চট্টগ্রামে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলোচিত নামগুলোর একটি ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম। বহুল আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী শিবির সাজ্জাদ, ছোট সাজ্জাদ এবং গুলিতে নিহত সারোয়ার বাবলা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যেসব সন্ত্রাসীর নাম জড়িয়ে আছে, তার মধ্যে ইকরামের নাম একটি।
আন্ডারওয়াল্ডের পক্ষ-বিপক্ষ কিংবা প্রতিপক্ষ নিয়ে যখন অস্ত্রের মহড়া এবং খুনোখুনিতে অস্থির চট্টগ্রাম, তখন থেকেই আলোচনায় আসে ইমরাম নামটি। এবার সেই একরাম র্যাব-৭ মহানগরের বায়েজিদ লিংক রোডের আরেফিন নগরের একটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে। অভিযানে গ্রেপ্তার হলো। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, একরামের হেফাজত থেকে উদ্ধার হয়েছে দুটি পিস্তল এবং গুলি। এই একরাম গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে আলোচিত তাসফিয়া হত্যাকান্ডের বিষয়টিও সামনে এসেছে। এই হত্যায় ইকরাম জড়িত থাকার অভিযোগে সেই সময় ইকরাম পালিয়েছিল বলে জানিয়েছে র্যাব। সবমিলিয়ে নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রাক্কালে র্যাবের এই অভিযান আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে বরদাশত করা হবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছিলেন। আর প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার দিনই চট্টগ্রামে র্যাব আলোচিত সন্ত্রাসীদের অন্দরমহল থেকে অস্ত্র উদ্ধার করলো।
সারোয়ার বাবলার মৃত্যুর পর পলাতক বড় সাজ্জাদ এই ইকরামকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল বলে দাবি করেছিল ইকরাম। ওই সময় একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল।
র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, স্কুলছাত্রী তাসফিয়া হত্যাকাণ্ডের পর ভারত হয়ে দুবাই পালিয়েছিলেন ইকরাম। সেখানে গিয়ে আরেক সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ এবং ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয়। দেশে ফিরে তাদের মধ্যেই চলে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড। বাকলিয়া লিংকরোডে জোড়াখুনের ঘটনা থেকে সারোয়ার বাবলা হত্যাকান্ড- সব জায়গাতেই আলোচনায় এসেছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের এসব সন্ত্রাসীদের নাম। সঙ্গে ইমরামের নামও উচ্চারিত হয়েছিল। এবার অস্ত্র বেচাকেনার অভিযোগে ইকরামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রথম তার গাড়ি থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধার হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে, তার বাসায় আরো অস্ত্র আছে। এরপর বাসায় অভিযান চালিয়ে আরো একটি পিস্তল উদ্ধার হয়। এই বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন র্যাব অধিনায়ক।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিষয়টি নিশ্চিত করে র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং তাসফিয়া হত্যা মামলার পলাতক আসামি। তার বিরুদ্ধে রাউজান থানায় একটি অপহরণ মামলাও রয়েছে, যা বর্তমানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে।
র্যাব জানায়, আটক দুজনের কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে বুধবার সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতে আরও অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
২০১৮ সালে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরেনি স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিন। সেই মামলার পলাতক আসামি ছিল ইকরাম।
আলোচিত তাসফিয়া হত্যা মামলা
চট্টগ্রামের সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসফিয়া আমিন ২০১৮ সালের ১ মে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। বাংলাদেশ এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষার্থী আদনান মির্জার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল, যা পরিবারের অপছন্দের কারণে তাকে বাসা থেকে বের হতে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়।
ঘটনার দিন তাসফিয়া গোল পাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে আদনান মির্জার সঙ্গে দেখা করে। সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ মিনিটে সেখান থেকে বের হয়ে একা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন ২ মে পতেঙ্গায় নেভাল একাডেমির কাছে কর্ণফুলী নদীর তীররক্ষা পাথরের ওপর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ৩ মে নিহতের বাবা মোহাম্মদ আমিন পতেঙ্গা থানায় আদনান মির্জাকে প্রধান আসামি করে ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। একই দিন সন্ধ্যায় নগরের মুরাদপুর এলাকা থেকে আদনান মির্জাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সুরতহাল প্রতিবেদনে তাসফিয়ার শরীরে ১১টি আঘাতের চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়। তার দুই চোখ মারাত্মকভাবে থেঁতলানো ছিল এবং ডান চোখের ভ্রু ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। মৃত্যুর আগে নাক দিয়ে ফেনা বের হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছিল প্রতিবেদনে, যা মৃত্যুর কারণ নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত করে।
পরবর্তীতে ডিবি, পিবিআই ও সিআইডির পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে পারিবারিক শাসনের ভয়ে ঘটনার দিন বাসায় না ফিরে কর্ণফুলী নদীর মোহনা এলাকায় যায় তাসফিয়া এবং পরে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম আদালতে সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে সেই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নিহতের পরিবার ১২ পৃষ্ঠার নারাজি আবেদন দাখিল করেছে।
ইমতিয়াজ সুলতান ইকরামের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই মামলাটি আবারও নতুন করে সামনে এলো।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমানের নির্বাচনি বুথে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ভোরে দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে এ নাশকতা চালানো হয়।
দলটি সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোর ৪টার পর ঢাকা-১৫ আসনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ১৩ ও ৩ নম্বর রোড এলাকায় অবস্থিত জামায়াতে ইসলামীর একটি নির্বাচনি বুথে আগুন দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ভোর ৪টা ২৬ মিনিটের দিকে এক ব্যক্তি চাদর মুড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলে আসে। এরপর সে বুথের ভেতরে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।
আগুনে বুথটির আংশিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ ঘটনায় কেউ আহত হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা চাই শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর নির্বাচন চাই। কিন্তু কেউ যদি পরিবেশ নষ্ট করে কিংবা কোথাও বাধা দেয় তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদেরকে দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হবে।
এবারের নির্বাচন ইতিহাসের সেরা নির্বাচন। এই নির্বাচন কারও ঠেকানোর সাধ্য নাই। সবচেয়ে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে পুলিশ সবধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. বাহারুল আলম।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১ টায় পুলিশ সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘নানান প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ফ্যাসিস্ট র্যাজিমের কিছুটা হুমকি রয়েছে দলীয় ব্যাপার, তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে পুলিশ নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।
সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠানো হলে তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসতেন বলে জবানবন্দিতে দাবি করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে শতাধিক মানুষকে গুম-খুনের ঘটনায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। এই প্যানেলের অপর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করত, তা হলো আমরা সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দিই—র্যাব, ডিজিএফআই এবং বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার পূর্বে ও পরে আমার ইন্টারভিউতে আসবে। যারা র্যাবে যেত তাদেরকে আমি এই বলে মটিভেট করতাম—নরহত্যা মহাপাপ এবং কাউকে হত্যা করলে তার পরিবারের অভিশাপ তোমার পরিবারের ওপর পড়বে।
তিনি বলেন, আমি তাদের আরো বলি, একজনকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ। সত্যিকারের সাহস হচ্ছে হাত-পা খুলে তার হাতে একটি অস্ত্র দিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। যারা ফেরত আসত তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীর র্যাব সদস্যদেরকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করলেন, র্যাব রক্ষীবাহিনীর চাইতেও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমি ইন্টারভিউতে আসা অফিসারদের এই বলে সাহস জোগালাম, যদি কাউকে কোনো কিলিং মিশনের জন্য বলা হয় সে যেন আমাকে সরাসরি ফোন করে। আমি তাদেরকে সেনাবাহিনীতে সম্মানের সঙ্গে ফেরত নিয়ে আসব এবং পুনর্বাসিত করব। আমার পাশাপাশি যারা র্যাবে নতুন যাচ্ছেন তাদেরকে মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর জেনারেল আনোয়ার, ডিএমআই এবং আমার পিএস কর্নেল সাজ্জাদ মোটিভেট করতে থাকেন। কিছুদিন জগলুল আমাকে এসে জানান, মোটিভেশনে কোনো কাজ হচ্ছে না। র্যাবে যোগদানের পরে অফিসারদেরকে ডিমোটিভেট করা হচ্ছে। তবুও দুজন অফিসারকে যখন প্রথম রাতেই কিলিং মিশনে যেতে বলে, তারা সেখান থেকে চলে এসে ঢাকা সেনানিবাসের এমপি চেকপোস্টে রিপোর্ট করেন। আমি তাদেরকে সসম্মানে সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত করি।