Connect with us

top1

জুলাই শহীদদের তথ্য লুকাতে রেকর্ড গায়েব

Published

on

জুলাই বিপ্লবের সময় হতাহতদের বড় একটি অংশকে যে কয়টি সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তার মধ্যে একটি। হাসপাতালের তথ্যমতে, এখানে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত তিন শতাধিক আহত এবং ৪৭ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। তবে ভিন্ন কথা বলছেন বিপ্লবের উত্তাল সময়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া চিকিৎসক ও নার্সরা। প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি বলে জানাচ্ছেন তারা।

চিকিৎসক ও নার্সদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামীপন্থি হাসপাতাল পরিচালক ডা. শফিউর রহমান সরকারের নির্দেশে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা গোপন করতে নিবন্ধন বইয়ের বহু পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেন। পাশাপাশি নতুন নিবন্ধন বইও গায়েব করেন। শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশে এমন ঘৃণ্য কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার পরও অধিকাংশ চিকিৎসক যখন আহতদের চিকিৎসাসেবা দিতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন হতাহতদের তথ্য গোপনে মরিয়া ছিলেন তিনি। তাকে সহযোগিতা করেন হাসপাতালে থাকা আওয়ামীপন্থি বেশ কয়েকজন চিকিৎসক।

অভিযোগ উঠেছে, জুলাই বিপ্লবের পর এসব অপকর্মের দায়ে শাস্তি হওয়ার কথা থাকলেও বিএনপি ও জামায়াতপন্থি চিকিৎসকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে স্বপদে টিকে থাকেন ডা. শফিউর। তবে শেষরক্ষা হয়নি। চলতি বছরের ১০ আগস্ট তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে সাভারের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) যুক্ত করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই বিপ্লবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বেশি হতাহত আসতে শুরু করে ১৮ জুলাই থেকে। ওই সময় দায়িত্ব পালন করা সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের আট চিকিৎসক, তিন নার্স এবং দুজন ওয়ার্ডবয়ের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা জানান, ঢাকা মহানগর ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে ১৮ জুলাই শতাধিক ব্যক্তিকে মৃত ও আহতাবস্থায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আনা হয়। আহতদের একটি অংশ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি অ্যান্ড ক্যাজুয়ালটি (ওসেক) বিভাগে আনার পরপরই মারা যান। কারো মৃত্যু হয় অ্যাম্বুলেন্সে থাকতেই আবার অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। 

পরদিন ১৯ জুলাই মৃত অবস্থায় আনা হয় ৩৩ জনকে। আহত অবস্থায় যাদের ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যু হয়। ওই দিন ওসেক, ক্যাজুয়ালটি এবং ইনডোরে ভর্তি থাকা অবস্থায় প্রায় ৬০ জনের মৃত্যু হয়। ২০ জুলাই এক শিফটেই ২০ জনের অধিকের লাশ আনা হয়।

চিকিৎসক ও নার্সরা আরো জানান, জুলাইয়ে হতাহতের যে স্রোত ছিল, আগস্টের শুরুতে সেটি আরো তীব্র আকার ধারণ করে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ জনের লাশ এসেছে হাসপাতালে। সে হিসাবে লাশের সংখ্যা দেড়শর মতো হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ লাশের হিসাব দিয়েছে এর তিনভাগের একভাগ। ফলে কর্তৃপক্ষ যে তালিকা করে তা নিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়।

জুলাই বিপ্লবের সময় হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ট্রেইনি ডাক্তার আমার দেশকে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে এটি কোনোভাবেই সত্য নয়। কারণ, চারদিক থেকে হতাহতের স্রোত আসছিল, কোথাও জায়গা দেওয়ার অবস্থা ছিল না। ফ্লোরে ফ্লোরে আহত ও লাশের মিছিল। বিশেষ করে ১৮ জুলাই থেকে এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এসব হতাহতের অধিকাংশের নাম ও ন্যূনতম পরিচয় যতটুকু পারা যায় নিবন্ধন বইয়ে লিখে রাখা হয়েছিল। নিবন্ধন বই বা রেজিস্ট্রার হচ্ছে এক ধরনের নথি যেখানে রোগীর পরিচয়, রোগের ইতিহাস, চিকিৎসা এবং প্রদত্ত ওষুধের তথ্য তারিখসহ লিখে রাখা হয়। অনেকেই পরবর্তী সময়ে ঝামেলা এড়াতে পরিচয় তালিকাভুক্ত করা ছাড়াই চলে যান। তবে ভর্তি রোগীদের তথ্য রেকর্ডভুক্ত হয়। সেই তালিকার কার্বন কপি আমাদের কাছে থাকলেও সেটি স্যাররা নিয়ে নেয়। পরে সেটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।’

ওই চিকিৎসক আরো বলেন, ‘ভর্তিদের ডেডিকেটেড ইউনিট ছিল ৪২১ নম্বর ওয়ার্ড। ১৮ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত সেখানে ১৮০ থেকে ২০০ জন ভর্তি ছিল। এর মধ্যে দৈনিক ২ থেকে ৩ জন করে মারা গেছেন।’

জুলাই বিপ্লবের শুরু থেকে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর পর্যন্ত ক্যাজুয়ালটি বিভাগে দায়িত্ব পালন করা আরেক চিকিৎসক আমার দেশকে বলেন, ‘১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চলে। ওই দিন দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলাম। 

সেদিন অন্তত ৫০টি লাশ এসেছে। এর মধ্যে খুব কমসংখ্যকের লাশের নাম, পরিচয় নথিভুক্ত করা হয়। অনেকের তথ্য নথিভুক্ত করা হলেও সেই তথ্য কোথায় গেছে তা অজানা। ওই দিন সার্জারি বিভাগে দুপুর ২টা পর্যন্ত চার থেকে পাঁচজন রোগী ভর্তি ছিলেন। কিন্তু এরপর দুই ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় অর্ধশত গুলিবিদ্ধ আহতকে এখানে ভর্তি করা হয়। যাদের অধিকাংশের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন ছিল। ৪২০ ও ৪২১ ওয়ার্ড মিলে ১০০ শয্যাতে অন্তত ৫শ আহতকে ভর্তি করা হয় ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত। সেই তথ্য গেল কোথায়? এ ছাড়া ক্যাজুয়ালটিতে আসা রোগীদের তথ্য তো আছেই। সব মিলিয়ে অন্তত এক হাজার ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন এই হাসপাতালে।

কিছুক্ষেত্রে ঝামেলা এড়াতে অনেকেই নিজেদের তথ্য দেননি। তবে অধিকাংশের তথ্য নিবন্ধন বইতে ছিল। ফলে সরকারের চাপ বা পরিচালকের নিজের স্বার্থ—যেটাই হোক, তথ্য গোপন করা হয়েছে এটি শতভাগ নিশ্চিত।’

তিনি আরো বলেন, ‘৫ আগস্টের পর পরিচালকের কাছে বিষয়গুলো জানতে চাইলে ট্রেইনি ডাক্তাররা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারে না বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিচালকের এসব অপকর্মে সহযোগিতা করেন আওয়ামীপন্থি ক্লিনিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট ডা. তানজিদ ও ডা. জ্যোতি। অন্য চিকিৎসকরা যখন চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা আসেননি। আবার যারা চিকিৎসা দিয়েছেন তাদের বিএনপি-জামায়াত হিসেবে ট্যাগ দেওয়া হতো।’

এই চিকিৎসক আরো বলেন, ‘হাসিনা না পালালে আমাদের মতো বহু চিকিৎসকের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের দরজা হয়তো চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যেত। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ৫ আগস্টের পর বিএনপি-জামায়াতপন্থি চিকিৎসকদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে টিকে ছিলেন পরিচালক, এটাই তার হাতিয়ার।’

অভিযোগ রয়েছে, জুলাই বিপ্লবের সময় বিপ্লবীদের চিকিৎসা দেওয়া বহু চিকিৎসককে বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ দেন ক্লিনিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট ডা. সৈয়দ তানজিদুল ইসলাম। এ বিষয়টি নিয়ে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বিভাগ পরিবর্তন করে লঘু শাস্তি দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘জুলাইয়ে ৪২০ নম্বর ওয়ার্ড ডেডিকেটেড ছিল। আমি সেখানে সহকারী রেজিস্ট্রার ছিলাম। আমি কাউকে কোনো ট্যাগ দিইনি। ওই সময় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়। পরে আমাকে এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে বদলি করা হয়েছে।’

ওসেকে দায়িত্ব পালন করা একজন সিনিয়র নার্স আমার দেশকে বলেন, ‘ওসেকে যেসব আহত এসেছে তার সর্বোচ্চ ২০ শতাংশকে সেবা দিতে পেরেছি আমরা। অনেকের নাম রেকর্ড করার মতো পরিস্থিতিও ছিল না। তারপরও সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় যতটুকু পারা যায় তা আমরা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সরকারের চাপে হাসপাতালের পরিচালক নিবন্ধন বইয়ের বহু পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেন। এমনকি নতুন একটি বই দেওয়া হয়েছিল। সেখানেও অনেক রোগীর পরিচয় থাকলেও সেটি পরবর্তী সময়ে গায়েব করা হয়।’

এই নার্স আরো বলেন, ‘পরিচালক নিজে উপস্থিত থেকে এগুলো করেছেন। এতে সহায়তা করেন সেবা তত্ত্বাবধায়ক শাহনেওয়াজ পারভীন।’

এই নার্সের কথার সত্যতা মেলে অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. রেহান উদ্দিন খানের দেওয়া তথ্যে। তিনি বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতা। আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘হতাহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে বিএনপি করি বলে বাধা দেওয়া হয়েছে। পরিচালক নিজে রোগী নিবন্ধন বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেন। হাসপাতাল থেকে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে এটি সঠিক নয়। আহতদের সংখ্যাটা সহস্রাধিক না হলেও কাছাকাছি হবে। মৃত্যুর সংখ্যাও যা বলা হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।’

সার্জারি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকারী অধ্যাপক বলেন, ‘যে হারে লাশ আর আহত আসছিল তাতে চিকিৎসকদের পাগল হওয়ার মতো অবস্থা ছিল। গুলিবিদ্ধ হয়ে আসাদের অনেকে হাসপাতালের গেটে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা গেছেন। চিকিৎসা শুরুর আগেও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। এগুলোর তালিকা থাকার কথা। তবে হাসপাতাল যে তথ্য দিয়েছে এতে গরমিল রয়েছে।’

সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এস এম কামরুল আক্তার সঞ্জু। তিনি আওয়ামীপন্থি চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘শত শত আহত ব্যক্তি চতুর্দিক থেকে আসছিল। কোনো দিকে তাকানোর মতো সময় ছিল না। আমার কক্ষের সোফাতেই তিন দিন ছিলাম। অনেকের অস্ত্রোপচার খুব জরুরি ছিল কিন্তু করা হয়নি সে সময়। কারণ তাদের চেয়ে গুরুতর আহতদের বাঁচানোটা জরুরি ছিল।’

তথ্য গোপন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেবা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তথ্য গোপন হয়েছে কিনা জানি না। সরকার থেকে চাপ থেকে থাকলে সেটি প্রশাসনিক পর্যায়ে হতে পারে।’

তবে এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ডা. শফিউর রহমান। আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় মনোনীত কমিটি তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করেছে। সব ডকুমেন্টসও যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে। এখানে আমার তথ্য গোপন করে লাভ কি? অফিসিয়ালি নতুন পরিচালককে সব তথ্য বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। ভুল তথ্য দিয়ে আমাকে হেয় করায় যাদের আনন্দ হয় তারাই এগুলো বলছেন।’

সেবা তত্ত্বাবধায়ক শাহনেওয়াজ পারভীন এ ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এখানে পরিচালকই সবকিছু। উনি যেভাবে বলেছেন সেভাবেই আমরা সেবা দিয়েছি। তথ্য গোপন হয়েছে কিনা এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর আমার দেশকে বলেন, ‘তথ্য গোপনের বিষয়টি স্পর্শকাতর। এটি নিয়ে ইতোমধ্যে সেখানকার স্বাস্থ্য প্রতিনিধি কাজ করছেন। শুধু সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল নয়, অনেক জায়গাতেই তথ্য-প্রমাণ ধ্বংস করা হয়েছে। এর সঙ্গে তৎকালীন যারা হাসপাতালের প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন তাদের দায় আছে। সেটি তারা বাধ্য হয়ে নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে করেছেন তা খতিয়ে দেখতে হবে।’

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ‘এটি যদি ঘটে থাকে তবে তা অপরাধ। কিন্তু বিষয়টি এখনো আমাদের কাছে আসেনি। হাসপাতালের কেউ কিংবা ভুক্তভোগীরা আবেদন জানালে মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।’

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top1

গভর্নর মনসুর এমন বিদায় ‘ডিজার্ভ’ করেন না: ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

Published

on

By

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ও সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছেন, বিদায়ী গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এমন ‘অসম্মানজনক’ বিদায় প্রাপ্য ছিলেন না। তার মতে, যোগ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে এমন আচরণ চললে ভবিষ্যতে সংকটের সময় কোনো দক্ষ মানুষ দেশের হাল ধরতে আসবে না।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ব্যক্তিগত প্রোফাইলে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত ছয় সদস্যের পর্যালোচনা কমিটির সদস্য হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য সেখানে তুলে ধরেন তিনি।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, রিজার্ভ চুরির তদন্তে তার মূল ভূমিকা ছিল কারিগরি নিরাপত্তা রিভিউ করা। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সার্ভার রুম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করে আমরা মোট ২৮টি সুপারিশ দিয়েছি। এর মধ্যে ১৭টি বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বাকিগুলোর কাজ চলমান। এই পুরো প্রক্রিয়ায় গভর্নর ড. মনসুর অত্যন্ত আন্তরিক ও সহযোগী ছিলেন।”

সুইফট সিস্টেমের নিরাপত্তা জোরদারে বিশ্বমানের ‘প্রিভিলেজ এক্সেস ম্যানেজমেন্ট’ (PAM) সফটওয়্যার ব্যবহারের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তার বিভিন্ন টুলস (SIEM, SOAR, VPN, XDR) ব্যবহারের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুইফট টিম তা পালনের লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও তিনি জানান।

ড. মনসুরের মেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৩ বিলিয়ন ডলারের নেট রিজার্ভ থেকে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে ২৯ বিলিয়ন ডলারে (গ্রস ৩৫ বিলিয়ন) উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে। ৩৬ মাস ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নভেম্বরে ৭ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে।”

৫ লক্ষ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ও প্রায় ২০টি দেউলিয়া ব্যাংক নিয়ে যাত্রা শুরু করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসায় সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ ও ড. আহসান এইচ মনসুরের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।

তবে গভর্নরের বিদায়ের পর এই সংস্কার কাজগুলো থমকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, “গভর্নর পরিবর্তন হওয়ায় সুইফট এবং আইটি সিস্টেমের ডেভেলপমেন্ট সংক্রান্ত কাজগুলো যেন আটকে না যায়।”

নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কবাণী দিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি নলেজ-ড্রিভেন ফাইনান্সিয়াল রেগুলেটর হতে হবে। এখানে ডিজিটাল কারেন্সি ও ফিনটেক বোঝার মতো নেতৃত্ব লাগবে। কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট আছে এমন কাউকে বা বড় খেলাপিদের সুবিধা দেওয়া ব্যক্তিদের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর বিপদসমূহ বিবেচনা করা উচিত।”

বাংলাদেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নিজের হতাশার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “ডিজিটাল ট্রান্সফর্মেশন রোডম্যাপে আরও ইনপুট দেওয়ার সুযোগ ছিল, যা তৈরি হয়নি। সময় থাকতে নীতিনির্ধারকদের কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ করা উচিত।”

Continue Reading

top1

একুশে বইমেলাকে ‘আন্তর্জাতিক’ করার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

Published

on

By

অমর একুশে বইমেলাকে আগামীতে ‘আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসেবে আয়োজন করা যায় কি না, তা ভেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ প্রস্তাব দেন।

তারেক রহমান বলেন, “বাংলা একাডেমির সৃজনশীল কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ অমর একুশে বইমেলা। তবে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছরগুলোতে এটি আন্তর্জাতিক বইমেলা হিসেবে আয়োজন করার সুযোগ আছে কি না, সেটি আমি আপনাদের ভেবে দেখার অনুরোধ জানাব।”

আন্তর্জাতিক পরিসরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হলে দেশের নাগরিকরা বিশ্ব সাহিত্যের পাশাপাশি বহু ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে বলে আশাপ্রকাশ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “সমৃদ্ধি ও সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। একইসঙ্গে বাংলাকে জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্যও কাজ শুরু করা প্রয়োজন।”

৫২-এর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আর শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বইমেলা কেবল কেনাবেচার মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশের মূল কেন্দ্রে পরিণত হবে।

বইমেলা কেবল ফেব্রুয়ারি মাসে বা ঢাকাতে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় আয়োজনের পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে প্রকাশকদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

তরুণ প্রজন্মের মেধা বিকাশে বাংলা একাডেমির নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের সমৃদ্ধ সাহিত্যকে ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশি ভাষায় অনুবাদের কাজ আরও বেগবান করা হবে।

বক্তব্যের শেষ দিকে নিয়মিত বই পড়ার বৈজ্ঞানিক উপযোগিতা তুলে ধরে তারেক রহমান এক জার্মান দার্শনিকের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, “বই ছাড়া ঘর, আত্মা ছাড়া দেহের মতন।”

গবেষণার তথ্য দিয়ে তিনি জানান, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি কমায়।

একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী অমর একুশে বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

Continue Reading

top1

ডিএমপি কমিশনারের দায়িত্বে মো. সরওয়ার

Published

on

By

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত আইজি) মো. সরওয়ার। নতুন কেউ যোগদান না করা পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করবেন।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) অ্যাডিশনাল ডিআইজি (পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-১) শামিমা ইয়াছমিন খন্দকার স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ডিএমপির পুলিশ কমিশনার হিসেবে কোনো কর্মকর্তা যোগ না দেওয়া পর্যন্ত মো. সরওয়ার ডিএমপি কমিশনারের দায়িত্বে থাকবেন।

এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘ব্যক্তিগত ও পারিবারিক’ কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। যদিও তার চুক্তির মেয়াদ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত ছিল।

বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা শেখ মো. সাজ্জাত আলী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি থাকা অবস্থায় ২০১৬ সালের নভেম্বরে চাকরিচ্যুত হন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভূতাপেক্ষভাবে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করে। ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর ডিএমপির ৩৮তম পুলিশ কমিশনার পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান সাজ্জাত আলী। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, যোগদানের তারিখ থেকে দুই বছর মেয়াদে তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হল।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৭ জানুয়ারি এসবি থেকে সরওয়ারকে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়। এরপর তাকে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের প্রধান করা হয়। এরপর ১১ আগস্ট অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। রাজধানীতে যানজট নিরসনে সরওয়ার আলমের অবদান অনেক।

Continue Reading

Trending