Connect with us

সাহিত্য ও গল্প

আজ আহমদ ছফা’র জন্মদিন: প্রতিবাদী ও প্রগতিশীল কণ্ঠস্বর

Published

on

আহমদ ছফা, বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, ষাটের দশকের শুরু থেকে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। একজন লেখক, সমালোচক, অনুবাদক, সম্পাদক এবং সমাজকর্মী হিসেবে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি একাধারে লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ ও গণবুদ্ধিজীবী। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

আহমদ ছফার লেখার মূল ভাবধারা ছিল প্রথাবিরোধিতা, স্পষ্টবাদিতা এবং স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস”, “বাঙালি মুসলমানের মন”, “ওঙ্কার”, “গাভী বিত্তান্ত”, “পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ” ইত্যাদি বিখ্যাত রচনার জন্য পরিচিত।

১৯৪৩ সালের ৩০শে জুন, চট্টগ্রাম জেলার গাছবাড়িয়ায় এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আহমেদ ছফা। তাঁর পিতা ছিলেন হেদায়েত আলী এবং মা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন আহমদ ছফা।

আহমেদ ছফার শিক্ষা জীবন শুরু হয় তার পিতার প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন জ্ঞানপিপাসু এবং বই পড়ার প্রতি তার ছিল অসাধারণ আগ্রহ। ১৯৫৭ সালে তিনি নিজ গ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কৃষক সমিতি-ন্যাপ বা তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কয়েকজন বন্ধু মিলে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন। পরে গ্রেপ্তার এড়াতে কিছুকাল পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মগোপন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। একই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু পরে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্থানান্তরিত হন এবং ১৯৬৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং “১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব, বিকাশ, এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব” বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কারণে তিনি তার গবেষণা সম্পন্ন করতে পারেননি। নাসির আল মামুনের লেখা ‘আহমদ ছফার সময়’ নামে বইটিতে একটি সাক্ষাৎকারে আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘একটা মানুষের মধ্যেই গোঁজামিল থাকে। কিন্তু যে সাপ সে হান্ড্রেড পারসেন্ট সাপ। যে শেয়াল সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শেয়াল। মানুষ সাপও হইতে পারে, শেয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেয়ার ক্ষমতা আছে। বুঝছো, গ্রাম দেশে আগে সাপ আর শেয়াল পাওয়া যাইতো। এগুলা নাই এখন। কারণ সাপ, শেয়াল এরা মানুষ হিসাবে জন্মাইতে আরম্ভ করছে।’ বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম প্রতিবাদী এবং প্রগতিশীল লেখক আহমদ ছফা। তিনি তাঁর কলমকে অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। আর কলম দিয়ে লেখা প্রতিটি শব্দ যেন এক-একটা বুলেট।আহমদ ছফা ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা মানুষ। তাই সহজে ছুঁয়ে গেছেন মানুষের হৃদয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, জাতির শিক্ষক ও জাতির দর্পণ হিসেবে আহমদ ছফাকে অভিহিত করা হয়। তিনি ছিলেন শোষিত মানুষের পক্ষে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। অনেকেই আহমদ ছফাকে প্রাবন্ধিক হিসেবে দেখলেও তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। একাধারে রাজনীতিক, কবি, ঔপন্যাসিক, চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট কলামিস্ট।বাংলা সাহিত্যে এ পর্যন্ত যত প্রাবন্ধিক, লেখক ও সাহিত্যিক জন্ম নিয়েছেন, তাদের মধ্যে আহমদ ছফাই সবচেয়ে সাহসী, কুশলী ও বহুমাত্রিক। যে সত্য প্রকাশ করতে তাঁর সমকালীন অনেক বড় বড় লেখকও হিমশিম খেতেন, তিনি তা অসংকোচে অবলীলায় প্রকাশ করতেন। তাঁর লেখায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে।

মানবিক মূল্যবোধ ও গুণাবলির জন্যও আহমদ ছফা ছিলেন অনন্য। সারা জীবন শুধু লেখা-লেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকেননি। অনেকের সুখ-দুঃখের অংশীদারও হয়েছেন। বিপদে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন যেমন তেমননি সামর্থ অনুযায়ী সহায়তাও করেছেন। বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশের অনেক প্রখ্যাত লেখক তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। কারণ, তাঁরা তাঁর সহযোগিতা না পেলে হয়তো লেখকও হয়ে উঠতো না। এরকম উদাহরণ অনেক আছে। সবার কথা বলতে গেলে পাতার পর পাতা শেষ হয়ে যাবে। আজ শুধু চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের কথাই বলবো। আমরা সবাই চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে চিনি। বেঁচে থাকতে তিনি আজকের মতো এতোটা জনপ্রিয়তা পাননি। আহমদ ছফা শিল্পী সুলতানের আঁকা ছবিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সেসময়কার ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য চিত্রশিল্পীরা হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে তাঁর পেছনে লেগে ছিলো। এই বিষয়টা খুব ভালোভাবে লক্ষ করেছিলেন আহমদ ছফা। তিনি মনে মনে ঠিক করলেন, সুলতানের পাশে দাঁড়াতেই হবে। পরবর্তীতে অনেক বাধা বিপত্তির পরেও আহমদ ছফা শিল্পী সুলতানের পাশে ছিলেন এবং সহযোগিতা করে গেছেন। আহমদ ছফা সুলতান ও তার শিল্পকে সবার নজরে আনার জন্য ৫০ পৃষ্ঠার গোটা একটি প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন। প্রবন্ধটির নাম ‘বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা’। ওই প্রবন্ধটি সবার নজরে আসার কিছুদিনের মধ্যে সুলতানের খ্যাতি পুরো বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। যদিও ততদিনে সুলতান আর বেঁচে ছিলেন না।আহমদ ছফা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মানচিত্র অঙ্কন করেছেন। করেছেন বুদ্ধিজীবীদের ব্যর্থতায় বাংলাদেশের কী দুর্দশা হতে পারে তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যজগতের অনুপ্রাণিত একজন স্রষ্টা। যার কর্মের মাধ্যমে লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, চলচ্চিত্রকারসহ অনেকে উৎসাহ পেয়েছেন প্রতিনিয়ত। যদি নাম বলা হয় তার মধ্যে অন্যতম আছেন হুমায়ূন আহমেদ, ফরহাদ মজহার, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খানসহ অনেকে। তাকে বলা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী।

সলিমুল্লাহ খান আহমদ ছফাকে ‘গরীবের রবীন্দ্রনাথ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর প্রবন্ধে সলিমুল্লাহ খান লিখেন, ‘গ্যেটের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমার জীবনে মহত্তম মানুষ, জীবনের সমস্ত সমস্যা-সংকটে আমি রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে অনুপ্রেরণা সঞ্চয় করেছি।’পড়াশোনা চলাকালীন অবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি ন্যাপ বা তৎকালীন জনপ্রিয় গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী কর্মকা- ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে আহমদ ছফাকে। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে এবং পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুদিন আত্মগোপন করেন।সত্যি কথা বলতে কি, আহমদ ছফার বিস্তৃতি অনেক। আমার এই ছোট্ট একটি নিবন্ধে পুরো বিস্তৃতি শেষ করা সম্ভব না। এরপরও যতটুকু সম্ভব তুলে ধরছি। আগামীর উদ্দেশ্যে। ষাটের দশকে সাহিত্য জগতে পা রাখেন আহমদ ছফা। সমসাময়িক উপন্যাস লেখকগণের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। তিনি বেশ কয়েকটি উপন্যাস রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো ‘সূর্য তুমি সাথী’, গাভী বিত্তান্ত’, ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’, ‘অলাতচক্র’ ‘মরণবিলাস’, ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ইশ্বরী’ ইত্যাদি।১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মাঝে সাড়া ফেলে দেন তিনি। তার আরেকটি বেশ জনপ্রিয় উপন্যাস হলো ‘গাভী বিত্তান্ত’। উপন্যাসটিতে তৎকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও শিক্ষকদের রাজনীতি প্রকাশ পেয়েছে বইটিতে। যে উপন্যাস সম্পর্কে বলতে হয় সেটি হলো ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’। তাঁর এই গ্রন্থটি জীবন সম্পর্কে তাঁর বোধ, প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর ভাবনাসহ সকল কিছু একসঙ্গে গেঁথে দেয়।আহমদ ছফার যে বিষয়টি একজন নতুন পাঠককে আকৃষ্ট করে তা হচ্ছে রচনার সাবলীলতা। তিন তাঁর লেখনিতে মুক্তিযুদ্ধকে অনেকবার স্মরণ করেছেন। তিনি নিজেও ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত ‘অলাতচক্র’ মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। এই উপন্যাসটিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে তিনি প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত ছিলেন। এই উপন্যাসে শরণার্থী বিষয়ও উঠে এসেছে। ১৯৮৬ সালের দিকে এসে জার্মান ভাষার উপর গ্যেটে ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। গ্যেটের অমর সাহিত্য ‘ফাউস্ট’ অনুবাদের ক্ষেত্রে এটিই ছিল প্রথম সোপান।আহমদ ছফার যে দুইটি উপন্যাসের কথা না বললেই নয়। আহমদ ছফা একদিকে লিখেছেন ‘একজন আলী কেনানের উত্থান পতন’ আর অন্যদিকে লিখেছেন ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ উপন্যাস দুটি। ছফা যেখানে আলী কেনানকে অসাধারণ করে তুলেছেন তাঁর চরিত্রের মাধ্যমে অন্যদিকে আঘাত করেছেন ধর্ম ব্যবসার মূলকে। যারা মাজার পুজো করে এবং মাজার নিয়ে ব্যবসা করে। ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে মুসলমান যে আলাদা একটি জাতি ও গোত্র সেটা তিনি সেখানে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

আহমদ ছফার লিখিত প্রবন্ধগুলো মূলত দুইভাগে ভাগ। একভাগ হচ্ছে রাজনীতি আরেকভাগ হচ্ছে অরাজনৈতিক। অরাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোতে তিনি দর্শন এবং বিভিন্ন শিল্পী এবং সামাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখেছেন।তিনি সাহিত্যের নির্যাস নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ থেকে। আর জ্ঞানের নির্যাস নিয়েছিলেন তৎকালীন জাতীয় অধ্যাপক জ্ঞানতাপস প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক থেকে। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ছফার জীবনে বড় ভূমিকা রাখেন। যা ‘যদ্যপি আমার গুরু’ গ্রন্থটি পাঠ করলে স্পষ্টই বোঝা যায়।আহমদ ছফা মূলত তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোর জন্য সেসময় আলেচিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সাহিত্যকে অন্যমাত্রায় নিয়ে আসেন। তাঁর সাহসী কলমের কালিতে উঠে এসেছে রাষ্ট্র ও রাজনীতির নির্মম সত্য।জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) মুখপত্র ‘দৈনিক গণকণ্ঠে’ লিখতেন আহমদ ছফা। গণকণ্ঠেই মূলত তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি এখনও বাংলাদেশে রাজনীতি সাহিত্যে অনবদ্য এক সৃষ্টি হিসেবে রয়ে গেছে। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’ প্রবন্ধে তিনি তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, সত্তুরের দশকে ছফার সেই খুঁজে পাওয়া সমস্যাগুলোর সাথে আজকের সমস্যা ও প্রাসঙ্গিকতা যে কেউ খুব সহজে মিলিয়ে নিতে পারেন। সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি ১৯৯৬ সালে যখন ‘সাম্প্রতিক বিবেচনা’ গ্রন্থে সংযোজন সহ পুনর্মুদ্রিত হয় তখন তিনি দেখিয়ে দেন কিভাবে তাঁর করা রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণীগুলো সত্য হয়েছে।

তিনি বাংলা ভাষা নিয়েও একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। সেটি হচ্ছে ‘বাংলা ভাষা রাজনীতির আলোকে’। এই গ্রন্থটিতে ছফা বাংলাভাষার উপনিবেশায়ন নিয়ে বিস্তর আলাপ করেছেন।কবি হিসেবেও আহমদ ছফা বাংলা সাহিত্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর ‘প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’, ‘লেনিন ঘুমোবে এবার’ ‘জল্লাদ সময়’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলো বেশ সাড়া জাগিয়েছে দেশে।এছাড়া আহমদ ছফা বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় প্রচুর কলাম লিখেছেন। যেগুলোতে সমাজ, রাষ্ট্রের এবং মানুষের চিত্র ফুটে উঠেছে। সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।আহমদ ছফা বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। শুধু নাম বললেই ভুল হবে, বলা যায় বাতিঘর। তাঁর রচনাগুলো শুধু পাঠ করলেই হবে না, সাথে তাকেও বুঝতে হবে। আর তাকে বুঝতে পারলেই বোঝা যাবে বাঙালি মুসলমান গোষ্ঠীকে।

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ

যুক্তরাষ্ট্রে ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি’র সুযোগ পেলেন বেরোবি শিক্ষার্থী ইমরান

Published

on

By

বেরোবি প্রতিনিধি

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইমরান যুক্তরাষ্ট্রের University of Wyoming-এ অর্থনীতি (Economics) বিষয়ে ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি করার সুযোগ অর্জন করেছেন। সেখানে তিনি অর্থনীতি বিভাগের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্র Climate Finance, Resource Economics এবং Applied Econometrics। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে নীতিনির্ধারণ ও টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।

নিজের এই দীর্ঘ যাত্রার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইমরান বলেন, কম সিজিপিএ থাকায় উচ্চশিক্ষার অনেক সুযোগ তাঁর জন্য সীমিত হয়ে পড়েছিল। তবে ধারাবাহিক গবেষণার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষকতা তাঁর এই অর্জনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

তিনি জানান, ২০১৮ সালে বন্ধু ফিরোজ মিয়ার সঙ্গে অধ্যাপক ড. মো. নূর আলম সিদ্দিকের তত্ত্বাবধানে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। শুরু থেকেই অধ্যাপক সিদ্দিকী তাঁদের গবেষণাপত্র পড়তে, নোট নিতে এবং গবেষণার ভিত্তি গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেন। গবেষণার বিভিন্ন জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি সবসময় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং হাতে-কলমে গবেষণার কৌশল শিখিয়েছেন।

ইমরান বলেন, একসময় তিনি উচ্চশিক্ষার স্বপ্নও দেখতেন না। কিন্তু অধ্যাপক সিদ্দিকীর অনুপ্রেরণা, দিকনির্দেশনা ও সার্বক্ষণিক সহযোগিতা তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। এ সাফল্যের জন্য তিনি তাঁর বাবা-মা, বোন, সহধর্মিণী, বন্ধু ফিরোজ মিয়া এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও জানান, তাঁদের যৌথভাবে লেখা একাধিক গবেষণা নিবন্ধ SSCI, SCIE ও Scopus-সূচিভুক্ত আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। নিবন্ধগুলো Elsevier, Sage, Emerald এবং Springer Nature-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থার জার্নালে প্রকাশিত হওয়ায় পিএইচডি আবেদনের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে তাঁরা ‘Best Paper Award’ অর্জন করেন। যাত্রার শেষ পর্যায়ে Finland-এর LAB University of Applied Sciences-এর অধ্যাপক ড. সজল কবিরাজও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা প্রদান করেন।

পিএইচডিতে ভর্তির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ইমরান বলেন, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি অর্জন তুলনামূলকভাবে কঠিন। ভালো সিজিপিএ গুরুত্বপূর্ণ হলেও গবেষণার অভিজ্ঞতা, মানসম্মত গবেষণা প্রকাশনা এবং শক্তিশালী সুপারিশপত্র (Recommendation Letter) একজন আবেদনকারীকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রাখে। তাই তিনি শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যায় থেকেই গবেষণায় সম্পৃক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন।

ইমনের এই সাফল্যে গর্ব প্রকাশ করেছেন ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক ও তাঁর গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ড. মো. নূর আলম সিদ্দিক। তিনি বলেন, ইমরান ও ফিরোজ নিয়মিত গবেষণায় সময় দিয়েছেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের এই অর্জন বিভাগের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং এটি ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করবে।

তিনি আরও বলেন, বিভাগের গবেষণামুখী পরিবেশই শিক্ষার্থীদের এমন সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। বিভাগীয় প্রধান ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন হিসেবে তিনি ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গবেষণাবান্ধব ও একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করে যাবেন।

Continue Reading

top3

তরমুজের খোসা-বীজেও মিলবে উপকার

Published

on

By

গ্রীষ্মের কাঠফাটা গরমে শরীর ঠাণ্ডা রাখতে এবং তৃষ্ণা মেটাতে তরমুজের বিকল্প নেই। যদিও আমরা সাধারণত সুস্বাদু এ ফলটির শুধু লাল অংশ খেয়ে থাকি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, তরমুজের খোসার ভেতরের সাদা অংশ এবং বীজও শরীরের জন্য অনেক উপকারী।

তরমুজ প্রায় ৯২ শতাংশ পানি দিয়ে তৈরি, যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে।

এর ভেতরে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শরীরের নানা কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
খোসার সাদা অংশের উপকারিতা

তরমুজের লাল অংশের পরের সাদা অংশে রয়েছে সিট্রুলিন নামের উপাদান। এটি শরীরে রক্ত চলাচল ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং এনার্জি বাড়ায়। ব্যায়ামের পর ক্লান্তি কমাতেও এটি সহায়ক হতে পারে।

এতে থাকা ফাইবার হজম শক্তি বাড়ায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, আর ভিটামিন এ ও সি ত্বক ভালো রাখতে সহায়তা করে। এ ছাড়া এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল ও শর্করা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ত্বক, কিডনি ও শরীরের জন্য উপকারী

তরমুজ শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য বের করতে সাহায্য করে, যা কিডনির জন্য ভালো।

এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বক সতেজ রাখতে এবং বয়সের ছাপ কমাতে সহায়তা করে। এ ছাড়া লাইকোপেন ও অন্যান্য উপাদান শরীরে জ্বালাপোড়া কমাতে এবং শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

তরমুজের খোসায় ক্যালরি খুব কম থাকে। তাই এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। নিয়মিত খেলে বিপাকক্রিয়াও উন্নত হয়।

বীজের পুষ্টিগুন

তরমুজের বীজেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এতে ফাইবার, ম্যাগনেসিয়াম ও ফোলেট থাকে, যা হার্ট ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে।

তরমুজের সাদা অংশ ছোট টুকরা করে কেটে কাঁচা সালাদ হিসেবে খাওয়া যায়। লেবু ও বিট লবণ মিশিয়ে খেলে স্বাদ আরো ভালো হয়। এটি ডাল বা তরকারির সঙ্গে রান্না করেও খাওয়া যায়। কেউ আবার ভাজি করেও খান। তবে পুষ্টিমান অটুট রাখতে কাঁচা খাওয়াই উত্তম।

এ ক্ষেত্রে হালকা লেবু, বিট লবণ মিশিয়ে সালাদ বানাতে পারেন। আবার চাইলে বরফকুচি, পুদিনাপাতা ও লেবুর রসসহযোগে ব্লেন্ড করে জুস বানিয়েও খেতে পারেন। এ ছাড়া সাধারণ খাওয়ারযোগ্য পানিতে বরফের টুকরা, তরমুজের খোসার টুকরা, পুদিনাপাতা, লেবু ইত্যাদি সারারাত ভিজিয়ে রেখে পরদিন ডিটক্স ওয়াটার বানিয়ে পান করুন এই পানি।

বীজ শুকিয়ে বা হালকা ভেজে খাওয়া যায়, যা স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস হিসেবে কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তরমুজ শুধু একটি ফল নয়, এর প্রতিটি অংশই শরীরের জন্য প্রাকৃতিক পুষ্টির উৎস।

Continue Reading

সাহিত্য ও গল্প

‘অসমাপ্ত কথা’

Published

on

By

মো.সাকিব মল্লিক

নীলা এবং রাতুল। ওরা দুই বছরের ছোট-বড়। মানে নীলা রাতুলের চেয়ে দুই বছরের ছোট এবং রাতুল নীলার চেয়ে দুই বছরের বড়। নীলা উচ্চতায় মাঝারি। গত নভেম্বরে তার বয়স পনেরো পেরিয়ে ষোলোতে পড়লো। কানে সবসময় সে দুল পরে। তার চোখের মনি সাধারণের তুলনায় একটু বেশি কালো, গায়ের রং ফর্সা, চুল হালকা কোঁকড়ানো। রাতুল আবার অতটা ফর্সা নয়, তবে অনেকটা লম্বা। আর দশটা ছেলের মতোই রাতুল।তবে অন্যদের থেকে রাতুল অনেক ভালো শ্রোতা। কেউ যখন কিছু বলে তখন রাতুল সেটা মন দিয়ে শুনতে পছন্দ করে এবং অল্পতে রেগে যাওয়ার স্বভাব তার নেই। এটাকে অন্যরা গুণ ভাবে কি না সে জানে না, তবে রাতুল ভাবে এটাই তার বড় গুণ।

রাতুল ও নীলা দুজন দুজনকে চেনে ছোটবেলা থেকেই। তারা ছোট থেকেই একই পাড়ায় থাকে। তাই সম্পর্কে তারা পাড়ার চাচতো ভাইবোনই বলা চলে। নীলা বয়সে ছোট হওয়ায় কখনো রাতুলের সাথে নিজে থেকে কথা বলার সাহস পেত না। রাতুল মাধ্যমিক পাস করে স্থানীয় একটা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ালেখা করছে৷ ছাত্র হিসেবে খুব একটা খারাপও না, আবার খুব একটা ভালোও না।

কৃষক বাবার ছেলে, বাবাকে সে অনেক ভালোবাসে।বাবার কাজে সে সবসময় সাহায্য করে। বাবাও ছেলের লেখাপড়ার খরচ দিতে কখনো পিছিয়ে যান না। এভাবেই রাতুল চালিয়ে যাচ্ছে তার পড়ালেখা। তার সাথের অনেকেই পড়ালেখা ছেড়ে এখন কাজ করে সংসারে অবদান রাখার চেষ্টা করছে। অনেকে তো মনেই করেন গ্রামে থেকে লেখাপড়া শিখলেও পরে ভালো কিছু করা সম্ভব না। রাতুল এসব কথায় বিশ্বাস করে না। সে তার পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে নিজ ইচ্ছাতেই৷

নীলার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা। মোটা বেতন পান। নিয়মিত তাকে শহরে যাওয়া-আসা করতে হয়। শহর দুই ঘন্টার পথ৷ নীলা সামনের বার এসএসসি দিবে। পড়ালেখায় সে বেশ ভালো। স্কুলেও সে যায় নিয়মিত। স্কুলে যাওয়ার সময় রাতুলের সাথে তার প্রতিদিনই দেখা হয়। রাতুল ওই রাস্তা দিয়েই চলাফেরা করে। তবে কখনো তাদের মধ্যে কথা হয়না। অবশ্য কথা হবেই বা কেন, সবাই তার নিজ কাজে ব্যস্ত। নীলা যায় স্কুলে, অন্যদিকে রাতুল যায় কলেজে বা তার বাবার সাথে দেখা করতে; স্কুলের সামনের মাঠে।

একদিন রাতুল কলেজের উদ্দেশ্যে বার হলো। অবশ্য এটা তার প্রতিদিনের কাজেরই অংশ। রাস্তা বেশ ফাঁকা। কিছুটা সামনে এসে একটা মোড়৷ ওই মোড়ে চায়ের দোকান। ওখানে স্থানীয় ছেলেরা-বড়রা আড্ডা দেয়। কী যেন বাড়ি ভুলে রেখে আসায় রাতুল ওই দিন কলেজ থেকে বাড়ির দিকে ফিরে আসছিল। সে বেশ ব্যস্ত। কারণ তাকে আবার কলেজে ফিরতে হবে। হঠাৎ সে রাস্তায় একটা জটলা মতো দেখলো। কৌতুহলী হয়ে সে কাছে যেতেই দেখে নীলা চায়ের দোকানের ছেলেদের সাথে চেচিয়ে কি যেন বলছে।

রাতুল এগিয়ে গেলো। নীলা রাতুলকে বললো আমি স্কুলে যাওয়ার সময় এরা আমাকে দেখে আজেবাজে কথা বলছে এবং কয়েকদিন থেকেই এমন করছে। আজ সে বিরক্ত হয়ে এদের যেই বলতে যাচ্ছে এমন যেন না করে, তখন ছেলেগুলো উল্টা তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। রাতুল বেশ ঠান্ডা ও ভদ্র স্বভাবের ছেলে। সে মেয়েদের অনেক সম্মান করে। সে লক্ষ করে দেখলো নীলাকে বিরক্ত করা ছেলেগুলো তার কলেজের। সবাই ফার্স্ট ইয়ারের।

রাতুল তাদের বললো তোমরা কলেজে না যেয়ে রাস্তায় মেয়েদের সাথে এমন করো কেন?  আরও অনেক কথাই রাতুল ওদের বুঝিয়ে বললো। তবে কলেজের বড়ভাই হওয়ায় ওই ছেলেগুলো তখন রাতুলকে কোনো কিছু বলে নাই এটা রাতুল ওদের হাবভাব দেখে ঠিকই বুঝে গেল।

ছেলেগুলো সরে গেল সেখান থেকে ঠিকই কিন্তু রাতুল বুঝলো নীলাকে তারা একা পেলে পরে কিছু বলতে পারে। রাতুল ভাবলো ছেলেগুলোকে পরে ডেকে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলবে। সেদিন রাতুল নীলাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। রাস্তায় রাতুল ও নীলা কেউ কারো সাথে কোনো কথা বলে নি। বাড়ির সামনে এসে নীলা শুধু বললো আপনি আমাকে কয়েকটা দিন স্কুলে যাওয়া ও আসার সময় সাথে করে পৌঁছে দেবেন। রাতুল ভাবলো ওই ছেলেগুলো আবার কোনো ঝামেলা করতে পারে। তখন সে মুখে কিছু না বলে, নীলার কথায় সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো।

নীলা বললো কাউকে যেন রাস্তায় ঘটে যাওয়া আজকের বিষয়টি না বলে রাতুল। নীলা সেদিন ক্লাস করে নি, রাস্তার ওইখান থেকে বাড়ি চলে আসছে। বাড়িতে মা শুনলে বলেছে আজ ক্লাস হবে না, তাই চলে এসেছি। পরের দিন থেকে রাতুল নীলাকে স্কুলে এগিয়ে দেয় এবং আসার সময় বাড়ির গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেয়৷ এভাবে রাতুল ও নীলা রাস্তায় অল্প অল্প করে দুজন দুজনের সাথে কথা বলা শুরু করে। দুজনেই বেশ লাজুক প্রকৃতির। দুজনেই চায় একে অন্যের সাথে কথা বলতে কিন্তু কোন বিষয় দিয়ে কথা বলা শুরু করবে তা খুঁজে পায় না।

তাই বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক কথা দিয়েই তাদের প্রতিদিনের কথা শুরু হতো। আস্তে আস্তে দিনে দিনে দুজনের মাঝের জড়তা দূর হয়ে যেতে থাকে। একদিন নীলা রাতুলকে বলে আপনিও তো ওইসব ছেলেদের মতো আমাকে বাজে কথা বলতে পারতেন, কিন্তু আপনি তো ওদের মতো না। কেন? নীলার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না রাতুল। নীলা এভাবে প্রায় প্রত্যেকদিনই নানা রকম প্রশ্ন করে রাতুলকে। রাতুল সব মনোযোগ দিয়ে শোনে। মাঝে মাঝে উত্তর দেয়, মাঝে মাঝে দেয় না।

এতো এতো কথা বলার পরও যে রাতুল বিরক্ত হয় না, এ বিষয়টা নীলার খুবই ভালো লাগে। কয়েকদিন পরই নীলার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে, রাতুল নীলাকে ভালোভাবে পরীক্ষা দেওয়ার কথা বলে। নীলা বলে আমি ভালোভাবে পরীক্ষা না দিলে আপনার কী? কথাটা রাতুলের মনে কষ্ট দেয়। রাতুল নিজেও বুঝতে পারে না নীলার এই কথায় তার কেন মনের ভিতর খারাপ লাগলো। নীলার পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট বের হওয়ার তারিখ ঠিক হয়ে যায়। পরীক্ষার সময়ও রাতুলের সাথে রাস্তায় নীলার দেখা হতো। তবে তখন খুব বেশি একটা কথা হতো না।

রেজাল্ট দেওয়ার দুইদিন আগে নীলা একদিন হঠাৎ রাস্তায় রাতুলকে বলে কাল আপনি বিকালে একবার আমার সাথে দেখা করতে পারবেন? রাতুল প্রথমে বলে আমাদের তো রাস্তায় নিয়মিতই দেখা হয়, কথাও হয়; তাহলে আবার বিকালে কেন?  কিন্তু নীলার জোরাজোরিতে রাতুল রাজি হয়। কাল নীলা ডেকেছে, কেন ডাকলো, কিছু কি বলবে আমাকে? বললেও কী বলবে?  এসব নানা রকম ভাবতে ভাবতে সেই রাতে রাতুলের ঘুমাতে দেরি হয়ে গেল।

রাতুলের মনে হচ্ছিল নীলাকে কেন জানি সে ভালোবাসে ফেলেছে এবং কাল দেখা হলে তখন সে নীলাকে বলবে কথাটা৷ ঘুমের মধ্যেও রাতুল নীলাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলো। ঘুম ভাঙলো সকাল নয়টায়। চায়ের দোকানে যেয়ে চায়ে চুমুক দিতেই সে শুনতে পেল সবাই কী নিয়ে যেন কথা বলছে। খেয়াল করে শুনে দেখলো একজন নীলাদের গ্রাম থেকে আজ সকালে শহরে চলে যাওয়ার কথা বলছে। তারা বলাবলি করছে নীলার বাবা নীলাকে শহরের ভালো কলেজে পড়াবে বলে অনেক আগে থেকেই গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার চিন্তা করে রেখেছিল। রাতুল ভাবলো নীলা কী জানতো যে তারা চলে যাবে?

আর যদি জানতোই তাহলে তাকে আগে কেন বলেনি। না কি দেখা করতে চেয়েছিল এইটা বলার জন্যই। একথাতো সেদিন রাস্তায় বললেই পারতো। তাহলে কি নীলা আমাকে ভালোবাসতো; একথা বলার জন্য ডেকেছিল। কী বলতে চেয়েছিল নীলা?  

এখন কি নীলার আমার কথা মনে পড়ছে, ভাবতে ভাবতে রাতুলের চোখের জল মুখ বেয়ে পড়তে লাগলো।

লেখা: মো. সাকিব মল্লিক, শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Continue Reading

Trending