Connect with us

ধর্ম

অপরিবর্তনীয় কোরআন যেভাবে পরিবর্তনশীল সংবিধানকে পথ দেখায়

Published

on

আশরাফ উদ্দিন খান

কুরআনের সব বিধান একই ধরনের নয়। কিছু বিধান ثابت (সাবিত/অপরিবর্তনীয়)—যার মূল হুকুম সময়, স্থান ও পরিস্থিতি বদলালেও পরিবর্তিত হয় না। আর কিছু বিধান متغير বা পরিবর্তনশীল তবে একটি “متغير” বলতে কুরআনের কোনো আয়াতের হুকুমকে ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা বোঝায় না। বরং পরিবর্তনশীল হলো—প্রয়োগ, উপায়, শর্ত, পরিস্থিতিনির্ভর বিধান বা ইজতিহাদি সিদ্ধান্ত।

কিছু উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করি:

১. ثابت বিধান: যার মূল হুকুম স্থায়ী

ক. সালাত: আল্লাহ বলেন—وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ“তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর।”পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ফরজিয়ত কোনো যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে না। আধুনিক যুগে প্রযুক্তি এসেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে—কিন্তু ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব ও এশার সালাত ফরজ হওয়া পরিবর্তনশীল নয়।

খ. রমজানের রোজা: فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে রোজা রাখে।”রোজার ফরজিয়ত ثابت

গ. উত্তরাধিকার: আল্লাহ বলেন—يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন”। উত্তরাধিকারের নির্ধারিত অংশগুলো কুরআনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে এসেছে। এ ধরনের নির্ধারিত শরিয়তি অংশকে মানুষের সামাজিক পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায় না।

ঘ. সুদের নিষেধাজ্ঞা: وَحَرَّمَ الرِّبَا“এবং তিনি সুদ হারাম করেছেন।”ব্যাংকিং ব্যবস্থা বদলেছে, ডিজিটাল অর্থনীতি এসেছে, অনলাইন লেনদেন এসেছে—কিন্তু রিবা হারাম হওয়ার মূলনীতি পরিবর্তিত হয়নি।

২. متغير: পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র কোথায়?

এখানে সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ হলো শূরা ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। কুরআন বলে—وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ“তাদের কার্যাবলি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।”এখানে শূরা বা পরামর্শ করা —মূলনীতি। কিন্তু শূরা কীভাবে হবে? সরাসরি বৈঠকে? নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে? বিশেষজ্ঞ পরিষদের মাধ্যমে? সংসদীয় কাঠামোর মাধ্যমে? কোনো বিষয়ে জনমত গ্রহণের মাধ্যমে? এসব পদ্ধতি একই রকম হতে বাধ্য নয়। তাহলে মূলনীতি ثابت তবে প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি পরিবর্তনশীল হতে পারে।

ক. যুদ্ধের প্রস্তুতি: খুব গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণআল্লাহ বলেন—وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ“তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তুত রাখো।”এখানে প্রস্তুতি গ্রহণের মূলনীতি স্থায়ী। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর যুগে শক্তির যে উপকরণ ছিল, আজকের যুগে তা একই নয়। তখন ছিল— তলোয়ার, বর্শা, ঘোড়া, ঢাল ইত্যাদি। আজকের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

খ. পোশাকের ক্ষেত্রে একই বিষয়: কুরআন বলে—يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا“হে আদমসন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্যের উপকরণ। কুরআন মুসলিমদের জন্য একটি নির্দিষ্ট এক ধরনের পোশাক নির্ধারণ করেনি। তবে মূলনীতি হলো— সতর আবৃত করা, শালীনতা, সৌন্দর্য, অহংকার ও অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকা। কিন্তু কোন কাপড়? জুব্বা, পাঞ্জাবি, শার্ট, পায়জামা, প্যান্ট, লুঙ্গি, এসবের অনেকটাই عرف ও সংস্কৃতিনির্ভর।

গ. ব্যবসা-বাণিজ্য: আল্লাহ বলেন—وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন”। ব্যবসা হালাল—এটি একটি মূলনীতি। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর যুগের ব্যবসার মাধ্যম আর আজকের ব্যবসার মাধ্যম এক নয়। আজ আছে—অনলাইন শপ ই-কমার্স, ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এসবের প্রত্যেকটির নাম কুরআনে থাকবে—এমন নয়।

তাই মূলনীতি: أحل الله البيع স্থায়ী। কিন্তু নতুন ব্যবসায়িক পদ্ধতিকে সেই মূলনীতি ও শরিয়াহর অন্যান্য বিধানের আলোকে যাচাই করা হবে।

ঘ. পরিবারে “معروف” ধারণাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ: কুরআনে বারবার بالمعروف বা “প্রচলিত ন্যায়সংগত রীতি অনুযায়ী” কথাটি এসেছে।যেমন—وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ“তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।” এখানে সৎভাবে আচরণ করা—স্থায়ী নীতি। কিন্তু পরিবারের— বাসস্থানের ধরন, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, যোগাযোগের পদ্ধতি, পারিবারিক দায়িত্ব পালনের অনেক উপায় সামাজিক রীতি, দেশ, কাল ও সমাজভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। এখানে عرف ও معروف গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইসলামী ফিকহের বড় কাজ হলো: কোনটি نصٌّ قطعي ও ثابت, কোনটি اجتهادي, কোনটি عرف ও مصلحة-নির্ভর এবং কোনটির প্রয়োগ পরিস্থিতিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে—তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা। এক কথায়: الشريعة ثابتة في أصولها، مرنة في فروعها وتطبيقاتها المنضبطة.“শরিয়ত তার মৌলনীতিতে স্থির; আর তার বহু শাখা ও নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগে রয়েছে নমনীয়তা।”

এভাবে যুগ যুগ ধরে অপরিবর্তনীয় কোরআন পরিবর্তনশীল সংবিধানকে নিয়ন্ত্রণ করেছে ও পথ দেখিয়েছে। মানব-প্রণীত সংবিধানে সংশোধন হয় কিন্তু ইসলামে ওহির মূল বিধানে সংশোধন নয়—বরং পরিবর্তনশীল বাস্তবতার জন্য ওহির নীতির অধীনে ইজতিহাদ ও প্রয়োগের বিকাশ হয়।

লেখা: আশরাফ উদ্দিন খান

খতিব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) কেন্দ্রীয় মসজিদ

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ধর্ম

বায়তুল মোকাররমে শুরু হচ্ছে পক্ষকালব্যাপী সিরাতুন্নবী অনুষ্ঠানমালা

Published

on

By

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ১৪৪৮ হিজরি উদযাপন উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পক্ষকালব্যাপী ‘সিরাতুন্নবী (সা.) অনুষ্ঠানমালা’ শুরু হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট)। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব সাহানে বাদ মাগরিব উদ্বোধন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ আয়োজন শুরু হবে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে সভাপতিত্ব করবেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, পক্ষকালব্যাপী এ অনুষ্ঠানমালায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবন, কর্ম, আদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ, শান্তি, সাম্য, ন্যায় ও সম্প্রীতির শিক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যে তুলে ধরতে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ওয়াজ মাহফিল, কেরাত মাহফিল, হামদ-নাত মাহফিল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ বেতারের যৌথ উদ্যোগে সেমিনার এবং বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শানে রচিত কবিতা পাঠের মাহফিল। এ ছাড়া স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, সিরাত স্মরণিকা ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ, ইসলামী ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী এবং জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া আগামী ২৫ আগস্ট থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বাদ মাগরিব থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখরা ওয়াজ করবেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, এসব আয়োজনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে নৈতিকতা, মানবিকতা, সহনশীলতা ও শান্তির চেতনা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এ পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, আলেম-ওলামা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের জনগণকে অংশগ্রহণ ও অনুষ্ঠানমালা উপভোগের জন্য আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

Continue Reading

top1

হজযাত্রীদের জন্য বিমান ভাড়া নিয়ে সুখবর

Published

on

By

আগামী ২০২৭ সালের পবিত্র হজযাত্রীদের জন্য সুখবর দিয়েছে সরকার। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের হজযাত্রীদের জন্য বিমান ভাড়া গত বছরের তুলনায় ৩৭ হাজার টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সচিবালয়ে ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।

জামায়াতকে টেক্কা দিয়ে ‘প্রকৃত বিরোধী দল’ হওয়ার চেষ্টায় কয়েকটি দল

ধর্মমন্ত্রী বলেন, সরকার ২০২৭ সালের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজের মূল্য ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা এবং দ্বিতীয় প্যাকেজের মূল্য ৬ লাখ ১৫ হাজার ২৬৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি প্যাকেজ ৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

Continue Reading

ধর্ম

কোরবানি কার নামে হবে, যা বলছে ইসলাম

Published

on

By

কোরবানির সময় এলেই অনেকেই নিজের নাম ছাড়াও বাবা-মা, নাবালক সন্তান বা মৃত আত্মীয়স্বজনের নামেও কোরবানি দিয়ে থাকেন। অনেক পরিবারে আবার একটি পশু কোরবানিতে কয়েকজন শরিক হন, কেউ কেউ মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য নামেও অংশ রাখেন।

কোরবানি কার নামে হবে, কার ওপর ওয়াজিব এবং অন্যের নামে কোরবানি দেওয়া যাবে কি-না এসব বিষয় নিয়ে ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট কিছু বিধান রয়েছে।

মূলত, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার মতো প্রাণী একজনের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি হিসেবেই আদায় করা হয়। অর্থাৎ, এসব পশুতে একাধিক ব্যক্তি শরিক হতে পারেন না। তবে গরু, মহিষ বা উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হয়ে কোরবানি দেওয়া যায়। প্রত্যেকের নিয়ত ও অংশ আলাদা হলেও কোরবানি একটি পশুর মাধ্যমেই আদায় করা সম্ভব।

ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেন,‘সাতজন মানে সাতটি নামের পক্ষ থেকে। সাতটি নামের চেয়ে কমও হতে পারে, বেশি হতে পারবে না। ভাগের ক্ষেত্রে নামের বিষয়টি হলো, অমুকের পক্ষ থেকে (কোরবানি হচ্ছে) এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোরবানির পশু জবাই আল্লাহ’র নামে করতে হয়।’

শরীফ মুহাম্মদ বলেন,‘কিন্তু মৃত বাবা-মায়ের নামে কোরবানি করা যাবে? স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই কি আলাদা কোরবানি প্রয়োজন? নাবালক সন্তান বা যাদের আয় রোজগার নেই, তাদের নামে কোরবানি দেওয়া যাবে?

কোরবানি মূলত কার ওপর ওয়াজিব?

ঈদ-উল-আজহা বা কোরবানির ঈদ বাংলাদেশের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সৃষ্টিকর্তার সন্তষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মুসলিম বিশ্বসহ বাংলাদেশের মুসলমানরা পশু কোরবানি করে থাকেন।

আরবি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ কোরবানির দিন ও পরবর্তী দুই দিন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কোরবানি দিয়ে থাকেন।

ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, যাদের ওপর কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব তারা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোরবানি না দেন, তাহলে গোনাহের ভাগীদার হতে হবে।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, নেসাব অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির কাছে সাড়ে সাত ভরি পরিমাণ স্বর্ণ অথবা, সাড়ে ৫২ ভরি পরিমাণ রুপা বা এর সমমূল্যের নগদ টাকা অথবা সম্পদ থাকলে তার জন্য কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। যাদের এই পরিমাণ সম্পদ বা সম্পত্তি নেই, তাদের জন্য পশু কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়। এই নিয়ম নারী-পুরুষ সবার জন্য প্রযোজ্য।

ইসলামের নবী মুহাম্মদের সময় মানুষের সম্পদের হিসাব অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণ-রুপা দিয়েই করা হতো। তাই, ইসলামে ‘নেসাব’ নির্ধারণে স্বর্ণ ও রুপাকে ভিত্তি ধরা হয়েছে।

বর্তমান বাজারে মানভেদে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ১৮ লাখ কিংবা ১৮ লাখের চেয়ে কিছুটা বেশি। অন্যদিকে, সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম প্রায় তিন লাখ টাকার কাছাকাছি। সেক্ষেত্রে রুপার নেসাব ধরলে যারা স্বচ্ছল নয়, তাদের ওপরও কোরবানি ওয়াজিব হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ এ বিষয়ে বলেন, ‘নবী মুহাম্মদ সা:-এর সময় সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ এবং সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম এক ছিল। যুগ পরিক্রমায় এখন দামে পার্থক্য হয়ে গেছে। তাই, এখন সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বাজারে যে দামে বিক্রি হয়, সেই পরিমাণ অর্থ যদি জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২-এই তিন দিনে যদি কারো হাতে জমা থাকে, তাহলে উনি কোরবানি দিবেন।

কখন অন্য কারো নামে কোরবানি দেওয়া যাবে?

ইসলামি বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। তবে অনেকেই আছেন, যারা অন্যদের নামেও কোরবানি দেন।

যেমন, কেউ তার কোনো পরিবারের সদস্য বা প্রিয় মানুষের নামে কোরবানি দেন। অনেকেই আছেন, যারা তাদের মৃত বাবা-মায়ের নামে বা কোনো আত্মীয়ের নামে কোরবানি দেন।

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে মৃত বাবা-মা বা স্বজনদের নামে কোরবানি দেওয়ার প্রচলন অনেক পুরোনো। ইসলামি দৃষ্টিতে মৃত ব্যক্তির নামে কোরবানি দেওয়া জায়েজ।

অনেকেই মনে করেন, এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াবের দোয়া করা হয়।

তবে, জীবিত বা মৃত, অন্য কারো নামে কোরবানি দেওয়ার সর্বপ্রথম শর্ত হলো, আগে নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে হবে। তারপর সে অন্য কারো নামও যুক্ত করতে পারবে বলে জানান শরীফ মুহাম্মদ।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন,‘নিজের নামে দিয়ে অন্যদের নামে দেওয়া যায়। তা হতে পারে কোনো মহান ব্যক্তি বা কোনো প্রিয় মানুষ বা পরিবারের সদস্য। তবে মৃত ব্যক্তির পক্ষে কোরবানি দিলে সেই গোশত গরীবকে একটু বেশি দিলে ভালো হয়।’

এছাড়া, অনেকেই আছেন যারা তাদের নাবালক সন্তানের নামে কোরবানি দেন। নাবালক সন্তানের নামেও কোরবানি দেওয়ার জায়েজ আছে বলে জানান শরীফ মুহাম্মদ।

সব শরীককে কি সমান অর্থ দিতে হবে?

বিধান অনুযায়ী, সব শরীককে সমান অর্থ দিতে হবে এবং গোশত সমবন্টন করতে হবে।

ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘সাতজন যদি একদমই স্বতন্ত্র হয়, যেমন- ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের বা ভিন্ন ব্যক্তি, তাহলে তারা প্রত্যেকে সমান টাকা দিবেন এবং গোশতও সমানভাবে ভাগ করে নিবেন।’

অধ্যাপক আব্দুর রশীদ বলেন,‘তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন, অনেকেই আছেন, যারা কোরবানি দিতে চান কিন্তু প্রতি ভাগে যে পরিমাণ টাকা দিতে হবে, তিনি সেই পরিমাণ দিতে পারছে না। তখন ‘কেউ তাকে ১০ হাজার টাকা উপহার হিসেবে দিতে পারে। কিন্তু গোশত সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে। কেউ উপহার হিসেবে দিলে সমস্যা নাই।’

তবে কেউ যদি সন্তান হিসেবে তার মায়ের বা বাবার নামে কোরবানি দেন, এমনকি পরিবারের অন্য কারো নামে বা একাধিক ব্যক্তির নামে স্বেচ্ছায় কোরবানি দেন, তখন তাদের কাছে সেই টাকা চাওয়া জরুরি না বলে জানিয়েছেন ইসলামি স্কলাররা।

শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘আর স্বামী হিসেবে কেউ যদি স্ত্রীর নামে কোরবানি দিতে চান, স্ত্রীর কোরবানি ওয়াজিব হোক বা না হোক, সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে না জানিয়ে করার চেয়ে জানিয়ে করা ভালো। যদি স্ত্রীর কোরবানি ওয়াজিব হয় সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে নিয়ত করতে হবে যে তার কোরবানিটা তার স্বামী করছেন।’

যদিও অধ্যাপক আব্দুর রশীদের মতে, মৃত ব্যক্তি বা অন্য কারো নামে কোরবানি দিলে এখানে অনুমতির প্রয়োজন নাই। যে কারো নামেই কোরবানি দেওয়া যেতে পারে। আর কোনো নারী যদি অবিবাহিত হন এবং তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়, তাহলে তাকেও আগে নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে হবে। এরপর তিনিও তার বাবা-মা বা অন্য কোনো আত্মীয়-স্বজন বা প্রিয়জনের নামে নিজ অর্থেই কোরবানি দিতে পারবেন।

ঋণ নিয়ে কোরবানি করা যায়?

এদিকে, অনেকেই আছেন, যারা খুব স্বচ্ছল নন, কিন্তু কোরবানি দিতে চান। সেক্ষেত্রে তারাও কোরবানি দিতে পারবেন এবং তা নফল হিসেবে কবুল হবে উল্লেখ করে ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলছিলেন, এখানে একটা শর্ত আছে।

তিনি বলেন, ‘ধরলাম, বাচ্চাদের মন খারাপ হয়ে আছে। সেজন্য তিনি কোরবানি দিতে চান। তাহলে হবে না। এখানে শর্ত হলো, কোনো সামাজিক উপলক্ষ্যই এখানে মূখ্য হতে পারবে না। নিয়ত থাকতে হবে যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য করছি। অর্থাৎ, এটা প্রদর্শনমূলক না।’

তিনি আরো বলেন এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি ঋণ নিয়ে সেই নফল কোরবানি আদায় করতে পারবেন। কিন্তু বারবার ঋণ করার পর সেই ঋণ ওয়াদামাফিক পূরণ না করতে পারলে সেটারও দরকার নাই করার।’

এছাড়া যারা ১০০ বা হাজার কোটি টাকা শিল্প ঋণ নিয়েছেন নেসাবের পরিমাণ মিলাতে গিয়ে তাদের ঋণের পরিমাণ ধর্তব্য হবে না। কারণ ঋণের টাকা হিসাবে ধরা হলে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও তার কোরবানি আবশ্যকীয় থাকে না।

শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘কিন্তু ব্যক্তিগত লোন, তা ১০ হাজার টাকা হোক বা ১০ লাখ টাকা হোক, এটা প্লাস-মাইনাস করে যদি দেখা যায় যে লোন পরিশোধ করেও আপনার কাছে নেসাব পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা আছে, তাহলে আপনার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যাবে।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Continue Reading

Trending