Connect with us

খেলাধুলা

১৬ হলুদ, ৪ লাল: যে রাতে ফুটবল ম্যাচ হয়ে উঠেছিল যুদ্ধক্ষেত্র

Published

on

ফুটবল কখনো কখনো শুধু গোলের গল্প নয়। কখনো এটি রাগের গল্প, প্রতিশোধের গল্প, নিয়ন্ত্রণ হারানোর গল্প। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ আছে, যেখানে স্কোরলাইন মনে রাখতে হয় না; মনে থাকে বাঁশি, ধাক্কা, ট্যাকল, প্রতিবাদ আর রেফারির পকেট থেকে বারবার বেরিয়ে আসা কার্ড।

২০০৬ সালের ২৫ জুন, জার্মানির নুরেমবার্গে পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের ম্যাচটি ছিল তেমনই এক রাত। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গ’। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচ, বড় দুই ইউরোপীয় দল, সামনে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট। কিন্তু সেই রাতে ফুটবল যেন ধীরে ধীরে ম্যাচ থেকে সরে গিয়ে জায়গা করে দেয় বিশৃঙ্খলাকে।

স্কোরলাইন ছিল পর্তুগাল ১, নেদারল্যান্ডস ০। গোল করেছিলেন মানিশ। কিন্তু এই ম্যাচকে কেউ শুধু সেই গোলের জন্য মনে রাখে না। মনে রাখে ১৬টি হলুদ কার্ড আর ৪টি লাল কার্ডের জন্য। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন কার্ডের বৃষ্টি আগে দেখা যায়নি। রাশিয়ান রেফারি ভ্যালেন্তিন ইভানোভের জন্য ম্যাচটি হয়ে ওঠে এক দুঃস্বপ্নের রাত।

শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এটি সাধারণ ম্যাচ হবে না। ট্যাকলের ভাষা ছিল কঠিন, শরীরী সংঘর্ষে ছিল উত্তাপ, দুই দলের খেলোয়াড়দের চোখে ছিল অদ্ভুত আগুন। পর্তুগাল-নেদারল্যান্ডস তখন কেবল প্রতিপক্ষ ছিল না; ম্যাচের ভেতর তারা যেন একে অন্যকে সহ্য করতেই পারছিল না। একটি ফাউল আরেকটি ফাউলের জন্ম দিচ্ছিল, একটি প্রতিবাদ আরেকটি উত্তেজনার দরজা খুলছিল।

প্রথমার্ধেই ম্যাচের স্বর বদলে যায়। পর্তুগালের কস্টিনিয়া দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এর আগে-পরে কার্ডের সংখ্যা বাড়ছিল, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই দলের ক্ষোভও বাড়ছিল। ফুটবলে অনেক সময় রেফারি অদৃশ্য থাকলেই ম্যাচ সুন্দর হয়। কিন্তু নুরেমবার্গে রেফারি নিজেই হয়ে উঠলেন ম্যাচের সবচেয়ে দৃশ্যমান চরিত্র।

দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নেদারল্যান্ডসের খালিদ বোলাহরুজ লাল কার্ড দেখেন। পর্তুগালের ডেকোও দ্বিতীয় হলুদে মাঠ ছাড়েন। শেষে নেদারল্যান্ডসের জিওভানি ফন ব্রঙ্কহর্স্টও লাল কার্ড দেখেন। একসময় এমন দৃশ্য তৈরি হয়, যেখানে মাঠের বাইরের শাস্তিপ্রাপ্ত খেলোয়াড়রাও পাশাপাশি বসে আছেন, যেন ম্যাচের ভেতরকার যুদ্ধ শেষে সবাই একই অস্বস্তির সাক্ষী।

এই ম্যাচের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক ছিল, ফুটবল বারবার শুরু হলেও ফুটবল বারবার থেমে যাচ্ছিল। বল গড়াচ্ছে, কিন্তু চোখ চলে যাচ্ছে রেফারির দিকে। আক্রমণ হচ্ছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আলোচনা হচ্ছে পরের ফাউল নিয়ে। কে গোল করবে, সেই প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে উঠছিল, কে পরের কার্ড দেখবে।

একের পর এক কার্ড দেখাতে হচ্ছিল রাশিয়ার রেফারিকে।

বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে উত্তেজনা থাকবেই। চাপ থাকবে, শরীরী খেলা থাকবে, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ থাকবে। কিন্তু নুরেমবার্গের রাত আলাদা ছিল, কারণ সেখানে উত্তেজনা ম্যাচকে বড় করেনি, খেয়ে ফেলেছিল। পর্তুগাল জিতেছিল, কিন্তু সেই জয়ও পুরোপুরি নির্মল ছিল না। তারা কোয়ার্টার ফাইনালে গেলেও হারাল ডেকো ও কস্টিনিয়াকে। নেদারল্যান্ডস বিদায় নিল ক্ষোভ, হতাশা আর বিতর্ক নিয়ে।

এই ম্যাচের পর সেপ ব্ল্যাটার নিজেই রেফারিং নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছিলেন, যদিও পরে তিনি সেই মন্তব্যের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন। ইভানোভ আর ওই বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পাননি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, দায় কি শুধু রেফারির? নাকি খেলোয়াড়দেরও? কারণ কার্ড দেখানো যত সহজ, ম্যাচের মেজাজ আগেভাগে পড়া তত সহজ নয়। নুরেমবার্গে রেফারি, খেলোয়াড়, বেঞ্চ, আবেগ, চাপ, সব মিলেই এক অগ্নিগর্ভ দৃশ্য তৈরি করেছিল।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে লাল কার্ডের গল্প অনেক আছে। ১৯৮৬ সালে উরুগুয়ের হোসে বাতিস্তা স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৫৬ সেকেন্ডে লাল কার্ড দেখে ইতিহাসে ঢুকে যান। সেটি এখনো বিশ্বকাপের দ্রুততম লাল কার্ড। কিন্তু নুরেমবার্গের ম্যাচ আলাদা। কারণ এটি একটি মুহূর্তের পাগলামি ছিল না; এটি ছিল পুরো ৯০ মিনিটের ধীরে ধীরে ভেঙে পড়া শৃঙ্খলা।

ফুটবল সৌন্দর্যের খেলা, কিন্তু সেই সৌন্দর্য টিকে থাকে সীমার ভেতর। শক্ত ট্যাকল হতে পারে, আবেগ থাকতে পারে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হতে পারে। কিন্তু যখন প্রতিটি সংঘর্ষ প্রতিশোধের মতো লাগে, প্রতিটি বাঁশি যুদ্ধবিরতির মতো শোনায়, তখন ম্যাচ আর ম্যাচ থাকে না। হয়ে যায় এক সতর্কবার্তা।

২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে। নতুন ফরম্যাট, নতুন দল, নতুন গল্প। কিন্তু প্রতিটি বিশ্বকাপই পুরোনো ইতিহাসের ছায়া নিয়ে আসে। নুরেমবার্গ সেই ইতিহাসের এক অস্বস্তিকর অধ্যায়।

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top1

বাংলাদেশের যে তিন চ্যানেলে সরাসরি দেখা যাবে বিশ্বকাপ

Published

on

By

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আয়োজনগুলোর একটি ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ ইতোমধ্যে তুঙ্গে। বাংলাদেশের দর্শকদের জন্যও এসেছে সুখবর। আসন্ন বিশ্বকাপের ম্যাচ দেশের তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রথমে বিটিভি এবং টি স্পোর্টসের পর্দায় বিশ্বকাপের ম্যাচ সরাসরি দেখা যাবে বলে শোনা গেলেও এবার জানা গেল সময় টিভিতেও সরাসরি খেলা উপভোগ করতে পারবেন দর্শকরা। বিষয়টি জানিয়েছে সময় টিভি কর্তৃপক্ষ। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবল অনুরাগীরা সহজেই খেলা দেখার সুযোগ পাবেন।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে প্রতি আসরেই তৈরি হয় ব্যাপক উন্মাদনা। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন এবং পর্তুগালের মতো জনপ্রিয় দলগুলোর ম্যাচ ঘিরে রাত জেগে খেলা দেখার সংস্কৃতি বহুদিনের। তবে এবারের আসরের সম্প্রচার নিয়ে দর্শকদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল। সম্প্রচার মাধ্যমগুলো নিশ্চিত হওয়ায় সে অপেক্ষার অবসান ঘটেছে।

এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন করবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো। তিন দেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ আসর ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করতে যাচ্ছে।

প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে টুর্নামেন্টে। ফলে ম্যাচ সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১০৪-এ পৌঁছেছে। এর ফলে প্রতিযোগিতার ব্যাপ্তি ও উত্তেজনা আগের যে কোনো আসরের তুলনায় আরও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অনেক দর্শকের কাছে এখনো টেলিভিশনই খেলা দেখার প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল এবং যেসব দর্শক অনলাইন সম্প্রচারের চেয়ে টিভি সম্প্রচারকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য মনে করেন, তাদের জন্য এই সম্প্রচার ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

বিটিভির মাধ্যমে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ খেলা দেখতে পারবেন। পাশাপাশি টি স্পোর্টস ও সময় টিভি দর্শকদের জন্য অতিরিক্ত বিকল্প তৈরি করছে।

টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও বিশ্বকাপ উপভোগের সুযোগ থাকবে। বাংলালিংকের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টফিতে সরাসরি ম্যাচ সম্প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া গ্রামীণফোনের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বায়োস্কোপের মাধ্যমেও দর্শকরা বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে পারবেন। ফলে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার কিংবা স্মার্ট টিভি ব্যবহারকারীরাও সহজে খেলা উপভোগ করতে পারবেন।

Continue Reading

খেলাধুলা

ফিফার বিরুদ্ধে মার্কিন শিল্পীর মামলা

Published

on

By

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের প্রচারণার জন্য ডালাস শহরের একটি ঐতিহাসিক তিমির ম্যুরাল মুছে ফেলার অভিযোগে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে ২৫ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা করেছেন মার্কিন শিল্পী রবার্ট ওয়াইল্যান্ড।

ডালাসের কেন্দ্রস্থলে একটি ভবনের দুই দেওয়াল জুড়ে আঁকা ‘হোয়েলিং ওয়াল ৮২’ নামের ম্যুরালটি ১৯৯৯ সালে সম্পন্ন করেন ওয়াইল্যান্ড। প্রায় ১ হাজার ৫৮০ বর্গমিটার আয়তনের এই শিল্পকর্মটি তিন দশকের কাছাকাছি সময় ধরে শহরের অন্যতম পরিচিত নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। 

তবে গত মাসে বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে নতুন শিল্পকর্ম স্থাপনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ম্যুরালটির ওপর রং করা শুরু হয়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

Continue Reading

top1

নেপালকে হারিয়ে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ

Published

on

By

আসরের আগের দুবারও শিরোপার মঞ্চে উঠেছিল বাংলাদেশ। এবার শক্ত প্রতিপক্ষ নেপাল বাধাও ডিঙিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। শেষ চারের লড়াইয়ে এসেছে ২-১ গোলের জয়। তাতেই টানা তৃতীয়বার নারী সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ নারী দল।

বুধবার (৩ জুন) গোয়ার জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে লড়াইটা জমে উঠেছিল। হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে ঋতুপর্ণা-সাগরিকারা। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে নেপালের আত্মঘাতী গোল বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করে।

রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে নেপাল হারে ২-১ গোলে। গত দুই ফাইনালে নেপালকে তাদের মাঠে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। ৬ জুনের ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হবে ভারত-ভুটান দ্বিতীয় সেমিফাইনালের জয়ী দল। 

ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে শুরু ভালো হয়নি বাংলাদেশের। সেই সুযোগে ম্যাচের ২৩ মিনিটে লিড নেয় নেপাল। পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ প্রথমার্ধের শেষ দিকে গোলের জন্য মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে। 

বিরতির বাঁশি বাজার ঠিক আগমুহূর্তে দুর্দান্ত এক গোল করেন ঋতুপর্ণা চাকমা। কর্নার কিক থেকে সরাসরি বাঁকানো শটে নেপালের জালে বল পাঠিয়ে দলকে ১-১ সমতায় ফেরান তিনি।

বিরতির পর দুই দলই জয়ের নেশায় মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালাতে থাকে। ম্যাচের ৭৮ মিনিটে গোল করার সহজ সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের সাগরিকা। তবে নেপাল অধিনায়ক গোলকিপার সুব্বার ক্ষিপ্রতায় সাগরিকার শটটি ফিরে যায়।

ম্যাচের যোগ করা সময়ে ভাগ্য সহায় হয় বাংলাদেশের। শামসুন্নাহার জুনিয়রের একটি পাস ছিল সাগরিকার উদ্দেশে। সাগরিকার চাপে নেপালের রক্ষণভাগ তালগোল পাকিয়ে ফেলে এবং আত্মঘাতী গোল দিয়ে বসে। এরপর শেষের বাঁশি বাজলে ফাইনালে ওঠার আনন্দে মেতে ওঠে বাংলাদেশের মেয়েরা।

Continue Reading

Trending