Connect with us

মতামত

মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন-ভাতা: বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্য

Published

on

ইবি প্রতিনিধি ও আশরাফ উদ্দিন খান

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে যখন বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের একটি বড় অংশ—কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক সমাজ—এই আলোচনার বাইরে থেকেই যায়। তাদের বেতন-ভাতা, জীবনমান ও ন্যায্য অধিকার নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা কাঠামোগত আলোচনা নেই বলেই চলে।

দেশে কওমী মাদ্রাসার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা করা হয়, এ সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা দ্বীনি শিক্ষাদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। সামগ্রিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব পেশ ঈমাম আশরাফ উদ্দিন খান।

তিনি তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন ভাতা ও বর্তমান জীবনযাপন’ সম্পর্কে লিখেন, শ্রমিক দিবসে বিশ্বের সমস্ত শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কথা হয়; আলোচনা হয়; তাদের অধিকারের প্রশ্ন উত্থাপিত হয় এবং সেই প্রশ্নের সঠিক ও ইনসাফপূর্ণ জবাবের প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়। শ্রমিক দিবসের আলোচনার বাইরে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী থেকে যায়, যাদের নিয়ে কোন আলোচনা নেই এবং তাদের পক্ষ থেকে কোন দাবি-দাওয়াও পেশ করার দৃষ্টান্ত দেখা যায় না। আমি এখানে বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসার কথা বলছিলাম। দ্বীনের দুর্গ নামে খ্যাত এই মাদ্রাসাগুলো নিরবে-নিভৃতে দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দিয়ে আসছে, উম্মতের জরুরত পূরণ করে আসছে। দেশে এই মাদ্রাসাগুলোর সংখ্যা কত তার পরিপূর্ণ হিসাব আমাদের হাতে নেই। বিভিন্ন ব্যক্তিগত গবেষণায় দেখানো হয় যে, এই মাদ্রাসাগুলোর সংখ্যা ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ হবে। শিক্ষকদের সংখ্যা হবে (দুই থেকে আড়াই লাখ) ২,০০০০০ থেকে ২,৫০,০০০ এর মত। তাদের বেতন-ভাতা নিয়ে আলোচনা করার আগে আমরা দেখবে যে, ইসলাম এই বিষয়টি কোন নীতিমালার আলোকে স্থির করেছে। কারো কাছ থেকে সেবা বা খেদমত গ্রহণ করে তাঁর পারিশ্রমিক বা মজুরি নির্ধারণ করার ব্যাপারে ইসলাম কিভাবে রুপরেখা পেশ করেছে?

ইসলামের দৃষ্টিতে সর্বনিম্ন মজুরি (Minimum Wage):

মজুরি নির্দিষ্ট কোনো টাকার অংকে নির্ধারিত নয়। বরং ইসলাম একটি ন্যায় ভিত্তিক নীতি দিয়েছে, যার মাধ্যমে শ্রমিকের মজুরি ঠিক করা হয়। সেই নীতিগুলো হচ্ছে— ন্যায্য মজুরি (عدل), সময়মতো মজুরি প্রদান (শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাঁর মজুরি দিয়ে দাও), জীবনধারণের উপযোগী মজুরি (এমন হওয়া উচিত যাতে তাঁর মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে) যেটাকে আজকের পরিভাষায় বলা হয় (Living Wage), পারস্পরিক সম্মতি (Mutual Agreement) এর ভিত্তিতে অর্থাৎ মালিক ও শ্রমিকের সম্মতিতে এবং কাজের ধরণ ও কষ্ট অনুযায়ী ও শোষণ নিষিদ্ধ (যে ব্যাক্তি শ্রমিকের মজুরি না দেয়, আমি কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে হব)

বর্তমানে কওমী মাদরাসার শিক্ষকদের সাধারণ বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা:

এটা হিসাব করে বের করার মত তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে তেমন নেই। তবে বাস্তবতার আলোকে দেখা যায় যে, সাধারণত বেতন-ভাতা ৬০০০ থেকে শুরু হয়ে ১৫,০০০ হাজার পর্যন্ত সিমাবদ্ধ থাকে। সামান্য কিছু ক্ষেত্রে কম-বেশি হতে পারে। এই পরিমাণ বেতন-ভাতা কি বর্তমান জীবনধারণের উপযোগী? বিশ্লেষণটা আমরা এইভাবে করতে চাই যে, আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নিয়োজিত আছেন তৈরি পোশাক খাতে। এখানে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ। তাদের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারিত আর সেটা হচ্ছে ১২,৫০০ টাকা। ১২,৫০০ থেকে তাদের বেতন ২৫,০০০+ হয়ে থাকে। যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন ৬০০০– ১৫,০০০ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। পোশাক শ্রমিকদের ব্যাপারে অনেক শ্রমিক সংগঠন বলছে ১২,৫০০ টাকা পর্যাপ্ত নয়। তাদের দাবি ২৩,০০০ করা উচিত। কারণ তাদের বাস্তব চাহিদার আলোকে এখানে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সেই ঘাটতির চিত্রটা বুঝতে জীবনযাপনের ন্যূনতম খরচের খাত ও পরিমাণ নিয়ে একটু আলোচনা করা যেতে পারে।

বর্তমান সমাজে মাসিক ন্যূনতম খরচের চিত্র:

খরচের খাতসমূহ (মূল খাত) বাসা ভাড়া, খাদ্য খরচ, বস্ত্র, চিকিৎসা, যাতায়াত, ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি) ও অন্যান্য। মোট খরচের একটা খসড়া অনুমান করা যাক। ১ম অংক/পরিমাণ একজনের জন্য আর ২য় পরিমাণ হচ্ছে ৪ সদস্যের একটি পরিবারের— বাসা ভাড়া- ৫০০০/ ৮০০০, খাদ্য- ৭০০০/ ১৪০০০, বস্ত্র- ৬০০/ ২০০০, চিকিৎসা- ৮০০/ ১৫০০, যাতায়াত- ১২০০/ ২০০০, ইউটিলিটি-১২০০/ ২০০০, শিক্ষা (২ সন্তান) ২০০০, অন্যান্য- ২০০০/ ৩০০০ = মোট ১৭,৮০০ (প্রায়) / ৩৪,৫০০। ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণে বললে শ্রমিকের মজুরি এমন হতে হবে যাতে তাঁর মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়। তাঁকে কষ্টে বা অভাবে রাখা যাবে না। তাই বাস্তবে ন্যূনতম জীবনধারণযোগ্য মজুরি = ১৮,০০০–২০,০০০। তাহলে যদি কারো বেতন হয়ে থাকে ১০,০০০ টাকা, বাস্তবে তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজন- ১৮,০০০+ টাকা, তাহলে ঘাটতি ৮,০০০ টাকা (একজনের জন্য) চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য তাদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের প্রয়োজন পড়ে ৩৪,০০০+। তাহলে এখানে ঘাটতি- ৩৪,০০০ (চাহিদা)–১০,০০০ (প্রাপ্য) = ২৪,০০০। তাহলে প্রতি মাসে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ২৪,০০০ হাজার টাকা। এই ঘাটতির খেসারত শুধু তিনি নিজে দিচ্ছেন বা তাঁর পরিবার দিচ্ছে এমন নয়, বরং এর ঘাটতি সমগ্র জাতিকে বহন করতে হচ্ছে। সেটা কিভাবে? তাঁর বিবরণ ইবনে খলদুনের দর্শনের আলোকে দেওয়া যাক।

ইবনে খলদুলের দর্শনে বেতন-ভাতার গুরুত্ব:

মুসলিম দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খলদুন (১৩৩২ খৃঃ) এর মতে ‘শ্রমই সম্পদের মূল উৎস। কোন সম্পদই শ্রম ছাড়া সৃষ্টি হয় না। কৃষক, শ্রমিক, কারিগর– তারাই আসল উৎপাদক। তাদের ছাড়া অর্থনীতি অচল। তাই শ্রমিকের মূল্য সর্বোচ্চ হওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে আমাদের কথা হবে শিক্ষকগণ হচ্ছে একটি আদর্শ জাতি তৈরির কারিগর। তাহলে তাদের ব্যাপারে আমাদের আর কত সচেষ্ট হওয়া উচিত সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। তিনি আরও বলেন, ন্যায্য মজুরি অপরিহার্য। শ্রমের বিনিময়ে যথাযত পারিশ্রমিক না দিলে সমাজে অবিচার তৈরি হয়। তাঁর দর্শন মতে কম মজুরির কারণে উৎপাদন কমে যায়। শ্রমিক নিরুৎসাহিত হয়। সুতরাং যদি শিক্ষকদের যথাযতভাবে উৎসাহিত করতে আমরা আবা আমাদের সমাজ সক্ষম না হয়, তাহলে তারা এই পেশার প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

সাধারণ বেতন নির্ধারণের মূলনীতি কি? (উদাহরণ: গার্মেন্টস শ্রমিক):

গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন প্রধানত ‘ন্যূনতম মজুরি বোর্ড’ (Minimum Wage Board) এর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। সরকার শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পরপর মজুরি নির্ধারণ করে। এতে তিন পক্ষ থাকে: শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিক প্রতিনিধি ও সরকার। তারা কি বিষয় বিবেচনা করে? -দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা – শিল্পের সক্ষমতা (মালিক পক্ষ কি পরিমাণ দিতে পারবে) -রপ্তানি প্রতিযোগিতা -শ্রমিকের জীবনযাত্রার খরচ (আংশিকভাবে)।

মাদ্রাসাগুলোতে বেতন কিভাবে নির্ধারণ করা হয়:

এখানে প্রথম যে দু’টি কথা সেটা হচ্ছে এই যে, এখানে ন্যূনতম কোন পরিমাণ নির্ধারিত নয়। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে এটার দেখভাল করার কোন প্রতিনিধি বা অভিভাবক নেই। এখানে বেতন নির্ধারিত হয় মূলত সমঝোতাভিত্তিক (Compromise model) একটা ব্যবস্থার মাধ্যমে। এই সমঝতার মাঝে যে বিষয়টি উভয় পক্ষের চিন্তায় থাকে সেটা হচ্ছে দ্বীনের খেদমত। অর্থাৎ যিনি চাকুরি গ্রহণ করছেন তিনিও প্রস্তুত থাকেন যে এটাকে তিনি দ্বীনের খেদমতের নিয়তে গ্রহণ করছেন এবং এখানে তিনি শ্রম ও মেধা বরাদ্দ করবেন। আবার মালিক পক্ষও অনেকটা মনে করেন যে, এটা দ্বীনের খেদমত হিসাবে সকলে একটু কষ্ট হলেও মেনে নিবেন। মানসিকভাবে উভয় পক্ষ এইভাবে সমঝোতা করলেও বাস্তবতার সামনে এই অবস্থা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বহন করা প্রায় সকলের জন্য কষ্টকর প্রমাণিত হয়। যার ফলে যে ভাবে এই পেশায় নিজের মেধা ও সময় উজার করে দিয়ে খেদমত করা উচিত ছিল সেটা অব্যাহত রাখা অনেক ক্ষেত্রেই দুরুহ হয়ে যায়। ফলে অনেক উপযুক্ত মেধা থেকে আমাদের মাদ্রাসাগুলো বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকদের মেধা থেকে সর্বোচ্চ উপকার গ্রহণ করার জন্যেই তাদেরকে আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। তাঁর আগ পর্যন্ত আমাদেরকে শিক্ষকদের বেতন ও বাস্তব চাহিদার মধ্যবর্তী ঘাটতির খেসারত বহন করতে হবে।

পরিশেষে আমি কাকে দায়িত্ব দিয়ে আমার কথা শেষ করবো সেটা নির্ধারণ করা হচ্ছে এই আলোচনার সবচেয়ে কঠিন অংশ। আমি কি অভিভাবক হিসাবে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডকে বলতে পারি যে, আমাদের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বর্তমান কাঠামো থেকে বাস্তব কাঠামোতে রুপান্তর করা হোক। আমি সেটা বলতে পারছি না। একই কথা আমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকেও বলতে পারি না যে, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হোক। কারণ এখানে বিদ্যমান বাস্তবতা কারো জানা থাকলে তাঁর পক্ষে এই দাবিগুলো করা সহজ হবে না। তবে অবস্থা বা বাস্তবতা যাই হোক না কেন এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া অতি জরুরি। لَا تَدۡرِي لَعَلَّ ٱللَّهَ يُحۡدِثُ بَعۡدَ ذَٰلِكَ أَمۡرٗا অর্থ (তুমি জানো না, হয়ত আল্লাহ এর পরে নতুন কোনো বিষয় (সমাধান) সৃষ্টি করবেন। (সুরা তালাকঃ ০১)

আশরাফ উদ্দিন খান (খতিব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ)

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মতামত

শ্রমিক দিবস: জিয়া পরিবারের প্রাসঙ্গিকতা

Published

on

By

তাছনিম আলম

প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। যা কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রতীক। আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি ইট-পাথরের পেছনে যে শ্রমিকের শক্তি, শ্রম ও ঘাম মিশে আছে, এই দিনটি সেই সংগ্রামের ইতিহাসকে সম্মানের সাথে স্মরণ করায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই জানেন না এই দিনের পেছনে লুকিয়ে থাকা রক্তাক্ত ইতিহাস ও শ্রমিকদের ত্যাগের গল্প। আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে যে আন্দোলন একদিন বিক্ষোভ থেকে বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছিল, যেখানে অসংখ্য শ্রমিককে জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়েছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীর কথা— যখন ইউরোপ ও আমেরিকায় শিল্প বিপ্লবের ফলে কলকারখানা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চাপানো শ্রমব্যবস্থানুযায়ী শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত ছিল এবং তাদেরকে দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানবিকভাবে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। শিল্পকারখানাগুলোতে তখন নারী, পুরুষ; এমনকি শিশুশ্রমিকরাও একইভাবে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য হতো, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ছুটি, কর্মনিরাপত্তা বা ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা ছিল না। এরকম নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত হয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে শুরু করেন এবং পরবর্তীতে এ শোষণমূলক পরিস্থিতির প্রতিবাদেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দেন। যার প্রধান দাবি ছিল– দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ করা। ১৮৬৬ সালে আমেরিকার বাল্টিমোরে প্রথম জাতীয় শ্রম সম্মেলনে দিনে আট ঘণ্টা কাজের প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু তখনও পর্যন্ত শ্রমিকরা সেই অনুযায়ী সুবিধা পাচ্ছিল না। যা পরবর্তীতে শ্রমিক আন্দোলনকে আরও জোরদার করে তোলে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। আমেরিকার বিভিন্ন শহরে শ্রমিকরা দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ শুরু করেন। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিকাগো। যেখানে হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন। পহেলা মে থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কয়েকদিন ধরে চলতে থাকে। ৩ মে শিকাগোর ম্যাক কর্মিক হারভেস্টার কারখানায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন শ্রমিক নিহত হন। এর প্রতিবাদে পরদিন ৪ মে ‘হে মার্কেট’ চত্বরে আয়োজিত সমাবেশে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি পুলিশের দিকে বোমা নিক্ষেপ করে, প্রত্যুত্তরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। এই ঘটনায় কমপক্ষে সাত জন পুলিশ এবং বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিহত হয়। শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এটিই ‘হে মার্কেট গণহত্যা’। বোমাটি কে নিক্ষেপ করেছে তা কখনোই শনাক্ত করা যায়নি, তবুও ৮ জন নেতাকে ষড়যন্ত্রের দায়ে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তাদের মধ্যে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। এই রক্তাক্ত ও আত্মত্যাগময় ঘটনার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টায় ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ১লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যাতে হে মার্কেটের সেই আত্মত্যাগের স্মৃতি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।

১৮৯০ সালের পহেলা মে প্রথমবারের মতো ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে এই দিনটি পালিত হয়। ২০ শতাব্দীতে মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা এই দিনে সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের দাবি তুলে ধরে। অনেক দেশে এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালন করা হচ্ছে, যা শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও সম্মানের প্রতিফলন।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এক ধরনের আত্মসমালোচনা এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের দিন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রমিক উন্নয়ন ও শ্রমনীতির প্রশ্নে জিয়া পরিবারের ভূমিকা বিশেষভাবে সমাদৃত। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কঠিন সময়ে শহীদ জিয়াউর রহমান উন্নয়নকে কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে শ্রমিক ছিল কোনো সহায়তার পাত্র নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের মূল শক্তি। এই ভাবনা থেকেই তিনি গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যার মধ্যে খাল খনন কর্মসূচি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে তিনি নিজে কোদাল হাতে সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করে শ্রমের মর্যাদা ও নেতৃত্বের অংশগ্রহণমূলক ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেন। তিনি শুধু প্রতীকী অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি বরং কাজের বিনিময়ে খাদ্য তথা ‘কাবিখা’ কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। রাস্তা, বাঁধ ও খাল পুনরায় খননের মতো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শ্রমিকদের যুক্ত করে তিনি একদিকে তাদের জীবিকার পথ খুলে দেন, অন্যদিকে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও গতি আনেন। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে ছিল গ্রাম, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন গ্রাম শক্তিশালী না হলে রাষ্ট্রও শক্তিশালী হতে পারে না।পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সময় ২০০৬ সালে ‘বাংলাদেশ লেবার কোড’ প্রণয়ন করা হয়। যেখানে দীর্ঘদিনের ছড়ানো-ছিটানো শ্রম আইন একত্রিত করে একটি আধুনিক কাঠামো তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘শ্রম কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা অসচ্ছল ও সংকটাপন্ন শ্রমিকদের সহায়তার একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বেগম জিয়া শাসনামলে নীতিগতভাবে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও শিল্প সম্প্রসারণের ফলে গার্মেন্টস খাত দ্রুত প্রসার ঘটে এবং এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক শিল্পে নারী কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং শ্রমবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ তাঁর শাসনামলে শ্রমনীতিকে আরও বিস্তৃত করে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জিয়া পরিবারের শ্রমবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমিক উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছেন। তার সময়ে প্রবর্তিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য মাসিক নগদ ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের খাদ্যসামগ্রী নিশ্চিত করছে, যা ইতোমধ্যে ৩৭ হাজারের বেশি পরিবারের মধ্যে প্রদান শেষে ৪ কোটি পরিবারে সম্প্রসারণের পথে। কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালু করে ভর্তুকিযুক্ত সার, বীজ, যন্ত্রপাতি ও স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রায় ১২ লাখ প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। নারী শ্রমিক ও গৃহিণীদের কথা মাথায় রেখে ‘এলপিজি কার্ড’ প্রবর্তনের মাধ্যমে রান্নার জ্বালানি সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আগামী ৫ বছরে দেশে ও বিদেশে ১ কোটি চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে আইসিটি খাতেই ৮ লাখের বেশি তরুণের জন্য কাজের ব্যবস্থা থাকবে। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সার্বিয়া, গ্রিস, পর্তুগাল ও রাশিয়ার মতো নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, তিনি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারকে কেবল প্রতীকী অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ না রেখে তা সুনির্দিষ্ট বাজেট, ডিজিটাল কার্ডভিত্তিক ভর্তুকি ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের মূল চেতনা তথা শ্রমের মর্যাদা, অধিকার ও ন্যায্যতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। জিয়া পরিবারের নীতি ও উদ্যোগগুলো একদিকে শ্রমিককে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে শ্রমিক কল্যাণকে কেবল দয়া নয় বরং অধিকার হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে এনেছে। শ্রমিক দিবস তাই শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের এক চলমান প্রতিশ্রুতি।

লেখক: তাছনিম আলম, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

Continue Reading

মতামত

ইবিতে ইসলামিক স্টাডিজ সংযুক্তি: ‘সাম্প্রদায়িক’ বনাম ‘সময়োপযোগী’

Published

on

By

তানভীর মাহমুদ মণ্ডল

সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইসলামিক স্টাডিজ ও বাংলাদেশ স্টাডিজ দুইটি কোর্সকে ক্রেডিট কোর্স হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো— বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, মূল দর্শন এবং একাডেমিক উদ্দেশ্য বিবেচনায় এটি একটি সময়োপযোগী, যৌক্তিক এবং প্রতিষ্ঠানের স্বকীয়তা পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ।

নানা সংগ্রামের পর ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল— আধুনিক জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানসমৃদ্ধ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা। অর্থাৎ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেবল আরেকটি সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি এমন একটি বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান—যার নাম, কাঠামো ও উদ্দেশ্যের মধ্যেই একটি আদর্শিক ভিত্তি নিহিত আছে। এই বাস্তবতায় ইসলামিক স্টাডিজ কোর্স চালু বা বাধ্যতামূলক করা কোনো সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একাডেমিক ব্যবস্থা।

বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে institutional identity অনুযায়ী foundational course বাধ্যতামূলক থাকেন। যেমন: কোনো প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে Ethics in Engineering, কোনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে Agricultural Studies, আবার ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে Religious or Moral Studies বাধ্যতামূলক থাকেন। এতে বৈষম্য নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বজায় থাকে।

অন্যদিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ইসলামিক স্টাডিজ কোর্সের উদ্দেশ্য ধর্মীয় আনুগত্য আরোপ করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের ইসলামী ইতিহাস, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও সভ্যতা সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান দেওয়া। একজন শিক্ষার্থী মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান যে ধর্মেরই হোক না কেন, এই কোর্স তাকে ইসলামী সভ্যতার মৌলিক ধারণা, নৈতিক শিক্ষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানাবে। এটি ধর্মান্তর বা বিশ্বাসের বিষয় নয়; এটি জ্ঞানার্জনের বিষয়। একইভাবে বাংলাদেশ স্টাডিজ কোর্স বাধ্যতামূলক করা আরও বেশি যৌক্তিক। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে ধারণা ছাড়া একজন শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ নাগরিক বিকাশ সম্ভব নয়। উচ্চশিক্ষা শুধু পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জায়গা নয়; বরং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রও। সে বিবেচনায় বাংলাদেশ স্টাডিজ কোর্স একটি জাতীয় প্রয়োজন।

কেউ কেউ বলছেন, ‘সকল ধর্মের শিক্ষার্থীদের ইসলামিক স্টাডিজ পড়া বাধ্যতামূলক করা সাম্প্রদায়িক আচরণ।’ এই বক্তব্য মূলত ‘পড়ানো’ ও ‘বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া’ এই দুই বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার ফল। বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন পড়ানো মানে সবাইকে দার্শনিক বানানো নয়; রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ানো মানে সবাইকে রাজনীতিবিদ বানানো নয়। একইভাবে ইসলামিক স্টাডিজ পড়ানো মানে কাউকে ধর্মীয় বিশ্বাসে বাধ্য করা নয়। এটি জ্ঞানের অংশ, পরিচয়ের অংশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শিক ভিত্তির অংশ। বরং বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন থেকে বিচ্যুতি ঘটেছিল। আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী জ্ঞানচর্চার যে সমন্বয় হওয়ার কথা ছিল, তা পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে তার একাডেমিক কাঠামোর একটি অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছিল। ইসলামিক স্টাডিজ-কে ক্রেডিট কোর্স করা সেই অসামঞ্জস্য দূর করার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ— একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা বৈষম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কাঠামো ও বাধ্যতামূলক কোর্স রয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েরও নিজস্ব আদর্শিক ভিত্তি থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে সেখানে ভর্তি হওয়া মানে সেই প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কাঠামো ও মূল্যবোধ মেনে নেওয়া। এটিকে সাম্প্রদায়িক বলা হলে প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্যকেই অস্বীকার করা হয়।সবচেয়ে বড় কথা, ইসলামিক স্টাডিজ ও বাংলাদেশ স্টাডিজ কোর্স চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নৈতিকতা, ইতিহাস, মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রচেতনার ভিত্তি পাবে, যা একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক গঠনে সহায়ক। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই কোর্স সেই ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।

অতএব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ ও বাংলাদেশ স্টাডিজ-কে ক্রেডিট কোর্স করা কোনো সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যুক্তিসঙ্গত এবং সময়োপযোগী একাডেমিক সংস্কার। যারা এটিকে সাম্প্রদায়িক বলছেন, তারা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, আদর্শিক ভিত্তি এবং একাডেমিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করছেন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিই তার প্রতিষ্ঠার দর্শন ‘আধুনিক শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধের সমন্বয়’ বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে এই সিদ্ধান্ত সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

মো. তানভীর মাহমুদ মন্ডল

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

সাবেক সহ-সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইবি শাখা

Continue Reading

top3

বাংলাদেশ ক্রান্তিলগ্নে রয়েছে : আলী রীয়াজ

Published

on

By

বাংলাদেশ বর্তমানে এক ধরনের ক্রান্তিলগ্নে রয়েছে এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য গণভোট ও জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ। তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ দেশের জনগণ রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং এটি মানুষের স্বীকৃত ঋণ হিসেবে বিবেচিত।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

আলী রীয়াজ বলেন, সরকারি চাকরিতে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে প্রবেশ নিশ্চিত করতে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। ন্যূনতম ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে জুলাই জাতীয় সনদ বিকল্পহীন। স্বাধীন বিচার বিভাগ এতদিন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। এটি সত্যিকারের স্বাধীন করতে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য।

তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। যারা এটিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলে মন্তব্য করছেন, তারা ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব জনগণের ওপর উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, জনগণকে দেশের পথরেখা দেখাতে হবে। এক ব্যক্তির ইচ্ছায় যেন দেশের মৌলিক অধিকার আর কখনো ধ্বংস না হয়, সেই কারণেই জুলাই জাতীয় সনদ অপরিহার্য।

Continue Reading

Trending