ছড়ানো-ছিটানো শ্রম আইন একত্রিত করে একটি আধুনিক কাঠামো তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘শ্রম কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা অসচ্ছল ও সংকটাপন্ন শ্রমিকদের সহায়তার একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বেগম জিয়া শাসনামলে নীতিগতভাবে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও শিল্প সম্প্রসারণের ফলে গার্মেন্টস খাত দ্রুত প্রসার ঘটে এবং এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক শিল্পে নারী কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং শ্রমবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ তাঁর শাসনামলে শ্রমনীতিকে আরও বিস্তৃত করে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জিয়া পরিবারের শ্রমবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমিক উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছেন। তার সময়ে প্রবর্তিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য মাসিক নগদ ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের খাদ্যসামগ্রী নিশ্চিত করছে, যা ইতোমধ্যে ৩৭ হাজারের বেশি পরিবারের মধ্যে প্রদান শেষে ৪ কোটি পরিবারে সম্প্রসারণের পথে। কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালু করে ভর্তুকিযুক্ত সার, বীজ, যন্ত্রপাতি ও স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রায় ১২ লাখ প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। নারী শ্রমিক ও গৃহিণীদের কথা মাথায় রেখে ‘এলপিজি কার্ড’ প্রবর্তনের মাধ্যমে রান্নার জ্বালানি সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আগামী ৫ বছরে দেশে ও বিদেশে ১ কোটি চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে আইসিটি খাতেই ৮ লাখের বেশি তরুণের জন্য কাজের ব্যবস্থা থাকবে। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সার্বিয়া, গ্রিস, পর্তুগাল ও রাশিয়ার মতো নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, তিনি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারকে কেবল প্রতীকী অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ না রেখে তা সুনির্দিষ্ট বাজেট, ডিজিটাল কার্ডভিত্তিক ভর্তুকি ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের মূল চেতনা তথা শ্রমের মর্যাদা, অধিকার ও ন্যায্যতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। জিয়া পরিবারের নীতি ও উদ্যোগগুলো একদিকে শ্রমিককে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে শ্রমিক কল্যাণকে কেবল দয়া নয় বরং অধিকার হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে এনেছে। শ্রমিক দিবস তাই শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের এক চলমান প্রতিশ্রুতি।
লেখক: তাছনিম আলম, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ