ইবি প্রতিনিধি ও আশরাফ উদ্দিন খান
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে যখন বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের একটি বড় অংশ—কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক সমাজ—এই আলোচনার বাইরে থেকেই যায়। তাদের বেতন-ভাতা, জীবনমান ও ন্যায্য অধিকার নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা কাঠামোগত আলোচনা নেই বলেই চলে।
দেশে কওমী মাদ্রাসার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা করা হয়, এ সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা দ্বীনি শিক্ষাদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। সামগ্রিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব পেশ ঈমাম আশরাফ উদ্দিন খান।
তিনি তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন ভাতা ও বর্তমান জীবনযাপন’ সম্পর্কে লিখেন, শ্রমিক দিবসে বিশ্বের সমস্ত শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কথা হয়; আলোচনা হয়; তাদের অধিকারের প্রশ্ন উত্থাপিত হয় এবং সেই প্রশ্নের সঠিক ও ইনসাফপূর্ণ জবাবের প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়। শ্রমিক দিবসের আলোচনার বাইরে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী থেকে যায়, যাদের নিয়ে কোন আলোচনা নেই এবং তাদের পক্ষ থেকে কোন দাবি-দাওয়াও পেশ করার দৃষ্টান্ত দেখা যায় না। আমি এখানে বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসার কথা বলছিলাম। দ্বীনের দুর্গ নামে খ্যাত এই মাদ্রাসাগুলো নিরবে-নিভৃতে দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দিয়ে আসছে, উম্মতের জরুরত পূরণ করে আসছে। দেশে এই মাদ্রাসাগুলোর সংখ্যা কত তার পরিপূর্ণ হিসাব আমাদের হাতে নেই। বিভিন্ন ব্যক্তিগত গবেষণায় দেখানো হয় যে, এই মাদ্রাসাগুলোর সংখ্যা ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ হবে। শিক্ষকদের সংখ্যা হবে (দুই থেকে আড়াই লাখ) ২,০০০০০ থেকে ২,৫০,০০০ এর মত। তাদের বেতন-ভাতা নিয়ে আলোচনা করার আগে আমরা দেখবে যে, ইসলাম এই বিষয়টি কোন নীতিমালার আলোকে স্থির করেছে। কারো কাছ থেকে সেবা বা খেদমত গ্রহণ করে তাঁর পারিশ্রমিক বা মজুরি নির্ধারণ করার ব্যাপারে ইসলাম কিভাবে রুপরেখা পেশ করেছে?
ইসলামের দৃষ্টিতে সর্বনিম্ন মজুরি (Minimum Wage):
মজুরি নির্দিষ্ট কোনো টাকার অংকে নির্ধারিত নয়। বরং ইসলাম একটি ন্যায় ভিত্তিক নীতি দিয়েছে, যার মাধ্যমে শ্রমিকের মজুরি ঠিক করা হয়। সেই নীতিগুলো হচ্ছে— ন্যায্য মজুরি (عدل), সময়মতো মজুরি প্রদান (শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাঁর মজুরি দিয়ে দাও), জীবনধারণের উপযোগী মজুরি (এমন হওয়া উচিত যাতে তাঁর মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে) যেটাকে আজকের পরিভাষায় বলা হয় (Living Wage), পারস্পরিক সম্মতি (Mutual Agreement) এর ভিত্তিতে অর্থাৎ মালিক ও শ্রমিকের সম্মতিতে এবং কাজের ধরণ ও কষ্ট অনুযায়ী ও শোষণ নিষিদ্ধ (যে ব্যাক্তি শ্রমিকের মজুরি না দেয়, আমি কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে হব)
বর্তমানে কওমী মাদরাসার শিক্ষকদের সাধারণ বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা:
এটা হিসাব করে বের করার মত তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে তেমন নেই। তবে বাস্তবতার আলোকে দেখা যায় যে, সাধারণত বেতন-ভাতা ৬০০০ থেকে শুরু হয়ে ১৫,০০০ হাজার পর্যন্ত সিমাবদ্ধ থাকে। সামান্য কিছু ক্ষেত্রে কম-বেশি হতে পারে। এই পরিমাণ বেতন-ভাতা কি বর্তমান জীবনধারণের উপযোগী? বিশ্লেষণটা আমরা এইভাবে করতে চাই যে, আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নিয়োজিত আছেন তৈরি পোশাক খাতে। এখানে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ। তাদের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারিত আর সেটা হচ্ছে ১২,৫০০ টাকা। ১২,৫০০ থেকে তাদের বেতন ২৫,০০০+ হয়ে থাকে। যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন ৬০০০– ১৫,০০০ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। পোশাক শ্রমিকদের ব্যাপারে অনেক শ্রমিক সংগঠন বলছে ১২,৫০০ টাকা পর্যাপ্ত নয়। তাদের দাবি ২৩,০০০ করা উচিত। কারণ তাদের বাস্তব চাহিদার আলোকে এখানে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সেই ঘাটতির চিত্রটা বুঝতে জীবনযাপনের ন্যূনতম খরচের খাত ও পরিমাণ নিয়ে একটু আলোচনা করা যেতে পারে।
বর্তমান সমাজে মাসিক ন্যূনতম খরচের চিত্র:
খরচের খাতসমূহ (মূল খাত) বাসা ভাড়া, খাদ্য খরচ, বস্ত্র, চিকিৎসা, যাতায়াত, ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি) ও অন্যান্য। মোট খরচের একটা খসড়া অনুমান করা যাক। ১ম অংক/পরিমাণ একজনের জন্য আর ২য় পরিমাণ হচ্ছে ৪ সদস্যের একটি পরিবারের— বাসা ভাড়া- ৫০০০/ ৮০০০, খাদ্য- ৭০০০/ ১৪০০০, বস্ত্র- ৬০০/ ২০০০, চিকিৎসা- ৮০০/ ১৫০০, যাতায়াত- ১২০০/ ২০০০, ইউটিলিটি-১২০০/ ২০০০, শিক্ষা (২ সন্তান) ২০০০, অন্যান্য- ২০০০/ ৩০০০ = মোট ১৭,৮০০ (প্রায়) / ৩৪,৫০০। ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণে বললে শ্রমিকের মজুরি এমন হতে হবে যাতে তাঁর মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়। তাঁকে কষ্টে বা অভাবে রাখা যাবে না। তাই বাস্তবে ন্যূনতম জীবনধারণযোগ্য মজুরি = ১৮,০০০–২০,০০০। তাহলে যদি কারো বেতন হয়ে থাকে ১০,০০০ টাকা, বাস্তবে তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজন- ১৮,০০০+ টাকা, তাহলে ঘাটতি ৮,০০০ টাকা (একজনের জন্য) চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য তাদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের প্রয়োজন পড়ে ৩৪,০০০+। তাহলে এখানে ঘাটতি- ৩৪,০০০ (চাহিদা)–১০,০০০ (প্রাপ্য) = ২৪,০০০। তাহলে প্রতি মাসে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ২৪,০০০ হাজার টাকা। এই ঘাটতির খেসারত শুধু তিনি নিজে দিচ্ছেন বা তাঁর পরিবার দিচ্ছে এমন নয়, বরং এর ঘাটতি সমগ্র জাতিকে বহন করতে হচ্ছে। সেটা কিভাবে? তাঁর বিবরণ ইবনে খলদুনের দর্শনের আলোকে দেওয়া যাক।
ইবনে খলদুলের দর্শনে বেতন-ভাতার গুরুত্ব:
মুসলিম দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খলদুন (১৩৩২ খৃঃ) এর মতে ‘শ্রমই সম্পদের মূল উৎস। কোন সম্পদই শ্রম ছাড়া সৃষ্টি হয় না। কৃষক, শ্রমিক, কারিগর– তারাই আসল উৎপাদক। তাদের ছাড়া অর্থনীতি অচল। তাই শ্রমিকের মূল্য সর্বোচ্চ হওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে আমাদের কথা হবে শিক্ষকগণ হচ্ছে একটি আদর্শ জাতি তৈরির কারিগর। তাহলে তাদের ব্যাপারে আমাদের আর কত সচেষ্ট হওয়া উচিত সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। তিনি আরও বলেন, ন্যায্য মজুরি অপরিহার্য। শ্রমের বিনিময়ে যথাযত পারিশ্রমিক না দিলে সমাজে অবিচার তৈরি হয়। তাঁর দর্শন মতে কম মজুরির কারণে উৎপাদন কমে যায়। শ্রমিক নিরুৎসাহিত হয়। সুতরাং যদি শিক্ষকদের যথাযতভাবে উৎসাহিত করতে আমরা আবা আমাদের সমাজ সক্ষম না হয়, তাহলে তারা এই পেশার প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
সাধারণ বেতন নির্ধারণের মূলনীতি কি? (উদাহরণ: গার্মেন্টস শ্রমিক):
গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন প্রধানত ‘ন্যূনতম মজুরি বোর্ড’ (Minimum Wage Board) এর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। সরকার শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পরপর মজুরি নির্ধারণ করে। এতে তিন পক্ষ থাকে: শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিক প্রতিনিধি ও সরকার। তারা কি বিষয় বিবেচনা করে? -দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা – শিল্পের সক্ষমতা (মালিক পক্ষ কি পরিমাণ দিতে পারবে) -রপ্তানি প্রতিযোগিতা -শ্রমিকের জীবনযাত্রার খরচ (আংশিকভাবে)।
মাদ্রাসাগুলোতে বেতন কিভাবে নির্ধারণ করা হয়:
এখানে প্রথম যে দু’টি কথা সেটা হচ্ছে এই যে, এখানে ন্যূনতম কোন পরিমাণ নির্ধারিত নয়। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে এটার দেখভাল করার কোন প্রতিনিধি বা অভিভাবক নেই। এখানে বেতন নির্ধারিত হয় মূলত সমঝোতাভিত্তিক (Compromise model) একটা ব্যবস্থার মাধ্যমে। এই সমঝতার মাঝে যে বিষয়টি উভয় পক্ষের চিন্তায় থাকে সেটা হচ্ছে দ্বীনের খেদমত। অর্থাৎ যিনি চাকুরি গ্রহণ করছেন তিনিও প্রস্তুত থাকেন যে এটাকে তিনি দ্বীনের খেদমতের নিয়তে গ্রহণ করছেন এবং এখানে তিনি শ্রম ও মেধা বরাদ্দ করবেন। আবার মালিক পক্ষও অনেকটা মনে করেন যে, এটা দ্বীনের খেদমত হিসাবে সকলে একটু কষ্ট হলেও মেনে নিবেন। মানসিকভাবে উভয় পক্ষ এইভাবে সমঝোতা করলেও বাস্তবতার সামনে এই অবস্থা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বহন করা প্রায় সকলের জন্য কষ্টকর প্রমাণিত হয়। যার ফলে যে ভাবে এই পেশায় নিজের মেধা ও সময় উজার করে দিয়ে খেদমত করা উচিত ছিল সেটা অব্যাহত রাখা অনেক ক্ষেত্রেই দুরুহ হয়ে যায়। ফলে অনেক উপযুক্ত মেধা থেকে আমাদের মাদ্রাসাগুলো বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকদের মেধা থেকে সর্বোচ্চ উপকার গ্রহণ করার জন্যেই তাদেরকে আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। তাঁর আগ পর্যন্ত আমাদেরকে শিক্ষকদের বেতন ও বাস্তব চাহিদার মধ্যবর্তী ঘাটতির খেসারত বহন করতে হবে।
পরিশেষে আমি কাকে দায়িত্ব দিয়ে আমার কথা শেষ করবো সেটা নির্ধারণ করা হচ্ছে এই আলোচনার সবচেয়ে কঠিন অংশ। আমি কি অভিভাবক হিসাবে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডকে বলতে পারি যে, আমাদের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বর্তমান কাঠামো থেকে বাস্তব কাঠামোতে রুপান্তর করা হোক। আমি সেটা বলতে পারছি না। একই কথা আমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকেও বলতে পারি না যে, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হোক। কারণ এখানে বিদ্যমান বাস্তবতা কারো জানা থাকলে তাঁর পক্ষে এই দাবিগুলো করা সহজ হবে না। তবে অবস্থা বা বাস্তবতা যাই হোক না কেন এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া অতি জরুরি। لَا تَدۡرِي لَعَلَّ ٱللَّهَ يُحۡدِثُ بَعۡدَ ذَٰلِكَ أَمۡرٗا অর্থ (তুমি জানো না, হয়ত আল্লাহ এর পরে নতুন কোনো বিষয় (সমাধান) সৃষ্টি করবেন। (সুরা তালাকঃ ০১)
আশরাফ উদ্দিন খান (খতিব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ)