Connect with us

top1

কারা পাবেন গানম্যান ও আবেদনের নিয়ম কী? 

Published

on

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে অনেক রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তি নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করছেন। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে ‘গানম্যান’ প্রসঙ্গ।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করেছে সরকার। এছাড়া নিজের নিরাপত্তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করেছেন অনেকে। কেউ চেয়েছেন গানম্যান, আবার কারও চাহিদা ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স। এসব আবেদনের প্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয় নেতাসহ অন্তত ২০ জনের জন্য গানম্যান দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) দুপুরে পুলিশ সদরদফতর জানায়, আবেদনের প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকায় এনসিপির ৬ নেতাসহ ২০ জনকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। এসবি এ বিষয়ে কাজ করছে। এই গানম্যানের সব খরচ বহন করবে সরকার। 

কারা গানম্যান পাবেন

সরকারি প্রটোকল বা পদাধিকার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি গানম্যান বা সশস্ত্র দেহরক্ষী পান। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা (সচিব বা সমপর্যায়ের) এবং বাহিনী প্রধানগণ এই ক্যাটাগরিতে পড়েন।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, “নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের যে-কোনও ব্যক্তি গানম্যানের জন্য আবেদন করতে পারেন। যাকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে তার আসলেই নিরাপত্তা প্রয়োজন কিনা, সেটি যাচাই-বাছাই করা হয়। গানম্যান বা বডিগার্ড নিয়োগের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।” 

গানম্যান পেতে যেভাবে আবেদন করবেন

গানম্যান ও বডিগার্ড পাওয়ার বিষয়টি মূলত ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকল এই দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাইলে যে কাউকে তার বিশেষ ঝুঁকি বিবেচনা করে গানম্যান বরাদ্দ দিতে পারে। রাজনৈতিক ঝুঁকি বা গুরুত্বপূর্ণ মামলার সাক্ষী হওয়ার কারণেও সরকার নিজ উদ্যোগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গানম্যান দিয়ে থাকে।

পুলিশ সদরদফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, গানম্যান পেতে লিখিতভাবে পুলিশকে অথবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। আবেদন প্রক্রিয়া শেষে গোয়েন্দা সংস্থা বা স্পেশাল ব্রাঞ্চ তদন্ত করে দেখে যে আবেদনকারীর সত্যিই নিরাপত্তা প্রয়োজন কিনা। এরপর চলে কঠোর যাচাই-বাছাই।

তিনি বলেন, “মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রটেকশন ইউনিট থেকে বডিগার্ড নিযুক্ত করা হয় এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ বা বিশেষ শাখা থেকে গানম্যান দেওয়া হয়। একজন গানম্যান সরকারি অস্ত্র ব্যবহার করেন এবং নির্দিষ্টসংখ্যক গুলিও তাদের জন্য বরাদ্দ করা থাকে। গানম্যানের খরচ বহন করে সরকার।” এছাড়া আনসার ভিডিপির সদস্যদের নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থও গানম্যান পেয়েছেন। তিনি বলেন, “নিরাপত্তার জন্য গানম্যান নিয়েছি। তিনি প্রতিদিন আসছেন, নিরাপত্তা দিচ্ছেন ও ডিউটি শেষে চলে যাচ্ছেন। তিন বেলা খাওয়া-দাওয়া আমাদের সঙ্গে করছেন। আর আমি যেহেতু ডিপ্লোম্যাটিক এলাকায় থাকি, তাই তার থাকার কোনও সমস্যা হচ্ছে না।” 

এদিকে গানম্যান নেননি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তিনি বলেন, “নির্বাচনের জন্য প্রচারণার এই সময়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারাসহ এনসিপির অনেক নেতা। জারাসহ অনেকেই গানম্যান পেয়েছেন। আমি গানম্যান নিইনি।” 

যা জানালেন পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলম বলেন, “ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মারা গেছেন। একটি নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিতে গিয়েছিলেন, এক আত্মঘাতী হামলাকারী তার কাছে এসে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে নিজের শরীরে লাগানো বোমার বিস্ফোরণ ঘটান। পৃথিবীর যত রাষ্ট্রপ্রধান আছেন, সবাইকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। তবে কোনও দেশই বলতে পারবে না— ব্যক্তিগত বডিগার্ড ও গানম্যান থাকলেই কোনো ব্যক্তিতে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।”

তিনি আরও বলেন, “আবেদনের প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকায় তাদের গানম্যান দেওয়া হচ্ছে। এর মানে এই নয় যে, তাদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।” 

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, “যারা হুমকির মধ্যে আছেন তাদেরকে গানম্যান দিচ্ছে সরকার। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে শুধু গানম্যান নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। পাশাপাশি সন্দেহভাজন কিলারদের— যারা ফোনে ও ম্যাসেজে হুমকি দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।” 

তিনি বলেন, “দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (এসবি, এনএসআই, ডিবি ও সিআইডি) এই হুমকি ও টার্গেট কিলিংয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। মাঠে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। হুমকি থাকা পর্যন্ত বৃহত্তর অপরাধ ঠেকাতে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশের পাশাপাশি দেশের নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।”

এছাড়া সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল বাড়ানো, দেশের আবাসিক হোটেলগুলোতে নজরদারি ও তথ্য রাখার কথাও বলেন এই সাবেক আইজিপি। পাশাপাশি নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে একটি মহল সব সময় তৎপর থাকে উল্লেখ করে তাদের প্রতিহত করতে আইনশৃঙ্খলাবহিনীর সঙ্গে জনগণকেও সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স (অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান) বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “গানম্যান হচ্ছে একটি প্রতীকী নিরাপত্তা, টার্গেট কিলিং ঠেকানো সম্ভব নয়।”

তিনি বলেন, “গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের তালিকা দেখে যৌথবাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ওয়ান ইলেভেন ও অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো জোরালো অপারেশন চালাতে হবে। বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নিষ্ক্রিয় মনে  হচ্ছে, মনে হচ্ছে তারা মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে গেছে, গা ছাড়া দেওয়া ভাব।”

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “হাদির আসামি অতিক্ষুদ্র, তাকে ধরা কোনও কঠিন কাজ নয়। ধরতে না পারা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ব্যর্থতা।”

২২ ডিসেম্বর দুপুরে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এনসিপির ছয় নেতাসহ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা মোট ২০ জনকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নিরাপত্তা, গানম্যান বা অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন রাজনীতিবিদ আবেদন করেছেন। এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অনেকেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি প্রায় ২৫ জন সরকারি কর্মকর্তাও অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন।

গানম্যান বরাদ্দ দেওয়া হলেও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি ‘প্রতীকী’ নিরাপত্তা। সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, কেবল একজন বডিগার্ড দিয়ে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; বরং টার্গেট কিলিং রুখতে হলে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। এর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পুলিশের তৎপরতা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।  

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top1

মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষ, সিটি করপোরেশনের ৩ গাড়িতে আগুন

Published

on

By

অনলাইন ডেস্ক

রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাতে এ ঘটনা ঘটে।

মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান চলার সময় বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হকার ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন।

এ সময় একটি ভেকু ও পুলিশের একটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। ঘটনার পর পুরো এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস কন্ট্রোল রুমের ডিউটি অফিসার রাকিব হোসেন জানান, মিরপুরের আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে।

Continue Reading

top1

আলজাজিরার কলাম/ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সমস্যা সামনে এনেছে

Published

on

By

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬-এ ওয়াশিংটন ডি.সি.-র হোয়াইট হাউসে একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্য প্রদানের পূর্বে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্রে এই রাষ্ট্রীয় সফরের সাথে সব ধরণের জাঁকজমক অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে ছিল বি-২ সামরিক বিমানের ফ্লাইওভার, পান্ডা এবং নিক্সন আমলের ঐতিহাসিক টোস্ট। তবে গ্লোবাল সাউথ থেকে যারা এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তাঁদের জন্য এই দৃশ্যমান জাঁকজমক মূল বিষয় ছিল না। এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের “গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা”র ওপর জোর দেওয়া। রিয়াদ থেকে নয়াদিল্লি বা জাকার্তা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের রাজধানীর জন্য এই শীর্ষ সম্মেলনটি চলতি দশকের বাকি সময়ে দুই পরাশক্তির সাথে কীভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করা যায় তার একটি স্পষ্ট আভাস দিয়েছে।

বেইজিং এই শীর্ষ সম্মেলন থেকে কোনো সামরিক ঝামেলায় না জড়িয়ে কূটনৈতিক সুরক্ষার সুবিধা নিয়ে বের হয়েছে। বিপরীতে, ওয়াশিংটন ততক্ষণে সাত মাসের কাছাকাছি সময় ধরে চলা মার্কিন-ইসরায়েলি ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, বাণিজ্য বিষয়ে মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল, লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য পুনর্প্রতিষ্ঠা করছিল এবং চীনকে ঠেকানোর প্রচেষ্টায় গ্লোবাল সাউথকে যেকোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছিল। ট্রাম্প নিজে শি-র উদ্দেশ্যে পরীক্ষা করেন এবং সম্মেলনটিকে সফল বলে ঘোষণা করলেও বেইজিং থেকে দূরত্ব বজায় রাখার তাগিদ পাওয়া গ্লোবাল সাউথের সরকারগুলোর কাছে এই স্পষ্ট বৈপরীত্য নজর না এড়িয়ে যাবে না।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প চান যে ইরানের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার চীন যেন ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অবরুদ্ধ থাকা হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে সাহায্য করে। শি যুদ্ধবিরতি এবং পরবর্তীতে শান্তি আলোচনায় ফেরার সমর্থনের কথা বললেও, চীনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রণালী খুলে দেওয়া বা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল না। বেইজিং কৌশলগতভাবে নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। রিয়াদ, আবুধাবি এবং দোহার জন্য এর স্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। চীন একজন সৈন্যও না পাঠিয়ে বা কোনো সামরিক ঘাঁটি দাবি না করেই তেহরানে সরাসরি কথা বলতে পারে, জাতিসংঘে প্রস্তাব দিতে পারে বা মধ্যস্থতার প্রস্তাব রাখতে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এই যুদ্ধের সরাসরি পক্ষ এবং সংকটের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকারী হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক সরঞ্জামের জন্য মার্কিন নিরাপত্তা ছত্রছায়ায় থাকলেও, কূটনৈতিক সংকট ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য বেইজিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের ঝুঁকি কমাচ্ছে। সহজ কথায়, চীনের উপযোগিতা কিছুটা হলেও এই তথ্যের মধ্যে রয়েছে যে ওয়াশিংটন যেসব যুদ্ধ লড়ছে চীন তাতে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিচ্ছে না।

এই হিসাব-নিকাশ সমগ্র অঞ্চলে বিস্তৃত রয়েছে। ইরাক, মিশর ও আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো, যারা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং নৌপথ অবরুদ্ধ হওয়া প্রত্যক্ষ করছে, তাদের কাছে চীনের এই সংযমের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। গ্লোবাল সাউথের নতুন কোনো পরাশক্তিকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; তাদের এমন কাউকে প্রয়োজন যিনি রক্তপাত না ঘটিয়ে সব পক্ষের সাথে আলোচনা করতে পারেন। বেইজিং সেই ভূমিকা পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে।

গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য সরকারের জন্য এটি কঠিন কিছু সিদ্ধান্তের সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প নিজে চীনের সাথে নতুন করে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য দেশকে চীনের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি আরও দুই মাসের জন্য বাড়ালেও, বাকিদের শুল্ক ও সরবরাহ ব্যবস্থার ধাক্কা সহ্য করতে বলা হচ্ছে। এর ফলে ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, পরাশক্তিগুলোর বৈরিতার মূল্য অন্যান্য দেশের বহন করা আশা করা হলেও ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে দরকষাকষির স্বাধীনতা বজায় রাখছে। এর প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। ভারত রাশিয়ার তেল কেনার পাশাপাশি মার্কিন প্রযুক্তি ও চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করে বহুপাক্ষিক ভারসাম্য বজায় রাখছে। ইন্দোনেশিয়া ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে তাদের “মুক্ত এবং সক্রিয়” পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিল ব্রিকস (BRICS) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে নিজেদের সুরক্ষার উপায় হিসেবে, যা কোনো পশ্চিমবিরোধী পদক্ষেপ নয় বরং এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিমা যেখানে অন্যরা নিয়ম নির্ধারণ করে। এই শীর্ষ সম্মেলনটি এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেনি, তবে এটি তা আরও জোরালো করতে পারে।

হুতিদের সামরিক শক্তির নেপথ্যে রুশ-ইরানি গোয়েন্দা তথ্য

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্লোবাল সাউথের জন্য একটি ভিন্ন প্রশ্ন তোলে: নিয়ম নির্ধারণের সুযোগ কার হাতে? শি-র “মানব নিয়ন্ত্রণ”-এর ওপর জোর দেওয়া এবং নতুন এআই নিয়মের প্রতি ট্রাম্পের অনীহা দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে, তবে এর কোনোটিই গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখে তৈরি হয়নি। উভয় পক্ষ একটি নতুন এআই সংলাপ চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে এবং দুর্ঘটনা-বিজ্ঞপ্তি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে, তবে কোনো বাধ্যবাধকতাযুক্ত নিয়ম তৈরি হয়নি। অনেক দেশই অন্যত্র তৈরি এআই ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল থেকে যাবে, যেখানে এসব নিয়ম পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের খুব কম ভূমিকা থাকবে। চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত মডেলকে আমেরিকার কর্পোরেট পরিচালিত বিকল্পের চেয়ে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, তবে এটিও এক প্রকারের নির্ভরতা। তবুও গ্লোবাল সাউথ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়। ভারত নিজস্ব বৃহৎ ভাষা মডেল (LLM) তৈরি করছে এবং তার ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামোর মডেল রফতানি করছে; সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেকে একটি প্রধান এআই হাব হিসেবে গড়ে তুলেছে; এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন ডেটা-সারভৌমত্ব কাঠামো তৈরি করছে যাতে আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলো তাদের ডেটা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ পায়।

এই প্রচেষ্টাগুলো প্রাথমিক স্তরে হলেও মার্কিন বা চীনা মডেলের মধ্যে একটিকে সহজভাবে বেছে নেওয়ার প্রবণতা এড়ানোর সংকল্প প্রদর্শন করে। বেইজিং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, ‘গ্লোবাল এআই গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ’ চালু করেছে এবং ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন’ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে, যার প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তিতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সাংহাইয়ে ২৯টি দেশ স্বাক্ষর করেছিল। কারও জন্য এটি পশ্চিমা কাঠামোর একটি বিকল্প; অন্যদের জন্য এটি এক নির্ভরতার বদলে অন্য নির্ভরতা গ্রহণ করা। প্রশ্ন হলো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো নিজেরা নিয়ম তৈরি করতে যথেষ্ট সুসংগঠিত হতে পারবে কিনা।

আনুষ্ঠানিকতার বাইরে শীর্ষ সম্মেলনের বার্তাটি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। ওয়াশিংটন ছবি ও সাময়িক শুল্ক বিরতি নিশ্চিত করেছে; বেইজিং অর্জন করেছে নিজের শর্তে সম্পর্ক পরিচালনার কৌশলগত স্বীকৃতি। গ্লোবাল সাউথের সরকারগুলোর জন্য এই সম্মেলনটি পক্ষ নেওয়া এড়িয়ে চলা, উভয় পরাশক্তির সাথে সম্পর্ক রাখা এবং নিজেদের সুযোগ তৈরির কৌশলকে আরও শক্তিশালী করেছে। বেইজিংয়ের শর্তে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা কোনো স্থায়ী শান্তি বয়ে আনে না। তবে রিয়াদ থেকে জাকার্তা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের জন্য ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যবর্তী ক্ষেত্রটি প্রভাব তৈরি করা এবং নিজেদের স্বার্থ অনুসরণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো ভবিষ্যতে এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার চুক্তি যেন বাকি সবাইকে সমস্যার মধ্যে না ফেলে দেয়।

Continue Reading

top1

বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ

Published

on

By

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

মঙ্গলবার বিকেলে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বঙ্গভবনে এটিই ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফর, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এবং সাইডলাইনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, জাতিসংঘের মহাসচিব ও শীর্ষ কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকসহ সফরের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন।

রাষ্ট্রপতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি ভাষণটিকে ‘দূরদর্শী, দৃঢ়প্রত্যয়ী ও দিকনির্দেশনামূলক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

Continue Reading

Trending