গেল ১৫ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক ঘোষিত নববর্ষ উদযাপন কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি শিক্ষিকা রুনা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত সহ ৪ দফা দাবিতে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এসময় দফায় দফায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনে ও প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়েছিলেন তারা। দুপুর ১২ টায় থিওলজি এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। প্রথমে নির্ধারিত সময়ের আল্টিমেটাম, পরে কর্তৃপক্ষের উপস্থিতি না পেয়ে অবস্থানরত বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রশাসন ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয়।
প্রধান ফটকে তালা (১৫ এপ্রিল)
এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন-সহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতে চার দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হল— নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সকল দোষীর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পরিবারের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও একজন সদস্যের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, নির্মাণাধীন হল ম্যামের নামে নামকরণ করা ও বিভাগে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। তবে অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন সময়ে প্রশাসন ভবনের ভিতরে থাকা অবরুদ্ধ এক ব্যক্তির অসদাচরণের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হন। ওই সময় উত্তেজিত অবস্থায় শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলতে দেখা যায়।
তখন আন্দোলনরত বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, “ম্যাম হত্যার ৪২দিন পার হওয়ার পরেও আমরা দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ দেখতে পাইনি। যার প্রেক্ষিতে প্রথমে অবস্থান কর্মসূচি করি এবং যথাসময়ে প্রশাসনের কোনো রেসপন্স না পেয়ে তালা দিলে ভিসি স্যার ও অন্যান্য শিক্ষকেরা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন। পরবর্তীতে ভিসি স্যাররা ডিপার্টমেন্টে এসে আমাদের সাথে বসেন এবং আমরা ভিসি স্যারের কাছে ফেস টু ফেস অনেক কথাবার্তা বলেছি।”
ব্যানার ছেঁড়া নিয়ে সমালোচনা ও অভিযোগ:
প্রশাসন ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করলে ভিতর থেকে এক কর্মকর্তার সঙ্গে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বাগবিতণ্ডা হয়। উত্তেজিত অবস্থায় পাশে টাঙানো ছবি সম্বলিত ব্যানার (ছাত্র সংগঠন, জিয়া পরিষদ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংক্রান্ত) ছিঁড়ে ফেলতে দেখা যায়। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি ও সমালোচনা সৃষ্টি হয়। শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ ফেসবুকে প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেন, “আমরা এতদিন আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটতে দেখিনি। হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রশাসনকে আরও তৎপর হওয়া উচিত।”
প্রশাসন ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের অবস্থান (১৫ এপ্রিল)
ব্যানার ছিঁড়ার বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করে বিভাগের শিক্ষার্থীরা সেইদিন (১৫ এপ্রিল) বিকালে সাংবাদিকদের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এক কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গে মিসবিহেভ করলে উত্তেজিত অবস্থায় ব্যানার ছেঁড়ার ঘটনা ঘটেছে। যা অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা ইচ্ছাকৃত করিনি। দুঃখপ্রকাশ করছি।”
ব্যানারের ছেঁড়া অংশ (১৫ এপ্রিল)
কর্মচারীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাগবিতণ্ডা:
চার দাবিতে প্রশাসন ভবনে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান নেয় সমাজকল্যাণ বিভাগের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ওই সময় ভিতরে অবরুদ্ধ থাকা এক কর্মচারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে উচ্চবাচ্য করতে শোনা যায়। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “তোমরা ভিসি স্যারের রুমে গিয়ে তালা দেও, আমাদের আটকিয়ে রাখছো কেন? আমাদের কষ্ট দিবি কেন? ওনার কাছে গিয়ে বিচার চাও, দরজার খুলে দাও। খুলে দিতে বলছি কিন্তু……”। পরপরই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা সৃষ্টি হয়। এদিক থেকে শিক্ষার্থীরা বলেছিলেন, “কষ্ট কি শুধু আপনার হচ্ছে? পারলে বিচার আপনিও চান। ধৈর্য্য ধরতে হবে। বেশি কথা বাড়াবেন না, সরে যান এখান থেকে…..”। একপর্যায়ে “ওনারে ধর ধর” বলে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা ছুটাছুটি করতে লাগছিলেন।
ব্যানার ছিঁড়ে অবমাননার অভিযোগে প্রতিবাদলিপি:
সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ছবি ও জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগ তুলে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘জিয়া পরিষদ’ ও ‘ইউট্যাব’। দোষীদের সনাক্ত করে শাস্তির দাবি জানিয়েছে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুই সংগঠনের নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষরিত পৃথক বিবৃতির মাধ্যমে এই প্রতিবাদ জানানো হয়।
জিয়া পরিষদ ও ইউট্যাবের প্রতিবাদলিপি (১৮ এপ্রিল)
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ মনে করেন, প্রশাসন ভবনের সামনে কতিপয় ছাত্র নামধারী দুষ্কৃতিকারী দেশের আপসহীন নেত্রী সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও জাতীয় পতাকার ছবি সম্বলিত বিভিন্ন ব্যানার ছিঁড়ে পদদলিত করে। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত হলদে পারে না। জাতীয় পতাকা আমাদের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। একইসঙ্গে দেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছবি অবমাননা করা শুধু ব্যক্তির প্রতি নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর আঘাত। যারা এ ধরনের ঘৃণ্য কাজে জড়িত, তারা প্রকৃত ছাত্র হতে পারে না। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই অবমাননাকর ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ব্যানার ছেঁড়ার ইস্যুতে শিক্ষকদের প্রতিবাদ সমাবেশ:
গত ১৯ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে জাতীয় পতাকা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবি অবমাননার অভিযোগে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) জাতীয়তাবাদী বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠন ‘ইউট্যাব’ ও ‘জিয়া পরিষদ’। এসময় সংহতি জানিয়ে জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা সংগঠন ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ এ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বিএনপিপন্থী শিক্ষক কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ (১৯ এপ্রিল)
প্রতিবাদ সমাবেশে কেউ ৭ দিন আর কেউ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আল্টিমেটাম দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। ১৫ তারিখের ঘটনা ১৯ তারিখ পার হওয়ায় অনেকে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এসময় নেতৃবৃন্দ বলেন, “প্রশাসনিক চেয়ারে যারা বসে আছে তারা কী করে? যদি আপনারা সরকারের সম্মান রক্ষা করতে না পারেন তাহলে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে যান। আর যদি দায়িত্ব উপযুক্তভাবে পালন করতে পারেন তাহলে দায়িত্বে থাকেন।”
তারা আরও বলেন, “খালেদা জিয়ার অবমাননা মানে বাংলাদেশের অবমাননা, একটি চক্র এরকম তাজ করেই যাবে যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়।”
৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন:
প্রশাসন ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ভবনে তালা লাগিয়ে অবরুদ্ধ করা, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা, ভাংচুর করা, উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা দেওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস শাহীদ মিয়া-কে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যদের তদন্ত কমিটি গঠন করা। অন্যান্য সদস্যরা হলেন- অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তফা আরীফ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহাবুল আলম, সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহা. খাইরুল ইসলাম, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. শহিদুল ইসলাম।
শিক্ষার্থীদের দুঃখপ্রকাশ:
শিক্ষক সংগঠনের প্রতিবাদ সমাবেশের পর গতকাল (২০ এপ্রিল) বিষয়টা স্পষ্ট করতে সংবাদ সম্মেলনে ব্যাখ্যা দিলেন সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থীরা। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, ঘটনার দিন (১৫ এপ্রিল) বিকেলেই আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি। যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকে আমরা দুঃখ প্রকাশ করেছি। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছি- গতকালকে আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা একটা বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। এটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত আমরা জানি না। তারপরও যদি উনারা কষ্ট পেয়ে থাকেন; আমরা সমাজকল্যাণ পরিবারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা চাই না ম্যামের হত্যাকাণ্ডের বিচার কেউ রাজনৈতিকভাবে অন্যদিকে ডাইভার্ট করুক।তারা বলেন, দাবি আদায়ে যখন আমরা প্রশাসন ভবনের গেটে তালা দিই, গুটিকয়েক শিক্ষার্থী ও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ভিতরে আটকা ছিল। উনারা আমাদেরকে বলছিল যে “আপনারা গেট খুঁলে দেন”। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের তাড়া বা খুব বেশি সমস্যা যাদের ছিল, তাদের প্রবেশ/বাহির হওয়ার সুযোগ দিয়েছি। ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়ে কর্মচারীদের বলেছিলাম যে “ভিসি স্যার আসা পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করেন, যদি কথা বলে সন্তুষ্ট হই; আমরা আপনাদেরকে ছেড়ে দিব।”
দুঃখপ্রকাশ করে ব্যাখ্যা দিলেন শিক্ষার্থীরা (২০ এপ্রিল)
সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, একপর্যায়ে রেজিস্টারভুক্ত কর্মচারী কি-না জানি না, একজন লোক আমাদের সাথে এবং আমাদের মেয়েদের স্লেজিং করেন। রাগান্বিত অবস্থায় তেড়ে আসার চেষ্টা করেন। পরপরই হুমকি ধামকি দিচ্ছিল তিনি। তখন আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঐ মানুষটার সাথে একটু বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটায়। গেটের বামপাশের যে পুরোটা দৃশ্য বিভিন্ন ব্যানারে আটকা। ওখানে দেখা যায় না। উনি যখন ব্যানারের ওপাশে লুকিয়ে যায়, নিচ থেকে উনার (কর্মচারীর) পা দেখা যাচ্ছিল। তখন শিক্ষার্থীরা তাঁকে খুঁজতে গিয়ে ব্যানার বেখেয়ালি সরাতে যায়। ব্যানারগুলো সাধারণত শক্ত রশি দিয়ে টাঙানো না। কর্মচারীকে দেখতে গিয়ে উত্তেজিত অবস্থায় ব্যানারগুলো ছিঁড়ে পড়ে যায়। আমরা কোনো ইনটেনশনালি এই কাজ করতে যাইনি। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী ম্যামের হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে গিয়েছি।
আসামির রিমান্ড শেষে পরবর্তী প্রক্রিয়া:
শিক্ষিকা রুনা হত্যার প্রধান আসামির ২ দিন পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞেসাবাদের (রিমান্ড) পর বিজ্ঞ আদালতে রিপোর্ট জমা দিয়েছে পুলিশ। বাদীপক্ষ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শেখ মোহাম্মদ সাইদ এই বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ে রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলমান। যদি ঘটনাক্রমে আরও জিজ্ঞেসাবাদের প্রয়োজন পড়ে তারা যেকোনো সময় রিমান্ড চাইবেন। আসামি পক্ষ যদি জামিন চাওয়া তাহলে রাষ্ট্রপক্ষ নামঞ্জুরের প্রক্রিয়ায় যাবেন।
(প্রতিবেদনে সহযোগিতা করেছেন ক্যাম্পাস সাংবাদিক রবিউল আলম ও মোসাদ্দেক হোসেন)
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে রাজনীতিক, ছাত্রনেতা, অধিকারকর্মী ও অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাসহ বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, ছাত্রনেতা নেহা বোরা, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। সাবেক ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকেও আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি রয়েছে আন্দোলনকারীদের। তাদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এ সংশোধন করা হচ্ছে।
দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের যাতায়াত ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথে অনেককে আটক করে বাস ও ভ্যানে করে অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসানো, যানবাহনে তল্লাশি এবং মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে আটক ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভিন্নতা রয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস শনিবার বিকেল পর্যন্ত দিল্লিতে প্রায় দুই হাজার মানুষকে আটকের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, আগের দিন ককরোচ জনতা পার্টির এক মুখপাত্র দাবি করেছিলেন, দেশজুড়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে স্থগিত হওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পরীক্ষার্থীরা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ের আগে এ সিদ্ধান্ত জানানো হলে ক্ষোভে সড়কে নামেন চাকরিপ্রার্থীরা। এতে কয়েকটি এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
সকাল ১১টায় অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা (১১তম গ্রেড) পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসায় কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে।
এরপর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সাতমসজিদ রোড, বাংলা কলেজ ও খিলগাঁওসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু করেন পরীক্ষার্থীরা। তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার ব্যাখ্যা ও দায়ীদের জবাবদিহি দাবি করেন।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অবরোধের বিষয়টি নিশ্চিত করে শেরেবাংলা নগর থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. লোকমান হোসেন বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আন্দোলনকারীরা আড়ং সিগনালে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন।
তিনি জানান, আসাদগেট থেকে ধানমন্ডিগামী সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ধানমন্ডি থেকে আসাদগেটমুখী সড়কে অবস্থান নিয়েছেন পরীক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভের সময় চাকরিপ্রার্থীদের ‘প্রশ্ন ফাঁস হলো কেন, প্রশাসন জবাব চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।
May be an image of one or more people, crowd and text
কেন্দ্রে পৌঁছেও পরীক্ষা দিতে পারেননি প্রার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী। নির্ধারিত কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিতের খবর পেয়ে তারা বিপাকে পড়েন। অনেকের অভিযোগ, আগে থেকে কোনো ঘোষণা না দিয়েই পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
রাজধানীর মাদারটেকের এ আজিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসা ঈমান জানান, তারা কেন্দ্রে প্রবেশ করে নির্ধারিত আসনে বসার পর পরিদর্শক এসে জানান, পরীক্ষা হবে না। কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করেছে।
কেন পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না, তা জানতে চাইলে ঈমান মোল্লা বলেন, কেন্দ্র থেকে কোনো কারণ জানানো হয়নি। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে তারা শুনেছেন। তিনি ফরিদপুর থেকে পরীক্ষা দিতে ঢাকায় এসেছিলেন।
একই কেন্দ্রের আরেক পরীক্ষার্থী মো. তামিম জানান, তাদের কেন্দ্রেও একইভাবে পরীক্ষা স্থগিতের কথা জানানো হয়।
পরীক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ৩০০টি পদের কথা উল্লেখ ছিল। এসব পদের বিপরীতে সারা দেশ থেকে লক্ষাধিক প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন তারা।
জানা গেছে, রাজধানীর কয়েকটি কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণের পর পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এ দিকে মানিক মিয়া এভিনিউতে রাস্তা অবরোধকারীদের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি জানানো হয়েছে।
দাবিগুলো হলো:
১. প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. দূর থেকে পরীক্ষা দিতে আসা পরীক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে
৩. আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পরীক্ষা নিতে হবে
দাবি বাস্তবায়নের ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, আমরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কিছু দাবি জানিয়েছে। আন্দোলনকারীদের বাইরে কেউ যেনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে বিষয় খেয়াল রাখা হচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পূর্ব ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে ধরপাকড় শুরু করেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির পুলিশ।
ইতোমধ্যে দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সার ধ্রুব রাঠিসহ আরও কয়েক নেতাকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। এ ছাড়া বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা প্রায় হাজার মানুষকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
এক প্রতিবেদনে রয়টার্স বলছে শনিবার সকালে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। এ ছাড়া দলের দুই সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকা এবং আইন সহায়তা বিভাগের প্রধান রত্না সিংকেও আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অপরদিকে সিজেপির সেই কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়া ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে শনিবার ভোরে রাজধানী সংলগ্ন শহর গুরুগ্রাম থেকে আটক করেছে পুলিশ।
একইভাবে বিক্ষোভে যোগ দিতে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় ১ হাজার জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইয়ের বরাতে জানা গেছে, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর কথা বলে এই পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ।
ভারত, দিল্লি, বিক্ষোভ, ককরোচ জনতা পর্টি, সিজেপিমুম্বাই থেকে শনিবার সকালে দিল্লিতে পৌঁছান ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরই পুলিশ তাকে আটক করে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আটকের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
আটকের আগে দীপকে জানিয়েছিলেন, কারাগারে যেতে হলেও কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা আইনে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তাদের আন্দোলন থামবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তা
এদিকে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান জন্তর মন্তরসহ দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে এবং পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগে বিধিনিষেধ, একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং ট্রেন চলাচলে বিঘ্নের খবরও পাওয়া গেছে। ফলে বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ
ককরোচ জনতা পার্টির এবারের আন্দোলনের মূল দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। সংগঠনটির অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে ক্ষমতাসীন বিজেপির পক্ষে প্রভাবিত করা হচ্ছে। তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি- দুই পক্ষই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সরকারের জবাবদিহির মতো ইস্যুতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এবার নির্বাচনি স্বচ্ছতার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে তারা।
এদিকে বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন ককরোচ জনতা পার্টি ও বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনকে ‘নৈরাজ্যবাদী’ কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেছেন, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
বিক্ষোভের আগেই আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের আটক এবং শত শত মানুষকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।