আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার শিরোনামে ৩৬ দফা অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার প্রকাশ করা হয়।
ইশতেহারের ৩৬ দফা হলো-
১. জুলাই সনদের যে দফাগুলো আইন ও আদেশের উপর নির্ভরশীল, তা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ্ধ
কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে।
২. জুলাইয়ে সংঘটিত গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী
ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি
ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে।
৩. ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং জাতি-পরিচয়ের কারণে যেকোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্যাতন ও নিপীড়নকে প্রতিহত করতে স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ার-সম্পন্ন মানবাধিকার কমিশনের একটি বিশেষ সেল গঠন করা হবে।
৪. মন্ত্রী, এমপিসহ সকল জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বাৎসরিক আয় ও সম্পদের হিসাব, সরকারি ব্যয় ও বরাদ্দের বিস্তারিত “হিসাব দাও” পোর্টালে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ ও হালনাগাদ করা হবে।
৫. আমলাতন্ত্রে ল্যাটেরাল এন্ট্রি বৃদ্ধি করা হবে এবং স্বাধীন পদোন্নতি কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরির শতভাগ পদোন্নতি হবে পার্ফরমেন্স-ভিত্তিক। পে-স্কেল মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তিন বছরে হালনাগাদ করা হবে এবং পে-স্কেলে ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদেমদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
৬. বিভিন্ন কার্ডের ঝামেলা ও জটিলতা দূর করতে এনআইডি কার্ডকেই সকল সেবা প্রাপ্তির জন্য ব্যবহার করা হবে।
৭. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা, বাধ্যতামূলক কর্ম-সুরক্ষা বীমা ও পেনশন নিশ্চিত করে শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
৮. টিসিবির বিদ্যমান এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে ট্রাকে লাইনে দাঁড়িয়ে নয়, বরং নিবন্ধিত মুদি দোকানে ব্যবহারযোগ্য করা হবে।
৯. সুনির্দিষ্ট বাড়িভাড়া কাঠামো তৈরি ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ/ ওয়াকফ সুকুক ভিত্তিতে সামাজিক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।
১০.গরীব ও মধ্যবিত্তের উপর করের বোঝা কমিয়ে, কর ফাঁকি বন্ধ করে কর-জিডিপি ১২%-এ উন্নীত করে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করা হবে ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে ।
১১. পরিকল্পিতভাবে LDC উত্তরণের জন্য আগাম FTA—CEPA করা হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য ও নতুন শিল্প গড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাত (ব্যাংকিং, ইন্সুরেন্স ও পুঁজিবাজারে) শৃঙ্খলা ফেরানো হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস, কঠোর আইন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যাহার নিশ্চিত করা হবে।
১২.স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামাতে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে, ৯৯৯-এর মতো হটলাইন চালু ও জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
১৩.মুদ্রাস্ফীতি ৬%-এ নামানো হবে; ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক ডেটা প্রকাশ বন্ধ করা হবে, রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্কুলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা চালু করে জনগণের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা হবে।
১৪. ভোটাধিকারের বয়স হবে ১৬ এবং তরুণদের কণ্ঠকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করতে Youth Civic Council গঠন করা হবে।
১৫. আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। SME খাতে ক্যাশফ্লো-ভিত্তিক ঋণ, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল, নিবন্ধন খরচ হ্রাস ও প্রথম ৫ বছরের করমুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
১৬. সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্লেসমেন্ট, ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বছরে ১৫ লাখ নিরাপদ ও দক্ষ প্রবাসী কর্মী গড়ে তোলা হবে।
১৭. শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিদ্যমান সকল ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও পদ্ধতিগুলোর একটি যৌক্তিক সমন্বয় করা হবে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও ৫ বছরে ৭৫% এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে।
১৮. উচ্চশিক্ষার সাথে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করতে স্নাতক পর্যায়ে ৬ মাসের পুর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ/ থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা হবে।
১৯. প্রবাসী গবেষকদের সিনিয়রিটি ও ল্যাবের জন্য এককালীন ফান্ডিং দিয়ে রিভার্স ব্রেন ড্রেইন করা হবে। কম্পিউটেশনাল গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করার জন্য একটি ন্যাশনাল কম্পিউটিং সার্ভার তৈরি করা হবে।
২০. হৃদরোগ, ক্যান্সার, ট্রমা, বন্ধ্যাত্ব ও জটিল অস্ত্রোপচারসহ জটিল ও দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন (SHZ) গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদেশে মেডিকেল ট্যুরিজমের বিকল্প তৈরি করা হবে।
২১. দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সার্বজনীন জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের জন্য জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ও প্রি–হসপিটাল এমার্জেন্সি সিস্টেম গঠন করা হবে যেখানে এমার্জেন্সি প্যারামেডিক রেসপন্স টিম সংযুক্ত থাকবে। সকল বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে অত্যাধুনিক এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোলা হবে। প্রতি জেলা হাসপাতালে অন্তত একটি অত্যাধুনিক সুবিধা সম্বলিত আইসিইউ ও সিসিইউ এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
২২. প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এনআইডি ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ ইনস্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
২৩. নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করবো যার সংখ্যা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সাথে সাথে হ্রাস করা হবে।
২৪. সকল প্রতিষ্ঠানে পূর্ণবেতনে ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ও ১ মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা হবে। সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ চালু করা হবে এবং ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করা হবে।
২৫. উপজেলা-ভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামোতে স্যানিটারি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকারি স্কুল ও কলেজে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হবে।
২৬. একটি “ডায়াস্পোরা ডিজিটাল পোর্টাল” (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) গড়ে তোলা হবে, যেখানে পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, কনস্যুলার সেবা, বিনিয়োগ ইত্যাদি সবকিছু অনলাইনে করা যাবে। বিমানবন্দর ও দূতাবাসে হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং চালু করা হবে।
২৭. প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণের বিপরীতে বিনিয়োগ ও পেনশন সুবিধা এবং বিমানে RemitMiles নামে ট্রাভেল মাইলস প্রদান করা হবে।
২৮. প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
২৯. ঢাকা ও চট্টগ্রামে একক কর্তৃপক্ষের আওতায় সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা করা হবে এবং মালবাহী ট্রেন বাড়িয়ে সড়কপথে ট্রাকের চাপ কমানো হবে।
৩০. দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, পরিচ্ছন্ন যানবাহন ও সবুজ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা হবে। পাঁচ বছরে বিদ্যুতের অন্তত ২৫% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন ও সরকারি ক্রয়ে ৪০% ইলেকট্রিক ভেহিকল চালু করা হবে।
৩১. দেশের সকল শিল্পকারখানায় ইটিপি (ETP) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এর ব্যয় কমাতে কর ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। শিল্পদূষণ, নদী-খাল দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।
৩২. এনআইডি-ভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি ক্যাশব্যাকের মাধ্যমে সার, বীজ ও যন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় কেন্দ্র, মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ ও ওয়্যারহাউজ স্থাপন করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য ক্রয় নিশ্চিত করা হবে।
৩৩. দেশীয় বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে। খাদ্য ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
৩৪. ভারতের সাথে সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা, অসম চুক্তিসহ সকল বিদ্যমান ইস্যুতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃঢ় ভূমিকা নেয়া হবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে যাওয়া হবে।
৩৫. দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মানবিক সমাধান ও আসিয়ানে যুক্ত হয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করা হবে।
৩৬. সশস্ত্র বাহিনীর জন্য রেগুলার ফোর্সের দ্বিগুন আকারের রিজার্ভ ফোর্স তৈরি করা হবে। পাঁচ বছরে সেনাবাহিনীতে একটি UAV (Unmanned Aerial Vehicle) ব্রিগেড গঠন ও মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণ করা হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম গতিশীল করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে দেশের সব সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দর ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিষয়টি জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকা বিমানবন্দরে আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
মাহদী আমিন জানান, সরকারের সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করবে, যাতে দেশের প্রতিটি বন্দর ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে সক্ষম হয়। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, বৈঠকে দেশের বেসরকারি খাতের বিভিন্ন সমস্যা, বিনিয়োগের পরিবেশ, শিল্পায়নের প্রতিবন্ধকতা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) পরিচালিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে কীভাবে আরও বেশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায় এবং বিদ্যমান জটিলতা দূর করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সরকারের নীতিগত সহায়তার বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, সরকার একটি ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গৃহীত নীতিমালার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা হবে।
তিনি বলেন, ব্যবসা সহজীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই সরকারের এই উদ্যোগ। বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়ীরাও বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার এবং যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতা ও বিভিন্ন আর্থিক অনুদানের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্ধিত এ সুবিধা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট অধিশাখা থেকে সম্প্রতি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ভাতা ও অনুদান বৃদ্ধির বিষয়টি জানানো হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার এবং যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতার পাশাপাশি উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, মহান বিজয় দিবসের বিশেষ অনুদান এবং বাংলা নববর্ষ ভাতার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আলোকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা, তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা আরও জোরদার করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা এখন থেকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পাবেন। এছাড়া তাদের জন্য ১০ হাজার টাকা উৎসব ভাতা, ৫ হাজার টাকা মহান বিজয় দিবস ভাতা এবং ২ হাজার টাকা বাংলা নববর্ষ ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। তাদের জন্যও ১০ হাজার টাকা উৎসব ভাতা, ৫ হাজার টাকা বিজয় দিবস ভাতা এবং ২ হাজার টাকা বাংলা নববর্ষ ভাতা দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতা ২৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ২ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ৫ হাজার টাকা খাদ্য ভাতা, ২৩ হাজার টাকা উৎসব ভাতা এবং ২ হাজার টাকা বাংলা নববর্ষ ভাতা প্রদান করা হবে।
যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অক্ষমতার মাত্রা অনুযায়ী চারটি শ্রেণিতে নতুন ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণির (৯৬-১০০ শতাংশ অক্ষম) মুক্তিযোদ্ধারা মাসিক ৩০ হাজার টাকা, ‘খ’ শ্রেণির (৬১-৯৫ শতাংশ) ২৮ হাজার টাকা, ‘গ’ শ্রেণির (২০-৬০ শতাংশ) ২৩ হাজার টাকা এবং ‘ঘ’ শ্রেণির (১-১৯ শতাংশ) যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা মাসিক ২০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পাবেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মু. আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সর্বশেষ ভাতা বৃদ্ধি সেই উদ্যোগেরই অংশ, যা তাদের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মরক্কো থেকে উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের ছিটমহল সেউতায় প্রবেশের চেষ্টাকালে অন্তত ৫৭ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। চলতি সপ্তাহে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সমুদ্র ও স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা চালান। তবে স্পেন সরকারের দাবি, শুক্রবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যার মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই মরক্কোয় ফিরে গেছেন।
এ অনুপ্রবেশ সামলাতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জরুরি ভিত্তিতে সেউতা সফর করেন। এই সংকটের জেরে ইতালি স্পেন থেকে যাওয়া যাত্রীদের ওপর সাময়িক সীমান্ত কড়াকড়ি আরোপ করেছে। অন্যদিকে ফ্রান্স স্পেন সীমান্তে অতিরিক্ত নজরদারি জোরদার করেছে।
সেউতা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার সীমান্তরক্ষীদের নিরাপত্তা বলয় ছিন্ন করে দলে দলে মানুষ সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে। এ সময় সমুদ্রে ডুবে অনেকের মৃত্যু হয়।
স্পেনে সীপান্ত নিরাপত্তা জোরদার
সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জানায়, সমুদ্রপথে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের সরাসরি মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে এই রায়ের পরও বেআইনিভাবে প্রবেশকারীদের দ্রুততম সময়ে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে স্পেন প্রশাসন।
কী ঘটেছে এবং কোথায়
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মরক্কো ও স্পেনের ক্ষুদ্র ভূখণ্ড সেউতার সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। চরম বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে আনুমানিক ৫০ হাজার মানুষ স্পেনীয় অংশে ঢুকে পড়েন। এতে বেশ কয়েকজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
এই অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ছিল সেউতার মূল জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের থেকেও বেশি। ফলে পুরো ছিটমহলে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দেয়।
শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষকে মরক্কোর দিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে আরও শত শত মানুষকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত সেউতা এবং তার থেকে ২৫০ মাইল পূর্বে অবস্থিত মেলিলা অঞ্চল। এই দুটি স্থানই আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র স্থলসীমান্ত।
১৫৮০ সাল থেকে সেউতা স্পেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখানে খ্রিস্টান ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান দেখা যায়। তবে মরক্কো কখনোই সেউতা ও মেলিলাকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা এগুলোকে নিজেদের ‘দখলকৃত ভূখণ্ড’ হিসেবে গণ্য করে।
অভিবাসনের কেন্দ্রবিন্দু কেন সেউতা
উন্নত জীবনযাত্রা ও নিজ দেশের সহিংসতা থেকে বাঁচতে ইউরোপে প্রবেশের জন্য স্পেন অন্যতম প্রধান রুট। আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে অভিবাসীরা সেউতা ও মেলিলাকে বেছে নেয়। তাই এই দুটি অঞ্চলকে শক্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।
সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানো অনেক অভিবাসীকে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠায়। বাকিদের আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়া চালানো হয়।
সেউতায় পৌঁছাতে অভিবাসীরা সাধারণত মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে প্রায় ৩ মাইল পথ সাঁতরে পাড়ি দেয়। আবার অনেকে কাছের শহর বেলিউনেচ থেকেও প্রবেশের চেষ্টা চালায়।
এর আগে ২০২২ সালে উপ-সাহারা অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ২ হাজার মানুষ মেলিলায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। তখন ২৩ জন নিহত হয়েছিলেন। এছাড়া ২০১৪ সালে সেউতা উপকূলে প্রাণ হারান অন্তত ১৪ জন।
তবে ক্যানারি ও ব্যালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ হয়ে স্পেনে প্রবেশকারীদের তুলনায় সেউতা ও মেলিলা সীমান্ত দিয়ে আগতদের সংখ্যা সাধারণত কম থাকে।
গত কয়েক দশকে স্পেনে বহিরাগত জনসংখ্যার হার অনেক বেড়েছে। দেশটির ৫ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১ কোটি মানুষই বিদেশি বংশোদ্ভূত। এদের বড় একটি অংশ কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা ও মরক্কো থেকে এসে স্পেনের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আশ্রয় খুঁজছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মতে, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে ৩৫ হাজার ১৫৩ জন অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। কেবল ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই এই সংখ্যা ১ হাজার ৪৯৩ জন।
এত মানুষ সীমান্ত পার হতে সক্ষম হলো যেভাবে
হঠাৎ এত মানুষ কীভাবে একসঙ্গে প্রবেশ করলো, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। মরক্কো কর্তৃপক্ষ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা কতটা কঠোর ছিল, তাও জানা যায়নি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার নেপথ্যে আঞ্চলিক রাজনীতি জড়িত থাকতে পারে। মরক্কো ও আলজেরিয়ার দ্বন্দ্ব এবং সম্প্রতি স্পেনীয় প্রধানমন্ত্রীর আলজিয়ার্স সফরের প্রধান কারণ হতে পারে।
এর আগে ২০২১ সালের মে মাসেও সেউতায় একইভাবে বড় ধরণের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। তখন পোলিসারিও ফ্রন্টের প্রধানকে কোভিডের চিকিৎসার জন্য স্থান দিয়েছিল স্পেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মরক্কো সীমান্ত শিথিল করে দেয়।
মরক্কো ও পোলিসারিও ফ্রন্ট উভয়ই বিতর্কিত পশ্চিম সাহারাকে নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে। এটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত স্পেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
২০২২ সালে মাদ্রিদ মরক্কোর নীতিকে সমর্থন দিলে সেই সংকটের নিরসন ঘটে। তবে স্পেনের এই পদক্ষেপে মরক্কোর প্রতিদ্বন্দ্বী আলজেরিয়া ক্ষুব্ধ হয়।
এরই মধ্যে গত ২০ জুলাই স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ আলজিয়ার্স সফরের যান। চার বছর পর এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করে। এটি মরক্কো ভালোভাবে নেয়নি।
শুক্রবার সেউতায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ মানব পাচারকারীদের দায়ী করেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পাচারকারীরা এই সংকট তৈরি করেছে বলে তিনি জানান। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের সরাসরি ফেরত পাঠানো যাবে না। পাচারকারীরা এটিকে স্পেনে থাকার সুযোগ হিসেবে অপপ্রচার করেছে।
ইতালীয় গবেষণা সংস্থা আইএসপিআই-এর বিশেষজ্ঞ মাত্তেও ভিল্লা বলেন, ২০২১ সালের ঘটনারই এক বড় সংস্করণ দেখলাম আমরা। যেখানে মাসে কয়েকশো লোক আসে, সেখানে রাতারাতি ৫০ হাজার লোক চলে আসা স্বাভাবিক নয়। সানচেজের আলজেরিয়া সফর মরক্কো পছন্দ করেনি।
ভিল্লা মনে করেন, কৌশলগত ক্ষমতা দেখাতে মরক্কো হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই সীমান্ত শিথিল রেখেছিল।
সরকার ও কর্তৃপক্ষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া
সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সেনা ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে স্পেন। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এটিকে ‘স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এই ঘটনায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছে স্পেন সরকার। ইউরোপীয় রাজনীতিকদের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। ডানপন্থী নেতারা স্পেনের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতিকে দায়ী করছেন।
ইতালির সরকার স্পেনকে শেঙ্গেন এলাকা থেকে সাময়িক বহিষ্কারের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে পরিস্থিতি সামলাতে ফ্রান্সও স্পেনের সঙ্গে তাদের সীমান্ত পাহারা জোরদার করেছে।