top3

সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান কমিটিতে ‘বিতর্কিত’ শিক্ষক নেতারা, প্রশ্ন উঠেছে নিরপেক্ষতা নিয়ে

Published

on

আনাস মাহমুদ; বেরোবি প্রতিবেদক;

সাবেক পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর ‘গোপন তৎপরতায়’ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাত শিক্ষকের যুক্ত থাকার অভিযোগের তথ্য অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে অভিযোগের অনুসন্ধানে গঠিত কমিটির কয়েকজন সদস্যের রাজনৈতিক ও শিক্ষক সংগঠনের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পাঁচ সদস্যের এই তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গঠনের বিষয়টি জানানো হয়।

অফিস আদেশে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সূত্রের খবরে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক পলাতক ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ও সাময়িক বরখাস্ত কয়েকজন শিক্ষকের নামও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক এ ধরনের গোপন অপতৎপরতায় জড়িত রয়েছেন কি না, তা সুষ্ঠুভাবে অনুসন্ধানের লক্ষ্যে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তানজিউল ইসলাম জীবনকে আহ্বায়ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের লিগ্যাল সেলের সহকারী রেজিস্ট্রার মোছা. রেহেনা আক্তার মনিকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান, রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. হারুন-আল-রশীদ এবং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান।

তথ্য অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক ড. মো. তানজিউল ইসলাম জীবনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। যৌন হয়রানি ও নম্বর টেম্পারিংয়ের অভিযোগ ওঠার পর ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। নিজ বিভাগের সাবেক এক শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অভিযোগ দেয়। তার একটি তদন্ত এখনো চলমান বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে তাকে অন্য একটি তদন্ত কমিটির দায়িত্ব দেওয়ায় ক্যাম্পাসে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।

একইভাবে কমিটির সদস্য ড. মো. হারুন-আল-রশীদ শিক্ষক সমিতির আওয়ামিলীগ পন্থী শিক্ষকদের সংগঠন‘নীল দল’-এর প্যানেল থেকে নির্বাচিত কোষাধ্যক্ষ এবং নীল দলের সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগের অনুসন্ধানের দায়িত্ব পাওয়া কমিটির সদস্যদের এমন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা থাকায় কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটি সদস্যদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত কমিটির অনুসন্ধানের আওতায় থাকা শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদ মন্ডল এবং গণিত বিভাগের ড. মশিউর রহমান। তাঁরা জুলাইয়ে আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন।

অন্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর ড. আয়েশা আকতার আঁখি, প্রফেসর ড. মো. জাকির হোসেন, জেড উদ্দিন, দেবু পিকে (সাংকেতিক নাম) এবং এসকে বি (সাংকেতিক নাম)।

তবে এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ‘গোপন তৎপরতায়’ জড়িত থাকার অভিযোগের সত্যতা এখনো অনুসন্ধানাধীন। তথ্য অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনের পরই বিষয়টি সম্পর্কে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, “এখন তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। তথ্য অনুসন্ধান কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শৃঙ্খলা কমিটি ও সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”তবে তথ্য অনুসন্ধান কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে রেজিস্ট্রার কোনো সময় উল্লেখ করেননি।

দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে তথ্য যাচাই করে সত্য উদঘাটন করা জরুরি। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার প্রশ্ন রয়েছে, তাদের দিয়ে তদন্ত করানো হলে স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে যাদের নামেই তদন্ত চলমান, তারা কীভাবে অন্যের তদন্তের দায়িত্বে থাকেন এ বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমরা চাই, রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা হোক।”

আরেক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে দোষী বলা যায় না। একইভাবে অভিযোগকে উপেক্ষাও করা উচিত নয়। তাই অনুসন্ধান কমিটির সদস্যদের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কমিটির প্রতিবেদন যেন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হয় এবং কারও প্রতি পক্ষপাত না থাকে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Trending

Exit mobile version