আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার শিরোনামে ৩৬ দফা অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার প্রকাশ করা হয়।
ইশতেহারের ৩৬ দফা হলো-
১. জুলাই সনদের যে দফাগুলো আইন ও আদেশের উপর নির্ভরশীল, তা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ্ধ
কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে।
২. জুলাইয়ে সংঘটিত গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী
ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি
ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে।
৩. ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং জাতি-পরিচয়ের কারণে যেকোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্যাতন ও নিপীড়নকে প্রতিহত করতে স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ার-সম্পন্ন মানবাধিকার কমিশনের একটি বিশেষ সেল গঠন করা হবে।
৪. মন্ত্রী, এমপিসহ সকল জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বাৎসরিক আয় ও সম্পদের হিসাব, সরকারি ব্যয় ও বরাদ্দের বিস্তারিত “হিসাব দাও” পোর্টালে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ ও হালনাগাদ করা হবে।
৫. আমলাতন্ত্রে ল্যাটেরাল এন্ট্রি বৃদ্ধি করা হবে এবং স্বাধীন পদোন্নতি কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরির শতভাগ পদোন্নতি হবে পার্ফরমেন্স-ভিত্তিক। পে-স্কেল মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তিন বছরে হালনাগাদ করা হবে এবং পে-স্কেলে ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদেমদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
৬. বিভিন্ন কার্ডের ঝামেলা ও জটিলতা দূর করতে এনআইডি কার্ডকেই সকল সেবা প্রাপ্তির জন্য ব্যবহার করা হবে।
৭. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা, বাধ্যতামূলক কর্ম-সুরক্ষা বীমা ও পেনশন নিশ্চিত করে শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
৮. টিসিবির বিদ্যমান এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে ট্রাকে লাইনে দাঁড়িয়ে নয়, বরং নিবন্ধিত মুদি দোকানে ব্যবহারযোগ্য করা হবে।
৯. সুনির্দিষ্ট বাড়িভাড়া কাঠামো তৈরি ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ/ ওয়াকফ সুকুক ভিত্তিতে সামাজিক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।
১০.গরীব ও মধ্যবিত্তের উপর করের বোঝা কমিয়ে, কর ফাঁকি বন্ধ করে কর-জিডিপি ১২%-এ উন্নীত করে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করা হবে ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে ।
১১. পরিকল্পিতভাবে LDC উত্তরণের জন্য আগাম FTA—CEPA করা হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য ও নতুন শিল্প গড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাত (ব্যাংকিং, ইন্সুরেন্স ও পুঁজিবাজারে) শৃঙ্খলা ফেরানো হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস, কঠোর আইন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যাহার নিশ্চিত করা হবে।
১২.স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামাতে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে, ৯৯৯-এর মতো হটলাইন চালু ও জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
১৩.মুদ্রাস্ফীতি ৬%-এ নামানো হবে; ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক ডেটা প্রকাশ বন্ধ করা হবে, রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্কুলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা চালু করে জনগণের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা হবে।
১৪. ভোটাধিকারের বয়স হবে ১৬ এবং তরুণদের কণ্ঠকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করতে Youth Civic Council গঠন করা হবে।
১৫. আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। SME খাতে ক্যাশফ্লো-ভিত্তিক ঋণ, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল, নিবন্ধন খরচ হ্রাস ও প্রথম ৫ বছরের করমুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
১৬. সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্লেসমেন্ট, ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বছরে ১৫ লাখ নিরাপদ ও দক্ষ প্রবাসী কর্মী গড়ে তোলা হবে।
১৭. শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিদ্যমান সকল ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও পদ্ধতিগুলোর একটি যৌক্তিক সমন্বয় করা হবে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও ৫ বছরে ৭৫% এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে।
১৮. উচ্চশিক্ষার সাথে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করতে স্নাতক পর্যায়ে ৬ মাসের পুর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ/ থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা হবে।
১৯. প্রবাসী গবেষকদের সিনিয়রিটি ও ল্যাবের জন্য এককালীন ফান্ডিং দিয়ে রিভার্স ব্রেন ড্রেইন করা হবে। কম্পিউটেশনাল গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করার জন্য একটি ন্যাশনাল কম্পিউটিং সার্ভার তৈরি করা হবে।
২০. হৃদরোগ, ক্যান্সার, ট্রমা, বন্ধ্যাত্ব ও জটিল অস্ত্রোপচারসহ জটিল ও দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন (SHZ) গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদেশে মেডিকেল ট্যুরিজমের বিকল্প তৈরি করা হবে।
২১. দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সার্বজনীন জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের জন্য জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ও প্রি–হসপিটাল এমার্জেন্সি সিস্টেম গঠন করা হবে যেখানে এমার্জেন্সি প্যারামেডিক রেসপন্স টিম সংযুক্ত থাকবে। সকল বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে অত্যাধুনিক এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোলা হবে। প্রতি জেলা হাসপাতালে অন্তত একটি অত্যাধুনিক সুবিধা সম্বলিত আইসিইউ ও সিসিইউ এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
২২. প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এনআইডি ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ ইনস্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
২৩. নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করবো যার সংখ্যা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সাথে সাথে হ্রাস করা হবে।
২৪. সকল প্রতিষ্ঠানে পূর্ণবেতনে ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ও ১ মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা হবে। সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ চালু করা হবে এবং ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করা হবে।
২৫. উপজেলা-ভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামোতে স্যানিটারি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকারি স্কুল ও কলেজে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হবে।
২৬. একটি “ডায়াস্পোরা ডিজিটাল পোর্টাল” (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) গড়ে তোলা হবে, যেখানে পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, কনস্যুলার সেবা, বিনিয়োগ ইত্যাদি সবকিছু অনলাইনে করা যাবে। বিমানবন্দর ও দূতাবাসে হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং চালু করা হবে।
২৭. প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণের বিপরীতে বিনিয়োগ ও পেনশন সুবিধা এবং বিমানে RemitMiles নামে ট্রাভেল মাইলস প্রদান করা হবে।
২৮. প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
২৯. ঢাকা ও চট্টগ্রামে একক কর্তৃপক্ষের আওতায় সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা করা হবে এবং মালবাহী ট্রেন বাড়িয়ে সড়কপথে ট্রাকের চাপ কমানো হবে।
৩০. দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, পরিচ্ছন্ন যানবাহন ও সবুজ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা হবে। পাঁচ বছরে বিদ্যুতের অন্তত ২৫% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন ও সরকারি ক্রয়ে ৪০% ইলেকট্রিক ভেহিকল চালু করা হবে।
৩১. দেশের সকল শিল্পকারখানায় ইটিপি (ETP) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এর ব্যয় কমাতে কর ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। শিল্পদূষণ, নদী-খাল দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।
৩২. এনআইডি-ভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি ক্যাশব্যাকের মাধ্যমে সার, বীজ ও যন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় কেন্দ্র, মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ ও ওয়্যারহাউজ স্থাপন করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য ক্রয় নিশ্চিত করা হবে।
৩৩. দেশীয় বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে। খাদ্য ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
৩৪. ভারতের সাথে সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা, অসম চুক্তিসহ সকল বিদ্যমান ইস্যুতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃঢ় ভূমিকা নেয়া হবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে যাওয়া হবে।
৩৫. দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মানবিক সমাধান ও আসিয়ানে যুক্ত হয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করা হবে।
৩৬. সশস্ত্র বাহিনীর জন্য রেগুলার ফোর্সের দ্বিগুন আকারের রিজার্ভ ফোর্স তৈরি করা হবে। পাঁচ বছরে সেনাবাহিনীতে একটি UAV (Unmanned Aerial Vehicle) ব্রিগেড গঠন ও মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণ করা হবে।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে রাজনীতিক, ছাত্রনেতা, অধিকারকর্মী ও অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাসহ বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, ছাত্রনেতা নেহা বোরা, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। সাবেক ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকেও আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি রয়েছে আন্দোলনকারীদের। তাদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এ সংশোধন করা হচ্ছে।
দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের যাতায়াত ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথে অনেককে আটক করে বাস ও ভ্যানে করে অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসানো, যানবাহনে তল্লাশি এবং মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে আটক ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভিন্নতা রয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস শনিবার বিকেল পর্যন্ত দিল্লিতে প্রায় দুই হাজার মানুষকে আটকের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, আগের দিন ককরোচ জনতা পার্টির এক মুখপাত্র দাবি করেছিলেন, দেশজুড়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে স্থগিত হওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পরীক্ষার্থীরা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ের আগে এ সিদ্ধান্ত জানানো হলে ক্ষোভে সড়কে নামেন চাকরিপ্রার্থীরা। এতে কয়েকটি এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
সকাল ১১টায় অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা (১১তম গ্রেড) পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসায় কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে।
এরপর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সাতমসজিদ রোড, বাংলা কলেজ ও খিলগাঁওসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু করেন পরীক্ষার্থীরা। তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার ব্যাখ্যা ও দায়ীদের জবাবদিহি দাবি করেন।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অবরোধের বিষয়টি নিশ্চিত করে শেরেবাংলা নগর থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. লোকমান হোসেন বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আন্দোলনকারীরা আড়ং সিগনালে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন।
তিনি জানান, আসাদগেট থেকে ধানমন্ডিগামী সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ধানমন্ডি থেকে আসাদগেটমুখী সড়কে অবস্থান নিয়েছেন পরীক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভের সময় চাকরিপ্রার্থীদের ‘প্রশ্ন ফাঁস হলো কেন, প্রশাসন জবাব চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।
May be an image of one or more people, crowd and text
কেন্দ্রে পৌঁছেও পরীক্ষা দিতে পারেননি প্রার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী। নির্ধারিত কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিতের খবর পেয়ে তারা বিপাকে পড়েন। অনেকের অভিযোগ, আগে থেকে কোনো ঘোষণা না দিয়েই পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
রাজধানীর মাদারটেকের এ আজিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসা ঈমান জানান, তারা কেন্দ্রে প্রবেশ করে নির্ধারিত আসনে বসার পর পরিদর্শক এসে জানান, পরীক্ষা হবে না। কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করেছে।
কেন পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না, তা জানতে চাইলে ঈমান মোল্লা বলেন, কেন্দ্র থেকে কোনো কারণ জানানো হয়নি। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে তারা শুনেছেন। তিনি ফরিদপুর থেকে পরীক্ষা দিতে ঢাকায় এসেছিলেন।
একই কেন্দ্রের আরেক পরীক্ষার্থী মো. তামিম জানান, তাদের কেন্দ্রেও একইভাবে পরীক্ষা স্থগিতের কথা জানানো হয়।
পরীক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ৩০০টি পদের কথা উল্লেখ ছিল। এসব পদের বিপরীতে সারা দেশ থেকে লক্ষাধিক প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন তারা।
জানা গেছে, রাজধানীর কয়েকটি কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণের পর পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এ দিকে মানিক মিয়া এভিনিউতে রাস্তা অবরোধকারীদের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি জানানো হয়েছে।
দাবিগুলো হলো:
১. প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. দূর থেকে পরীক্ষা দিতে আসা পরীক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে
৩. আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পরীক্ষা নিতে হবে
দাবি বাস্তবায়নের ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, আমরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কিছু দাবি জানিয়েছে। আন্দোলনকারীদের বাইরে কেউ যেনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে বিষয় খেয়াল রাখা হচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পূর্ব ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে ধরপাকড় শুরু করেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির পুলিশ।
ইতোমধ্যে দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সার ধ্রুব রাঠিসহ আরও কয়েক নেতাকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। এ ছাড়া বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা প্রায় হাজার মানুষকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
এক প্রতিবেদনে রয়টার্স বলছে শনিবার সকালে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। এ ছাড়া দলের দুই সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকা এবং আইন সহায়তা বিভাগের প্রধান রত্না সিংকেও আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অপরদিকে সিজেপির সেই কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়া ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে শনিবার ভোরে রাজধানী সংলগ্ন শহর গুরুগ্রাম থেকে আটক করেছে পুলিশ।
একইভাবে বিক্ষোভে যোগ দিতে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় ১ হাজার জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইয়ের বরাতে জানা গেছে, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর কথা বলে এই পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ।
ভারত, দিল্লি, বিক্ষোভ, ককরোচ জনতা পর্টি, সিজেপিমুম্বাই থেকে শনিবার সকালে দিল্লিতে পৌঁছান ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরই পুলিশ তাকে আটক করে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আটকের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
আটকের আগে দীপকে জানিয়েছিলেন, কারাগারে যেতে হলেও কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা আইনে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তাদের আন্দোলন থামবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তা
এদিকে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান জন্তর মন্তরসহ দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে এবং পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগে বিধিনিষেধ, একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং ট্রেন চলাচলে বিঘ্নের খবরও পাওয়া গেছে। ফলে বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ
ককরোচ জনতা পার্টির এবারের আন্দোলনের মূল দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। সংগঠনটির অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে ক্ষমতাসীন বিজেপির পক্ষে প্রভাবিত করা হচ্ছে। তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি- দুই পক্ষই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সরকারের জবাবদিহির মতো ইস্যুতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এবার নির্বাচনি স্বচ্ছতার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে তারা।
এদিকে বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন ককরোচ জনতা পার্টি ও বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনকে ‘নৈরাজ্যবাদী’ কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেছেন, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
বিক্ষোভের আগেই আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের আটক এবং শত শত মানুষকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।