হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার খোয়াই নদীর তীররক্ষা বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। টানা বর্ষণ ও ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে বাঁধের একাংশ ধসে পড়ার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে ডুবে গেছে অসংখ্য বসতবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের খামার ও গ্রামীণ সড়ক। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে এ খাতে প্রায় ৩০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৯ জুলাই রাত প্রায় ৯টার দিকে সদর উপজেলার চরহামুয়া-কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর ডান তীররক্ষা বাঁধের একটি বড় অংশ ভেঙে যায়। এরপর নদীর পানি দ্রুত লোকালয়ে প্রবেশ করে। প্রথম দিনেই প্রায় ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পরবর্তী সময়ে পানি ছড়িয়ে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের সংখ্যা বেড়ে ২৫টিতে পৌঁছেছে। নতুন করে বাহুবল উপজেলার লামাতাশী ইউনিয়ন এবং সদর উপজেলার পইল ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকাও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
চরহামুয়া, কালীগঞ্জ, লস্করপুর, পইল, তেঘরিয়া ও আলাপুরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পানি প্রবেশ করায় হাজারো পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এবং সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে আলাপুর-কালীগঞ্জ এলাকায় অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ ও তীররক্ষা বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে। সম্প্রতি আরও কয়েকটি শক্তিশালী ড্রেজার যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তাদের দাবি, পাহাড়ি ঢলের তীব্র চাপে সেই দুর্বল অংশ ভেঙেই এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
লস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উজ্জ্বল মিয়া বলেন, বছরের পর বছর অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলেই বাঁধের ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেছে। দ্রুত এসব কার্যক্রম বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার প্রশাসনের কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ জানিয়েও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। তাদের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নজরদারির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চালিয়ে এসেছে।
বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ জি কে গউছ, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা। এ সময় জি কে গউছ অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত সংস্কার এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন।
পরিদর্শন শেষে তিনি বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করেন। জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানও দুর্গত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাকসুদুল আলম জানান, বন্যায় একাধিক মাছের খামার ভেসে গেছে। পাশাপাশি সবজির ক্ষেত, ফলের বাগান ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, খোয়াই নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও কালনী-কুশিয়ারা ও সুতাং নদীর পানি এখনও বাড়ছে। চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে খোয়াই নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ওপরে রয়েছে। এছাড়া সদর উপজেলার কালীগঞ্জ এবং বানিয়াচং উপজেলার রাঘপুর এলাকায় নতুন করে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
দুর্গত এলাকাবাসীর দাবি, শুধু বাঁধ সংস্কার নয়, খোয়াই নদীতে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দ্রুত পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা একই ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।