Connect with us

আন্তর্জাতিক

হঠাৎ কেন রিলস বানাতে মন দিলেন মোদি?

Published

on

দীর্ঘদিন ধরেই বক্তৃতা, আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান ও পরিকল্পিত প্রচারের মাধ্যমে নিজেরে ‘স্ট্রংম্যান’ ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।  কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তরুণদের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নতুনভাবে তার উপস্থিতি দেখা গেছে।  তরুণদের কাছে টানতে যেন তাদেরই একজন হওয়ার চেষ্টা করছেন ৭৫ বছর বয়সি এই নেতা। 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলছে, এক মাস আগেও মোদির সামাজিক মাধ্যম হ্যান্ডেলগুলোতে অত্যন্ত ভেবেচিন্তে তৈরি কনটেন্ট পোস্ট করা হতো।  তবে এখন তার অ্যাকাউন্টে দেখা যাচ্ছে আরও ব্যক্তিগত ও স্বতঃস্ফূর্ত ভিডিও। এর মধ্যে রয়েছে ‘গেট রেডি উইথ মি’ ধরনের ভিডিও এবং তরুণদের উদ্দেশে সেলফি-স্টাইলের বক্তব্য। এসব ভিডিওতে তরুণদের তিনি প্রায়ই ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করছেন।

সম্প্রতি দিল্লিতে এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাকে জেন-জি’দের জনপ্রিয় ভাষা ও ভঙ্গিও ব্যবহার করতে দেখা যায়। 

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর বদলেছে কৌশল

ভারতের সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনের পর মোদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কৌশলে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যঙ্গাত্মক ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন মিম, লাইভস্ট্রিম ও ইনস্টাগ্রাম রিলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।  এই আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকেও পদত্যাগ করতে হয়। 

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনুরাগ মিনাস ভার্মার মতে, এক দশকের বেশি সময় ধরে বিজেপি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ফেসবুক পেজ ও এক্স অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অনলাইনে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। কিন্তু তরুণ ভারতীয়রা এখন ভিন্নভাবে রাজনীতি ও অনলাইন কনটেন্ট গ্রহণ করছে।

ভারতের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া জেন-জি ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভারতের অন্যতম বড় ভোটার গোষ্ঠীতে পরিণত হবে। 

মোদির ভিডিও নিয়ে ব্যঙ্গ

তরুণদের কাছে পৌঁছাতে ইনস্টাগ্রামে মোদির নতুন ধরনের ভিডিও প্রকাশের পর শুরুতেই আসে নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ।  বিক্ষোভ চলাকালে  মোদির প্রথম সেলফি-স্টাইলের ভিডিও নিয়ে ব্যাঙ্গ শুরু হয়। অনেকে ভিডিওটির লাইট, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও উপস্থাপনা নিয়েও ঠাট্টা করেন।

এরপরের ভিডিওগুলোতে মোদির টিম ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, লাইট ও পেছনের দৃশ্য বদলে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে।

তবে এতেও সন্তুষ্ট হয়নি সবাই।  ২২ বছর বয়সি গিনি মালিয়ার মতে, বিজেপি কেন তার বয়সি তরুণদের কাছে পৌঁছাতে চাইছে, তা বোঝা যায়। কিন্তু হঠাৎ করে তরুণদের প্রতি এই বাড়তি আগ্রহ কেন—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তার মতে, ভিডিওগুলোতে জেন-জি’দের ভাষা ও ফরম্যাট ব্যবহার করা হলেও বিক্ষোভের পেছনে থাকা মূল সমস্যাগুলো নিয়ে তেমন কথা বলা হচ্ছে না।

বিজেপিও ব্যবহার করছে মিম ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি

শুধু মোদির অ্যাকাউন্ট নয়, তার দল বিজেপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজগুলোতেও এখন মিম, তরুণদের প্রচলিত ভাষা এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিক্ষোভ শেষ হওয়ার পর বিজেপি একটি জিমের দৃশ্য নিয়ে রিল প্রকাশ করে। সেখানে তরুণদের বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ভিডিওটির নিচে অনেকেই এটিকে ‘ক্রিঞ্জ’ বা ‘অস্বস্তিকর’ বলে মন্তব্য করেন।

আরেকটি ভিডিওতে জনপ্রিয় ৯০-এর দশকের সিরিজ ‘ফ্রেন্ডস’ এর গান জুড়ে দিয়ে লেখা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী আপনাদের সঙ্গে আছে’।  তবে জেন-জি’দের  কাছে এই সিরিজের আবেদন তুলনামূলক কম হওয়ায় ভিডিওটিও তেমন সাড়া পায়নি।

মালিয়ার মতে, তার প্রজন্মের অনেকেই এসব ভিডিওকে রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে না দেখে বরং ‘কমেডি কনটেন্ট’ হিসেবে দেখছে।

ইনস্টাগ্রামে জনপ্রিয়তা পেলেই কি ভোট পাওয়া যাবে?

বিশ্লেষকদের মতে, ইনস্টাগ্রামে তরুণদের মনোযোগ পাওয়া আর সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্যের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এক বিষয় নয়। 

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জয়োজিত পাল বলেন, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে এক্স ও হোয়াটসঅ্যাপের সমর্থক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নিজেদের বার্তা ছড়িয়ে আসছে।  কিন্তু ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম ভিন্নভাবে কাজ করে। এখানে বেশি সময় ধরে ভিডিও দেখা, পুনরায় দেখা, শেয়ার ও মন্তব্যের মতো বিষয়গুলো কনটেন্ট কতটা ছড়াবে, তা নির্ধারণ করে। ফলে বড় সংখ্যক অনুসারী থাকলেই কোনো ভিডিও বেশি জনপ্রিয় হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

মোদির প্রথম ইনস্টাগ্রাম রিলটি এর বড় উদাহরণ। ভিডিওটি ৪০ কোটির বেশি বার দেখা হয়েছে। কিন্তু তরুণদের অনেকে সেটি ব্যঙ্গাত্মকভাবে সম্পাদনা (এডিট) করে আবার পোস্ট করেছেন। ফলে মোদির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বার্তার বদলে ভিডিওটির ভিন্ন একটি অর্থ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষক ভার্মার মতে, ইনস্টাগ্রাম মূলত ব্যঙ্গ ও রসিকতাপ্রবণ একটি প্ল্যাটফর্ম। তাই গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক বক্তব্য রিল আকারে প্রকাশ করলেও তা সহজেই ট্রলের শিকার হতে পারে।

নির্বাচনে বিজেপির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য জেন জেন-জি’কে  কাছে টানার এই প্রচেষ্টাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, বিজেপির নির্বাচনী সাফল্য এখনও অনেক বেশি নির্ভর করে দলের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও দীর্ঘদিনের সমর্থকভিত্তির ওপর।

জয়োজিত পালের ভাষায়, নির্বাচনে জয় পাওয়া আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেন-জি’কে বড় একটি অংশ বিজেপিকে অপছন্দ করলেও দলটি নির্বাচনে বড় জয় পেতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ইনস্টাগ্রাম ও জেন-জি’র নতুন ভাষা বুঝতে বিজেপির কিছুটা সময় লাগবে। তবে দলটি শেষ পর্যন্ত এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গেও মানিয়ে নিতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top1

বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি, ১২ ঘণ্টা ইন্টারনেট বন্ধ; আটক ৭০০-এর বেশি

Published

on

By

অনলাইন ডেস্ক

ভারতের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভ ঘিরে যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় ১২ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় ৭০০-এর বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ।

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার যন্তর মন্তর ও এর ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখতে এয়ারটেল, রিলায়েন্স জিও ও ভোডাফোন আইডিয়ার মতো টেলিকম অপারেটরগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত এ বিষয়ে দিল্লি সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিক্ষোভে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এআইএসএ, এসএফআই ও এনএসইউআইসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনও এতে যোগ দেয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানানো হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভের জন্য আয়োজকদের কোনো অনুমতি ছিল না।

পিটিআইয়ের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকা থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন।

এর আগে গত জুলাই মাসেও যন্তর মন্তর ও মধ্য দিল্লির কয়েকটি এলাকায় সাময়িকভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল। সে সময় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজিপি) আন্দোলনের মধ্যে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ চলছিল।

প্রায় তিন মাসের ব্যবধানে একই এলাকায় ফের বিক্ষোভের মধ্যে ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

Continue Reading

top1

আলজাজিরার কলাম/ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সমস্যা সামনে এনেছে

Published

on

By

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬-এ ওয়াশিংটন ডি.সি.-র হোয়াইট হাউসে একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্য প্রদানের পূর্বে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্রে এই রাষ্ট্রীয় সফরের সাথে সব ধরণের জাঁকজমক অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে ছিল বি-২ সামরিক বিমানের ফ্লাইওভার, পান্ডা এবং নিক্সন আমলের ঐতিহাসিক টোস্ট। তবে গ্লোবাল সাউথ থেকে যারা এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তাঁদের জন্য এই দৃশ্যমান জাঁকজমক মূল বিষয় ছিল না। এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের “গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা”র ওপর জোর দেওয়া। রিয়াদ থেকে নয়াদিল্লি বা জাকার্তা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের রাজধানীর জন্য এই শীর্ষ সম্মেলনটি চলতি দশকের বাকি সময়ে দুই পরাশক্তির সাথে কীভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করা যায় তার একটি স্পষ্ট আভাস দিয়েছে।

বেইজিং এই শীর্ষ সম্মেলন থেকে কোনো সামরিক ঝামেলায় না জড়িয়ে কূটনৈতিক সুরক্ষার সুবিধা নিয়ে বের হয়েছে। বিপরীতে, ওয়াশিংটন ততক্ষণে সাত মাসের কাছাকাছি সময় ধরে চলা মার্কিন-ইসরায়েলি ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, বাণিজ্য বিষয়ে মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল, লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য পুনর্প্রতিষ্ঠা করছিল এবং চীনকে ঠেকানোর প্রচেষ্টায় গ্লোবাল সাউথকে যেকোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছিল। ট্রাম্প নিজে শি-র উদ্দেশ্যে পরীক্ষা করেন এবং সম্মেলনটিকে সফল বলে ঘোষণা করলেও বেইজিং থেকে দূরত্ব বজায় রাখার তাগিদ পাওয়া গ্লোবাল সাউথের সরকারগুলোর কাছে এই স্পষ্ট বৈপরীত্য নজর না এড়িয়ে যাবে না।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প চান যে ইরানের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার চীন যেন ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অবরুদ্ধ থাকা হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে সাহায্য করে। শি যুদ্ধবিরতি এবং পরবর্তীতে শান্তি আলোচনায় ফেরার সমর্থনের কথা বললেও, চীনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রণালী খুলে দেওয়া বা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল না। বেইজিং কৌশলগতভাবে নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। রিয়াদ, আবুধাবি এবং দোহার জন্য এর স্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। চীন একজন সৈন্যও না পাঠিয়ে বা কোনো সামরিক ঘাঁটি দাবি না করেই তেহরানে সরাসরি কথা বলতে পারে, জাতিসংঘে প্রস্তাব দিতে পারে বা মধ্যস্থতার প্রস্তাব রাখতে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এই যুদ্ধের সরাসরি পক্ষ এবং সংকটের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকারী হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক সরঞ্জামের জন্য মার্কিন নিরাপত্তা ছত্রছায়ায় থাকলেও, কূটনৈতিক সংকট ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য বেইজিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের ঝুঁকি কমাচ্ছে। সহজ কথায়, চীনের উপযোগিতা কিছুটা হলেও এই তথ্যের মধ্যে রয়েছে যে ওয়াশিংটন যেসব যুদ্ধ লড়ছে চীন তাতে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিচ্ছে না।

এই হিসাব-নিকাশ সমগ্র অঞ্চলে বিস্তৃত রয়েছে। ইরাক, মিশর ও আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো, যারা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং নৌপথ অবরুদ্ধ হওয়া প্রত্যক্ষ করছে, তাদের কাছে চীনের এই সংযমের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। গ্লোবাল সাউথের নতুন কোনো পরাশক্তিকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; তাদের এমন কাউকে প্রয়োজন যিনি রক্তপাত না ঘটিয়ে সব পক্ষের সাথে আলোচনা করতে পারেন। বেইজিং সেই ভূমিকা পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে।

গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য সরকারের জন্য এটি কঠিন কিছু সিদ্ধান্তের সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প নিজে চীনের সাথে নতুন করে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য দেশকে চীনের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি আরও দুই মাসের জন্য বাড়ালেও, বাকিদের শুল্ক ও সরবরাহ ব্যবস্থার ধাক্কা সহ্য করতে বলা হচ্ছে। এর ফলে ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, পরাশক্তিগুলোর বৈরিতার মূল্য অন্যান্য দেশের বহন করা আশা করা হলেও ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে দরকষাকষির স্বাধীনতা বজায় রাখছে। এর প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। ভারত রাশিয়ার তেল কেনার পাশাপাশি মার্কিন প্রযুক্তি ও চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করে বহুপাক্ষিক ভারসাম্য বজায় রাখছে। ইন্দোনেশিয়া ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে তাদের “মুক্ত এবং সক্রিয়” পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিল ব্রিকস (BRICS) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে নিজেদের সুরক্ষার উপায় হিসেবে, যা কোনো পশ্চিমবিরোধী পদক্ষেপ নয় বরং এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিমা যেখানে অন্যরা নিয়ম নির্ধারণ করে। এই শীর্ষ সম্মেলনটি এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেনি, তবে এটি তা আরও জোরালো করতে পারে।

হুতিদের সামরিক শক্তির নেপথ্যে রুশ-ইরানি গোয়েন্দা তথ্য

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্লোবাল সাউথের জন্য একটি ভিন্ন প্রশ্ন তোলে: নিয়ম নির্ধারণের সুযোগ কার হাতে? শি-র “মানব নিয়ন্ত্রণ”-এর ওপর জোর দেওয়া এবং নতুন এআই নিয়মের প্রতি ট্রাম্পের অনীহা দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে, তবে এর কোনোটিই গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখে তৈরি হয়নি। উভয় পক্ষ একটি নতুন এআই সংলাপ চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে এবং দুর্ঘটনা-বিজ্ঞপ্তি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে, তবে কোনো বাধ্যবাধকতাযুক্ত নিয়ম তৈরি হয়নি। অনেক দেশই অন্যত্র তৈরি এআই ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল থেকে যাবে, যেখানে এসব নিয়ম পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের খুব কম ভূমিকা থাকবে। চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত মডেলকে আমেরিকার কর্পোরেট পরিচালিত বিকল্পের চেয়ে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, তবে এটিও এক প্রকারের নির্ভরতা। তবুও গ্লোবাল সাউথ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়। ভারত নিজস্ব বৃহৎ ভাষা মডেল (LLM) তৈরি করছে এবং তার ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামোর মডেল রফতানি করছে; সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেকে একটি প্রধান এআই হাব হিসেবে গড়ে তুলেছে; এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন ডেটা-সারভৌমত্ব কাঠামো তৈরি করছে যাতে আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলো তাদের ডেটা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ পায়।

এই প্রচেষ্টাগুলো প্রাথমিক স্তরে হলেও মার্কিন বা চীনা মডেলের মধ্যে একটিকে সহজভাবে বেছে নেওয়ার প্রবণতা এড়ানোর সংকল্প প্রদর্শন করে। বেইজিং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, ‘গ্লোবাল এআই গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ’ চালু করেছে এবং ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন’ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে, যার প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তিতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সাংহাইয়ে ২৯টি দেশ স্বাক্ষর করেছিল। কারও জন্য এটি পশ্চিমা কাঠামোর একটি বিকল্প; অন্যদের জন্য এটি এক নির্ভরতার বদলে অন্য নির্ভরতা গ্রহণ করা। প্রশ্ন হলো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো নিজেরা নিয়ম তৈরি করতে যথেষ্ট সুসংগঠিত হতে পারবে কিনা।

আনুষ্ঠানিকতার বাইরে শীর্ষ সম্মেলনের বার্তাটি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। ওয়াশিংটন ছবি ও সাময়িক শুল্ক বিরতি নিশ্চিত করেছে; বেইজিং অর্জন করেছে নিজের শর্তে সম্পর্ক পরিচালনার কৌশলগত স্বীকৃতি। গ্লোবাল সাউথের সরকারগুলোর জন্য এই সম্মেলনটি পক্ষ নেওয়া এড়িয়ে চলা, উভয় পরাশক্তির সাথে সম্পর্ক রাখা এবং নিজেদের সুযোগ তৈরির কৌশলকে আরও শক্তিশালী করেছে। বেইজিংয়ের শর্তে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা কোনো স্থায়ী শান্তি বয়ে আনে না। তবে রিয়াদ থেকে জাকার্তা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের জন্য ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যবর্তী ক্ষেত্রটি প্রভাব তৈরি করা এবং নিজেদের স্বার্থ অনুসরণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো ভবিষ্যতে এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার চুক্তি যেন বাকি সবাইকে সমস্যার মধ্যে না ফেলে দেয়।

Continue Reading

top2

সব শর্ত মানলেও পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেবে না ইরান

Published

on

By

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহারসহ ইরানের অন্যান্য শর্ত মেনে নিলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুত তেহরান। তবে ওয়াশিংটন সব প্রস্তাবে সম্মত হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তেহরানের প্রস্তাব অনুযায়ী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হতে পারে। তবে এর জন্য সাত দিনের মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি অর্থ ছাড় এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নিরসনের আলোচনায় হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির বিষয় হয়ে উঠেছে। তেহরান মার্কিন নৌ অবরোধ থেকে মুক্তি চায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। বর্তমানে প্রণালিটি ইরান কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের এক ফাঁকে গত বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা করছেন তিনি। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই এমন একটি চুক্তি হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে নিলে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যেতে প্রস্তুত তারা। তবে ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর মতো বিষয়ে ইরান ছাড় দেবে না। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তারা ইরানের ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করার বিষয়টিও তুলে ধরে। তবে তেহরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

Continue Reading

Trending