মোজো রিপোর্টার
চলছে গ্রীষ্মকাল, গাছে গাছে দেখা মিলছে মধুমাসের জনপ্রিয় ফল—আম, কাঁঠাল ও লিচু। তবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ক্যাম্পাসে সম্প্রতি অপরিপক্ব কাঁচা লিচু পাড়ার প্রবণতা বেড়েছে, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা।
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে গাছে উঠে কাঁচা বা আধাপাকা লিচু পাড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে এটি যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিপক্ব লিচু খাওয়া শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে জানান, আমরা না পাড়লেও অন্য কেউ নিয়ে যাবে। তাই টক হলেই খাওয়ার উপযোগী মনে করে নিয়ে যাচ্ছি।
এবিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “পরিপক্ব লিচু বা খালি পেটে কাঁচা লিচু খাওয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো সবার আবশ্যিকভাবে জানা উচিত। অপরিপক্ব লিচু খেলে শরীরে টক্সিন তৈরি করে এবং টক্সিন শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই অপরিপক্ব লিচু খাওয়া বন্ধ করা অতিব জরুরি এবং এখানে সতর্ক থাকা এবং মানুষকে সচেতন করা খুবই জরুরি।”
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, লিচুতে যে উপাদান থাকে, সেটা গ্লুকোজ শোষণ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে বা গ্লুকোজের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। কারণ কাঁচা লিচুতে ‘হাইপোগ্লাইসিন এ’ এবং মিথাইল সাইক্লো প্রোপাইল গ্লাইসিন (এমসিপিজি) থাকে। এই উপাদান দুটি শরীরের গ্লুকোজ তৈরির প্রক্রিয়াকে বন্ধ করে ফলে রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যায়, যাকে আমরা হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলি। এটা হলে সাধারণত কাঁচা লিচুতে বেশি দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, কাঁচা লিচুতে এটা থাকার জন্য শরীরের ভেতরে হাইপোগ্লাইসেমিক ভাব হয়ে হাইপোগ্লাইসেমিক রিঅ্যাকশন তৈরি করে, হঠাৎ করে শরীরে বিষক্রিয়া বা অজ্ঞান হওয়া থেকে শুরু করে যেকোনো সমস্যা, দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। উপসর্গগুলো এরকম হতে পারে যে বমি, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খিঁচুনি, অচেতন হয়ে যাওয়া, গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
লিচু কাণ্ড নিয়ে লালন শাহ হলে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো আম, লিচু এবং কাঁঠাল গাছ কিন্তু কেউ ফল গুলোকে পাকতেই দিচ্ছে না। অন্তত আমরা দেখতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আম, লিচু পাকলে কেমন দেখায়; তোমরা তো সেটার সুযোগই দিচ্ছ না। আমি একদিন সকাল বেলায় হাটার সময় কয়েকজনকে দেখলাম আম পাড়তে, তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম কেন এই কাঁচা আম গুলো পড়ছে, তখন তাঁরা আমাকে বলল, “স্যার এইসব আমরা না পাড়লে অন্য কেউ এসে নিয়ে যাবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল ডাক্তাররা জানান, কাঁচা লিচু খালি পেটে খাওয়া যাবে না। শর্করার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় স্বাস্থ্যঝুকি থাকে। কিশোর বয়সে ফলাফল না পেলেও শেষ বয়সে গিয়ে ভোগাবে। এগুলো সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে মেনে চলা উচিত।
এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে ভারতের বিহার রাজ্যের মুজাফফরপুর জেলায় লিচু খেয়ে অসুস্থ হয়ে অন্তত ১২২ শিশুর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে গবেষণায় তাদের শরীরে লিচুর টক্সিন উপাদান শনাক্ত করা হয়। এছাড়া ২০১২ সালে দিনাজপুরে ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল লিচু খাওয়ার ফলে। ২০১৫ সালে একই কারণে একই জেলাতেই ১১ শিশুর মৃত্যু ঘটে।
(রিপোর্ট সম্পাদনায় সহযোগিতা করেন ক্যাম্পাস সাংবাদিক সামিউল ইসলাম)