রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি:
ভারতের মিজোরাম থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়ন। দ্বিতীয় দফার পাহাড়ি ঢলে পুরো ফারুয়া বাজার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নদীতে প্রবল স্রোত থাকায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতেও বেগ পেতে হচ্ছে প্রশাসনকে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রাইংখ্যং নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে আশপাশের নিম্নাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক জায়গায় গ্রাম, বাজার ও বসতবাড়ি পানির নিচে চলে যাওয়ায় সেগুলো আলাদা করে চেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফারুয়া ইউনিয়নের প্রায় ১৫০টি দোকান ডুবে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, মন্দির ও গির্জাসহ বিভিন্ন স্থাপনায়ও পানি ঢুকে পড়েছে। ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় বহু পরিবার ফারুয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদ ভবনসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
রাইংখ্যং নদীর তীব্র স্রোতের কারণে বিলাইছড়ি উপজেলা সদর থেকে ফারুয়া ইউনিয়নে নৌপথে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি ত্রাণসামগ্রী সরাসরি দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলায় বন্যার পানি কিছুটা কমলেও বরকল ও জুড়াছড়ির নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। টানা চার দিন ধরে বাঘাইছড়ির সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বাঘাইহাট-মারিশ্যা সড়কের ‘তিন কিলো’ এলাকায় সড়কের একাংশ ধসে পড়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে রাঙ্গামাটি-বান্দরবান সড়কের শিলক ব্রিজঘাট সেতুর একটি অংশ ধসে পড়েছে। এতে শনিবার সকাল থেকে ওই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে এবং দুই জেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তংচংগ্যা এক অডিও বার্তায় জানান, শনিবার ভোরের ভারী বৃষ্টিতে ফারুয়া বাজার, চাইন্দ্যা, উলুছড়ি, তত্তানালা, উত্তর ও দক্ষিণপাড়া এবং একগুজ্জাছড়িসহ অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ, শুকনো খাবার এবং পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানান। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য স্থানীয়ভাবে রান্না করা খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন বলেন, রাইংখ্যং নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় আপাতত নৌপথে ফারুয়ায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্রোত কমে এলে বড় পরিসরে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় যাওয়া হবে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য স্থানীয়ভাবে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রুহুল আমিন জানান, শুক্রবার থেকেই ফারুয়ায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু নদীর প্রবল স্রোতের কারণে তা সম্ভব হয়নি। বিকল্প হিসেবে স্থানীয় বাজার থেকে চাল, ডাল ও তেল সংগ্রহ করে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলার মধ্যে বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, জুড়াছড়ি, বিলাইছড়ি ও নানিয়ারচরের অধিকাংশ এলাকা নৌপথনির্ভর হওয়ায় পাহাড়ি ঢলে যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এদিকে রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান জানিয়েছেন, দুর্গম ফারুয়া এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা রয়েছেন। স্থানীয়ভাবে খাদ্য সংগ্রহ করে দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি শনিবার বরকল উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করে ত্রাণ ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন।