মূল অংশে যান
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ · ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ · ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি ✍️ Blog / Citizen Journalism👤 লগইন
ব্রেকিং
📣 Citizen Journalism · 📰 নাগরিক খবর / এলাকার সমস্যা

শাস্তি নয়, প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন: তরুণদের মাদক থেকে রক্ষায় এখনই বদলাতে হবে কৌশল

নাগরিক সাংবাদিক: Limia
📍 মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র · ৪ নভেম্বর ২০২৬, ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ
মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের অপব্যবহার তরুণদের স্বাস্থ্য, পরিবার ও সামাজিক জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের অপব্যবহার তরুণদের স্বাস্থ্য, পরিবার ও সামাজিক জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। · ছবি: Limia

বাংলাদেশে মাদক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত সীমান্ত, চোরাচালান, অভিযান, গ্রেপ্তার ও শাস্তির কথা সামনে আসে। এসব পদক্ষেপের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিতে সমস্যাটি দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়: আমাদের কিশোর ও তরুণরা কেন মাদকের দিকে যাচ্ছে?

মাদকাসক্তি কেবল ব্যক্তিগত চরিত্রের দুর্বলতা নয়। এর সঙ্গে পরিবার, বন্ধুমহল, মানসিক চাপ, বেকারত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল যোগাযোগের সম্পর্ক রয়েছে। একজন তরুণ যখন প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে, তখন অনেক ক্ষেত্রে সে অপরাধী হওয়ার পরিকল্পনা করে না। কৌতূহল, বন্ধুর চাপ, হতাশা, একাকিত্ব কিংবা সাময়িকভাবে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা তাকে প্রথম পদক্ষেপটির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

কিন্তু সেই প্রথম পদক্ষেপই পরবর্তী সময়ে নির্ভরতা, অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট এবং অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ঝুঁকিতে তরুণরা
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি সরকারি কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বড় অংশ। সেখানে এই বয়সীদের অনুপাত ২০২১ সালে ২১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

এই তথ্য পুরো বাংলাদেশের চিত্র নয়, কারণ এটি একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের রোগীদের তথ্য। তবু বিষয়টি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়। শিক্ষা শেষ করা, চাকরি খোঁজা, কর্মজীবনে প্রবেশ, পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণ এবং নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার চাপ সাধারণত এই বয়সেই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।

এই সময় কোনো তরুণ যদি ব্যর্থতা, বেকারত্ব, সম্পর্কের সংকট অথবা মানসিক সমস্যার মধ্যে পড়ে, অথচ পরিবার ও সমাজে কথা বলার নিরাপদ জায়গা না পায়, তাহলে ক্ষতিকর বন্ধুমহল বা মাদকের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে।

## বদলে যাচ্ছে মাদকের ধরন ও সরবরাহের পথ

বাংলাদেশে গাঁজা, হেরোইন ও কোডিনযুক্ত সিরাপের অপব্যবহার দীর্ঘদিনের সমস্যা। এর সঙ্গে এখন ইয়াবা, আইস বা ক্রিস্টাল মেথ এবং অন্যান্য সিনথেটিক মাদকের ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে। পথশিশুদের মধ্যে কম দামে পাওয়া আঠাজাতীয় পদার্থ ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আরেকটি উদ্বেগজনক পরিবর্তন হলো ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যবহার। আগে মাদক বিক্রির জন্য পরিচিত এলাকা বা সরাসরি যোগাযোগের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতো। এখন অনলাইন নেটওয়ার্ক এবং যোগাযোগমাধ্যম নতুন ধরনের মাদক ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। ফলে অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় সমাজের চোখ এড়িয়ে তরুণদের কাছে পৌঁছানো আগের তুলনায় সহজ হতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি তাই ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ, অনলাইন অভিযোগ গ্রহণ এবং তরুণদের ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

ভয় দেখানো প্রচার কেন যথেষ্ট নয়
মাদকবিরোধী প্রচারে আমরা প্রায়ই দেখি: “মাদককে না বলুন”, “মাদক জীবন ধ্বংস করে” অথবা “মাদকসেবী সমাজের শত্রু”। বার্তাগুলো ভুল নয়। কিন্তু শুধু ভয়, লজ্জা ও সামাজিক নিন্দা ব্যবহার করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না।

আসক্তিকে কেবল নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে অনেক পরিবার বিষয়টি গোপন রাখে। চিকিৎসার পরিবর্তে সন্তানকে মারধর, অপমান, ঘরে আটকে রাখা কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয়। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি আরও একা হয়ে যেতে পারে এবং চিকিৎসা গ্রহণে অনীহা তৈরি হতে পারে।

মাদক বিক্রেতা ও চোরাচালানকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দরকার। কিন্তু মাদকনির্ভর একজন তরুণকে একইভাবে দেখলে সামাজিক পুনর্বাসনের পথ সংকুচিত হয়। একজনাসক্ত ব্যক্তির প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ।

পরিবারকে প্রথম প্রতিরোধব্যবস্থা হতে হবে
তরুণদের সুরক্ষায় পরিবারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত ও বিচারহীনভাবে কথা বলা। আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, দীর্ঘ সময় নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা, পরিচিত বন্ধুমহল বদলে যাওয়া, পড়াশোনা বা কাজে আগ্রহ কমে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক অর্থের চাহিদা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

তবে এমন পরিবর্তন দেখলেই কাউকে মাদকাসক্ত বলা উচিত নয়। একই লক্ষণ মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অন্য সমস্যার কারণেও হতে পারে। সন্দেহ হলে অপমান বা শাস্তির পরিবর্তে শান্তভাবে কথা বলে চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী বা স্বীকৃত আসক্তি চিকিৎসাসেবার সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে সন্তান বিপদে পড়লে শাস্তির ভয় না পেয়ে সত্য বলতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব উপস্থিতি গণনার চেয়ে বড়
বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকবিরোধী কমিটি থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শিক্ষক ও কাউন্সেলরদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শনাক্ত করা, গোপনীয়তার সঙ্গে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজনে শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার প্রশিক্ষণ দরকার।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবা, ক্যারিয়ার পরামর্শ এবং সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং থাকা প্রয়োজন। কারণ প্রতিরোধ মানে শুধু মাদকের ক্ষতি শেখানো নয়; তরুণদের জীবনে অর্থবহ বিকল্প, সামাজিক সংযোগ এবং ভবিষ্যতের আশা তৈরি করাও প্রতিরোধের অংশ।

শিক্ষার্থী কোনো সমস্যায় পড়লে যাতে বহিষ্কারই প্রথম সিদ্ধান্ত না হয়, সে জন্য একটি স্পষ্ট সহায়তা ও রেফারেল নীতি থাকা উচিত।

চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সহজলভ্য করতে হবে
চিকিৎসা শুধু বড় শহরের উচ্চমূল্যের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো পিছিয়ে পড়বে। জেলা পর্যায়ে সাশ্রয়ী চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা বাড়ানো জরুরি।

পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোর মানও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। সেখানে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও কাউন্সেলর আছেন কি না, রোগীর মর্যাদা রক্ষা করা হচ্ছে কি না এবং নির্যাতন বা জোরপূর্বক আটকে রাখার অভিযোগ আছে কি না, এসব বিষয়ে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।

চিকিৎসার পর শিক্ষা বা কর্মজীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে পুনরায় মাদক গ্রহণের ঝুঁকি থেকে যায়। তাই দক্ষতা প্রশিক্ষণ, চাকরির প্রস্তুতি এবং সামাজিক পুনঃঅন্তর্ভুক্তিকে চিকিৎসারই অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ
বাংলাদেশে তরুণদের মাদক থেকে রক্ষা করতে পাঁচটি বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন:

১. সীমান্ত ও স্থানীয় পর্যায়ে মাদক সরবরাহ বন্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ;
২. স্কুল-কলেজে প্রমাণভিত্তিক প্রতিরোধ শিক্ষা ও কাউন্সেলিং;
৩. পরিবারকে প্রাথমিক লক্ষণ ও সহায়তার উপায় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ;
৪. জেলা পর্যায়ে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন;
৫. চিকিৎসা শেষে শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সামাজিক পুনঃঅন্তর্ভুক্তি।

মাদক সমস্যা মোকাবিলা শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন, সংবাদমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও ভূমিকা রয়েছে।

আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হবে আক্রান্ত তরুণকে শুধু অপরাধী, ব্যর্থ বা পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখা। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি আসক্তিতে আক্রান্ত মানুষের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা এবং ফিরে আসার সম্মানজনক পথ।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে শুধু প্রশ্ন করলে হবে না, “কে মাদক গ্রহণ করছে?” আমাদের জানতে হবে, “কেন করছে, কে সরবরাহ করছে এবং বিপদে পড়ার আগে আমরা কোথায় ছিলাম?”

একটি সমাজের শক্তি শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতায় নয়, ঝুঁকিতে থাকা একজন তরুণকে সময়মতো ধরে রাখার সক্ষমতাতেও প্রকাশ পায়।

ⓘ এই লেখা ও ছবি নাগরিক সাংবাদিকের নিজস্ব। লেখার তথ্য, মতামত ও ছবির সম্পূর্ণ দায় লেখকের; এটি AllTimeNews-এর সম্পাদকীয় মত নয়। কোনো ভুল বা আপত্তিকর বিষয় চোখে পড়লে “⚑ রিপোর্ট” করুন — আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব। · নিয়ম ও দায়

লেখাটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া

প্রতিক্রিয়া জানাতে লগইন করুন · নতুন? অ্যাকাউন্ট খুলুন (বিনামূল্যে)

💬 মন্তব্য

✍️ মন্তব্য লিখুন… — মন্তব্য করতে বিনামূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন
আগে থেকেই অ্যাকাউন্ট আছে? লগইন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য লেখকের নিজস্ব মত, AllTimeNews-এর নয়। অশালীন, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিজ্ঞাপনমূলক মন্তব্য মুছে ফেলা হবে। · গোপনীয়তা / Datenschutz