Connect with us

top1

বিএনপির জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে জামায়াতের ‘ডোর টু ডোর’ কৌশল

Published

on

আওয়ামী লীগ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার সম্পর্ক ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এক নতুন এবং জটিল দিকে মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের দুঃসহ জেল-জুলুম, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক অবদমনের পর দল দুটি এখন নির্বাচনী ময়দানে একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যমান জনসমর্থন এবং বিশাল জনসভার জনস্রোতে বিএনপি অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও সুসংগঠিত কৌশলে তৃণমূলের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। একদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির পুনরুত্থান এবং অন্যদিকে জামায়াতের ‘নিভৃত বিপ্লব’—এই দুই মেরুর লড়াই এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জনপ্রিয়তার পাল্লা বিএনপির দিকে ভারী হলেও জামায়াতের সুদূরপ্রসারী কৌশল নির্বাচনের ফলাফলকে যেকোনো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দুই দলই নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দেড় দশকে দল দুটির সাংগঠনিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সব ধরনের চেষ্টা করা হয়েছিল। বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ১৭ বছর নির্বাসিত থাকতে হয়েছে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জরাজীর্ণ জেল সেলে ও পরবর্তীতে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল।

এমনকি উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং স্বামীর বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো জনমনে গভীর সহানুভূতি তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি দেওয়ার বিষয়টি দলটিকে নেতৃত্বশূন্য করার একটি বড় প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। এক সময় এই দুই দল জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বন্ধুত্বের পুরোনো সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বিশেষ করে গত ২৬ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফেরার পর থেকে জামায়াত মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজ ও বিশৃঙ্খল’ দল হিসেবে প্রমাণ করতে, যাতে তারা নিজেদের একটি সুশৃঙ্খল বিকল্প হিসেবে ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করতে পারে।

গত ২২ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণায় যে জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি দেশের প্রতিটি জেলায় বিরামহীনভাবে জনসভা করছেন, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দলটির বিশাল ভোটব্যাংকের প্রমাণ দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা শোনার ভঙ্গি তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তার বক্তব্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে, যা তরুণ ভোটারদের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

তবে বড় জনসভা মানেই জয়—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে তারা সতর্ক করেছেন। কারণ বিশাল জনসভার জনসমর্থনকে ভোটের বাক্সে রূপান্তরিত করার জন্য যে সাংগঠনিক নিপুণতা প্রয়োজন, সেখানে জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

বিএনপি যখন বিশাল জনসভায় ব্যস্ত, জামায়াতে ইসলামী তখন বেছে নিয়েছে ‘ডোর-টু-ডোর’ বা ঘরে ঘরে যাওয়ার কৌশল। দলটির নারী কর্মীরা এখন প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গিয়ে নারীদের সাথে ধর্মীয় আলোচনা বা ‘তালিম’ এর মাধ্যমে ভোট প্রার্থনা করছেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন—তারা নিজেরা দুর্নীতি করবেন না এবং রাষ্ট্রকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করবেন। তবে তাদের এই প্রচারণার ধরন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, জামায়াত কর্মীরা বস্তিবাসী ও স্বল্প শিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে, যা ভোটারদের প্রভাবিত করার একটি অনৈতিক চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিএনপি ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশনে এই বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, জামায়াতের এই নিভৃত প্রচারণা এবং ভোটারদের তথ্য সংগ্রহের কৌশল নির্বাচনের দিন বিএনপিকে বড় ধরনের বিপাকে ফেলতে পারে।

ঢাকার আসনগুলোতে জামায়াতের তৎপরতা এখন ঘরে ঘরে। বিশেষ করে বস্তি এলাকাগুলোতে তারা ধর্ম এবং অর্থের প্রলোভন দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির নেতারা। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বাংলানিউজকে বলেন, “আমারা শুনেছি বিভিন্ন বস্তিতে, স্বল্প শিক্ষিত ও স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বিকাশ নম্বর চাওয়া হচ্ছে যা নির্বাচনী আচরণ পরিপন্থি। অসৎ উদ্দেশ্যে একটি দল এই কাজগুলো করছেন এই নিম্ন আয়ের ভোটারদের প্রলুব্ধ করতে। নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দায়িত্বরত অন্যদের কয়েক দফা জানিয়েছি একটি দল অনৈতিকভাবে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করছে। তারা ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখনো দৃশ্যত কিছুই হয়নি। বিএনপি একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়, কিন্তু এভাবে যদি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, তবে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।”

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে, যা নির্বাচনের পরিবেশকে ঘোলাটে করতে পারে।

সরেজমিনে ফরিদপুরের আসনগুলোতে দেখা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এক অদ্ভুত লড়াই চলছে। ফরিদপুর-১ আসনে জামায়াতের মো. ইলিয়াস মোল্লা প্রচারণায় এগিয়ে থাকলেও স্থানীয়রা বলছেন তাদের ভোটগুলো ‘গুপ্ত’। অন্যদিকে ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির শামা ওবায়েদ তার বিদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাচনে নামায় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। তবে ফরিদপুর-৩ ও ফরিদপুর-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা অত্যন্ত সুকৌশলে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ফরিদপুর-৪ আসনে জামায়াতের মো. সরোয়ার হোসাইনকে অন্যান্য ছোট দলগুলো সমর্থন দেওয়ায় তিনি একটি বড় ভোটব্যাংক পেতে যাচ্ছেন।

স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, ফরিদপুরে জামায়াতের নারী কর্মীরা যেভাবে প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গেছেন, বিএনপি সেখানে কেবল উঠান বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এবার ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার সম্ভাবনা থাকায়, সেই ফাঁকা মাঠ দখল করতে জামায়াত অনেক বেশি তৎপর।

খুলনা বিভাগে জামায়াতে ইসলামী অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। খুলনা-১ আসনে যেখানে হিন্দু ভোটারদের প্রাধান্য বেশি, সেখানে জামায়াত কৃষ্ণ নন্দীর মতো একজন সনাতন ধর্মালম্বীকে প্রার্থী করে এক বড় ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছে। অন্যদিকে খুলনা-৬ আসনটি জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হলেও এবার বিএনপি সেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছে। খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ারের অবস্থান বেশ মজবুত বলে স্থানীয়রা জানাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খুলনার আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট যেদিকে যাবে, সেদিকেই পাল্লা ভারী হবে। তবে সাধারণ ভোটাররা এখন পর্যন্ত মুখ খুলছেন না। বিএনপি ও জামায়াত দুই দলের জন্যই তা উদ্বেগের কারণ। এছাড়া সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটেও জামায়াতের প্রচার-প্রচারণা বিএনপির তুলনায় অনেক বেশি সুসংগঠিত বলে জানা গেছে।

যশোরের আসনগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র ফুটে উঠছে। যশোর-৩ আসনে বিএনপির অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইমেজের কারণে এগিয়ে থাকলেও জামায়াতের আব্দুল কাদের তাকে কড়া চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। যশোর-৪ ও ৫ আসনে বিএনপি অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত, যার সুযোগ নিতে মরিয়া জামায়াত।

কুষ্টিয়ার আসনগুলোতেও একই চিত্র; সেখানে ভোটাররা বলছেন তারা ‘মার্কা দেখে নয়, প্রার্থী দেখে’ ভোট দেবেন। চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরেও বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব অঞ্চলে জামায়াতের প্রচারণা অনেক বেশি সুসংগঠিত এবং লক্ষ্যভিত্তিক, যা বিএনপির বিশাল জনসমর্থনের বিপরীতে এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বরিশাল বিভাগের আসনগুলোতে এবার এক নতুন ধরনের মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। বরিশাল-৩ আসনে বিএনপির ধানের শীষের বিপরীতে এ বি পার্টির ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ জামায়াতের সমর্থন নিয়ে এক শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছেন। নদীভাঙন রোধ ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণে তিনি তরুণ ভোটারদের মন জয় করেছেন। অন্যদিকে বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের সাথে ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করীমের তুমুল লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বরিশালে জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে জোটের প্রার্থীদের সমর্থন দিয়ে বিএনপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালের এই নতুন সমীকরণ বিএনপির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যেখানে ইসলামী আন্দোলনের ভোটব্যাংক একটি বড় ফ্যাক্টর।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের আসনগুলোতে বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হলেও জামায়াত সেখানে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে মরিয়া। কক্সবাজার-২ ও ৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা অত্যন্ত সক্রিয় এবং তারা সাংগঠনিক ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। সিলেটে বিএনপির প্রার্থীরা চারটিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও সিলেট-৫ ও ৬ আসনে জামায়াতের সক্রিয়তা বিএনপিকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। সিলেটে জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা বিএনপির প্রথাগত প্রচারণাকে টেক্কা দিচ্ছে। তবে সিলেটের প্রবাসীরা বিএনপির পক্ষে থাকায় দলটি এখনো আশা ছাড়েনি।

বিশ্লেষকদের মতে, সিলেটের এই অঞ্চলে ধর্মীয় আবেগ একটি বড় ভূমিকা পালন করবে, যা জামায়াতের জন্য সুবিধার কারণ হতে পারে।

জাতীয় পার্টির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত রংপুরে এবার বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই ভাগ বসাচ্ছে। তবে জামায়াত আমিরের কিছু সাম্প্রতিক মন্তব্য (নারী এবং কেরু অ্যান্ড কোং) সেখানে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, যা বিএনপির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। ময়মনসিংহে জামায়াতের প্রচারণা অত্যন্ত সুসংগঠিত; সেখানে তারা দলীয়ভাবেই লিফলেট ও ব্যানার বিতরণের কাজ পরিচালনা করছে, প্রার্থীকে এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা নির্বাচনের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে বিএনপির মামলা এবং জামাতের কারণে তাদের জামিন পাওয়ায় এই মেরুকরণ আরও তীব্র হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মাঠে বিএনপি জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকলেও দলটির সামনে অন্তত কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামলানো যা অনেক আসনে ভোট ভাগাভাগির কারণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, গত ১৮ মাসে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তৃতীয়ত, তরুণ ভোটারদের মন জয় করার ক্ষেত্রে প্রচারণায় ঘাটতি। চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতের পরিকল্পিত প্রচারণার সাথে পাল্লা দিতে না পারা। এছাড়া জামায়াতের নারী কর্মীদের ‘তালিম’ কৌশলের বিপরীতে বিএনপির প্রচারণার ধীরগতি, নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে বিএনপির অস্পষ্ট অবস্থানও অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে না পারলে কেবল জনসমর্থন দিয়ে বৈতরণী পার হওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, “বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা জনপ্রিয়তা বনাম সংগঠনের এক ক্লাসিক দ্বন্দ্ব দেখছি। বিএনপি এখনো জনসমর্থনের দিক থেকে এগিয়ে আছে—বিশাল জনসভা, পয়েন্ট টু পয়েন্ট বক্তব্য এবং দীর্ঘ দমন-পীড়নের স্মৃতি দলটির পক্ষে কাজ করছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর ‘ডোর টু ডোর’ কৌশল নীরব কিন্তু কার্যকর রাজনৈতিক পদ্ধতি, যা সরাসরি ভোটার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “এই নির্বাচন আসলে কোনো দলের একক আধিপত্যের নয়, বরং তা নির্ধারণ করবে জনপ্রিয়তা কতটা সংগঠনে রূপ নিতে পারে এবং সংগঠন কতটা বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সেই অর্থে বিএনপি ও জামায়াতের এই লড়াই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রও নির্ধারণ করবে।”

জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত সুসংগঠিত দল হলেও তাদের কিছু বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থনে এখনো ঘাটতি আছে এবং ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া নারী অধিকার প্রশ্নে জামায়াতের আমিরের সাম্প্রতিক মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব এবং ভূ-রাজনীতিতে দলটির অবস্থান কী হবে—এই প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত। তবে জামায়াতের বড় শক্তির জায়গা হলো তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীবাহিনী এবং ‘নতুন কাউকে দেখার’ আকাঙ্ক্ষা ভোটারদের মধ্যে তারা তৈরি করতে পেরেছে। বিএনপি এই ইস্যুটিকে মোকাবিলা করতে জামায়াতের অভিজ্ঞতার অভাবকে সামনে নিয়ে আসছে।

সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির এক চূড়ান্ত পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। বিএনপি তাদের বিশাল জনসমর্থন ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর ভর করে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের নিভৃত ও গভীর কৌশলের মাধ্যমে বড় ধরনের চমক দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রিয়তায় বিএনপি এগিয়ে থাকলেও জামায়াতের কৌশলী প্রচারণা এবং তৃণমূলের সাথে তাদের নিবিড় যোগাযোগ নির্বাচনের ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কি রাজপথের জনজোয়ারকে প্রাধান্য দেবেন, নাকি জামায়াতের ঘরের ভেতরের প্রচারণায় সাড়া দেবেন, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত। তবে বিশ্লেষকরা এটা নিশ্চিতভাবে বলেছেন—এবারের নির্বাচন কেবল জয়-পরাজয়ের নয়, বরং কৌশল ও জনপ্রিয়তার এক অনন্য লড়াই হতে যাচ্ছে।

সুত্র: বাংলা নিউজ টোয়েন্টি ফোর

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top1

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকে নতুন বল

Published

on

By

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চ বাড়াতে নকআউট পর্বের চূড়ান্ত চার ম্যাচের জন্য নতুন ফুটবল উন্মোচন করেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ধারাবাহিকতায় এবারও সেমিফাইনাল, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ও ফাইনালের জন্য আনা হয়েছে বিশেষ বল ‘ট্রিওন্ডা ফাইনাল’।

জমকালো এই বলটির সোনালি ও কালো রঙের বিশেষ নকশা টুর্নামেন্টের শেষভাগের মহোৎসবকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন বলের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে এর নকশা ও রঙে এসেছে ভিন্নতা। কালো বেসের ওপর সোনালি রঙের প্রাধান্য রয়েছে, যা বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতীকী ইঙ্গিত বহন করে। এর সঙ্গে রয়েছে লাল ও গোলাপি রঙের সংমিশ্রণ।

বলটির প্যানেলে লেখা থাকবে টুর্নামেন্টের শেষ চার ম্যাচের আয়োজক শহরের নাম-ডালাস, আটলান্টা, মিয়ামি এবং নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি। অন্য আয়োজক শহরগুলোর নাম থাকবে বলের গায়ে থাকা ত্রিভুজাকৃতির গ্রাফিক্সে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে বলটিতে আগের মতোই থাকছে ‘কানেক্টেড বল টেকনোলজি’। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বলের ভেতরে থাকা বিশেষ সেন্সর চিপ রিয়াল-টাইম বা তাৎক্ষণিক ডেটা সরাসরি ম্যাচ রেফারি ও ভিএআর কক্ষে পাঠাবে, যা সেমি-অটোমেটেড অফসাইড সিস্টেমকে আরও নির্ভুলভাবে অফসাইড এবং নিখুঁত বল-টাচ শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।

বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বল বদলানোর ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল থেকে নতুন বল ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে ২০১৮ রাশিয়া, ২০১৪ ব্রাজিল, ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা ও ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে শুধু ফাইনালের জন্য আলাদা বল আনা হয়েছিল। আর ২০০২ সালের আগে বিশ্বকাপের মাঝপথে বল পরিবর্তনের নজির ছিল না।

Continue Reading

top1

বাংলাদেশকে ৩.৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স

Published

on

By

দেশের জ্বালানি ও খাদ্য খাতের সুরক্ষায় বাংলাদেশকে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেবে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তেল, গ্যাস ও সার আমদানিতে এই অর্থ ব্যবহৃত হবে।

সোমবার (৫ জুলাই) আইটিএফসির সৌদি আরবের জেদ্দার সদর দপ্তরে এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়। আইটিএফসি ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠান।

আইটিএফসির এই অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের তিনটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা পাবে। সেগুলো হলো—বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি), তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) এবং কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পেট্রোলিয়াম পণ্য, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সার আমদানির সুবিধার্থে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জেদ্দা সফররত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং আইটিএফসির পক্ষে সই করেন প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) নাজিম নুরদালি। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইটিএফসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইঞ্জিনিয়ার আদিব ইউসুফ আল আমা।

আইটিএফসি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই অর্থায়ন কর্মসূচি জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ও আইটিএফসির মধ্যকার যৌথ অংশীদারত্বকে আরও দৃঢ় করবে। ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে সহায়তার জন্য ২২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন দিয়েছে আইটিএফসি-আইএসডিবি।

Continue Reading

top1

বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য খুলল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী

Published

on

By

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

তিনি বলেন, সরকারের ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই এই অগ্রগতি এসেছে। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি দেশের শ্রমবাজারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত হবে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউসে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং বিদ্যমান শ্রমবাজার সম্প্রসারণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

সৌজন্য সাক্ষাতে সিলেটের সার্বিক উন্নয়ন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি, বিশেষ করে সিলেটি প্রবাসীদের অবদান, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ করতে দুই দেশ নিবিড়ভাবে কাজ করছে। এ ধরনের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বকে আরও গতিশীল করবে।

সাক্ষাতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার, সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Continue Reading

Trending