Connect with us

আন্তর্জাতিক

ইসলামিক বিপ্লবের পর যেসব ঘটনায় কেঁপেছিল ইরান

Published

on

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লব মধ্য দিয়ে দেশটির শেষ রাজা বা শাহ-র পতন হয়। এরপর নিষেধাজ্ঞা, ভূমিকম্প, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাসহ নানান ঘটনায় কেঁপেছিল ইরান।

১৯৭৯ : ওই বছরের ইসলামিক বিপ্লবের পর ফেব্রুয়ারি মাসে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইরাক ও ফ্রান্সে ১৪ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেন। এরপর এপ্রিলে সংবিধানে সংশোধনী এনে ইরানকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন।

সে বছরের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। মূলত তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে কিছু মার্কিনিকে জিম্মি করায় এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ইসলামিক বিপ্লবকে সমর্থন জানিয়েছিল। এরআগে ১৯৫৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে ক্ষমতাচ্যুত করতেও সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৮০ : সে বছর ইরাক ইরানে হামলা চালায়। এ দুই দেশের যুদ্ধে ৫ লাখের বেশি মানুষ মারা যান। বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় ইরান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরান-ইরাক যুদ্ধে পরিখা, মেশিনগান এবং বেয়নেটের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছিল। এর পাশাপাশি ইরাক ইরান এবং কুর্দিদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রও ব্যবহার করেছিল।

১৯৮১ : ওই বছর তেহরান মার্কিন জিম্মিদের ছেড়ে দেয়। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমে। কিন্তু সে বছরের জুনে ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির সদর দপ্তরে বোমা হামলায়। এতে বিচার বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ বেহেস্তিসহ কয়েক ডজন নেতাকর্মী প্রাণ হারান। মোহাম্মদ খোমেনির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি ছিলেন।

এ ঘটনা যখন পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেয় তখনই আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী রাজাই এবং প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ বাহানোর তেহরানে এক বোমা হামলায় প্রাণ হারান। এ ঘটনার জন্য দায়ী করা হয় বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন মোজাহেদিন-ই-খালিক নামে একটি দলকে। এর আগের বছর এ দলটির ওপর ব্যাপক দমন চালিয়েছিল ইরান সরকার।

১৯৮২ : এ বছর লেবাননে হামলা চালায় দখলদার ইসরায়েল। এরপর লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা শুরু করে ইরান। তাদের প্রচেষ্টায় জন্ম হয় হিজবুল্লাহর।

১৯৮৮ : এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল ক্রুজার জাহাজ ইউএসএস ভিনসেনেস ইরানের একটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করে। এতে বিমানে থাকা ২৯০ জনের সবাই প্রাণ হারান। বাড়ে উত্তেজনা।

ওই বছরই ইরাকের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধবিরতি হয়। এতে সহায়তা করে জাতিসংঘ।

১৯৮৯ : ইসলামিক বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনি মারা যান। ৩ জুন তার মৃত্যু হয়। এরপরের দিন সংসদের বিশেষজ্ঞরা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সুপ্রিম লিডার হিসেবে নির্বাচিত করে।

৯৯০ : ইরানে ওই বছর আঘাত হানে বড় এক ভূমিকম্প। এতে ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়।

১৯৯৫ : যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তেল ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে ইরান সন্ত্রাসবাদে সহায়তা করে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।

২০০২ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ উত্তর কোরিয়া ও ইরাকের সঙ্গে ইরানকে ‘এক্সিস অব ইভিল’-এর অংশ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, এ দেশগুলো সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দেয়।

২০০৩ : যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালায়। এরপ্রেক্ষিতে দেশটিতে থাকা শিয়া যোদ্ধাদের অর্থায়ন শুরু করে ইরান। যারা আজও দেশটিতে সক্রিয়।

আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে ওই বছর ইরান ঘোষণা দেয় তারা ইউরেনিয়াম মজুদিকরণ পোগ্রাম বাদ দেবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থাকে তারা নিজ দেশে ঢুকতে দেয়। সংস্থাটি পরবর্তীতে নিশ্চিত করে ইরানের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই।

ওই বছরই ইরানে আঘাত হানে আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। এতে করে আরও ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়।

২০০৬ : সে বছর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পারমাণবিক ম্যাটারিয়ালস এবং প্রযুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরআগে ইরান কূটনীতির বদলে তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম বাদ দিতে ব্যর্থ হয়।

২০০৭ : যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয়।

২০১০ : ইরানের ওপর চতুর্থ দফায় নিষেধাজ্ঞা দেয় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। যারমধ্যে অস্ত্র এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ছিল।

২০১১ : মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতো সিরিয়ায় ছোঁয়া পড়ে আরব বসন্তের। তখন সাধারণ মানুষকে দমন করতে নৃশংসতা চালান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাসার আল-আসাদ। তাকে সহায়তা করতে বিপ্লবী গার্ডের সেনাদের পাঠায় ইরান।

২০১২ : ইরানের তেল বয়কটের ঘোষণা দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থা অভিযোগ করে ইরান তাদের পারমাণবিক অবকাঠামোতে তাদের কর্মীদের কাজ করতে দিচ্ছে না এবং ইরান ইউরেনিয়ামের মজুদ বাড়িয়েছে।

সে বছরের অক্টোবরে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব প্রকট হয়। এবং ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের বিপরীতে ইরানের রিয়ালের ৮০ শতাংশ দরপতন হয়।

২০১৫ : ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ইউরোপের দেশগুলোর পারমাণবিক সঙ্গে চুক্তি করে। এর বদলে তাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় দেশগুলো। তখন ইরান ভেবেছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ‘একঘরে’ থেকে তারা বেরিয়ে আসবে।

২০১৮ : ইরান প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না এ অজুহাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই বছর ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল এবং আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

২০২০ : ওই বছর ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের চৌকস কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হন।

২০২২ : এ বছর মাহসা আমিনি নামে এক তরুণী হিজাব পরা নিয়ে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে প্রাণ হারান। এরপর দেশটিতে হিজাব বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। যা দমনে কঠোর অবস্থান নেয় দেশটির সরকার। ওই সময় পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হন। 

২০২৪ : দখলদার ইসরায়েল সিরিয়ার দামেস্কে ইরানের দূতাবাসে হামলা চালিয়ে বিপ্লবী গার্ডের দুই জেনারেলসহ সাতজনকে হত্যা করে।

এ বছর ইরানের জন্য ছিল খারাপ। কারণ ওই বছরেরই মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান।

২০২৫ : এ বছরের জুনে দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বাধে। যা ১২ দিন স্থায়ী হয়। এ যদ্ধে ৬১০ ইরানি এবং ২৮ ইসরায়েলি নিহত হয়।

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top2

নদীর পানি কমতেই দৃশ্যমান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি যুদ্ধজাহাজ

Published

on

By

অলটাইম ডেস্ক রিপোর্ট

ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী ড্যানিউবের পানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সার্বিয়ার প্রাহোভো অঞ্চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবিয়ে রাখা নাৎসি জার্মানির একাধিক যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবারও দৃশ্যমান হয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়া ও তাপপ্রবাহের কারণে নদীর পানির স্তর নেমে যাওয়ায় ইতিহাসের এই নিদর্শনগুলো নতুন করে নজরে এসেছে। এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।

প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ড্যানিউব নদীর পানি কমলে এসব ডুবে থাকা যুদ্ধজাহাজের কিছু অংশ দেখা যায়। ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি জাহাজগুলোও পর্যায়ক্রমে উদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আকারে বড় কয়েকটি জাহাজ নদীতলেই আরও গভীরে চাপা দিয়ে রাখা হবে, যাতে নৌযান চলাচলে কোনো সমস্যা না হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডুবুরি দল, বালু ও পলি অপসারণের জন্য আধুনিক পাম্প এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে।

এসব যুদ্ধজাহাজের ইতিহাস জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ের সঙ্গে। ১৯৪৪ সালের শরৎকালে সোভিয়েত রেড আর্মির অগ্রযাত্রার মুখে জার্মান বাহিনী স্থল ও নৌপথে পিছু হটতে শুরু করে। সে সময় অ্যাডলফ হিটলারের নির্দেশ ছিল, ব্যবহারযোগ্য কোনো সামরিক সরঞ্জাম যেন শত্রুপক্ষের হাতে না পড়ে। সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে ড্যানিউব নদীতে অবস্থানরত জার্মান নৌবাহিনীর সদস্যরা নিজেদের যুদ্ধজাহাজ নিজেরাই ডুবিয়ে দেন।

বহু বছর পর নদীর পানি কমে যাওয়ায় সেই ডুবে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলোর ধ্বংসাবশেষ আবারও দৃশ্যমান হয়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হিসেবে নতুন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

Continue Reading

top2

ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রস্তুতি নিয়ে জোর আলোচনা

Published

on

By

অলটাইম ডিজিটাল ডেস্ক

ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চলতি সপ্তাহান্তেই বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন না দিলেও আন্তর্জাতিক অর্থবাজার সোমবার খোলার আগেই সম্ভাব্য অভিযান শেষ করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

ক্যাম্প ডেভিডে আয়োজিত এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন আঘাত হানবে যাতে একপর্যায়ে ইরান তা সহ্য করতে না পারার কথা জানাবে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য স্পষ্ট এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে পেন্টাগনের মুখপাত্র শিন পারনেল জানান, মার্কিন বাহিনী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তবে প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাম্প ডেভিড বৈঠক থেকেই সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে অনুমোদন এসেছে। তবে কূটনৈতিক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে পারেন।

অন্যদিকে, সিবিএস নিউজকে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর বিষয়ে তারা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত নন।

এদিকে সম্ভাব্য হামলার খবর প্রকাশের পর ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। দেশটির তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালালে তার জবাবে বিস্তারিত সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে।

ইরানের ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, হামলা হলে ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোও পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

Continue Reading

top1

হঠাৎ স্পেন সীমান্তে অবিভাসীদের এত ভিড় কেন

Published

on

By

মরক্কো থেকে উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের ছিটমহল সেউতায় প্রবেশের চেষ্টাকালে অন্তত ৫৭ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। চলতি সপ্তাহে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সমুদ্র ও স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা চালান। তবে স্পেন সরকারের দাবি, শুক্রবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যার মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই মরক্কোয় ফিরে গেছেন।

এ অনুপ্রবেশ সামলাতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জরুরি ভিত্তিতে সেউতা সফর করেন। এই সংকটের জেরে ইতালি স্পেন থেকে যাওয়া যাত্রীদের ওপর সাময়িক সীমান্ত কড়াকড়ি আরোপ করেছে। অন্যদিকে ফ্রান্স স্পেন সীমান্তে অতিরিক্ত নজরদারি জোরদার করেছে।

সেউতা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার সীমান্তরক্ষীদের নিরাপত্তা বলয় ছিন্ন করে দলে দলে মানুষ সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে। এ সময় সমুদ্রে ডুবে অনেকের মৃত্যু হয়।

স্পেনে সীপান্ত নিরাপত্তা জোরদার

সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জানায়, সমুদ্রপথে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের সরাসরি মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে এই রায়ের পরও বেআইনিভাবে প্রবেশকারীদের দ্রুততম সময়ে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে স্পেন প্রশাসন।

কী ঘটেছে এবং কোথায়

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মরক্কো ও স্পেনের ক্ষুদ্র ভূখণ্ড সেউতার সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। চরম বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে আনুমানিক ৫০ হাজার মানুষ স্পেনীয় অংশে ঢুকে পড়েন। এতে বেশ কয়েকজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

এই অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ছিল সেউতার মূল জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের থেকেও বেশি। ফলে পুরো ছিটমহলে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দেয়।

শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষকে মরক্কোর দিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে আরও শত শত মানুষকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত সেউতা এবং তার থেকে ২৫০ মাইল পূর্বে অবস্থিত মেলিলা অঞ্চল। এই দুটি স্থানই আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র স্থলসীমান্ত।

১৫৮০ সাল থেকে সেউতা স্পেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখানে খ্রিস্টান ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান দেখা যায়। তবে মরক্কো কখনোই সেউতা ও মেলিলাকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা এগুলোকে নিজেদের ‘দখলকৃত ভূখণ্ড’ হিসেবে গণ্য করে।

অভিবাসনের কেন্দ্রবিন্দু কেন সেউতা

উন্নত জীবনযাত্রা ও নিজ দেশের সহিংসতা থেকে বাঁচতে ইউরোপে প্রবেশের জন্য স্পেন অন্যতম প্রধান রুট। আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে অভিবাসীরা সেউতা ও মেলিলাকে বেছে নেয়। তাই এই দুটি অঞ্চলকে শক্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানো অনেক অভিবাসীকে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠায়। বাকিদের আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়া চালানো হয়।

সেউতায় পৌঁছাতে অভিবাসীরা সাধারণত মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে প্রায় ৩ মাইল পথ সাঁতরে পাড়ি দেয়। আবার অনেকে কাছের শহর বেলিউনেচ থেকেও প্রবেশের চেষ্টা চালায়।

এর আগে ২০২২ সালে উপ-সাহারা অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ২ হাজার মানুষ মেলিলায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। তখন ২৩ জন নিহত হয়েছিলেন। এছাড়া ২০১৪ সালে সেউতা উপকূলে প্রাণ হারান অন্তত ১৪ জন।

তবে ক্যানারি ও ব্যালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ হয়ে স্পেনে প্রবেশকারীদের তুলনায় সেউতা ও মেলিলা সীমান্ত দিয়ে আগতদের সংখ্যা সাধারণত কম থাকে।

গত কয়েক দশকে স্পেনে বহিরাগত জনসংখ্যার হার অনেক বেড়েছে। দেশটির ৫ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১ কোটি মানুষই বিদেশি বংশোদ্ভূত। এদের বড় একটি অংশ কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা ও মরক্কো থেকে এসে স্পেনের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আশ্রয় খুঁজছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মতে, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে ৩৫ হাজার ১৫৩ জন অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। কেবল ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই এই সংখ্যা ১ হাজার ৪৯৩ জন।

এত মানুষ সীমান্ত পার হতে সক্ষম হলো যেভাবে

হঠাৎ এত মানুষ কীভাবে একসঙ্গে প্রবেশ করলো, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। মরক্কো কর্তৃপক্ষ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা কতটা কঠোর ছিল, তাও জানা যায়নি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার নেপথ্যে আঞ্চলিক রাজনীতি জড়িত থাকতে পারে। মরক্কো ও আলজেরিয়ার দ্বন্দ্ব এবং সম্প্রতি স্পেনীয় প্রধানমন্ত্রীর আলজিয়ার্স সফরের প্রধান কারণ হতে পারে।

এর আগে ২০২১ সালের মে মাসেও সেউতায় একইভাবে বড় ধরণের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। তখন পোলিসারিও ফ্রন্টের প্রধানকে কোভিডের চিকিৎসার জন্য স্থান দিয়েছিল স্পেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মরক্কো সীমান্ত শিথিল করে দেয়।

মরক্কো ও পোলিসারিও ফ্রন্ট উভয়ই বিতর্কিত পশ্চিম সাহারাকে নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে। এটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত স্পেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

২০২২ সালে মাদ্রিদ মরক্কোর নীতিকে সমর্থন দিলে সেই সংকটের নিরসন ঘটে। তবে স্পেনের এই পদক্ষেপে মরক্কোর প্রতিদ্বন্দ্বী আলজেরিয়া ক্ষুব্ধ হয়।

এরই মধ্যে গত ২০ জুলাই স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ আলজিয়ার্স সফরের যান। চার বছর পর এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করে। এটি মরক্কো ভালোভাবে নেয়নি।

শুক্রবার সেউতায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ মানব পাচারকারীদের দায়ী করেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পাচারকারীরা এই সংকট তৈরি করেছে বলে তিনি জানান। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের সরাসরি ফেরত পাঠানো যাবে না। পাচারকারীরা এটিকে স্পেনে থাকার সুযোগ হিসেবে অপপ্রচার করেছে।

ইতালীয় গবেষণা সংস্থা আইএসপিআই-এর বিশেষজ্ঞ মাত্তেও ভিল্লা বলেন, ২০২১ সালের ঘটনারই এক বড় সংস্করণ দেখলাম আমরা। যেখানে মাসে কয়েকশো লোক আসে, সেখানে রাতারাতি ৫০ হাজার লোক চলে আসা স্বাভাবিক নয়। সানচেজের আলজেরিয়া সফর মরক্কো পছন্দ করেনি।

ভিল্লা মনে করেন, কৌশলগত ক্ষমতা দেখাতে মরক্কো হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই সীমান্ত শিথিল রেখেছিল।

সরকার ও কর্তৃপক্ষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া

সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সেনা ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে স্পেন। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এটিকে ‘স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এই ঘটনায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছে স্পেন সরকার। ইউরোপীয় রাজনীতিকদের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। ডানপন্থী নেতারা স্পেনের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতিকে দায়ী করছেন।

ইতালির সরকার স্পেনকে শেঙ্গেন এলাকা থেকে সাময়িক বহিষ্কারের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে পরিস্থিতি সামলাতে ফ্রান্সও স্পেনের সঙ্গে তাদের সীমান্ত পাহারা জোরদার করেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন

Continue Reading

Trending