Connect with us

top1

জমিদারি প্রথার মতো চাঁদাবাজি

Published

on

সুত্র: আরটিএনএন 

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই যে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুতই ভেঙে পড়ে। ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ৬ আগস্ট সকাল থেকেই সংঘবদ্ধ দখলদার চক্র আবার সক্রিয় হয়ে রাস্তা, ফুটপাত ও জনপরিসর পুনর্দখল শুরু করে। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন স্থায়ী না হওয়ায় কারা এই দখলদার, কীভাবে তারা সংগঠিত, কারা নেপথ্যে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং প্রতিদিনের চাঁদার অর্থ কোন স্তর পেরিয়ে কোথায় পৌঁছায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গত এক মাস ধরে রাজধানীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অনুসন্ধান চালায় আরটিএনএন টিম। সেই অনুসন্ধানে দখলদার চক্রের কাঠামো, অর্থ আদায়ের পদ্ধতি ও বণ্টনের পূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে, যার দ্বিতীয় পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর—ঢাকার দুটি ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। অথচ এই এলাকাগুলোতেই দিনের পর দিন গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক, যা স্থানীয়দের ভাষায় ‘জমিদারি প্রথা’র আদলে পরিচালিত হচ্ছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভ্যান ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ভবন নির্মাণকারী এমনকি বাসাবাড়ির বাসিন্দারাও এই চক্রের বাইরে নন।

চাঁদাবাজির অদৃশ্য শেকলস্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে ব্যবসা পরিচালনা বা বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে চাঁদা দেওয়া কার্যত বাধ্যতামূলক। পরিবহন খাত থেকে শুরু করে বর্জ্য সংগ্রহের নামেও নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদাবাজদের দাপটে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।

সরকার বদলায়, চাঁদাবাজি টিকে থাকেসরকার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বরং ক্ষমতার পালাবদলের পর নিয়ন্ত্রণের হাতবদল ঘটে, আরও সংগঠিতভাবে চাঁদাবাজি শুরু হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হামলা, মারধর এমনকি খুন-জখমের ঘটনাও ঘটছে বলে জানান স্থানীয়রা।

‘ডন’ কাঠামো ও রাজনৈতিক আশ্রয়অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিটি ওয়ার্ড বা এলাকায় একজন করে ‘ডন’ নিয়োগ দিয়ে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এসব ডনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক গডফাদার। সামাজিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্লাবগুলোকে ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে এই অপরাধ নেটওয়ার্ক, যার অধীনে সক্রিয় ছোট-বড় গ্রুপ ও কিশোর গ্যাং।

নিয়ন্ত্রণের হাতবদলএকসময় এই এলাকাগুলোতে শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ–হারিসের ভাতিজা ও তৎকালীন ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসিফ আহমেদের প্রভাব ছিল। তার আগে কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিবের নাম ছিল আলোচনায়, যার পেছনে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদ থাকার অভিযোগ স্থানীয়দের।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধিকাংশ এলাকায় চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিএনপি সংশ্লিষ্ট নেতাদের হাতে—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বর্তমানে পিচ্চি হেলাল ও ক্যাপ্টেন ইমনকে কেন্দ্র করে এই চক্র পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

কারা কোথায় নিয়ন্ত্রণেঅনুসন্ধানে জানা যায়, পিচ্চি হেলালের হয়ে ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি বেলাল আহমেদ, যুবদল নেতা জাহিদ মোড়ল এবং ‘শুটার পাপ্পু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন। টাউন হল, লালমাটিয়া, কৃষি মার্কেটের একাংশ ও আদাবরের কিছু এলাকা তাদের আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে ক্যাপ্টেন ইমনের হয়ে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় জসিম নামে এক ব্যক্তি সক্রিয়। বর্জ্য বাণিজ্যের আড়ালে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।

ভ্যান থেকেই কোটি কোটি টাকাসবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে ভ্যান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। তিন রাস্তার মোড় থেকে বেরিবাঁধ এবং শিয়া মসজিদ থেকে শ্যামলী রিং রোড—এই দুটি পয়েন্টেই প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ভ্যান থেকে গড়ে ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায় হয়। এতে দৈনিক প্রায় ৬ লাখ টাকা, মাসে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ এবং বছরে প্রায় পৌনে ২২ কোটি টাকা আদায় হচ্ছে বলে হিসাব উঠে এসেছে। এক ভ্যান বিক্রেতা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমরা চাঁদা দিই বলেই তো প্রভাবশালীরা বিলাসী জীবনযাপন করে।

পরিবহন ও নির্মাণ খাতেও চাঁদাপরিবহন শ্রমিকরা জানান, মোহাম্মদপুর থেকে চলাচলকারী বিভিন্ন রুটের যানবাহন থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয়। একইভাবে ঢাকা উদ্যান, সাত মসজিদ হাউসিং, বসিলা মডেল টাউনসহ বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণে চাঁদা ছাড়া কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে নিরাপত্তার কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি।

বর্জ্য সংগ্রহের নামে চাঁদাবাজিঅনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বর্জ্য সংগ্রহের নামে বাসাবাড়িতে রসিদ দিয়ে ইচ্ছামতো অঙ্ক বসিয়ে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এই অর্থের একটি অংশ রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছে যায়।

এত বড় পরিসরে চাঁদাবাজি চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এই ‘জমিদারি চাঁদাবাজি’ বন্ধ করা সম্ভব নয়। অনুসন্ধান বলছে, মোহাম্মদপুর ও আদাবরের চাঁদাবাজি শুধু অপরাধ নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে, যা ভাঙতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও শক্ত হাতে আইন প্রয়োগ।

রাজধানীতে মাসে ২০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি

৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া লাগার কথা থাকলেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি। রাজধানী ঢাকার বাস্তবতা খুব দ্রুতই ভিন্ন রূপ নিতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর থেকে যাদের হাতে ছিল ঢাকার রাস্তা-ঘাট, ফুটপাত ও জনপরিসরের নিয়ন্ত্রণ—ঘটনার দিন তারা সবকিছু ফেলে শূন্য করে পালিয়ে যায়। সেই শূন্যতার ভেতর নতুন করে স্বপ্ন দেখেছিল জাতি—দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অনিয়মমুক্ত একটি বাংলাদেশের। কিন্তু সেই স্বপ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ৫ আগস্ট শেষ না হতেই ৬ আগস্টের সকাল থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হুমড়ি খেয়ে নামে দখলদারিত্বে, আগের জায়গাগুলো নতুনভাবে কব্জা করতে শুরু করে।

একটি বেসরকারী হিসাব অনুযায়ী রাজধানীতে ভ্রাম্যমান ফুটপাতের দোকানের সংখ্যা ২লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখের মত। প্রতিদিন এসব দোকান থেকে গড়ে ২শ টাকা করে চাঁদাবাজি হয়। সে হিসেবে প্রতি মাসে ১৮০ থেকে ২শ কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়।

কারা এই দখলদার, কেন তারা আবার সক্রিয় হলো এবং কীভাবে পুরো ব্যবস্থা পুনর্দখল করা হলো—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে মাঠে নামে আরটিএনএন টিম। রাজধানীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গত এক মাস ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদকরা চিহ্নিত করেছেন দখলদার চক্র ও তাদের নেপথ্য নিয়ন্ত্রকদের। প্রতিদিন কত টাকা চাঁদা ওঠে, কারা আদায় করে, সেই অর্থের ভাগ কোথা থেকে শুরু হয়ে কোন কোন স্তরে কত শতাংশ বণ্টিত হয়—সবকিছুর ময়নাতদন্ত উঠে এসেছে এই অনুসন্ধানে। আজ সেই ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করা হলো।

পর্ব-১: গুলিস্তানে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক বলয়ের হাতে

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা গুলিস্তানে চাঁদাবাজি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ফুটপাতের দোকানি, ছোট-বড় ব্যবসায়ী এবং পরিবহনশ্রমিকদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রকাশ্যেই চাঁদা আদায় হলেও কার্যকর কোনো প্রতিকার না থাকায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের হাতেই গুলিস্তানের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রণের পেছনে রয়েছে সরাসরি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা।

গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট ও সিটি করপোরেশন মার্কেটসংলগ্ন এলাকা, কাপ্তানবাজার, মুরগিপট্টি, ফলপট্টি এবং বায়তুল মোকাররম এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এলাকাভিত্তিকভাবে চাঁদা আদায় করছে। কোথাও দৈনিক, কোথাও সাপ্তাহিক, আবার মার্কেটগুলোতে মাসিক হারে চাঁদা নেওয়া হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান বসাতে বাধা, হুমকি কিংবা মারধরের অভিযোগও রয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর কিছু মার্কেটে দোকান দখলের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

গতবছরের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর শেরে বাংলা নগর থানাধীন তালতলা এলাকার জনতা হাউজিং গেটের সামনে ফুটপাতে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে মো.বাবলু নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ফুটপাতে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে প্রায় এমন সংঘষ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে।

সিটি করপোরেশন মার্কেট এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বংশাল–ফুলবাড়িয়া এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মামুন আহমেদ মামুন। নবাবপুর অঞ্চলও তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব এলাকায় গালিব, মনা, জুম্মন ও ডালিমসহ একটি দল চাঁদা আদায় করে থাকে। মূলত তারাই এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী। তাদের ছাড়া এখানে একটি দোকানও বসার কোন সুযোগ নেই।

ব্যবসায় টিকে থাকা এবং জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করেই এক ব্যবসায়ী জানান, সিটি করপোরেশন মার্কেট থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এ ছাড়া ফুটপাতের দোকান থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) ও বঙ্গবাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন ২০ নম্বর ওয়ার্ডের টিটু ও সুফিয়ান। তাদের পেছনে ওই ওয়ার্ডের একটি রাজনৈতিক দলের নেতা স্বপনের ‘শেল্টার’রয়েছে বলে অভিযোগ। পরিবহনে ‘সিটি টোল’নামে চাঁদাবাজিতেও ২০ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তারা নিজেদের বিএনপির নেতাকর্মী বলে পরিচয় দেন।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরো গুলিস্তানকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। জাতীয় স্টেডিয়াম, ভাসানী স্টেডিয়াম ও আউটার স্টেডিয়াম এলাকা ইউনিট বিএনপি ও যুবদলের পরিচয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন এস এম আব্বাস ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মিজানুর রহমান টিপু।

বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেট থেকে উৎসব কাউন্টার হয়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের বন্ধন কাউন্টার পর্যন্ত একই নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গুলিস্তান নাট্যমঞ্চ পার্ক ও পশ্চিম পাশের ফলপট্টি যুবদলের নামে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেট এলাকার ফুটপাতের প্রায় ২০০ দোকান থেকে কাদের ও খোকন চাঁদা আদায় করেন। তারাও নিজেদের বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মী বলে পারিচয় দেন। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মোবাইল চোরা মার্কেট থেকে আউটার স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশ পর্যন্ত এলাকা।

মুক্তাঙ্গন, পল্টন মোড় ও বায়তুল মোকাররমের লিংক রোডেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় যুবদল ইউনিটের জিয়া, শহীদ ও লুচ্চা কামালের আধিপত্য রয়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। এর পেছনে মহানগর দক্ষিণ বদরুল আলম সবুজের নামও উঠে এসেছে।

চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রতি গুলিস্তান এলাকার মার্কেট ব্যবসায়ী মজিবর হোসেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও রাজধানীতে এখনো একটি সংঘবদ্ধ চক্র চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ২০ নম্বর ওয়ার্ড কমিটি স্থগিত করা হলেও বাস্তবে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, গুলিস্তানের ফুটপাত, পুরান বাজার মার্কেট, গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্স, ফুলবাড়িয়া, বঙ্গবাজার মার্কেট ও বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি চলছে। এতে ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন টিটু, যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান ও নুরুল হক হাদীসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রত্যেক দোকান থেকে আট হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। পাশাপাশি খালি জায়গা ও প্রশস্ত গলিতে চৌকি বসিয়ে প্রায় ২০০ অবৈধ দোকান স্থাপন করা হয়েছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে এক ব্যবসায়ীকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গুলিস্তানের প্রায় ৬০০ ফুটপাত দোকান থেকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জামানত বাবদ অফেরতযোগ্য চাঁদা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে নিয়মিত আদায় করা হয়। সম্প্রতি এক ব্যবসায়ীকে মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোলাপশাহ মাজার এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। না দিলে জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলতে বলে। পুলিশ এলে সবাই সরে যায়, পরে আবার ফিরে আসে।

পরিবহনশ্রমিকদের ভাষ্য, বাস ও লেগুনা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। এক চালক জানান, দিনে একাধিকবার টাকা দিতে হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত যাত্রী ভাড়ার ওপর পড়ে।

পথচারীদের মতে, সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দলবদ্ধভাবে অবস্থান নিয়ে কিছু লোক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, এতে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top1

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে থেকে শুরু, সংসদে পরিকল্পনা জানালেন মির্জা ফখরুল

Published

on

By

চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।’

মঙ্গলবার (১৬ জুন) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বাজেটের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে এ নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হবে। এক্ষেত্রে প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে অন্যান্য স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন হবে। নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও একই সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।

সরকার দলীয় এমপি মোহাম্মদ শামীম কায়সারের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সব উপজেলায় সংসদ সদস্যসহ ঊর্ধ্বতন কর্মচারীদের জন্য উপজেলা পরিষদের অভ্যন্তরে একটি পরিদর্শন কক্ষ নির্মাণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ হতে ইতোমধ্যে প্রতিটি উপজেলা পরিষদের অনুকূলে ৬ লাখ টাকা করে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।’

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনে দৈনিক পানির চাহিদা ৩২০-৩২৫ কোটি লিটার। যদিও গ্রীষ্মে ও শীত মৌসুমে পানির চাহিদার তারতম্য হয়ে হয়ে থাকে। ঢাকা ওয়াসার বর্তমান দৈনিক পানি উৎপাদন সক্ষমতা ২৯৫-৩০০ কোটি লিটার।’

তিনি বলেন, ‘পানি বিশুদ্ধকরণের কাজটি অত্যাধুনিক কেমিক্যাল পিএসি অ্যালাম সালফেট ও ক্লোরিনেশনের মাধ্যমে পরিশোধন করা হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করে ওয়াসার নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে পানির গুণগত মান নিশ্চিত হওয়ার পর দা নেটওয়ার্কে সরবরাহ করা হয়। ঢাকা ওয়াসা মহানগরীর বিভিন্ন স্থান হতে প্রতিদিন ৪০-৫০টি পানির নমুনা সংগ্রহ করে বিভিন্ন প্যারামিটার পরীক্ষা করে পানির গুণগতমান নিশ্চিত করে থাকে।’

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিমা রহমানের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বাসাবাড়ী থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কার্যক্রম বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভ্যানে করে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে এ বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার নিমিত্ত সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তির আওতায় আনার জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। চুক্তি প্রক্রিয়া কার্যক্রম সম্পন্ন হলে পরবর্তীতে ছোট ছোট কাভার্ড ভ্যানে পরিবেশ সম্মতভাবে ময়লা অপসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুন রায় চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সফটওয়্যার ভার্সন ২ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন সিস্টেমে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের ব্যবস্থা রাখা হবে। নতুন সিস্টেমে ব্লক চেইনের মাধ্যমে কোনো প্রকার তথ্য পরিবর্তন হলে তার লগ জানা যাবে। এ ছাড়া কোন স্তরে তথ্য পরিবর্তন হলো, তা উদঘাটন করা সহজ হবে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সেবা সহজীকরণ ও জনভোগান্তি দূরীকরণের লক্ষ্যে সারা দেশের নিবন্ধক ও নিবন্ধন সহকারীগণের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।’

নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘দেশের যুব সমাজকে মোবাইল আসক্তি, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে সচেতন করার লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়াধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরেরর মাধ্যমে প্রতিটি জেলায় জনসচেতনতামূলক কর্মশালা আয়োজন করা হয়ে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিত যুব সংগঠনের মাধ্যমে যুব ও যুব নারীদের মোবাইল আসক্তি, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা হয়ে থাকে।’

মুন্সিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল্লাহের প্রশ্নের জবাবে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যুব সমাজকে মাদকাসক্তি থেকে বিরত রাখার জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর হতে ‘যুব সমাজকে মাদকাসক্তি থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যে যুব সংগঠনের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি প্রকল্প’র ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করা হয়েছে।”

Continue Reading

top1

আজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে বেনজীরের প্রয়োজনীয় নথিপত্র

Published

on

By

দুবাইয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ লক্ষ্যে তার বিরুদ্ধে মামলাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র মঙ্গলবার (১৬ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ছয়টি মামলার মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে করা একটি মামলায় আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ওই পরোয়ানার ভিত্তিতেই ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে গ্রেফতারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদালতে আবেদন করে উল্লেখ করেন, বেনজীর বিদেশে অবস্থান করছেন এবং বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে তাকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতার করা প্রয়োজন। পরে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

আদালতের আদেশ পাওয়ার পর ১২ ফেব্রুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে আবেদন করেন। আবেদনে গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলার বিবরণ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংযুক্ত করে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা বিষয়টি ইন্টারপোলে পাঠায়। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে ইন্টারপোল। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ডাটাবেজে তার তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের নজরে আসেন তিনি।

দুদক জানিয়েছে, দুবাইয়ে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী, গ্রেফতারের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ প্রত্যর্পণের আবেদন জমা দিতে হবে। এ কারণে দুদক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আজ বেনজীর আহমেদের মামলাসংক্রান্ত সব প্রয়োজনীয় নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে।

Continue Reading

top1

ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে নেতানিয়াহুর, চাপে ইসরায়েল

Published

on

By

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রীতিমতো বাজি ধরেছিলেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বিত যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল কিংবা উৎখাত করবেন।

একইসঙ্গে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সখ্যতা আসন্ন নির্বাচনের আগে তাকে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। ওয়াশিংটন-তেলআবিব জোট মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতাই বদলে দেবে বলেও তার প্রত্যাশা ছিল।

কিন্তু বাস্তবতার গতিপথ ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। এখন ইসরায়েলের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র ট্রাম্পের সঙ্গেই মতবিরোধের পথে হাঁটছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, যুদ্ধের শুরুতে উভয় পক্ষ যে লক্ষ্যগুলোর কথা বলেছিল, তার সিংহভাগই এখন অর্জিত হয়নি। একইসঙ্গে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও জটিল অবস্থায় আটকে আছে।

আপাতত, এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছেন। কারণ তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ট্রাম্প যেন অসন্তুষ্ট না হন। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট সমালোচকদের বিষয়ে বরাবরই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, প্রাথমিক চুক্তিটি ‘ইসরায়েলের জন্য ভয়াবহ’। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের কেউই এটিকে ভিন্নভাবে দেখছেন না।

যদিও ওয়াশিংটনের দাবি, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্বেগ, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার পথ তৈরি হবে।

তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আলোচনার সময়সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসরায়েলের উদ্বেগগুলো অমীমাংসিত থেকেই যাবে এবং দেশটি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়বে।

লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান সীমিত করতে অস্বীকৃতি জানানোকে কেন্দ্র করে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে বারবার মতবিরোধ হয়েছে। অথচ যুদ্ধবিরতি ছিল ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি।

চলতি মাসের শুরুতে এক উত্তপ্ত ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘উন্মাদ’ বলে অভিহিত করেন। একইসঙ্গে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলাকালে বৈরুতে হামলা না করার নির্দেশ দেন। সেদিন নেতানিয়াহু হামলা স্থগিত করলেও এক সপ্তাহ পর বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরে আবারও আক্রমণ চালান। ইসরায়েলের দাবি, এর জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পরে ট্রাম্প উভয় পক্ষকেই প্রকাশ্যে তিরস্কার করেন।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচু্ক্তিতে বাগড়া ইসরায়েলের, জোরালো আক্রমণের ঘোষণা

রোববার (১৪ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েল আবারও বৈরুতে হামলা চালায়। এর আগে লেবানন থেকে ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছিল। ট্রাম্প ওই হামলাকে ‘ছোট ও অর্থহীন’ বলে বর্ণনা করেন।

পরদিন রাতে জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, দৃঢ় ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে ইসরায়েল এখন ‘শক্তিশালী ও স্থিতিশীল’। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার মাঝে মাঝে মতপার্থক্য হয়েছে।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। অনেক বিষয়ে আমাদের মত এক হয়, আবার কিছু বিষয়ে ভিন্নতাও থাকে। আমি ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে আছি।’

নির্বাচনের আগে বাড়ছে চাপ

আসন্ন শরতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পরাজয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ট্রাম্পের অবস্থান উপেক্ষা করতে আরও আগ্রহী হতে পারেন। কারণ জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলি জনগণের একটি বড় অংশ এখন দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে সন্দিহান।

বারাক এইচ ওবামা প্রশাসনের সময়ে ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড্যান শ্যাপিরো বলেন, ‘এটি স্বার্থগত বিভেদের একটি অত্যন্ত স্পষ্ট মুহূর্ত’।

বর্তমানে আটলান্টিক কাউন্সিলের এই গবেষক বলেন, নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে চুক্তির বিরোধিতা করে ট্রাম্পের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চাইবেন না। তবে তিনি ইঙ্গিত দেবেন যে, ইসরায়েল এ চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং প্রয়োজনে নিজস্ব পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।

ইসরায়েল ইতোমধ্যে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতায় তারা বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে না।

শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এর বিস্তারিত শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, এতে লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সেনা মোতায়েন বজায় রাখবে এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ‘অপারেশনাল স্বাধীনতা’ ধরে রাখবে।

তিনি বলেন, ইরান চেয়েছিল আমরা সেখান থেকে সরে আসি। কিন্তু আমি সেই অবস্থান মেনে নেইনি। আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা বজায় রাখছি এবং উত্তরাঞ্চলের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা বলয়ও ধরে রাখছি।

ইসরায়েলের উদ্বেগ কাটছে না

অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ পুনরায় খুলে যাবে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যত ৬০ দিনের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প উভয়েই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দমন এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করাকে যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু এসব বিষয় বর্তমান আলোচনার আনুষ্ঠানিক এজেন্ডায় নেই বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

তিনজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের ধারণা ৬০ দিনের চুক্তির মেয়াদ ৯০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। একই সঙ্গে বৃহত্তর সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলজুড়ে তার সামরিক উপস্থিতিও বজায় রাখবে।

আরও দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে ট্রাম্প যখন প্রথমবারের মতো বলেন যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, তখন ইসরায়েল বিস্মিত হয়েছিল। তাদের মতে, আলোচনায় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ইসরায়েল খুব কমই সফল হয়েছে।

সব কর্মকর্তাই পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেছেন, কারণ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করার অনুমতি তাদের ছিল না।

‘এই চুক্তি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করা কঠিন’

ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা ও জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ও নেতানিয়াহু একাধিকবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছিলেন। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি ভোটারদের কাছে নিজেকে রিপাবলিকান ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দক্ষ নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তর করে এবং আব্রাহাম চুক্তিকে সমর্থন দেয়। এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। একই সময়ে ট্রাম্প ওবামা আমলের ইরান পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেন, যেটিকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল বলে সমালোচনা করে আসছিল।

২০১৯ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহু তেলআবিব ও জেরুজালেমে বড় বড় বিলবোর্ড টাঙিয়েছিলেন। সেখানে তাকে ট্রাম্পের সঙ্গে হাসিমুখে করমর্দন করতে দেখা যায়। তবে বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি নেতানিয়াহুর সেই রাজনৈতিক সুবিধাকেই দুর্বল করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, নেতানিয়াহু এই চুক্তি ইসরায়েলি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবেন না। সর্বোচ্চ তিনি আশা করতে পারেন, আলোচনা ব্যর্থ হবে এবং ৬০ দিনের মধ্যে ইসরায়েলের অনুকূলে যুদ্ধ আবার শুরু হবে।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের শুক্রবার প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৪১ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি মনে করেন, ট্রাম্পের কাছে তাদের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। গত মার্চ মাসে এ হার ছিল ৬৪ শতাংশ।

এদিকে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, ইরান যদি তার পারমাণবিক বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, তবে ইসরায়েল একাই ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ইরান যদি তার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনরায় চালুর চেষ্টা করে, আমরা সেখানে থাকব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

Continue Reading

Trending