বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াত একটি প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থি ইসলামী রাজনৈতিক দল, যা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের নীতিমালা ধারাবাহিকভাবে পরিমার্জন করে আসছে। তিনি বলেন, জামায়াত সবসময়ই গণতান্ত্রিক ও জনমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাসী।
ভারতের সাপ্তাহিক ইংরেজি ম্যাগাজিন দ্য উইককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। সাক্ষাৎকারে তিনি জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট না থাকলেও জাতীয় স্বার্থে গঠনমূলক সহযোগিতা এবং ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের বিষয়ে জামায়াত ইতিবাচক বলে জানান তিনি।
সাক্ষাৎকারে *দ্য উইক*-এর দিল্লি ব্যুরোপ্রধান নম্রতা বিজি আহুজার প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রথাগত নির্বাচনি রাজনীতির বাইরে থাকলেও জামায়াত কখনোই গণতান্ত্রিক কার্যক্রম থেকে সরে আসেনি। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে একই প্রতীকে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে জামায়াত শিখেছে—গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়লে সব গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য কতটা জরুরি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের এই সময় জামায়াতকে আরও শক্তিশালী করেছে। সংগঠনের কাঠামো মজবুত করা হয়েছে, শৃঙ্খলা আরও কঠোর করা হয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে জনসংযোগ গভীর হয়েছে। একইসঙ্গে সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনৈতিক কৌশলও নতুন করে সাজানো হয়েছে।
তিনি জানান, ২০১৩ সাল থেকে কার্যত নিষিদ্ধ অবস্থার মধ্যেও জামায়াত সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। বর্তমানে দেশের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ দুর্নীতি ও অপশাসনের বিকল্প হিসেবে জামায়াতের সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামোর প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতপন্থি ছাত্র সংগঠনের সাফল্য এ আগ্রহের প্রমাণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত এখন কেবল একটি আদর্শিক দল নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের দেশ গঠনের অংশীদার করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
জোট রাজনীতি প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দলটি নির্দিষ্ট কোনো আদর্শের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। জামায়াত বহুদলীয় গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনে বিশ্বাসী। ইতোমধ্যে ১০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠন করেছে দলটি। তবে বিএনপির সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট না থাকলেও জাতীয় স্বার্থে গঠনমূলক সহযোগিতা এবং জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়ে তারা ইতিবাচক।
তিনি জানান, জোটবদ্ধ রাজনীতির ক্ষেত্রে জামায়াতের তিনটি মূলনীতি রয়েছে—জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং দেশপ্রেমিক রাজনীতি।
নারী ও সংখ্যালঘুদের বিষয়ে ওঠা সমালোচনার জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মানবিক মর্যাদায় বিশ্বাসী। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন প্রার্থীকে মনোনয়নের কথা উল্লেখ করেন। তবে আসন বণ্টন ও জোটগত সমীকরণের কারণে এবার নারী প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হয়নি। জোটের নারী প্রার্থীদের জামায়াত পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের নারী জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচিত হওয়ার নজিরও তুলে ধরেন।
অতীতের বিতর্ক প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জামায়াতের কোনো সদস্যের কারণে যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তবে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।