আশরাফ উদ্দিন খান
হাফপ্যান্ট যাদের ভূষণ ও স্বাধীনতা
আজকে হাফপ্যান্ট পরিধান করে যারা নিজেদের স্বাধীনতার প্রদর্শন করতে চায় তারা আসলে স্বাধীনতার মুখোশে আত্মসমর্পণ দেখাচ্ছে। তারা ভাবে “আমি যা চাই তাই করছি” মানে আমি স্বাধীন।
অথচ তারা সবচেয়ে বেশি বন্দি। বন্দি বিজ্ঞাপনের, বন্দি সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমের, বন্দি পুঁজিবাদের চাহিদা তৈরির কারখানার। “যা ইচ্ছা তাই করা” স্বাধীনতা নয়, বরং দাসত্বের সবচেয়ে সূক্ষ্ম রূপ।
ইচ্ছা কি সত্যিই আপনার?
আধুনিক ভোক্তাবাদী সমাজ তরুণদের শেখায়—”তোমার ইচ্ছা তোমার পরিচয়।” কিন্তু দার্শনিক প্রশ্ন হলো: এই ইচ্ছাগুলো কি সত্যিই আপনার নিজের?
আপনি হাফ প্যান্ট পরতে চান—কেন? কারণ আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু এই “স্বাচ্ছন্দ্য” কোথা থেকে এলো? কে ঠিক করল যে হাফ প্যান্ট “স্বাচ্ছন্দ্যময়” আর পাঞ্জাবি “অস্বাচ্ছন্দ্যময়”? বিজ্ঞাপন, সিনেমা, সোশ্যাল মিডিয়া—এরা দশক ধরে আপনার মস্তিষ্কে এই সমীকরণ ঢুকে গেছে।
জাঁ-জাক রুশো দুই শতাব্দী আগে সতর্ক করেছিলেন: “মানুষ স্বাধীন জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলাবদ্ধ।” আজকের তরুণরা মনে করে তারা শৃঙ্খলমুক্ত, অথচ তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ—কিন্তু সে শৃঙ্খল লোহার নয়, ইচ্ছার শৃঙ্খল। আর ইচ্ছার শৃঙ্খল সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ আপনি নিজেই তা পরতে স্বেচ্ছায় রাজি হন।
“যা ইচ্ছা তাই করা” বাস্তবেপশুর স্বাধীনতা
আইজায়া বার্লিন স্বাধীনতার দুই ধারণার পার্থক্য করেন—Negative Liberty (বাধা না থাকা) এবং Positive Liberty (আত্ম-নিয়ন্ত্রণ)। কিন্তু তিনি সতর্ক করেন, Positive Liberty যখন বিকৃত হয়, তখন তা স্বৈরাচারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
আজকে আমাদের অনেকে Positive Liberty-এর সবচেয়ে বিকৃত রূপটি গ্রহণ করেছে—”আমি যা চাই, তা করব।” দার্শনিকভাবে এই অবস্থানটি অযৌক্তিক। কারণ:
পশুও যা চায় তাই করে —ক্ষুধা লাগলে খায়, ইচ্ছা হলে ঘুমায়। যদি “যা ইচ্ছা তাই করা” স্বাধীনতা হয়, তবে পশু সবচেয়ে স্বাধীন প্রাণী।
পক্ষান্তরে মানুষের স্বাধীনতা তার যুক্তিতে —মানুষ পারে ইচ্ছাকে বিশ্লেষণ করতে, পরিণতি ভাবতে, সঠিক-ভুল বিচার করতে। যে ব্যক্তি ইচ্ছার দাস, সে পশুর চেয়ে উন্নত নয়—সে কেবল আরও জটিল পশু।
ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন—স্বাধীনতা মানে স্বায়ত্তশাসন (Autonomy) , অর্থাৎ নিজের যুক্তি দিয়ে নিজের নিয়ম তৈরি করা। আর “যা ইচ্ছা তাই করা” হলো বিষয়াসক্তি (Heteronomy) —অন্যের দেওয়া ইচ্ছার দাসত্ব।
সীমা ছাড়া স্বাধীনতা মানে বিশৃঙ্খলা
জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর On Liberty-তে স্পষ্ট বলেছেন: “আপনার স্বাধীনতার সীমা হলো অন্যের ক্ষতির সূচনা বিন্দু।” কিন্তু আজকের অনেকে এই সীমাকে “বাধা” বলে মনে করে।
আপনি যদি মেট্রোতে হাফ প্যান্ট পরে ওঠেন, আপনার পোশাক আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু মেট্রো একটি গণপরিবহণ সেখানে শিশু, বয়স্ক, নারী সবাই আছেন। আপনার “স্বাধীনতা” যদি তাদের অস্বস্তির কারণ হয়, তবে সেটি আর স্বাধীনতা নয়—সেটি অন্যের উপর আপনার ইচ্ছার চাপিয়ে দেওয়া।
দার্শনিকভাবে এটি “নেতিবাচক স্বাধীনতার অপব্যবহার”। মিল বলেছেন—স্বাধীনতা মানে “বাধা না থাকা,” কিন্তু এই বাধা কেবল আইনি নয়, সামাজিকও। যে ব্যক্তি সামাজিক রীতিকে “পুরনো” বলে উড়িয়ে দেয়, সে আসলে সামাজিক চুক্তি (Social Contract) ভঙ্গ করে। টমাস হবস বলেছেন—সমাজে বাস করতে হলে কিছু স্বাধীনতা ছাড়তে হয়, নইলে “সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ” শুরু হয়।
“সচেতনতা” নামের অচেতনতা।
আজকের অনেকে মনে করে তারা “সচেতন” কারণ তারা “পুরনো নিয়ম” মানে না। কিন্তু দার্শনিকভাবে সচেতনতা মানে নিয়ম ভাঙা নয়—সচেতনতা মানে জানা কেন নিয়ম আছে, আর কেন ভাঙছি।
প্রকৃত স্বাধীনতা কি?
প্রকৃত স্বাধীনতা “যা ইচ্ছা তাই করা” নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো—জানা, বোঝা, বিচার করা, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া।
যে ব্যক্তি ইচ্ছার দাস—সে দাস।
যে ব্যক্তি সামাজিক চাপে চলে—সে দাস। যে ব্যক্তি বিজ্ঞাপনের নির্দেশে পোশাক বেছে নেয়—সে দাস।
যে ব্যক্তি “ট্রেন্ড” অনুসরণ করে—সে দাস।
প্রকৃত স্বাধীন মানুষ সে-ই, যে জানে সে কেন যা করছে, তা করছে। যে প্রশ্ন করে—”এটি কি আমার ইচ্ছা, নাকি অন্যের তৈরি ইচ্ছা?” যে জানে—স্বাধীনতার সীমা অন্যের সম্মান। স্বাধীনতা মানে দায়িত্ব, স্বাধীনতা মানে সংযম, স্বাধীনতা মানে জানা ও বোঝা।
যে সমাজে প্রত্যেকে “যা ইচ্ছা তাই করে,” সে সমাজে কেউ স্বাধীন নয়—সবাই সবার ইচ্ছার দাস। আর যে সমাজে প্রত্যেকে জানে “কেন করছি,” সে সমাজেই প্রকৃত স্বাধীনতা বাস করে। সুস্থ রুচি ও সংস্কৃতির বিজয় হোক!
আশরাফ উদ্দিন খান
খতিব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ