Connect with us

top1

ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্র প্রকল্পে গোপনে সহায়তা দিয়েছিল জার্মানি

Published

on

ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লির অস্তিত্ব প্রথম প্রকাশ্যে আসে ১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে। এরপর থেকে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তর গবেষণা, বই এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জার্মানি ‘গোপনে’ এই প্রকল্পে ‘অর্থায়ন’ করেছিল।

ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাভনার কোহেনের ‘ইসরায়েল অ্যান্ড দ্য বোম্ব’সহ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, পাশাপাশি সিমুর হার্শ, জাকি শালোম এবং আদম রাজের গবেষণায় এই কর্মসূচির উৎস, বিকাশ এবং গোপনীয়তা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে সাংবাদিক শ্যানি হাজিজার প্রামাণ্যচিত্র সিরিজ ‘দ্য অ্যাটম অ্যান্ড মি’ এই গল্পে ব্যক্তিগত ও সামাজিক মাত্রা যোগ করে।

তবে দশকের পর দশক গবেষণার পরও দুটি বড় প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়ে গেছে—প্রকল্পের মোট খরচ কত ছিল এবং সেই অর্থ কে জুগিয়েছিল? প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ১৯৬১ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে বন সরকার (তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির রাজধানী) গোপন ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিবছর ১৪০ থেকে ১৬০ মিলিয়ন জার্মান মার্ক ইসরায়েলে পাঠায়। মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ বিলিয়ন মার্ক, যা বর্তমান মূল্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো (৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি)। ১৯৮৯ সালে স্বাক্ষরিত পরবর্তী এক পরিশোধ চুক্তির মাধ্যমে এই ঋণ কার্যত অনুদানে পরিণত হয় বলে জানা যায়।

এই দাবি সত্য হলে, ইসরায়েলের পারমাণবিক প্রকল্পের বড় অংশ ইসরায়েলি করদাতা বা ব্যক্তিগত দাতাদের অর্থে নয়, বরং জার্মান সরকারি অর্থে নির্মিত হয়েছিল।

ফ্রান্সের সহায়তা, জার্মান সমর্থন

ঘটনার সূত্রপাত ১৯৫৭ সালে, যখন ১৯৫৬ সালের সিনাই যুদ্ধের পর ইসরায়েল-ফ্রান্স সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্স কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন দেয় এবং দুই দেশের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে গোপনে একটি পারমাণবিক চুল্লি পেতে সহায়তায় সম্মত হয়। তবে তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ন কেবল ফরাসি সমর্থনে আশ্বস্ত ছিলেন না। তিনি আশঙ্কা করছিলেন, মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দেল নাসের এবং প্যান-আরব জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণে ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।

এ কারণে বেন-গুরিয়ন এমন এক শক্তির সন্ধান শুরু করেন, যাকে তিনি নাকি ‘বৃষ্টির দিনের ছাতা’ বা বিপদের সঙ্গী বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে পশ্চিম জার্মানিই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত। এটি ছিল দ্রুত উত্থানশীল ইউরোপীয় শক্তি, নাসেরবিরোধী এবং নেতৃত্বে ছিলেন কনরাড অ্যাডওয়ারের মতো ব্যক্তিত্ব, যিনি হলোকাস্টের পর ইসরায়েলের প্রতি জার্মানির নৈতিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাস করতেন।

বনে গোপন সম্পর্কের সূচনা

১৯৫৭ সালের ৩ জুলাই বন শহরে এক গোপন বৈঠকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক শিমন পেরেস এবং পশ্চিম জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্রাঞ্জ জোসেফ স্ট্রাউস বৈঠকে বসেন। এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বেন-গুরিয়নের আশঙ্কা ছিল, জার্মানির সঙ্গে প্রকাশ্য সম্পর্ক ইসরায়েলের ভেতরে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বন সরকার ভয় পাচ্ছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে দৃশ্যমান সহযোগিতা আরব বিশ্বে তাদের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং পূর্ব জার্মানিকে কূটনৈতিক সুবিধা দেবে।

পশ্চিম জার্মানি ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়াকে নৈতিক দায়িত্ব এবং কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছিল। আর ইসরায়েল চাইছিল সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন। আলোচনায় পেরেস জানান, ১৯৫২ সালের ক্ষতিপূরণ চুক্তির বাইরে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়া উচিত। স্ট্রাউস ইতিবাচক সাড়া দেন, এমনকি সাবমেরিন সরবরাহের অনুরোধেও। যদিও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এগুলোকে অপরিহার্য মনে করেনি, তবুও এই অনুরোধ বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পথ খুলে দেয়।

শেষ পর্যন্ত সাবমেরিনগুলো ব্রিটেন থেকে জার্মান অর্থায়নে কেনা হয়। পশ্চিম জার্মানি ইসরায়েলের কাছ থেকে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জামও কেনে, যা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

১৯৬০ সালের বৈঠক: মোড় ঘোরানো মুহূর্ত

এরপর, ১৯৬০ সালের ১৪ মার্চ নিউইয়র্কের ওয়াল্ডর্ফ অ্যাস্টোরিয়াতে বেন-গুরিয়ন ও অ্যাডেনওয়ারের বৈঠককে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়। বৈঠকটি প্রকাশ্যে হলেও আলোচনার বিষয়বস্তু বহু বছর গোপন ছিল। কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিলিপি নেই, তবু এটিকে ইসরায়েল-জার্মানি নিরাপত্তা সম্পর্কের ইতিহাসে বড় ঘটনা হিসেবে ধরা হয়।

আলোচনায় বেন-গুরিয়ন নাকি ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে সরাসরি হলোকাস্টের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর মতে, ইউরোপীয় ইহুদিদের ধ্বংস জায়নবাদী প্রকল্পকেও মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে জার্মান সহায়তাকে তিনি অতীত অপরাধের ক্ষতিপূরণই নয়, ভবিষ্যতে ইসরায়েলের টিকে থাকার জন্যও অবদান হিসেবে উপস্থাপন করেন।

‘নেগেভ উন্নয়ন’ ছিল আড়াল

জার্মান সামরিক সহায়তা নজর কাড়লেও প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল গোপন আর্থিক ব্যবস্থা, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নেগেভ উন্নয়ন’ সহায়তা হিসেবে দেখানো হয়। অ্যাডেনওয়ারে দপ্তর এই পরিকল্পনার কোডনাম দেয় অ্যাকশিওন গুশাফসফ্রন্ড বা অপারেশন বিজনেস ফ্রেন্ড। এর আওতায় ইসরায়েলকে ১০ বছর ধরে বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হওয়ার কথা ছিল, সুদের হার ৩.৬ শতাংশ।

প্রথমে বন সরকার চেয়েছিল ১৯৬৫ সালে ক্ষতিপূরণ প্রদান শেষ হওয়ার পর এই ব্যবস্থা কার্যকর হোক। কিন্তু ইসরায়েলের চাপের কারণে তা আগেই শুরু হয় এবং প্রথম অর্থ স্থানান্তর হয় ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে। গোপনীয়তা বজায় রাখতে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি করা হয়নি। পরিবর্তে ইসরায়েলের প্রতিনিধি ফেলিক্স শিনার এবং অ্যাডেনওয়ারের উপদেষ্টা হারমান অ্যাবস এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করেন, যাতে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ঋণের মতো করে অর্থ পাঠানো হয়।

অর্থের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখতে সরকারি কাগজে এগুলোকে অজ্ঞাত উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আর্থিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখানো হয়। জার্মানির অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয় এই ব্যবস্থা অনুমোদন দেয়, তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিষয়টি জানানো হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

সে সময়, ১৯৬০ সালের মে মাসে বেন-গুরিয়ন নাৎসি কর্মকর্তা এডলফ আইখম্যানকে গ্রেপ্তার এবং জেরুজালেমে বিচার করার পরিকল্পনা ঘোষণা করলে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। পশ্চিম জার্মান কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেন, এই বিচার অ্যাডেনওয়ার সরকারের সেইসব উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের দিকে নজর টানতে পারে, যারা নাৎসি আমলে কাজ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তাঁর চিফ অব স্টাফ হ্যান্স গ্লবকে, যিনি নুরেমবার্গ আইন প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক সম্পর্কেও অবগত ছিলেন।

গোপন অর্থায়ন ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হারমান অ্যাবসও নাৎসি আমলে শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকার ছিলেন।

সব মিলিয়ে এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, ডিমোনা প্রকল্প শুধু ফ্রান্সের প্রযুক্তিগত সহায়তায় নয়, বরং পশ্চিম জার্মানির গোপন আর্থিক সহায়তার ওপরও দাঁড়িয়ে ছিল। এই ব্যবস্থা পুরোপুরি নিশ্চিত হলে, তা ইসরায়েলের পারমাণবিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ কম আলোচিত দিকগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে। হলোকাস্টের স্মৃতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং গোপন কূটনীতির জটিল মিশ্রণে এই ইতিহাস গড়ে উঠেছে

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top1

আলজাজিরার কলাম/ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সমস্যা সামনে এনেছে

Published

on

By

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬-এ ওয়াশিংটন ডি.সি.-র হোয়াইট হাউসে একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্য প্রদানের পূর্বে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্রে এই রাষ্ট্রীয় সফরের সাথে সব ধরণের জাঁকজমক অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে ছিল বি-২ সামরিক বিমানের ফ্লাইওভার, পান্ডা এবং নিক্সন আমলের ঐতিহাসিক টোস্ট। তবে গ্লোবাল সাউথ থেকে যারা এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তাঁদের জন্য এই দৃশ্যমান জাঁকজমক মূল বিষয় ছিল না। এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের “গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা”র ওপর জোর দেওয়া। রিয়াদ থেকে নয়াদিল্লি বা জাকার্তা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের রাজধানীর জন্য এই শীর্ষ সম্মেলনটি চলতি দশকের বাকি সময়ে দুই পরাশক্তির সাথে কীভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করা যায় তার একটি স্পষ্ট আভাস দিয়েছে।

বেইজিং এই শীর্ষ সম্মেলন থেকে কোনো সামরিক ঝামেলায় না জড়িয়ে কূটনৈতিক সুরক্ষার সুবিধা নিয়ে বের হয়েছে। বিপরীতে, ওয়াশিংটন ততক্ষণে সাত মাসের কাছাকাছি সময় ধরে চলা মার্কিন-ইসরায়েলি ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, বাণিজ্য বিষয়ে মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল, লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য পুনর্প্রতিষ্ঠা করছিল এবং চীনকে ঠেকানোর প্রচেষ্টায় গ্লোবাল সাউথকে যেকোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছিল। ট্রাম্প নিজে শি-র উদ্দেশ্যে পরীক্ষা করেন এবং সম্মেলনটিকে সফল বলে ঘোষণা করলেও বেইজিং থেকে দূরত্ব বজায় রাখার তাগিদ পাওয়া গ্লোবাল সাউথের সরকারগুলোর কাছে এই স্পষ্ট বৈপরীত্য নজর না এড়িয়ে যাবে না।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প চান যে ইরানের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার চীন যেন ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অবরুদ্ধ থাকা হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে সাহায্য করে। শি যুদ্ধবিরতি এবং পরবর্তীতে শান্তি আলোচনায় ফেরার সমর্থনের কথা বললেও, চীনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রণালী খুলে দেওয়া বা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল না। বেইজিং কৌশলগতভাবে নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। রিয়াদ, আবুধাবি এবং দোহার জন্য এর স্পষ্ট সুবিধা রয়েছে। চীন একজন সৈন্যও না পাঠিয়ে বা কোনো সামরিক ঘাঁটি দাবি না করেই তেহরানে সরাসরি কথা বলতে পারে, জাতিসংঘে প্রস্তাব দিতে পারে বা মধ্যস্থতার প্রস্তাব রাখতে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এই যুদ্ধের সরাসরি পক্ষ এবং সংকটের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকারী হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক সরঞ্জামের জন্য মার্কিন নিরাপত্তা ছত্রছায়ায় থাকলেও, কূটনৈতিক সংকট ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য বেইজিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের ঝুঁকি কমাচ্ছে। সহজ কথায়, চীনের উপযোগিতা কিছুটা হলেও এই তথ্যের মধ্যে রয়েছে যে ওয়াশিংটন যেসব যুদ্ধ লড়ছে চীন তাতে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিচ্ছে না।

এই হিসাব-নিকাশ সমগ্র অঞ্চলে বিস্তৃত রয়েছে। ইরাক, মিশর ও আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো, যারা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং নৌপথ অবরুদ্ধ হওয়া প্রত্যক্ষ করছে, তাদের কাছে চীনের এই সংযমের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। গ্লোবাল সাউথের নতুন কোনো পরাশক্তিকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; তাদের এমন কাউকে প্রয়োজন যিনি রক্তপাত না ঘটিয়ে সব পক্ষের সাথে আলোচনা করতে পারেন। বেইজিং সেই ভূমিকা পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে।

গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য সরকারের জন্য এটি কঠিন কিছু সিদ্ধান্তের সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প নিজে চীনের সাথে নতুন করে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য দেশকে চীনের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি আরও দুই মাসের জন্য বাড়ালেও, বাকিদের শুল্ক ও সরবরাহ ব্যবস্থার ধাক্কা সহ্য করতে বলা হচ্ছে। এর ফলে ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, পরাশক্তিগুলোর বৈরিতার মূল্য অন্যান্য দেশের বহন করা আশা করা হলেও ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে দরকষাকষির স্বাধীনতা বজায় রাখছে। এর প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। ভারত রাশিয়ার তেল কেনার পাশাপাশি মার্কিন প্রযুক্তি ও চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করে বহুপাক্ষিক ভারসাম্য বজায় রাখছে। ইন্দোনেশিয়া ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে তাদের “মুক্ত এবং সক্রিয়” পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিল ব্রিকস (BRICS) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে নিজেদের সুরক্ষার উপায় হিসেবে, যা কোনো পশ্চিমবিরোধী পদক্ষেপ নয় বরং এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিমা যেখানে অন্যরা নিয়ম নির্ধারণ করে। এই শীর্ষ সম্মেলনটি এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেনি, তবে এটি তা আরও জোরালো করতে পারে।

হুতিদের সামরিক শক্তির নেপথ্যে রুশ-ইরানি গোয়েন্দা তথ্য

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্লোবাল সাউথের জন্য একটি ভিন্ন প্রশ্ন তোলে: নিয়ম নির্ধারণের সুযোগ কার হাতে? শি-র “মানব নিয়ন্ত্রণ”-এর ওপর জোর দেওয়া এবং নতুন এআই নিয়মের প্রতি ট্রাম্পের অনীহা দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে, তবে এর কোনোটিই গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখে তৈরি হয়নি। উভয় পক্ষ একটি নতুন এআই সংলাপ চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে এবং দুর্ঘটনা-বিজ্ঞপ্তি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে, তবে কোনো বাধ্যবাধকতাযুক্ত নিয়ম তৈরি হয়নি। অনেক দেশই অন্যত্র তৈরি এআই ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল থেকে যাবে, যেখানে এসব নিয়ম পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের খুব কম ভূমিকা থাকবে। চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত মডেলকে আমেরিকার কর্পোরেট পরিচালিত বিকল্পের চেয়ে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, তবে এটিও এক প্রকারের নির্ভরতা। তবুও গ্লোবাল সাউথ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়। ভারত নিজস্ব বৃহৎ ভাষা মডেল (LLM) তৈরি করছে এবং তার ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামোর মডেল রফতানি করছে; সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেকে একটি প্রধান এআই হাব হিসেবে গড়ে তুলেছে; এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন ডেটা-সারভৌমত্ব কাঠামো তৈরি করছে যাতে আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলো তাদের ডেটা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ পায়।

এই প্রচেষ্টাগুলো প্রাথমিক স্তরে হলেও মার্কিন বা চীনা মডেলের মধ্যে একটিকে সহজভাবে বেছে নেওয়ার প্রবণতা এড়ানোর সংকল্প প্রদর্শন করে। বেইজিং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, ‘গ্লোবাল এআই গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ’ চালু করেছে এবং ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন’ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে, যার প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তিতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সাংহাইয়ে ২৯টি দেশ স্বাক্ষর করেছিল। কারও জন্য এটি পশ্চিমা কাঠামোর একটি বিকল্প; অন্যদের জন্য এটি এক নির্ভরতার বদলে অন্য নির্ভরতা গ্রহণ করা। প্রশ্ন হলো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো নিজেরা নিয়ম তৈরি করতে যথেষ্ট সুসংগঠিত হতে পারবে কিনা।

আনুষ্ঠানিকতার বাইরে শীর্ষ সম্মেলনের বার্তাটি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। ওয়াশিংটন ছবি ও সাময়িক শুল্ক বিরতি নিশ্চিত করেছে; বেইজিং অর্জন করেছে নিজের শর্তে সম্পর্ক পরিচালনার কৌশলগত স্বীকৃতি। গ্লোবাল সাউথের সরকারগুলোর জন্য এই সম্মেলনটি পক্ষ নেওয়া এড়িয়ে চলা, উভয় পরাশক্তির সাথে সম্পর্ক রাখা এবং নিজেদের সুযোগ তৈরির কৌশলকে আরও শক্তিশালী করেছে। বেইজিংয়ের শর্তে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা কোনো স্থায়ী শান্তি বয়ে আনে না। তবে রিয়াদ থেকে জাকার্তা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের জন্য ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যবর্তী ক্ষেত্রটি প্রভাব তৈরি করা এবং নিজেদের স্বার্থ অনুসরণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো ভবিষ্যতে এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার চুক্তি যেন বাকি সবাইকে সমস্যার মধ্যে না ফেলে দেয়।

Continue Reading

top1

বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ

Published

on

By

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

মঙ্গলবার বিকেলে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বঙ্গভবনে এটিই ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফর, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এবং সাইডলাইনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, জাতিসংঘের মহাসচিব ও শীর্ষ কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকসহ সফরের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন।

রাষ্ট্রপতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি ভাষণটিকে ‘দূরদর্শী, দৃঢ়প্রত্যয়ী ও দিকনির্দেশনামূলক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

Continue Reading

top1

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর: যুবলীগ নেতা অনিক গ্রেপ্তার

Published

on

By

অনলাইন ডেস্ক

জনপ্রিয় ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শাহ আলম অনিককে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ভাষানটেক থানা যুবলীগের সহসভাপতি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিবি সূত্রের দাবি, মিরপুরের সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত শাহাদাতের সঙ্গে অনিকের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। শাহাদাত ও ইব্রাহিমের হয়ে অনিক এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে সূত্রটি।

অনিককে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুর রহমান বলেন, তাকে কিছুক্ষণ আগে আটক করে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ডিবি সূত্রের দাবি, শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে ইসিবি চত্বরের কাছে নিউ গিনি কনডোমিনিয়াম সিটিতে সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় অনিক সরাসরি জড়িত ছিলেন। তবে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনিককে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন নিখিল ও মিরপুরের সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত করা হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিরপুর, ভাষানটেক, কাফরুল, পল্লবী ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার কথাও জানিয়েছে সূত্র।

এ ছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে অনিক সামনের সারিতে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও সংগঠিত করার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে সূত্রের দাবি।

মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক ও কাফরুল এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ এবং বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাতেও অনিকের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছে সূত্র। বিদেশ থেকে আসা বিভিন্ন নির্দেশনা দেশে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রাখতেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এর আগে শুক্রবার রাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকা থেকে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের ছোট ভাই মোতাহার হোসেন খান সুফলকে গ্রেপ্তার করা হয়। সূত্রের দাবি, সুফল ও অনিক একসঙ্গে ঢাকায় অস্থিরতা তৈরির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।

Continue Reading

Trending