Connect with us

ধর্ম

যে পাপের কারণে আল্লাহ অভিশাপ দেয়

Published

on

পৃথিবীর বুকে যত বিপর্যয় ও দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, তার জন্য প্রধানত দায়ী মানুষের সীমাহীন পাপ ও সীমালঙ্ঘন। ছোট বড় অনেক ধরনের পাপ রয়েছে। তবে এমন কিছু পাপ রয়েছে, যেগুলো করলে আল্লাহর অভিশাপ নেমে আসে। এমন কিছু পাপ কাজের কথা নিচে দেওয়া হলো-

বিপরীত লিঙ্গের বেশ ধারণ করা :

যে নারী পুরুষের পোশাক গ্রহণ করে এবং যে পুরুষ নারীদের পোশাক, চালচলন নকল করে কিংবা অঙ্গবিকৃতি করে তাদের ওপর আল্লাহর রাসুলের লানত বর্ষিত হয়। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষদের এবং পুরুষের বেশ ধারণকারী নারীদের অভিশাপ করেছেন।’(বুখারি, হাদিস : ৫৮৮৫)

সমকামিতা :

পুরুষে-পুরুষে ও নারীতে-নারীতে জৈবিক চাহিদা নিবারণের জন্য লজ্জাস্থান ব্যবহার করাকে সমকামিতা বলা হয়। এটি আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর লানতের কারণ। ইবনে আববাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা সমকামী তাদের ওপর লানত বর্ষিত হোক।’(তিরমিজি, হাদিস : ১৪৫৬)

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা :

আল্লাহ তাআলা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের ওপর লানত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা জনপদে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। আল্লাহ এদের প্রতি লানত করেন। অতঃপর তাদের তিনি বধির করেন ও তাদের চোখ দৃষ্টিহীন করে দেন।’(সুরা ; মুহাম্মাদ, আয়াত : ২২-২৩)

সতীসাধ্বী নারীর ওপর অপবাদ দেওয়া :

কোনো নারীর ওপর মিথ্যা অপবাদ দিলে আল্লাহর লানত নেমে আসে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা সতীসাধ্বী, সরলা ঈমানদার নারীদের প্রতি (ব্যভিচারের) অপবাদ দেয়, তারা ইহকালে ও পরকালে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য আছে গুরুতর শাস্তি।’(সুরা : নূর, আয়াত : ২৩)

জুলুম করা :

জালিমদের ওপর আল্লাহ লানত করেন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘জেনে রেখো! জালিমদের ওপর আল্লাহ লানত করেন।’(সুরা : হুদ, আয়াত : ১৮)

জমির নিশানা পরিবর্তন করা :

আবু তুফায়ল আমির ইবনে ওয়াসিলা (রহ.) বলেন, আমি আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, নবী (সা.) আপনাকে আড়ালে কী বলেছিলেন? বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রেগে গেলেন এবং বলেন, নবী (সা.) লোকদের কাছ থেকে গোপন রেখে আমার কাছে একান্তে কিছু বলেননি। তবে তিনি আমাকে চারটি (বিশেষ শিক্ষণীয়) কথা বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি বলল হে আমিরুল মুমিনিন, সে চারটি কথা কী? তিনি বলেন, ১. যে ব্যক্তি তার মা-বাবাকে অভিসম্পাত করে, আল্লাহ তাকে অভিসম্পাত করেন, ২. যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে পশু জবাই করে আল্লাহ তার ওপরও অভিসম্পাত করেন, ৩. ওই ব্যক্তির ওপরও আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, যে কোনো বিদাতি লোককে আশ্রয় দেয় এবং ৪. যে ব্যক্তি জমিনের (সীমানার) চিহ্ন অন্যায়ভাবে পরিবর্তন করে তার ওপরও আল্লাহ লানত করেন। (মুসলিম, হাদিস : ৫০১৮)

মানুষকে অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখানো :

যে ব্যক্তি মানুষকে ধারালো হাতিয়ার দিয়ে ভয় দেখায় তার ওপর ফেরেশতারা লানত করে। ইবনে সিরিন (রহ.) থেকে বলেন, আমি আবু হুরায়রা (রা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রতি (লৌহ নির্মিত) অস্ত্র উত্তোলন করে সে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে লানত করতে থাকে, যদিও তার সহোদর ভাই হয়।’(মুসলিম, হাদিস : ২৬১৬)

ঘুষ দেওয়া ও ঘুষ গ্রহণ করা :

আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) বলেছেন, ‘ঘুষ আদান-প্রদান করা লানতের কারণ। হাদিসে এসেছে, ‘রাসুল (সা.) ঘুষদাতা এবং ঘুষগ্রহীতার ওপর লানত করেছেন।’(আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫৮০)

মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা :

মদপান করা, মদ বহনকারী, মদ বিক্রেতা ইত্যাদি কাজে জড়িতদের ওপর আল্লাহর লানত। আনাস বিন মালেক (রা.) বলেন, ‘মদের সঙ্গে সম্পৃক্ত দশম শ্রেণির লোককে রাসুল (সা.) লানত করেছেন। মদ প্রস্তুতকারী, যে মদ প্রস্তুত করতে বলে, পানকারী, বহনকারী, যার জন্য বহন করা হয়, যে পান করায়, বিক্রয়কারী, মূল্য গ্রহণকারী, যে মদ ক্রয় করে এবং যার জন্য ক্রয় করা হয়।’(তিরমিজি, হাদিস : ১২৯৫)

কবরকে সিজদার স্থান বানানো :

কবরের ওপর বা কবরকে সামনে রেখে সিজদা করলে লানত বর্ষিত হয়। আবদুল্লাহ (রা.) ও আয়েশা (রা.) উভয়েই বর্ণনা করেছেন যে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা ইহুদি ও নাসারাদের ওপর লানত করেছেন। কারণ তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৩৫)

গাইরুল্লাহর নামে পশু জবাই করা :

সালাত-সিয়াম, জবেহ-কোরবানি শুধু আল্লাহর নামে হতে হবে। এসব আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে করা হলে সেটা লানতের কারণ হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবাই করল তার ওপর আল্লাহ লানত বর্ষণ করেন।’(মুসলিম, হাদিস : ১৯৭৮)

কুফর ও শিরক অবস্থায় মারা যাওয়া :

শিরক বা কুফরি করার পর তওবা না করে মারা গেলে এমন ব্যক্তির ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হয়। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করে এবং অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাদের ওপর আল্লাহর লানত এবং ফেরেশতা ও গোটা মানবজাতির লানত।’(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬১-১৬২)

রাসুল (সা.)-এর নাফরমানি করা :

যারা রাসুল (সা.)-এর নাফরমানি করে, তাদের ওপর তিনি লানত করেছেন। আর তারা কিয়ামত দিবসে একে অন্যকে লানত করতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যেদিন তাদের মুখমণ্ডল আগুনে ওলটপালট করা হবে, সেদিন তারা বলবে, হায়! যদি আমরা আল্লাহকে মানতাম ও রাসুলকে মানতাম! ‘তারা আরও বলবে, হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নেতাদের ও বড়দের আনুগত্য করতাম। অতঃপর তারাই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের রব! তাদের তুমি দ্বিগুণ শাস্তি দাও এবং তাদের মহা অভিশাপ দাও।’(সুরা ; আহজাব, আয়াত : ৬৬-৬৮)

তাকদির বা ভাগ্য অস্বীকার করা :

তাকদির বা ভাগ্য অস্বীকারকারী অভিশপ্ত। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ছয় ব্যক্তিকে আমি লানত করি, আল্লাহ তাআলা লানত করেন এবং প্রত্যেক নবী লানত করেছেন। (তারা হচ্ছে) আল্লাহর কিতাবে সংযোজনকারী, তাকদির মিথ্যা প্রতিপন্নকারী, শক্তি দ্বারা ক্ষমতা দখলকারী, যে ক্ষমতার বলে সে আল্লাহ তাআলা যাকে অপদস্থ করেছেন তাকে সম্মানিত করে এবং আল্লাহ যাকে সম্মানিত করেছেন তাকে অপদস্থ করে, আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু হালাল জ্ঞানকারী, আমার পরিবার-পরিজনদের মধ্যে যাদের আল্লাহ হারাম করেছেন তাদের হালাল জ্ঞানকারী ও আমার সুন্নাত পরিত্যাগকারী।’(তিরমিজি, হাদিস : ২১৫৪)

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ধর্ম

বায়তুল মোকাররমে শুরু হচ্ছে পক্ষকালব্যাপী সিরাতুন্নবী অনুষ্ঠানমালা

Published

on

By

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ১৪৪৮ হিজরি উদযাপন উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পক্ষকালব্যাপী ‘সিরাতুন্নবী (সা.) অনুষ্ঠানমালা’ শুরু হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট)। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব সাহানে বাদ মাগরিব উদ্বোধন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ আয়োজন শুরু হবে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে সভাপতিত্ব করবেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, পক্ষকালব্যাপী এ অনুষ্ঠানমালায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবন, কর্ম, আদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ, শান্তি, সাম্য, ন্যায় ও সম্প্রীতির শিক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যে তুলে ধরতে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ওয়াজ মাহফিল, কেরাত মাহফিল, হামদ-নাত মাহফিল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ বেতারের যৌথ উদ্যোগে সেমিনার এবং বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শানে রচিত কবিতা পাঠের মাহফিল। এ ছাড়া স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, সিরাত স্মরণিকা ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ, ইসলামী ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী এবং জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া আগামী ২৫ আগস্ট থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বাদ মাগরিব থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখরা ওয়াজ করবেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, এসব আয়োজনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে নৈতিকতা, মানবিকতা, সহনশীলতা ও শান্তির চেতনা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এ পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, আলেম-ওলামা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের জনগণকে অংশগ্রহণ ও অনুষ্ঠানমালা উপভোগের জন্য আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

Continue Reading

top1

হজযাত্রীদের জন্য বিমান ভাড়া নিয়ে সুখবর

Published

on

By

আগামী ২০২৭ সালের পবিত্র হজযাত্রীদের জন্য সুখবর দিয়েছে সরকার। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের হজযাত্রীদের জন্য বিমান ভাড়া গত বছরের তুলনায় ৩৭ হাজার টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সচিবালয়ে ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।

জামায়াতকে টেক্কা দিয়ে ‘প্রকৃত বিরোধী দল’ হওয়ার চেষ্টায় কয়েকটি দল

ধর্মমন্ত্রী বলেন, সরকার ২০২৭ সালের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজের মূল্য ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা এবং দ্বিতীয় প্যাকেজের মূল্য ৬ লাখ ১৫ হাজার ২৬৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি প্যাকেজ ৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

Continue Reading

ধর্ম

কোরবানি কার নামে হবে, যা বলছে ইসলাম

Published

on

By

কোরবানির সময় এলেই অনেকেই নিজের নাম ছাড়াও বাবা-মা, নাবালক সন্তান বা মৃত আত্মীয়স্বজনের নামেও কোরবানি দিয়ে থাকেন। অনেক পরিবারে আবার একটি পশু কোরবানিতে কয়েকজন শরিক হন, কেউ কেউ মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য নামেও অংশ রাখেন।

কোরবানি কার নামে হবে, কার ওপর ওয়াজিব এবং অন্যের নামে কোরবানি দেওয়া যাবে কি-না এসব বিষয় নিয়ে ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট কিছু বিধান রয়েছে।

মূলত, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার মতো প্রাণী একজনের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি হিসেবেই আদায় করা হয়। অর্থাৎ, এসব পশুতে একাধিক ব্যক্তি শরিক হতে পারেন না। তবে গরু, মহিষ বা উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হয়ে কোরবানি দেওয়া যায়। প্রত্যেকের নিয়ত ও অংশ আলাদা হলেও কোরবানি একটি পশুর মাধ্যমেই আদায় করা সম্ভব।

ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেন,‘সাতজন মানে সাতটি নামের পক্ষ থেকে। সাতটি নামের চেয়ে কমও হতে পারে, বেশি হতে পারবে না। ভাগের ক্ষেত্রে নামের বিষয়টি হলো, অমুকের পক্ষ থেকে (কোরবানি হচ্ছে) এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোরবানির পশু জবাই আল্লাহ’র নামে করতে হয়।’

শরীফ মুহাম্মদ বলেন,‘কিন্তু মৃত বাবা-মায়ের নামে কোরবানি করা যাবে? স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই কি আলাদা কোরবানি প্রয়োজন? নাবালক সন্তান বা যাদের আয় রোজগার নেই, তাদের নামে কোরবানি দেওয়া যাবে?

কোরবানি মূলত কার ওপর ওয়াজিব?

ঈদ-উল-আজহা বা কোরবানির ঈদ বাংলাদেশের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সৃষ্টিকর্তার সন্তষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মুসলিম বিশ্বসহ বাংলাদেশের মুসলমানরা পশু কোরবানি করে থাকেন।

আরবি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ কোরবানির দিন ও পরবর্তী দুই দিন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কোরবানি দিয়ে থাকেন।

ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, যাদের ওপর কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব তারা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোরবানি না দেন, তাহলে গোনাহের ভাগীদার হতে হবে।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, নেসাব অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির কাছে সাড়ে সাত ভরি পরিমাণ স্বর্ণ অথবা, সাড়ে ৫২ ভরি পরিমাণ রুপা বা এর সমমূল্যের নগদ টাকা অথবা সম্পদ থাকলে তার জন্য কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। যাদের এই পরিমাণ সম্পদ বা সম্পত্তি নেই, তাদের জন্য পশু কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়। এই নিয়ম নারী-পুরুষ সবার জন্য প্রযোজ্য।

ইসলামের নবী মুহাম্মদের সময় মানুষের সম্পদের হিসাব অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণ-রুপা দিয়েই করা হতো। তাই, ইসলামে ‘নেসাব’ নির্ধারণে স্বর্ণ ও রুপাকে ভিত্তি ধরা হয়েছে।

বর্তমান বাজারে মানভেদে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ১৮ লাখ কিংবা ১৮ লাখের চেয়ে কিছুটা বেশি। অন্যদিকে, সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম প্রায় তিন লাখ টাকার কাছাকাছি। সেক্ষেত্রে রুপার নেসাব ধরলে যারা স্বচ্ছল নয়, তাদের ওপরও কোরবানি ওয়াজিব হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ এ বিষয়ে বলেন, ‘নবী মুহাম্মদ সা:-এর সময় সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ এবং সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম এক ছিল। যুগ পরিক্রমায় এখন দামে পার্থক্য হয়ে গেছে। তাই, এখন সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বাজারে যে দামে বিক্রি হয়, সেই পরিমাণ অর্থ যদি জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২-এই তিন দিনে যদি কারো হাতে জমা থাকে, তাহলে উনি কোরবানি দিবেন।

কখন অন্য কারো নামে কোরবানি দেওয়া যাবে?

ইসলামি বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। তবে অনেকেই আছেন, যারা অন্যদের নামেও কোরবানি দেন।

যেমন, কেউ তার কোনো পরিবারের সদস্য বা প্রিয় মানুষের নামে কোরবানি দেন। অনেকেই আছেন, যারা তাদের মৃত বাবা-মায়ের নামে বা কোনো আত্মীয়ের নামে কোরবানি দেন।

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে মৃত বাবা-মা বা স্বজনদের নামে কোরবানি দেওয়ার প্রচলন অনেক পুরোনো। ইসলামি দৃষ্টিতে মৃত ব্যক্তির নামে কোরবানি দেওয়া জায়েজ।

অনেকেই মনে করেন, এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াবের দোয়া করা হয়।

তবে, জীবিত বা মৃত, অন্য কারো নামে কোরবানি দেওয়ার সর্বপ্রথম শর্ত হলো, আগে নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে হবে। তারপর সে অন্য কারো নামও যুক্ত করতে পারবে বলে জানান শরীফ মুহাম্মদ।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন,‘নিজের নামে দিয়ে অন্যদের নামে দেওয়া যায়। তা হতে পারে কোনো মহান ব্যক্তি বা কোনো প্রিয় মানুষ বা পরিবারের সদস্য। তবে মৃত ব্যক্তির পক্ষে কোরবানি দিলে সেই গোশত গরীবকে একটু বেশি দিলে ভালো হয়।’

এছাড়া, অনেকেই আছেন যারা তাদের নাবালক সন্তানের নামে কোরবানি দেন। নাবালক সন্তানের নামেও কোরবানি দেওয়ার জায়েজ আছে বলে জানান শরীফ মুহাম্মদ।

সব শরীককে কি সমান অর্থ দিতে হবে?

বিধান অনুযায়ী, সব শরীককে সমান অর্থ দিতে হবে এবং গোশত সমবন্টন করতে হবে।

ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘সাতজন যদি একদমই স্বতন্ত্র হয়, যেমন- ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের বা ভিন্ন ব্যক্তি, তাহলে তারা প্রত্যেকে সমান টাকা দিবেন এবং গোশতও সমানভাবে ভাগ করে নিবেন।’

অধ্যাপক আব্দুর রশীদ বলেন,‘তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন, অনেকেই আছেন, যারা কোরবানি দিতে চান কিন্তু প্রতি ভাগে যে পরিমাণ টাকা দিতে হবে, তিনি সেই পরিমাণ দিতে পারছে না। তখন ‘কেউ তাকে ১০ হাজার টাকা উপহার হিসেবে দিতে পারে। কিন্তু গোশত সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে। কেউ উপহার হিসেবে দিলে সমস্যা নাই।’

তবে কেউ যদি সন্তান হিসেবে তার মায়ের বা বাবার নামে কোরবানি দেন, এমনকি পরিবারের অন্য কারো নামে বা একাধিক ব্যক্তির নামে স্বেচ্ছায় কোরবানি দেন, তখন তাদের কাছে সেই টাকা চাওয়া জরুরি না বলে জানিয়েছেন ইসলামি স্কলাররা।

শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘আর স্বামী হিসেবে কেউ যদি স্ত্রীর নামে কোরবানি দিতে চান, স্ত্রীর কোরবানি ওয়াজিব হোক বা না হোক, সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে না জানিয়ে করার চেয়ে জানিয়ে করা ভালো। যদি স্ত্রীর কোরবানি ওয়াজিব হয় সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে নিয়ত করতে হবে যে তার কোরবানিটা তার স্বামী করছেন।’

যদিও অধ্যাপক আব্দুর রশীদের মতে, মৃত ব্যক্তি বা অন্য কারো নামে কোরবানি দিলে এখানে অনুমতির প্রয়োজন নাই। যে কারো নামেই কোরবানি দেওয়া যেতে পারে। আর কোনো নারী যদি অবিবাহিত হন এবং তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়, তাহলে তাকেও আগে নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে হবে। এরপর তিনিও তার বাবা-মা বা অন্য কোনো আত্মীয়-স্বজন বা প্রিয়জনের নামে নিজ অর্থেই কোরবানি দিতে পারবেন।

ঋণ নিয়ে কোরবানি করা যায়?

এদিকে, অনেকেই আছেন, যারা খুব স্বচ্ছল নন, কিন্তু কোরবানি দিতে চান। সেক্ষেত্রে তারাও কোরবানি দিতে পারবেন এবং তা নফল হিসেবে কবুল হবে উল্লেখ করে ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলছিলেন, এখানে একটা শর্ত আছে।

তিনি বলেন, ‘ধরলাম, বাচ্চাদের মন খারাপ হয়ে আছে। সেজন্য তিনি কোরবানি দিতে চান। তাহলে হবে না। এখানে শর্ত হলো, কোনো সামাজিক উপলক্ষ্যই এখানে মূখ্য হতে পারবে না। নিয়ত থাকতে হবে যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য করছি। অর্থাৎ, এটা প্রদর্শনমূলক না।’

তিনি আরো বলেন এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি ঋণ নিয়ে সেই নফল কোরবানি আদায় করতে পারবেন। কিন্তু বারবার ঋণ করার পর সেই ঋণ ওয়াদামাফিক পূরণ না করতে পারলে সেটারও দরকার নাই করার।’

এছাড়া যারা ১০০ বা হাজার কোটি টাকা শিল্প ঋণ নিয়েছেন নেসাবের পরিমাণ মিলাতে গিয়ে তাদের ঋণের পরিমাণ ধর্তব্য হবে না। কারণ ঋণের টাকা হিসাবে ধরা হলে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও তার কোরবানি আবশ্যকীয় থাকে না।

শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘কিন্তু ব্যক্তিগত লোন, তা ১০ হাজার টাকা হোক বা ১০ লাখ টাকা হোক, এটা প্লাস-মাইনাস করে যদি দেখা যায় যে লোন পরিশোধ করেও আপনার কাছে নেসাব পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা আছে, তাহলে আপনার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যাবে।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Continue Reading

Trending