বিজ্ঞান ডেস্ক
হঠাৎ পায়ের নিচের মাটি কেঁপে ওঠা বা দালানকোঠা দুলে ওঠার আতঙ্ক আমরা অনেকেই অনুভব করেছি। কিন্তু পৃথিবীর গভীরে ঠিক কী পরিবর্তনের কারণে এই ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়? মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) ও বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে এর নেপথ্যের কারণ ও কারিগরি বিশ্লেষণ।
টেকটনিক প্লেটের ঘর্ষণ ও শক্তির মুক্তি
বিজ্ঞানীরা জানান, পৃথিবী কোনো অখণ্ড বা একক ভূখণ্ড নয়। এর গঠন চারটি প্রধান স্তরে বিভক্ত—অন্তঃস্থ কেন্দ্র, বহিস্থ কেন্দ্র, ম্যান্টল ও ভূত্বক। পৃথিবীর উপরিভাগ বা ভূত্বক অনেকগুলো বিশাল খণ্ডে বিভক্ত, যেগুলোকে ‘টেকটনিক প্লেট’ বলা হয়। এই প্লেটগুলো স্থির নয়, বরং ধীরগতিতে নড়াচড়া করে।
যখন দুটি প্লেট একে অপরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অমসৃণ কিনারায় আটকে যায়, তখন সেখানে প্রচণ্ড শক্তির সঞ্চার হয়। প্লেটের বাকি অংশ নড়তে চাইলেও কিনারা আটকে থাকায় সেখানে চাপ বাড়ে। একসময় এই সঞ্চিত চাপ ঘর্ষণ বলের চেয়ে বেশি হলে প্লেটগুলো হঠাৎ পিছলে যায় বা ভেঙে সরে যায়। তখনই সঞ্চিত শক্তি ‘সিসমিক ওয়েভ’ বা তরঙ্গ আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যা আমরা ভূমিকম্প হিসেবে অনুভব করি।
হাইপোসেন্টার ও এপিসেন্টার: পার্থক্য কোথায়?
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও প্রভাব নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে কিছু পরিভাষা জানা জরুরি। মাটির নিচে যে স্থানে শিলাস্তর ফেটে বা পিছলে গিয়ে কম্পন শুরু হয়, তাকে বলা হয় ‘হাইপোসেন্টার’ (Hypocenter)। আর ঠিক এর সোজাসুজি ওপরে ভূপৃষ্ঠের অবস্থানটিকে বলা হয় ‘এপিসেন্টার’ (Epicenter)। সাধারণত এপিসেন্টার বা উপকেন্দ্রেই কম্পনের তীব্রতা বেশি অনুভূত হয়।
মেইনশক ও আফটারশক
বড় কোনো ভূমিকম্পের (মেইনশক) আগে কখনো কখনো ছোট কম্পন অনুভূত হয়, যাকে ‘ফোরশক’ বলা হয়। আবার মূল ভূমিকম্পের পরেও ভূস্তরের ভারসাম্য ফিরে আসতে সময় লাগে। ফলে মেইনশকের কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত একই স্থানে ছোট ছোট ভূমিকম্প হতে পারে, যা ‘আফটারশক’ নামে পরিচিত।
কীভাবে মাপা হয় ভূমিকম্প?
ভূমিকম্প পরিমাপের জন্য ‘সিসমোগ্রাফ’ যন্ত্র ব্যবহৃত হয়। এই যন্ত্রে মাটির কম্পন একটি গ্রাফ বা ‘সিসমোগ্রাম’-এ রেকর্ড হয়। সিসমোগ্রামের রেখা যত বেশি নড়বড়ে ও দীর্ঘ হয়, ভূমিকম্পের আকার বা ম্যাগনিচিউড তত বড় হয়।
ভূমিকম্পের অবস্থান নিখুঁতভাবে বের করতে বিজ্ঞানীরা ‘ট্রায়াঙ্গুলেশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। বজ্রপাতের আলো ও শব্দের গতির পার্থক্যের মতো, ভূমিকম্পের পি-তরঙ্গ (দ্রুতগামী) ও এস-তরঙ্গ (ধীরগামী) সিসমোগ্রাফে পৌঁছানোর সময়ের ব্যবধান হিসাব করে উৎপত্তিস্থল শনাক্ত করা হয়।
পূর্বাভাস কি সম্ভব?
বর্তমান বিজ্ঞানে বন্যা বা ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হলেও ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে তা এখনো অধরা। ইউএসজিএস-এর তথ্যমতে, বিজ্ঞানীরা জানেন পৃথিবীর কোন কোন ফল্ট লাইন বা চ্যুতিতে ভবিষ্যতে ভূমিকম্প হতে পারে। কিন্তু ঠিক ‘কখন’ বা ‘কোন সময়ে’ তা ঘটবে, তা বলার মতো কার্যকর কোনো পদ্ধতি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতিই ভূমিকম্প মোকাবিলার একমাত্র উপায়।