মাফিদুল হাসান, ববি
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর মানেই আড্ডা, মিছিল, স্লোগান আর একঝাঁক তরুণ প্রাণের উচ্ছ্বাস। কিন্তু বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) চিত্রটি একটু ভিন্ন। এখানে শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের কোলাহলের মাঝে মিশে আছে চারপেয়ে এক শান্ত সদস্য। সে কোনো শিক্ষার্থী নয়, নয় কোনো কর্মচারী—তবুও সে এই ক্যাম্পাসেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। জানা যায়, কয়েক বছর আগে এক অজানা মানত পূরণের উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাসে ছেড়ে যাওয়া সেই গরুটি আজ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরম মমতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ঘটনাটি কয়েক বছর আগের। জনৈক এক ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত মানত পূরণের উদ্দেশ্যে একটি গরু ক্রয় করেন। ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থেকে তিনি গরুটি কোনো কসাইখানা বা হাটে না পাঠিয়ে বেছে নেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে। একদিন নিঃশব্দে গরুটি ক্যাম্পাসে ছেড়ে দিয়ে তিনি চলে যান। কোনো মালিকানা নেই, কোনো নির্দিষ্ট গোয়াল নেই—পুরো ক্যাম্পাসটাই হয়ে ওঠে গরুটির নতুন ঠিকানা।
তবে গরুটিকে বেশ কিছুদিন ধরে ক্যাম্পাসে দেখতে পাওয়া যায়নি। গরুটিকে না দেখতে পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী বিচলিত হয়ে পড়েন। অনেকে ভাবতে থাকেন ক্যাম্পাস থেকে গরুটি চুরি হয়ে গেলো কী না? কিন্তু সম্প্রীতি গরুটিকে আবার ক্যাম্পাসে দেখতে পেয়ে আনন্দিত শিক্ষার্থীরা।
শুরুতে অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল, মুক্তভাবে বিচরণ করা এই প্রাণীটি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে কি না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে গরুটি প্রমাণ করেছে, সে কোনো উটকো আগন্তুক নয়, বরং এই পরিবারেরই এক নীরব সদস্য।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে যখন ফুটবল বা ক্রিকেটের আসর বসে, তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। একপাশে যখন শিক্ষার্থীরা ঘাম ঝরিয়ে গোল করার নেশায় মত্ত, মাঠের সীমানায় দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগে তা পর্যবেক্ষণ করে এই গরুটি। তার চাহনিতে থাকে এক অদ্ভুত স্থিরতা। সাধারণ প্রাণীদের মতো সে কেবল ঘাস খেয়েই ক্ষান্ত থাকে না; বরং মানুষের খেলাধুলার প্রতি তার এই ‘মানুষের মতো’ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিস্ময় জাগায়। অনেক শিক্ষার্থী মজা করে বলেন, “আমাদের এই বন্ধুটি হয়তো মনে মনে কোনো এক দলের সমর্থন দিচ্ছে!
গরুটির সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো তার স্বভাবজাত শিষ্টাচার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরু পথগুলোতে যখন শিক্ষার্থীদের ভিড় থাকে, তখন প্রায়ই দেখা যায় গরুটি পথের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, কোনো শিক্ষার্থীকে আসতে দেখলেই সে নিজে থেকেই পথ ছেড়ে পাশে সরে দাঁড়ায়। কাউকে গুঁতো দেওয়া বা বিরক্ত করার কোনো রেকর্ড তার ডায়েরিতে নেই। এই আচরণটি কেবল সহজাত প্রবৃত্তি নয়, বরং শিক্ষার্থীদের প্রতি তার এক অদ্ভুত মায়ারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন অনেকে।
বাংলাদেশে অসংখ্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে কুকুর বা বিড়ালের অবাধ বিচরণ সাধারণ চিত্র। কিন্তু একটি গরু কোনো নির্দিষ্ট মালিক ছাড়া বছরের পর বছর ক্যাম্পাসে অবস্থান করা এবং শিক্ষার্থীদের সাথে এমন আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ঘটনা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কেই প্রথম এই তালিকায় স্থান করে দিয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গরুটি আজ আর কেবল একটি প্রাণী হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। সে হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসের মায়া, মমতা আর সহনশীলতার এক জীবন্ত প্রতীক। আধুনিক যান্ত্রিক যুগে যখন মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে, তখন একটি অবুঝ প্রাণীর এই শান্ত আচরণ এবং শিক্ষার্থীদের তাকে আপন করে নেওয়া আমাদের শেখায়—মায়া দিলে মায়া পাওয়া যায়।