Connect with us

মতামত

শ্রমিক দিবস: জিয়া পরিবারের প্রাসঙ্গিকতা

Published

on

তাছনিম আলম

প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। যা কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রতীক। আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি ইট-পাথরের পেছনে যে শ্রমিকের শক্তি, শ্রম ও ঘাম মিশে আছে, এই দিনটি সেই সংগ্রামের ইতিহাসকে সম্মানের সাথে স্মরণ করায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই জানেন না এই দিনের পেছনে লুকিয়ে থাকা রক্তাক্ত ইতিহাস ও শ্রমিকদের ত্যাগের গল্প। আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে যে আন্দোলন একদিন বিক্ষোভ থেকে বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছিল, যেখানে অসংখ্য শ্রমিককে জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়েছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীর কথা— যখন ইউরোপ ও আমেরিকায় শিল্প বিপ্লবের ফলে কলকারখানা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চাপানো শ্রমব্যবস্থানুযায়ী শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত ছিল এবং তাদেরকে দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানবিকভাবে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। শিল্পকারখানাগুলোতে তখন নারী, পুরুষ; এমনকি শিশুশ্রমিকরাও একইভাবে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য হতো, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ছুটি, কর্মনিরাপত্তা বা ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা ছিল না। এরকম নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত হয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে শুরু করেন এবং পরবর্তীতে এ শোষণমূলক পরিস্থিতির প্রতিবাদেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দেন। যার প্রধান দাবি ছিল– দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ করা। ১৮৬৬ সালে আমেরিকার বাল্টিমোরে প্রথম জাতীয় শ্রম সম্মেলনে দিনে আট ঘণ্টা কাজের প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু তখনও পর্যন্ত শ্রমিকরা সেই অনুযায়ী সুবিধা পাচ্ছিল না। যা পরবর্তীতে শ্রমিক আন্দোলনকে আরও জোরদার করে তোলে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। আমেরিকার বিভিন্ন শহরে শ্রমিকরা দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ শুরু করেন। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিকাগো। যেখানে হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন। পহেলা মে থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কয়েকদিন ধরে চলতে থাকে। ৩ মে শিকাগোর ম্যাক কর্মিক হারভেস্টার কারখানায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন শ্রমিক নিহত হন। এর প্রতিবাদে পরদিন ৪ মে ‘হে মার্কেট’ চত্বরে আয়োজিত সমাবেশে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি পুলিশের দিকে বোমা নিক্ষেপ করে, প্রত্যুত্তরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। এই ঘটনায় কমপক্ষে সাত জন পুলিশ এবং বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিহত হয়। শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এটিই ‘হে মার্কেট গণহত্যা’। বোমাটি কে নিক্ষেপ করেছে তা কখনোই শনাক্ত করা যায়নি, তবুও ৮ জন নেতাকে ষড়যন্ত্রের দায়ে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তাদের মধ্যে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। এই রক্তাক্ত ও আত্মত্যাগময় ঘটনার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টায় ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ১লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যাতে হে মার্কেটের সেই আত্মত্যাগের স্মৃতি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।

১৮৯০ সালের পহেলা মে প্রথমবারের মতো ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে এই দিনটি পালিত হয়। ২০ শতাব্দীতে মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা এই দিনে সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের দাবি তুলে ধরে। অনেক দেশে এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালন করা হচ্ছে, যা শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও সম্মানের প্রতিফলন।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এক ধরনের আত্মসমালোচনা এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের দিন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রমিক উন্নয়ন ও শ্রমনীতির প্রশ্নে জিয়া পরিবারের ভূমিকা বিশেষভাবে সমাদৃত। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কঠিন সময়ে শহীদ জিয়াউর রহমান উন্নয়নকে কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে শ্রমিক ছিল কোনো সহায়তার পাত্র নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের মূল শক্তি। এই ভাবনা থেকেই তিনি গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যার মধ্যে খাল খনন কর্মসূচি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে তিনি নিজে কোদাল হাতে সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করে শ্রমের মর্যাদা ও নেতৃত্বের অংশগ্রহণমূলক ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেন। তিনি শুধু প্রতীকী অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি বরং কাজের বিনিময়ে খাদ্য তথা ‘কাবিখা’ কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। রাস্তা, বাঁধ ও খাল পুনরায় খননের মতো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শ্রমিকদের যুক্ত করে তিনি একদিকে তাদের জীবিকার পথ খুলে দেন, অন্যদিকে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও গতি আনেন। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে ছিল গ্রাম, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন গ্রাম শক্তিশালী না হলে রাষ্ট্রও শক্তিশালী হতে পারে না।পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সময় ২০০৬ সালে ‘বাংলাদেশ লেবার কোড’ প্রণয়ন করা হয়। যেখানে দীর্ঘদিনের ছড়ানো-ছিটানো শ্রম আইন একত্রিত করে একটি আধুনিক কাঠামো তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘শ্রম কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা অসচ্ছল ও সংকটাপন্ন শ্রমিকদের সহায়তার একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বেগম জিয়া শাসনামলে নীতিগতভাবে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও শিল্প সম্প্রসারণের ফলে গার্মেন্টস খাত দ্রুত প্রসার ঘটে এবং এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক শিল্পে নারী কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং শ্রমবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ তাঁর শাসনামলে শ্রমনীতিকে আরও বিস্তৃত করে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জিয়া পরিবারের শ্রমবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমিক উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছেন। তার সময়ে প্রবর্তিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য মাসিক নগদ ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের খাদ্যসামগ্রী নিশ্চিত করছে, যা ইতোমধ্যে ৩৭ হাজারের বেশি পরিবারের মধ্যে প্রদান শেষে ৪ কোটি পরিবারে সম্প্রসারণের পথে। কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালু করে ভর্তুকিযুক্ত সার, বীজ, যন্ত্রপাতি ও স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রায় ১২ লাখ প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। নারী শ্রমিক ও গৃহিণীদের কথা মাথায় রেখে ‘এলপিজি কার্ড’ প্রবর্তনের মাধ্যমে রান্নার জ্বালানি সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আগামী ৫ বছরে দেশে ও বিদেশে ১ কোটি চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে আইসিটি খাতেই ৮ লাখের বেশি তরুণের জন্য কাজের ব্যবস্থা থাকবে। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সার্বিয়া, গ্রিস, পর্তুগাল ও রাশিয়ার মতো নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, তিনি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারকে কেবল প্রতীকী অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ না রেখে তা সুনির্দিষ্ট বাজেট, ডিজিটাল কার্ডভিত্তিক ভর্তুকি ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের মূল চেতনা তথা শ্রমের মর্যাদা, অধিকার ও ন্যায্যতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। জিয়া পরিবারের নীতি ও উদ্যোগগুলো একদিকে শ্রমিককে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে শ্রমিক কল্যাণকে কেবল দয়া নয় বরং অধিকার হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে এনেছে। শ্রমিক দিবস তাই শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের এক চলমান প্রতিশ্রুতি।

লেখক: তাছনিম আলম, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top1

দ্য হিন্দুর এক্সপ্লেইনার/২০১৩ সালের চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে কি ফেরত পাঠাবে ভারত

Published

on

By

কল্লোল ভট্টাচার্য

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকা বলছে, তারেক রহমানের সফরের জন্য নয়াদিল্লিকে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করতে হবে। আর এই পরিবেশ তৈরির প্রধান শর্ত হলো শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। তখন থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। গত ৫ আগস্ট (২০২৬) দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি দাবি করেন, ‘বাংলাদেশে আবার ভয় ফিরে এসেছে।’

তার এই বক্তব্যের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনাকে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিশুসহ নিরীহ মানুষ হত্যার জন্য সরাসরি তাকে দায়ী করেছে ঢাকা।

ওসমান হাদির খুনিদের ফেরত চায় বাংলাদেশ

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম গত রোববার আরেকটি দাবি সামনে এনেছেন। তিনি ওসমান হাদির সন্দেহভাজন খুনিদের ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানান।

ওসমান হাদি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। পরে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তখন বাংলাদেশে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলার সংকট তৈরি হয়েছিল।

চীন কেন ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানবে না

অভিযুক্ত খুনিরা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বলে ঢাকা দাবি করছে। বর্তমানে দেশের রাজপথে প্রভাবশালী ইসলামপন্থিরা এই মামলার ওপর কড়া নজর রাখছেন। সংসদে ৬৭টি আসন থাকা দল জামায়াতে ইসলামীও হাদির বিচারের দাবিতে সোচ্চার। ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে এই মামলাটি বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ ও আইনি জটিলতা

দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, ভারত যে কোনো অপরাধীকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে পারে। দুই দেশের পারস্পরিক এই চুক্তিতে এমন বিধানই রয়েছে। তবে চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে রাজনৈতিক অপরাধীদের হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

‘পলিটিক্যাল অফেন্স এক্সেপশন’ বা রাজনৈতিক অপরাধের ব্যতিক্রম নামের এই ধারা অনুযায়ী, অপরাধটি রাজনৈতিক চরিত্রের হলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ নাকচ করতে পারে যে কোনো পক্ষ।

অবশ্য খুন, অপহরণ ও নরহত্যার মতো গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না। তবে মূল সমস্যা হলো, চুক্তিতে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’-এর কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া নেই। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত যে কোনো অপরাধকে নিজেদের মতো করে ‘রাজনৈতিক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পেতে পারে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অনেক মামলা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতও (আইসিজে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরের রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আইসিজে ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের সততা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে।

আইসিটির রায় ও দিল্লির অবস্থান

২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনাকে পুলিশি দমন-পীড়নের জন্য দায়ী করে। পরে একটি দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে।

আমি স্বাধীনতা উপভোগ করছি, তারা আফগানিস্তানে ‘বন্দি’

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় দমন-পীড়নে নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০।

রায়ের পর শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। তবে নয়াদিল্লি এ নিয়ে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল জানিয়েছে, তারা রায়টি পর্যবেক্ষণ করছে। ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণ কামনা করে।

তারা সেখানে শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা দেখতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা সবসময় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করবে। অন্যদিকে জাতিসংঘ নীতিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করলেও বাংলাদেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে।

৮ নম্বর অনুচ্ছেদের বাধা

প্রত্যর্পণ চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদটি ভারতের জন্য আরেকটি আইনি পথ খুলে দিয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, কোনো অভিযোগ যদি ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ বা ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থে’ করা না হয়, তবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা যাবে। শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই আইসিটির রায়কে ‘পূর্বনির্ধারিত’ বলে আখ্যায়িত করেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকার অভিযোগ তোলেন।

স্পেন কি কোনো ‘শাস্তি’ পাচ্ছে?

তৎকালীন সরকার জামায়াতের পক্ষে বহু মামলা লড়া ব্যারিস্টার তাজুল ইসলামকে ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। শেখ হাসিনা নিজেও এক বিবৃতিতে এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার দাবি করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হলে ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধন প্রয়োজন।

বাস্তবতা ও সম্পর্কের উষ্ণতা

দুই দেশের সীমান্তে অপরাধীদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা ও দিল্লি এই প্রত্যর্পণ চুক্তি সই করে। একই বছরের ২৩ অক্টোবর থেকে এটি কার্যকর হয়। ইতোপূর্বে এই চুক্তির আওতায় ২০২২ সালে ১১টি হত্যা মামলার আসামি নূর নবী ম্যাকসনের মতো বেশ কয়েকজন অপরাধীকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। পলাতক আসামিদের হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এই চুক্তিটিই দুই দেশের একমাত্র কার্যকর আইনি মাধ্যম।

তাত্ত্বিকভাবে প্রত্যর্পণ সম্ভব হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলার ক্ষেত্রে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই প্রধান ভূমিকা রাখে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে হঠাৎ ফেরত পাঠালে বাংলাদেশে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তা ছাড়া যখন দুই দেশের সম্পর্ক সর্বোচ্চ চূড়ায় ছিল, তখন এই চুক্তি সই হয়েছিল। বর্তমানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াটি দিল্লির জন্য বেশ জটিল।

Continue Reading

মতামত

কেন খাবেন না কোমল পানীয়?

Published

on

By

লাইফস্টাইল ডেস্ক

কোমল পানীয় যে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়-তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। ২০২১ সালে কোমল পানীয়ের বিশ্বব্যাপী বাজারমূল্য ৪১৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল। যদিও নিয়মিত কোমল পানীয় পানের নেতিবাচক পরিণতি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত তবুও সব বয়সের মানুষকেই এসব পানীয় অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করতে দেখা যায়। 

কোমল পানীয় মূলত পানির ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি পানীয়। এর সঙ্গে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস মিশ্রিত হলে কার্বনেটেড হয়ে যায়। অগণিত কোমল পানীয়ের বিভিন্ন স্বাদের পেছনে এমন কিছু উপাদান আছে যা শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

কোমল পানীয়ের ভেতরের লোভনীয় বুদবুদ, অথবা পান করার সময় মুখে সুড়সুড়ির অনুভূতি, কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের ফলে হয়।

এই যৌগটি পাকস্থলীকে অনেকের ধারণার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। 

কোমল পানীয় পান করার পর এবং এটি অন্ত্রে পৌঁছানোর পর, শরীর পনীয়টিকে ‘উষ্ণ’ করে যার ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড পেটে গ্যাস হিসাবে প্রসারিত হয়। কার্বনেশন এবং গ্যাস জমা হওয়ার কারণে এর ফলে তীব্র পেট ব্যথা হতে পারে।

এছাড়া পেট ফাঁপা, অস্বস্তি, পেট ভরা অনুভূতি এবং পেটের পেশীতে খিঁচুনি সৃষ্টি করতে পারে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে, এটি ঢেকুর তোলার অনুভূতি সৃষ্টি করে। 

এছাড়া সোডা পান করার পর অতিরিক্ত ঢেকুর তোলার ফলে খাদ্যনালীতে অ্যাসিড বেরিয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে খাবারের সময় বা ঠিক পরে সোডা পান করলে।

আবার কেউ যদি ডায়েট কোমল পানীয়কে স্বাস্থ্যকর বিকল্প মনে করেন তাহলে তাও সঠিক নয়।  বেশিরভাগ অন্ত্রের সমস্যা  ডায়েট সোডায় পাওয়া কৃত্রিম মিষ্টির জন্য হয়।  এই মিষ্টিগুলো অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া (মাইক্রোবায়োম) উৎপাদন এবং নিয়ন্ত্রণকে ব্যাহত করে।

কোমল পানীয় পেটের উপর ‘অ্যাসিড লোড’ হিসেবে কাজ করতে পারে।  এটি পাকস্থলীর অ্যাসিডিটির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, পাকস্থলীর আস্তরণের ক্ষতি করে এবং প্রায়শই অম্বল এবং অ্যাসিড রিফ্লাক্স (প্রচলিতভাবে ধোয়া ঢেকুর) করে। 

তথ্যসূত্র: সামাটিভি

Continue Reading

মতামত

কুরবানির তাৎপর্য

Published

on

By

মাওলানা আশরাফ উদ্দিন খান

ইসলামে ইবাদতের ধারণা খুব স্পষ্ট ও বিস্তৃত। এখানে ইবাদত বলতে কোন সীমাবদ্ধ ধর্মীয় ধারণা বুঝানো হয় না। সাধারণ ধারণায় ইবাদত হতে পারে ব্যক্তিগত কোন ধর্মীয় কাজ-কর্ম, কিন্তু ইসলামে ইবাদতের ধারণা, অভ্যাস ও প্রভাব ব্যক্তির পরিধি অতিক্রম করে সমাজ ও জাতির সভ্যতা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কুরবানির শুরু একজন ব্যক্তির ইসতিসলাম বা আত্মসমার্পণ দিয়ে, আর পরবর্তীতে সেটা ধীরে ধীরে ব্যক্তি-পরিবারকে অতিক্রম করে সমাজ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে সমাজের মধ্য থেকে বৈষম্য দূর করার কৌশল প্রদান করে থাকে। কাজেই এটার শুরু ব্যক্তিগত ইবাদত হলেও এটা শেষ হয় সামাজিক সুফল অর্জনের মধ্য দিয়ে। কুরবানির মধ্যে এমন কিছু ভিত্তি বিদ্যমান রয়েছে যা একটি সভ্যতার সৃষ্টির জন্য অতি প্রয়োজনীয় ভিত্তি।

কুরবানির মধ্যে বিদ্যমান ভিত্তিসমূহ কি কি?

কুরবানির ভিত্তি ও স্তম্ভ কুরবানির আমলের মধ্যে চারটি ভিত্তি ও স্তম্ভ বিদ্যমান যেগুলো হচ্ছে-

1. তাকওয়া

2. ত্যাগ

3. বণ্টন

4. ঐক্য

—তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর ভয়। কুরআনের পরিভাষায় মানুষকে সভ্য মানুষে পরিণত করে এই তাকওয়া। কুরআন বলে ‘তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়ার অধিকারী’। এই তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়ের মাধ্যমে মানুষের ভিতরে দায়িত্ব বোধ ও জবাবদিহিতা তৈরি হয়। ফলে মানুষ দুর্নীতি মুক্ত হয়ে জীবনযাপন করতে শিখে। এভাবে সমাজের মধ্যে আল্লাহভীরু ও দুর্নীতিমুক্ত মানুষের সৃষ্টি হতে থাকে। এক এক করে কিছু আল্লাহভীরু মানুষের সমষ্টিতে একটি আল্লাহভীরু সমাজের বিকাশ করে।

কুরবানির দ্বিতীয় ভিত্তি ছিল ত্যাগ। মদিনাতে মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের মাধ্যমে মুসলিম সভ্যতার যে গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই সভ্যতার একটি উল্লেখযোগ্য ভিত্তি ও গুণ ছিল এই ত্যাগ। কুরআন বলছেঃ وَٱلَّذِينَ تَبَوَّءُو ٱلدَّارَ وَٱلۡإِيمَٰنَ مِن قَبۡلِهِمۡ يُحِبُّونَ مَنۡ هَاجَرَ إِلَيۡهِمۡ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمۡ حَاجَةٗ مِّمَّآ أُوتُواْ وَيُؤۡثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ وَلَوۡ كَانَ بِهِمۡ خَصَاصَةٞۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفۡسِهِۦ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ٩‘… এবং তারা তাদেরকে (অন্যদেরকে) নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় যদিও তাতে তাদের ভীষণ প্রয়োজন থাকে’। (সুরা হাশরঃ ০৯) ত্যাগ এমন একটি গুণ যা মানুষকে মহামানব এবং সভ্যতাকে মানবিক সভ্যতায় পরিণত করে। ত্যাগের বিপরীত ধারণা হচ্ছে দখলদারিত্বের মানসিকতা। যেই মানসিকতা থেকে মানুষের মুক্ত থাকা চেতনা ছাড়া সম্ভব নয়। কুরআনের দুটি আয়াতের দুটি অংশ উল্লেখ করা যাকঃ وَأُحۡضِرَتِ ٱلۡأَنفُسُ ٱلشُّحَّۚ وَإِن تُحۡسِنُواْ وَتَتَّقُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٗا١٢٨‘… মানুষকে কার্পণ্যের উপর সৃষ্টি করা হয়েছে, যদি সৎকর্মশীল হও এবং মুত্তাকী হও তবে তোমরা যা করো নিশ্চয় আল্লাহ তার খবর রাখেন’। (সুরা নিসাঃ ১২৮) وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفۡسِهِۦ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ‘… যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে তারাই সফলকাম’। (সুরা হাশরঃ ০৯) কুরবানির ইবাদত মানুষকে আধুনিক ভোগবাদের ধারণাকে বাদ দিয়ে মানুষের কল্যাণের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করার শিক্ষা দান করে। কুরবানি মানুষকে শেখায় ‘আমি কম নিতে ও অপরকে বেশি দিতে অভ্যস্ত হব’। কুরবানির গোশত বণ্টনের মাধ্যমে নিজের সম্পদকে অন্যের সামনে পেশ করার সবক ও শিক্ষা রয়েছে। এই শিক্ষাকে ব্যাপকতার রুপ দান করতে পারলে সেটা সভ্যতার উপাদানে রুপান্তরিত হবে। এটাকে কুরবানির গোশত থেকে মসজিদে নামাজের জায়গা দখল করা, বাসের সিট দখল, পাবলিক লাইব্রেরীর চেয়ার দখল করা, নিজের গাড়ি দিয়ে কারো স্থান দখল করা থেকে আরো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

আর চতুর্থ ভিত্তি ছিল ঐক্য। অর্থাৎ সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একদিন, এক আমল ও এক অনুভুতির মাধ্যমে সারা দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান নিজেদের মধ্যে ঐক্যের অনুভতি অর্জন করতে সক্ষম হয়। আজক যেহেতু কুরবানি তাঁর যথাযত অর্থ ও মর্ম হারিয়ে নিছক একটি আচার ও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তাই প্রতিবছর কুরবানি আদায় করার পরেও কুরবানির এই ভিত্তিগুলো আমাদের সমাজে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে ইবাদত বা আমল আছে ঠিক কিন্তু তাঁর যথাযথ ফল আমরা অর্জন করতে পারছি না। আমরা আকৃতি গ্রহণ করেছি কিন্তু চেতনা হারিয়ে ফেলেছি, সুন্নত পালন করছি ঠিক কিন্তু সেই প্রেরণা আমাদের মাঝে ধরে রাখতে পারিনি। যে জাতি বা উম্মাহ কুরবানির মর্ম বুঝতে পারে, সেই উম্মাহ ইতিহাস রচনা করতে পারে। আর যে উম্মাহ কুরবানি ভুলে যায় সে তাঁর ইতিহাসকে হারিয়ে ফেলে। আজকে আমাদের কুরবানির মধ্যে হযরত ইবরাহীম আঃ এর আমলের বাহ্যিক রূপ আছে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু যেই ঈমান আর চেতনাকে সাথে নিয়ে তিনি কুরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন সেই ঈমান আর চেতনা থেকে আমাদের অবস্থান কত দূরে। কুরবানির চেতনা যদি আমরা আসলেই ধারণ করতে পারি, তাহলে সেই ধারণাকে আমরা অতি সহজে মুসলিম উম্মাহর সভ্যতার পুনঃনির্মাণে ব্যবহার করার সাহস ও সুযোগ পাবো ইনশা আল্লাহ। আর যদি আমরা প্রতি বছরে অভ্যাস অনুযায়ী কুরবানি করতে থাকি, এর চেতনা ধারণা করা ব্যতীত তাহলে সেটা হবে কুরবানির নিছক সাদৃশ্য গ্রহণ করা। ফলে কুরবানির সুদুর প্রসারি ফল আমরা অর্জন করতে পারব না। যেটা আমাদের প্রতিদিনের আমল প্রমাণ করে দিচ্ছে। আমাদের কুরবানির ভিত্তি হোক তাকওয়া, ত্যাগ, বণ্টন ও ঐক্যের সুতায় গাঁথা একটি সমন্বিত আমল, যা আমাদেরকে সুন্নতে ইবরাহীমের নিকটবর্তী করবে ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ উত্তম তাওফিকদাতা।

লেখক: মাওলানা আশরাফ উদ্দিন খান (খতিব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ)

Continue Reading

Trending