বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সম্প্রতি যে নতুন নামটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তিনি হলেন জাইমা রহমান—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানের একমাত্র কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনী এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাতনী। তার শান্ত, পরিমিত ও পেশাদারী উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
জাইমা জারনাজ রহমান জন্মগ্রহণ করেন ২৬ অক্টোবর ১৯৯৫ সালে, ঢাকায়। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার—জিয়া–মজুমদার পরিবারের সদস্য। তার বাবা তারেক রহমান বিএনপির শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং মা ড. জুবাইদা রহমান একজন চিকিৎসক। দাদা–দাদি হলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত হলো ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন, যখন তিনি মাত্র ছয় বছর বয়সে দাদী খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যান এবং প্রথমবার গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
শিক্ষাজীবন ও পেশাগত পরিচয়
জাইমা রহমান তার প্রাথমিক জীবন কাটান ঢাকার সেনানিবাসে। ২০০৮ সালে তার বাবা গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর পরিবারসহ তিনি লন্ডনে চলে যান এবং দীর্ঘ ১৭ বছর সেখানেই অবস্থান করেন। লন্ডনে থেকেই তার শিক্ষা ও পেশাগত বিকাশ ঘটে।
শিক্ষা
আইন বিষয়ে স্নাতক: কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন (Queen Mary University of London)
Bar-at-Law: ২০১৯ সালে লন্ডনের লিংকনস ইন (Lincoln’s Inn) থেকে বার অ্যাট ল’ উত্তীর্ণ।
পেশা
জাইমা রহমান যুক্তরাজ্যে প্রশিক্ষিত একজন ব্যারিস্টার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা অনেকের মতো তিনি শুরু থেকেই রাজনীতিতে অংশ নেননি; বরং আইন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং আধুনিক বিচারব্যবস্থার অভিজ্ঞতা তার প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের থেকে তাকে আলাদা করেছে।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা: নীরবতা থেকে এগিয়ে আসা
যদিও দীর্ঘ সময় তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন না, তবুও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন—
২০২১ সালের বিতর্কের পর জাতীয় নজরকাড়া
আওয়ামী লীগের প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান তার সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করলে বিষয়টি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে মুরাদ হাসানকে পদত্যাগ করতে হয় এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এই ঘটনাই তাকে সরাসরি জনদৃষ্টিতে আনে।
২০২5 সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপি প্রতিনিধিদলে অংশগ্রহণ
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ৭৩তম ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট–এ তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রতিনিধিদলে অংশ নেন যেখানে উপস্থিত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নেতৃবৃন্দ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ তার রাজনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
বিনপির ভার্চুয়াল বৈঠকে প্রথম অংশগ্রহণ (২০২৫)
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তিনি প্রথমবারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল বৈঠকে যোগ দেন, যেখানে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। এই অংশগ্রহণকে দলীয় নেতারা তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রার সম্ভাব্য সূচনা বলে মনে করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা ও প্রত্যাবর্তন (ডিসেম্বর ২০২৫)
১৭ বছর পর বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি একটি আবেগঘন বার্তা দেন-
“I never forgot to tend to and cultivate my roots”
এই বার্তার মধ্য দিয়ে তিনি পরিবার, রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে তার অবস্থানকে অনেকটা স্পষ্ট করেন। বিশ্লেষকদের মতে, তার এই ভাষ্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক এঙ্গেজমেন্টের একটি কৌশলগত ইঙ্গিত।
সামাজিক–সাংস্কৃতিক ভূমিকা
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার উপস্থিতি তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলছে।
নারী নেতৃত্বের সম্ভাব্য রোল মডেল হিসেবে তাকে অনেকে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক পরিসরে তার যোগাযোগ–সম্পৃক্ততা বিএনপির কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন তিনি আলোচনায়?
রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম, কিন্তু দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে থাকা—যা রহস্য তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে প্রশিক্ষিত তরুণ ব্যারিস্টার, যা রাজনীতিতে নতুন ব্র্যান্ডিং তৈরি করছে।
বিএনপি–র পুনর্গঠন, যুবভিত্তি শক্তিশালীকরণ এবং ২০২৬ নির্বাচনের আগে দলীয় ভাবমূর্তি নতুন করে সাজানোর অংশ হিসেবে তাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাইমা রহমান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন তা ঘোষণা করেননি। তবুও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং সাম্প্রতিক কার্যক্রম তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভাবনাময় এক নতুন মুখ হিসেবে তুলে ধরেছে। তিনি কি ভবিষ্যতে বিএনপি–র নেতৃত্বে আরও সক্রিয় হবেন—এ প্রশ্ন এখন জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।