নতুন বাংলাদেশ গঠনে জুলাই সনদের খসড়া চূড়ান্ত করেছে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন। পাঠিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। তবে পিআর পদ্ধতি সহ গণ-অধিকার পরিষদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী সাংসদে ও নিম্নকক্ষে পিআর পদ্ধতি চায়।
জামায়াত ইসলামী-সহ সাত দলের বিক্ষোভ:
জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ সাতটি দল রাজধানীতে একযোগে বিক্ষোভ সমাবেশ করে জুলাই সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজন ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বলেছে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার বিষয়ে সফলতা আসছে না বলেই তারা মাঠের কর্মসূচিতে গেছে। ইসলামী আন্দোলন পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন প্রশ্নে ‘গণভোট’ দাবি করে বলেছে, জনগণ না চাইলে তারা এ দাবি থেকে সরে যাবে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, জাতীয় প্রেসক্লাব ও বিজয়নগর এলাকায় সাত দলের এই বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়। বিক্ষোভকারী অপর দলগুলো হলো, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও খেলাফত আন্দোলন।একই দাবিতে শুক্রবার সারা দেশে সব মহানগরে এবং ২৬ সেপ্টেম্বর জেলা ও উপজেলায় বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি রয়েছে।
দলগুলোর দাবি— জামায়াত-সহ কয়েকটি দল দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের সাথে আলোচনা করে আসছিলেন। তবে টেবিলে তাদের দাবিদাওয়া পূরণ না হওয়ায় মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছে। জুলাই সনদ ও পিআর পদ্ধতি নাকচ করে বিএনপি একতরফা নির্বাচনে যেতে চায়।
আন্দোলনে নেই এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ ও এবি পার্টি:
জামায়াত তার ভাষায়– জুলাই সনদের ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন দলকে নিয়ে একটি জোট গড়ার চেষ্টা করছে।রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে একটা ‘শোডাউনেরও’ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে।
তবে এখনো যুগপৎ মডেলে কোনো কর্মসূচিতে যেতে আগ্রহ দেখায়নি এনসিপি। যদিও শুরু থেকেই ইসলামী বিভিন্ন দল এবং এর বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় সম্পৃক্ত ছিল এই দলটি। দলটি উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি চাইলেও নিম্নকক্ষে আগের মতো নির্বাচন চান।
জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলন:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৫ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে। দাবিগুলো হলো— জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের জুলুম-নির্যাতন, গণহত্যা ও দুর্নীতির বিচার দৃশ্যমান করা এবং স্বৈরাচারী শক্তির দোসর জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ।
এই দাবিগুলো আদায়ের লক্ষ্যে আগামী ১৮, ১৯ ও ২৬ সেপ্টেম্বর তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণ জামায়াতের যৌথ উদ্যোগে বিক্ষোভ কর্মসূচি করেছে সংগঠনটি। তবে ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাবি আদায় করতে পারবে কিনা প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকে জামায়াতের বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। সেখানে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা চলমান অবস্থায় কেন জামায়াত মাঠের কর্মসূচিতে গেল, তার ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘আলোচনার টেবিলে যাচ্ছি, কিন্তু সে আলোচনায় সফলতার মুখ দেখছি না। মনে হয়, কোনো চাপের মধ্যে পড়ে সরকার একটি শুভংকরের ফাঁকির দিকে যাচ্ছে।’
এই আন্দোলনকে ‘রাজনীতির অংশ’ উল্লেখ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘এই আন্দোলন জনগণের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরার জন্য।’ সমাবেশে পিআরের পক্ষে গণভোটের দাবি করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘আমরা চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি, গণভোট দিন। জনগণ যদি পিআর মানে, তো আপনাদেরও (অন্তর্বর্তী সরকার) মানতে হবে। আর জনগণ যদি বিপক্ষে যায়, আমরা জামায়াতে ইসলামী তা মেনে নেব।’
জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ সমাবেশ
বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোতে নির্বাচন হলে আরেকটি ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে উল্লেখ করে পরওয়ার বলেন, ‘সংস্কার যদি এখন না হয়; রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যগুলো ঠিক করার জন্য যত সংস্কার, তা যদি নির্বাচনের আগে না হয়; বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোতে যদি আবার নির্বাচন হয়, তাহলে এই কাঠামোতে আরেকটি ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে। আরেকটি হাসিনার জন্ম হবে। বাংলার মানুষ আর ফ্যাসিবাদ জন্ম হতে দেবে না।’
এই যুগপৎ কর্মসূচি বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আন্দোলন হবে কি-না শঙ্কায় রাজনীতিবিদরা। কথার উত্তাপ আর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে নিয়ে যাবে কারো জানা নেই। এদিকে আলোচনার টেবিল থেকে মাঠে নামাটা ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে বলে মনে করছে বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু বলেন, ‘আন্দোলনের নামে আমি তো চাইলে রাস্তা অবরোধ করতে পারবো না৷ মবক্রেসি করতে পারি না৷ কেউ যদি রাস্তায় নেমে জোর করে চাপিয়ে দিতে চায় তাহলে জনগণের উপর আস্থার অভাব।’
আমীর খসরু
পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক উত্তাপ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘সবাই চাচ্ছে আর আপনি চাচ্ছেন না এটা কেমন সংস্কার? আপনি যেটা চাচ্ছেন সেটা বাংলাদেশে আর হবে না। আমরা জনগণের পক্ষে আন্দোলন করতেছি। এখানে সংঘাত-ক্লেশ হবে কেন? এখনও কি স্বৈরাচার মাঠে আছে?’
হামিদুর রহমান আযাদ
বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ ফয়জুল করিম বলেন, ‘টেবিলে সমাধান করতে পারেনি। জনগণ কী চায় তা তারা বুঝতেছে না। যদি ঐক্যমতে পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে গণভোট দেন। ডিসাইড করবে জনগণ— তারা পিআর চায় কি চায় না।’
বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন
এদিকে বিবিসি বাংলার এক সাক্ষাতকারে গণঅধিকার পরিষদের নেতা রাশেদ খান মন্তব্য করেন, ‘যুগপৎ আন্দোলন নামে আমরা বিভক্ত হয়ে গেলে আবারো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে।’
এদিকে রাজপথে জবাব দিতে প্রস্তুত না বিএনপি, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন গোছানোর পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি।
পিআর পদ্ধতির সুবিধা-আসুবিধা:
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিআর পদ্ধতিতে যেসব সুবিধা রয়েছে তা হচ্ছে:
১. অসংখ্য রাজনৈতিক দলের এ দেশে বহু মত-পথ থেকে ভোটারদের কাছে যাওয়া হয়। অতীতের নির্বাচনগুলোতে আট-দশটির বেশি দল সংসদে যেতে পারেনি। হয়তো কোনো দল ৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে কিন্তু আসন একটিও পায়নি। কিন্তু পিআর পদ্ধতি হলে ৯টি আসন পেতে পারত। সুতরাং পিআর পদ্ধতি ছোট দলগুলোর সংসদে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। লক্ষণীয়, কোনো কোনো ছোট দলে বড় মাপের দু’-একজন নেতা দেখা যায়। পিআর পদ্ধতি হলে ছোট ছোট দলের একাধিক নেতা সংসদে স্থান পাবেন। তাতে সংসদে জনপ্রতিনিধিত্ব যেমন বাড়বে, তেমনি সংসদে মানসম্মত নেতারা যেতে পারবেন।
২. বর্তমান পদ্ধতিতে একটি আসনে যদি পাঁচজন প্রার্থী থাকেন, তার মধ্যে একজন ২৫ শতাংশ ভোট পেয়েও বিজয়ী হতে পারেন। তার মানে তিনি ৭৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন ছাড়া নির্বাচিত হয়েছেন। পিআর পদ্ধতি এ দিক থেকে অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল।
৩. বর্তমান পদ্ধতিতে প্রার্থীরা যেকোনো আঞ্চলিক ইস্যুতে আবেগ ছড়িয়ে দিয়ে বা কালো টাকা ব্যবহার করে সুইং ভোটারদের মন জয় করতে পারেন। কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে কোনো নির্বাচনী এলাকায় বিশেষ কোনো প্রার্থী থাকেন না বিধায় বিশেষ কোনো ইস্যু নিয়ে জোয়ার সৃষ্টি করার সুযোগ পাবেন না। ভোটারদের নিজ নিজ দলের এবং জাতীয় বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।
৪. বর্তমানে দেশের সংসদ সদস্যরা এলাকার বিচার সালিস থেকে শুরু করে ছোটখাটো উন্নয়নমূলক কাজেও হস্তক্ষেপ করে থাকেন। তারা বিভিন্ন কাজে মন্ত্রণালয়ে তদবির কাজে ব্যস্ত থাকেন। অথচ তাদের প্রধান কাজ দেশের জন্য আইন প্রণয়ন করা। আইন প্রণয়নে যথেষ্ট পড়াশোনা ও যোগ্যতা থাকতে হয়। পিআর পদ্ধতিতে কোনো সংসদ সদস্য যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো এলাকার প্রতিনিধিত্ব করবেন না, সেহেতু তারা আইন প্রণয়নে অধিকতর সময় ব্যয় করতে পারবেন। এতে করে এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ করতে স্থানীয় সরকার তথা ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা বা জেলা পরিষদ অধিকতর সক্রিয় হয়ে উঠতে পারবে।
৫. আমাদের সংস্কৃতিতে যার ভোটে প্রার্থী জিততে পারেন না তার ভোট মূল্যহীন গণ্য করা হয়। পিআর পদ্ধতিতে কোনো দল কমপক্ষে ১ শতাংশ ভোট পেলেও দলটি সংসদে তিনটি আসন পাবে। ফলে ছোট ছোট দলকে যারা ভোট দিয়েছেন তাদের ভোটটি নষ্ট হয় না বলে বিবেচনা করা হয়।
৬. বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোনো নির্বাচনী এলাকার কয়েকজন প্রার্থী থাকলে একজন ন্যায়নিষ্ঠ ভোটার তাদের কাউকে পছন্দ নাও করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তিনি হয়তো ‘না’ ভোট দিতে পারবেন, কারণ তার কাছে আর কোনো অপশন থাকে না। কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে একটি দলের অনেক প্রার্থীর কারণে তিনি কোনো একটি দলকে বেছে নিতে পারেন। অর্থাৎ- তার ভোট দেয়ার জন্য বৃহত্তর অপশন থাকে।
৭. বিদ্যমান ব্যবস্থায় একজন প্রার্থী জয়লাভে মরিয়া হয়ে উঠেন এবং বিশাল বাজেট (যা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না), পেশিশক্তি দিয়ে ভোটারদের ভয় দেখানো, ভোটকেন্দ্র দখল, অনৈতিক আচরণ ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। কিন্তু পিআর পদ্ধতি হলে যেহেতু ব্যক্তি মুখ্য থাকে না, সেহেতু তিনি দলের হয়ে ততটা মরণপণ করবেন না। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
৮. বিদ্যমান দু-একটি দল প্রভাবশালী হওয়ায় নির্বাচনকালে অধিকতর সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। কিন্তু পিআর পদ্ধতি হলে ছোট-বড় সব দল সমান সুবিধা পাবে।৯. বিদ্যমান ব্যবস্থায় একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি দলীয় মনোনয়ন লাভে অর্থ ব্যয় করেন (অনেক দলের ক্ষেত্রে এটি সত্য)। কিন্তু পিআর পদ্ধতি হলে অর্থ ব্যয়ে মনোনয়ন লাভের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
১০. অনেকে যুক্তি দিয়ে থাকেন, পিআর পদ্ধতিতে কোনো দলের পক্ষে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়া সম্ভব হয় না বিধায় কোয়ালিশনের বিকল্প থাকে না; ফলে সরকার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বিষয়টি ইতিবাচকভাবেও দেখা যেতে পারে। সেটি হচ্ছে- কোয়ালিশন বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সুযোগ করে দিতে পারে। একটি দেশের সব মত-পথকে সমান মর্যাদা দিতে হবে।
১১. বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোনো একটি জেলা বা উপজেলার দোহাই দিয়ে আঞ্চলিকতার সুর তুলে ভোটারদের মন জয় করা যেতে পারে। যেমন- রংপুরের ভোটাররা একসময়ে জেনারেল এরশাদকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু তার দল অন্য জেলায় ভালো ভোট পেত না। আবার কোনো দল গোপালগঞ্জের বা পার্বত্য চট্টগ্রামের দোহাই দিয়ে কয়েকজন প্রার্থী জিতিয়ে আনতে পারে। পিআর পদ্ধতি হলে সেটি সম্ভব হবে না। জার্মানিতে ১৯৪৯ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত একাধারে ৫০ বছরের মধ্যে আট বছর ছাড়া ফ্রি ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় ছিল, যদিও কখনো ১২ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।
পিআর পদ্ধতির অসুবিধাগুলো কী কী:-
১. পিআর পদ্ধতির অসুবিধাগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে কোয়ালিশন সরকারের স্থিতিশীলতা থাকে না। সে জন্য সরকার কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিভাজন এত বেশি যে, কোয়ালিশন সরকারের কতটা স্থিতিশীল থাকবে তা বলা কঠিন। যদিও নির্বাচনী জোট গঠনের সুখকর উদাহরণ একাধিক রয়েছে।
২. পিআর পদ্ধতি যদিও ছোট দলগুলোকে সুবিধা দেয় কিন্তু কোনো উগ্রবাদী দল যদি সরকার গঠনে অপরিহার্য হয়ে উঠে সে ক্ষেত্রে বেশি ভোট পাওয়া দলটির জন্য বিপদ হয়ে যেতে পারে। উগ্রবাদীদের চাপে সরকার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে সরকার বাধ্য হতে পারে।
৩. পিআর পদ্ধতি যদিও কোয়ালিশন সরকারের প্রবণতা নিশ্চিত করে, সমধর্মী পার্টিগুলো যদি একত্র হয়ে সরকার গঠন করে, সে ক্ষেত্রে ক্ষমতা আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে।
৪. পিআর পদ্ধতি ছোট দলগুলোকে আরো সুবিধা দেয়, এরা সরকার গঠনে অপরিহার্য শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ফলে নির্বাচকমণ্ডলীর একটি ক্ষুদ্র অংশ দেশের বৃহত্তর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অনুঘটকের কাজ করতে পারে।
৫. বিদ্যমান পদ্ধতিতে কোনো নির্বাচিত সদস্য যদি কোনো ভুলত্রুটি করেন বা জনগণের চাহিদা/দাবি পূরণে ব্যর্থ হন, তাহলে ভোটাররা পরবর্তী নির্বাচনে আর ভোট দেবেন না। কিন্তু পিআর পদ্ধতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, প্রার্থী কোনো বিশেষ এলাকার না হওয়ায় ব্যর্থ সংসদ সদস্যের প্রতি অনাস্থা দেয়ার সুযোগ থাকে না। কারণ তিনি ব্যক্তি হিসেবে নন, দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচিত হন।
৬. ব্রিটিশ আমল থেকে বাংলাদেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে ভোট হয়ে আসছে। পিআর পদ্ধতি কারো কাছে বেশ জটিল মনে হতে পারে। এ জন্য ভোটার এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রায়হান সুবহান পিআর পদ্ধতির অসুবিধা নিয়ে ফেসবুক স্টাটাসে লিখেন, পিআর সিস্টেমের একটা বড় অসুবিধা হলো-মুফতি আমীর হামজার মতো রিলিজিয়াস কাভারে রাতদিন বানোয়াট কথা বলা ব্যক্তিও এমপি হয়ে যেতে পারে। যারা এমন ব্যক্তিকে এমপি নমিনেট করলো তারা পিআর এ তাকে এমপি বানাতেও পারে।একজন এমপি -এর মূল কাজ কী? – Making laws or supporting them. এই দেশের ৫০%+ নেতা আইনের Definitionও জানে কি-না ডাউট আছে। আমাদের রাজনৈতিক সিস্টেম এমন এখানে অতীতে মমতাজ ও ভবিষ্যতে আমীর হামজারা আইন বানাবে এবং আইন অনুমোদন দিবে। যাহোক , ভালো থাকুন এবং ভালো রাখুন।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ভারতের একজন কূটনীতিকের বৈঠক নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা শুরু হয়। এ বিষয়ে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের অবস্থান জানিয়েছে ভারত। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের বৈঠককে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয় মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে। জবাবে তিনি জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে এবং ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেন। তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে হওয়া বৈঠকটিও সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই পড়ে।
এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, চলতি বছরের শুরুতে তিনি ভারতের একজন কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি বলেন, অন্য দেশের কূটনীতিকেরা প্রকাশ্যে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেও ওই ভারতীয় কর্মকর্তা বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একে অপরের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ জরুরি এবং এ ক্ষেত্রে বিকল্প কোনো পথ নেই।
এই মন্তব্য প্রকাশের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিল রয়টার্স। তবে সে সময় কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। প্রায় দুই সপ্তাহ পর ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য এলো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের জোটে না যাওয়ার ঘোষণা দেন ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। এ সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
গাজী আতাউর রহমান বলেন, জামায়াত শরিয়াহ আইনে রাষ্ট্র পরিচালনা নীতি থেকে সরে এসেছে। তাই ১১ দলীয় জোট থেকে অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকেও বেরিয়ে আসার আহ্বান জানাই।
ইসলামপন্থী দলগুলোর জন্য আলোচনার দরজা খোলা আছে, বলেও জানান তিনি।
ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতের আমির বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছেন, যার অর্থ দাঁড়ায়, সমঝোতার নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে জামায়াত।
দীর্ঘ সময় পর দেশের মানুষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশায় ছিলেন, এর ফলে সেই প্রত্যাশা পূরণ পূরণ হওয়া নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।
ইসলামের নীতি থেকে জামায়াত সরে এসেছে দাবি করে একলা পথে গিয়ে ২৬৮টি আসনে লড়ার কথা জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। বাকি আসনগুলোতে বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির সাথে আসন সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন চরমোনাই পীরের দল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করেছে। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুক্রবার বিকাল ৪টায় আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে প্ল্যাটফর্মটি।
‘জনগণের শক্তি, আগামীর মুক্তি’এই স্লোগান সামনে রেখে যাত্রা শুরু করা প্ল্যাটফর্মটির পাঁচটি মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূলনীতিগুলো হলো- গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রাণ ও প্রকৃতি সুরক্ষা। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে জনগণপন্থী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দুপুর থেকে প্ল্যাটফর্মটির নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনুষ্ঠানের জন্য সেখানে মঞ্চ ও প্যান্ডেল প্রস্তুত করা হয়। বিকাল নাগাদ শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জমে ওঠে জনসমাগম।
এ সময় প্ল্যাটফর্মটির অন্যতম উদ্যোক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক শিক্ষার্থী মীর হুযাইফা আল মামদূহ জানান, এনপিএর ১০১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হবে। তিনি ৯৯ জন সদস্যের নাম ঘোষণা করেন। অন্য নামগুলো পরামর্শের ভিত্তিতে পরে ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি।
১০১ সদস্যের মধ্যে রয়েছেন- জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করা অনিক রায়, অলীক মৃ, তুহিন খান, ঢাবি শাখা ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি মেঘমল্লার বসু, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক নাজিফা জান্নাত, অধিকারকর্মী ফেরদৌস আরা রুমি, তাসলিমা মিজি প্রমুখ।
এনপিএ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের বিদ্যমান শাসনকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের পরিবর্তে শাসকগোষ্ঠীর অনুগত করে তুলেছে। ফলে জনগণের রক্ষক প্রতিষ্ঠানগুলোই ক্ষমতাচর্চা ও সম্পদ আহরণের অংশীদারে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে জনগণের অধিকার রক্ষা ও সেবাভিত্তিক কাঠামোতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে চায় প্ল্যাটফর্মটি।
প্ল্যাটফর্মটির ঘোষণায় আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের কার্যকর ও পূর্ণ পৃথকীকরণের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে শক্তিশালী, আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং কেন্দ্রের প্রভাবমুক্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এনপিএ লুটপাট, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটনির্ভর ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে। তাদের লক্ষ্য স্বনির্ভর, উৎপাদনমুখী ও জনকল্যাণভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, সহজ কৃষিঋণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ভর্তুকি এবং শিল্পশ্রমিকদের জন্য সম্মানজনক মজুরি কাঠামোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রগতিশীল করব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাস ও রাষ্ট্রীয় আয় বাড়ানোর কথা জানানো হয়।
পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট নিয়েও অবস্থান তুলে ধরে প্ল্যাটফর্মটি। এনপিএ জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্প প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নদী দখল, বন উজাড়, দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার প্ল্যাটফর্মটি।
এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে এনপিএ জানায়, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও শ্রেণি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করতে তারা কাজ করবে। মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি জান-মালের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।