ইবি প্রতিনিধি
এক শিবির নেতাকে থাপ্পড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাস। দফায় দফায় শোডাউন, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মুখোমুখি অবস্থান, নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, লাঠিসোঁটা নিয়ে নিয়ে নেতাকর্মীদের অবস্থান ও প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া এবং ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামানের সার্বক্ষণিক তৎপরতায় ক্যাম্পাসে বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের। ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের জিয়া হল সেক্রেটারি কাজী জুহায়েরকে চড় মারেন শাখা ছাত্রদলের সদস্য আলীনূর রহমান। ঘটনার পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা জিয়া হলে জড়ো হলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও সেখানে উপস্থিত হন। এতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা। তাঁরা দুই পক্ষকে শান্ত করার পাশাপাশি ঘটনার তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেন। পরে জিয়া হলের প্রভোস্টের কক্ষে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রক্টর ও হল প্রভোস্ট।
বৈঠকে অভিযুক্ত আলীনূরকে উপস্থিত করার দাবি ওঠে। তাঁকে আনতে প্রক্টরিয়াল বডি কক্ষে গেলে বাইরে উত্তেজনা তৈরি হয়। কক্ষটি তালাবদ্ধ থাকায় প্রথমে আলীনূরকে বের করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ বৈঠকস্থল ত্যাগ করেন। ফের দুই পক্ষের মধ্যে আবারও হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। ধাক্কাধাক্কির মাঝখানেই দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে দেখা যায় প্রক্টরকে। পরবর্তীতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রধান ফটকের সামনে মহাসড়কে অবস্থান নেন। অন্যদিকে, শিবিরের নেতাকর্মীরা জিয়া হলসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে পাইপ হাতে অবস্থান নেন। এর মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই প্রক্টরিয়াল বডি পুলিশের সহায়তায় ক্ষুব্ধ শিবির নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে আলীনূরকে জিয়া হল থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়। এ সময় শিবিরের নেতাকর্মীরা তাঁকে মারধরের চেষ্টা করেন এবং প্রক্টরের গাড়িতে ইট নিক্ষেপ করেন। গাড়ির গ্লাসও ভেঙে যায়। এসময় প্রক্টর অফিসের কর্মচারীর মোবাইলও চাপে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। এরপরও পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎপর ছিলেন প্রক্টর ও তাঁর নেতৃত্বাধীন দল। প্রক্টরের দাবি— “অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে গাড়ি তোলার সময় পাশে থেকে ইট নিক্ষেপ করলে আমার কানের নিচ দিয়ে গিয়ে গাড়িতে পড়ে। এটা আল্লাহর রহমত মনে করি।”
পরে দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে উভয় পক্ষের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে প্রক্টর অফিসে আবারও আলোচনা করা হয়। প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে সমঝোতা হয়। ঘটনার সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, র্যাব ও ইউএনওসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস টহল দেওয়া হয়।কমিটিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ, ছাত্রসংগঠনগুলোর সহাবস্থান এবং মেধার ভিত্তিতে আবাসিক হলে সিট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।এদিকে এখনও ক্যাম্পাস থমথমে অবস্থা। গতকাল সার্বক্ষণিক প্রধান ফটকে আনসার সদস্যদের ভূমিকায় অবস্থান নিলেন তিনি। গতকাল শেষ রাতেও (২ টা ০৬ মিনিটের দিকে) নিরাপত্তা জোরদারে ক্যাম্পাসের প্রবেশপথগুলোতেও তদারকি ও টহল দিতে দেখা গেছে।
সর্বশেষ আজ বিএনপি জামায়াত সমাবেশ কর্মসূচি দিলে পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়। উপাচার্যের নির্দেশনায় প্রক্টর তাঁর অফিস কার্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়ে আলোচনায় বসেন। এসময় ছাত্রদল-শিবিরের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাসের সহাবস্থান বজায় রাখতে সমঝোতায় চলে আসেন। এতেও নেতৃত্ব দিলেন প্রক্টর নিজেও। সর্বশেষ উভয় পক্ষ সমঝোতায় চলে গেলে আপাতত ক্যাম্পাসে শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ঘটনার পরপরই ভিসির নির্দেশে প্রক্টোরিয়াল বডির মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। পরে উভয় পক্ষের সঙ্গে প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনায় বসি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ইউএনওসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস পরিদর্শন করা হয়। ক্যাম্পাসে পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে। মাইকিং করে বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আইডি কার্ড সঙ্গে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পুরো ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রক্টর ও প্রক্টোরিয়াল বডির পক্ষ থেকে সারারাত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়।
ঘটনার দিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছাত্র সংগঠনের দলীয় ইস্যুতে রূপ নেওয়ায় ঘটনাটি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের বাহিরে গিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শুরু থেকেই তাদের মধ্যে সহবস্থান তৈরি করে আসছি। সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্তের অবস্থান অস্পষ্ট হওয়ায় এমনটা সৃষ্টি হয়েছে। তারপরও মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে অভিযুক্তকে উদ্ধার করেছি।