Connect with us

top1

বিএনপির জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে জামায়াতের ‘ডোর টু ডোর’ কৌশল

Published

on

আওয়ামী লীগ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার সম্পর্ক ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এক নতুন এবং জটিল দিকে মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের দুঃসহ জেল-জুলুম, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক অবদমনের পর দল দুটি এখন নির্বাচনী ময়দানে একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যমান জনসমর্থন এবং বিশাল জনসভার জনস্রোতে বিএনপি অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও সুসংগঠিত কৌশলে তৃণমূলের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। একদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির পুনরুত্থান এবং অন্যদিকে জামায়াতের ‘নিভৃত বিপ্লব’—এই দুই মেরুর লড়াই এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জনপ্রিয়তার পাল্লা বিএনপির দিকে ভারী হলেও জামায়াতের সুদূরপ্রসারী কৌশল নির্বাচনের ফলাফলকে যেকোনো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দুই দলই নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দেড় দশকে দল দুটির সাংগঠনিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সব ধরনের চেষ্টা করা হয়েছিল। বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ১৭ বছর নির্বাসিত থাকতে হয়েছে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জরাজীর্ণ জেল সেলে ও পরবর্তীতে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল।

এমনকি উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং স্বামীর বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো জনমনে গভীর সহানুভূতি তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি দেওয়ার বিষয়টি দলটিকে নেতৃত্বশূন্য করার একটি বড় প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। এক সময় এই দুই দল জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বন্ধুত্বের পুরোনো সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বিশেষ করে গত ২৬ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফেরার পর থেকে জামায়াত মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজ ও বিশৃঙ্খল’ দল হিসেবে প্রমাণ করতে, যাতে তারা নিজেদের একটি সুশৃঙ্খল বিকল্প হিসেবে ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করতে পারে।

গত ২২ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণায় যে জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি দেশের প্রতিটি জেলায় বিরামহীনভাবে জনসভা করছেন, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দলটির বিশাল ভোটব্যাংকের প্রমাণ দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা শোনার ভঙ্গি তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তার বক্তব্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে, যা তরুণ ভোটারদের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

তবে বড় জনসভা মানেই জয়—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে তারা সতর্ক করেছেন। কারণ বিশাল জনসভার জনসমর্থনকে ভোটের বাক্সে রূপান্তরিত করার জন্য যে সাংগঠনিক নিপুণতা প্রয়োজন, সেখানে জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

বিএনপি যখন বিশাল জনসভায় ব্যস্ত, জামায়াতে ইসলামী তখন বেছে নিয়েছে ‘ডোর-টু-ডোর’ বা ঘরে ঘরে যাওয়ার কৌশল। দলটির নারী কর্মীরা এখন প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গিয়ে নারীদের সাথে ধর্মীয় আলোচনা বা ‘তালিম’ এর মাধ্যমে ভোট প্রার্থনা করছেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন—তারা নিজেরা দুর্নীতি করবেন না এবং রাষ্ট্রকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করবেন। তবে তাদের এই প্রচারণার ধরন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, জামায়াত কর্মীরা বস্তিবাসী ও স্বল্প শিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে, যা ভোটারদের প্রভাবিত করার একটি অনৈতিক চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিএনপি ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশনে এই বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, জামায়াতের এই নিভৃত প্রচারণা এবং ভোটারদের তথ্য সংগ্রহের কৌশল নির্বাচনের দিন বিএনপিকে বড় ধরনের বিপাকে ফেলতে পারে।

ঢাকার আসনগুলোতে জামায়াতের তৎপরতা এখন ঘরে ঘরে। বিশেষ করে বস্তি এলাকাগুলোতে তারা ধর্ম এবং অর্থের প্রলোভন দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির নেতারা। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বাংলানিউজকে বলেন, “আমারা শুনেছি বিভিন্ন বস্তিতে, স্বল্প শিক্ষিত ও স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বিকাশ নম্বর চাওয়া হচ্ছে যা নির্বাচনী আচরণ পরিপন্থি। অসৎ উদ্দেশ্যে একটি দল এই কাজগুলো করছেন এই নিম্ন আয়ের ভোটারদের প্রলুব্ধ করতে। নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দায়িত্বরত অন্যদের কয়েক দফা জানিয়েছি একটি দল অনৈতিকভাবে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করছে। তারা ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখনো দৃশ্যত কিছুই হয়নি। বিএনপি একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়, কিন্তু এভাবে যদি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, তবে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।”

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে, যা নির্বাচনের পরিবেশকে ঘোলাটে করতে পারে।

সরেজমিনে ফরিদপুরের আসনগুলোতে দেখা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এক অদ্ভুত লড়াই চলছে। ফরিদপুর-১ আসনে জামায়াতের মো. ইলিয়াস মোল্লা প্রচারণায় এগিয়ে থাকলেও স্থানীয়রা বলছেন তাদের ভোটগুলো ‘গুপ্ত’। অন্যদিকে ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির শামা ওবায়েদ তার বিদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাচনে নামায় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। তবে ফরিদপুর-৩ ও ফরিদপুর-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা অত্যন্ত সুকৌশলে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ফরিদপুর-৪ আসনে জামায়াতের মো. সরোয়ার হোসাইনকে অন্যান্য ছোট দলগুলো সমর্থন দেওয়ায় তিনি একটি বড় ভোটব্যাংক পেতে যাচ্ছেন।

স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, ফরিদপুরে জামায়াতের নারী কর্মীরা যেভাবে প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গেছেন, বিএনপি সেখানে কেবল উঠান বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এবার ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার সম্ভাবনা থাকায়, সেই ফাঁকা মাঠ দখল করতে জামায়াত অনেক বেশি তৎপর।

খুলনা বিভাগে জামায়াতে ইসলামী অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। খুলনা-১ আসনে যেখানে হিন্দু ভোটারদের প্রাধান্য বেশি, সেখানে জামায়াত কৃষ্ণ নন্দীর মতো একজন সনাতন ধর্মালম্বীকে প্রার্থী করে এক বড় ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছে। অন্যদিকে খুলনা-৬ আসনটি জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হলেও এবার বিএনপি সেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছে। খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ারের অবস্থান বেশ মজবুত বলে স্থানীয়রা জানাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খুলনার আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট যেদিকে যাবে, সেদিকেই পাল্লা ভারী হবে। তবে সাধারণ ভোটাররা এখন পর্যন্ত মুখ খুলছেন না। বিএনপি ও জামায়াত দুই দলের জন্যই তা উদ্বেগের কারণ। এছাড়া সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটেও জামায়াতের প্রচার-প্রচারণা বিএনপির তুলনায় অনেক বেশি সুসংগঠিত বলে জানা গেছে।

যশোরের আসনগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র ফুটে উঠছে। যশোর-৩ আসনে বিএনপির অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইমেজের কারণে এগিয়ে থাকলেও জামায়াতের আব্দুল কাদের তাকে কড়া চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। যশোর-৪ ও ৫ আসনে বিএনপি অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত, যার সুযোগ নিতে মরিয়া জামায়াত।

কুষ্টিয়ার আসনগুলোতেও একই চিত্র; সেখানে ভোটাররা বলছেন তারা ‘মার্কা দেখে নয়, প্রার্থী দেখে’ ভোট দেবেন। চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরেও বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব অঞ্চলে জামায়াতের প্রচারণা অনেক বেশি সুসংগঠিত এবং লক্ষ্যভিত্তিক, যা বিএনপির বিশাল জনসমর্থনের বিপরীতে এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বরিশাল বিভাগের আসনগুলোতে এবার এক নতুন ধরনের মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। বরিশাল-৩ আসনে বিএনপির ধানের শীষের বিপরীতে এ বি পার্টির ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ জামায়াতের সমর্থন নিয়ে এক শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছেন। নদীভাঙন রোধ ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণে তিনি তরুণ ভোটারদের মন জয় করেছেন। অন্যদিকে বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের সাথে ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করীমের তুমুল লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বরিশালে জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে জোটের প্রার্থীদের সমর্থন দিয়ে বিএনপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালের এই নতুন সমীকরণ বিএনপির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যেখানে ইসলামী আন্দোলনের ভোটব্যাংক একটি বড় ফ্যাক্টর।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের আসনগুলোতে বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হলেও জামায়াত সেখানে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে মরিয়া। কক্সবাজার-২ ও ৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা অত্যন্ত সক্রিয় এবং তারা সাংগঠনিক ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। সিলেটে বিএনপির প্রার্থীরা চারটিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও সিলেট-৫ ও ৬ আসনে জামায়াতের সক্রিয়তা বিএনপিকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। সিলেটে জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা বিএনপির প্রথাগত প্রচারণাকে টেক্কা দিচ্ছে। তবে সিলেটের প্রবাসীরা বিএনপির পক্ষে থাকায় দলটি এখনো আশা ছাড়েনি।

বিশ্লেষকদের মতে, সিলেটের এই অঞ্চলে ধর্মীয় আবেগ একটি বড় ভূমিকা পালন করবে, যা জামায়াতের জন্য সুবিধার কারণ হতে পারে।

জাতীয় পার্টির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত রংপুরে এবার বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই ভাগ বসাচ্ছে। তবে জামায়াত আমিরের কিছু সাম্প্রতিক মন্তব্য (নারী এবং কেরু অ্যান্ড কোং) সেখানে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, যা বিএনপির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। ময়মনসিংহে জামায়াতের প্রচারণা অত্যন্ত সুসংগঠিত; সেখানে তারা দলীয়ভাবেই লিফলেট ও ব্যানার বিতরণের কাজ পরিচালনা করছে, প্রার্থীকে এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা নির্বাচনের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে বিএনপির মামলা এবং জামাতের কারণে তাদের জামিন পাওয়ায় এই মেরুকরণ আরও তীব্র হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মাঠে বিএনপি জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকলেও দলটির সামনে অন্তত কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামলানো যা অনেক আসনে ভোট ভাগাভাগির কারণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, গত ১৮ মাসে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তৃতীয়ত, তরুণ ভোটারদের মন জয় করার ক্ষেত্রে প্রচারণায় ঘাটতি। চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতের পরিকল্পিত প্রচারণার সাথে পাল্লা দিতে না পারা। এছাড়া জামায়াতের নারী কর্মীদের ‘তালিম’ কৌশলের বিপরীতে বিএনপির প্রচারণার ধীরগতি, নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে বিএনপির অস্পষ্ট অবস্থানও অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে না পারলে কেবল জনসমর্থন দিয়ে বৈতরণী পার হওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, “বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা জনপ্রিয়তা বনাম সংগঠনের এক ক্লাসিক দ্বন্দ্ব দেখছি। বিএনপি এখনো জনসমর্থনের দিক থেকে এগিয়ে আছে—বিশাল জনসভা, পয়েন্ট টু পয়েন্ট বক্তব্য এবং দীর্ঘ দমন-পীড়নের স্মৃতি দলটির পক্ষে কাজ করছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর ‘ডোর টু ডোর’ কৌশল নীরব কিন্তু কার্যকর রাজনৈতিক পদ্ধতি, যা সরাসরি ভোটার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “এই নির্বাচন আসলে কোনো দলের একক আধিপত্যের নয়, বরং তা নির্ধারণ করবে জনপ্রিয়তা কতটা সংগঠনে রূপ নিতে পারে এবং সংগঠন কতটা বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সেই অর্থে বিএনপি ও জামায়াতের এই লড়াই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রও নির্ধারণ করবে।”

জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত সুসংগঠিত দল হলেও তাদের কিছু বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থনে এখনো ঘাটতি আছে এবং ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া নারী অধিকার প্রশ্নে জামায়াতের আমিরের সাম্প্রতিক মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব এবং ভূ-রাজনীতিতে দলটির অবস্থান কী হবে—এই প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত। তবে জামায়াতের বড় শক্তির জায়গা হলো তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীবাহিনী এবং ‘নতুন কাউকে দেখার’ আকাঙ্ক্ষা ভোটারদের মধ্যে তারা তৈরি করতে পেরেছে। বিএনপি এই ইস্যুটিকে মোকাবিলা করতে জামায়াতের অভিজ্ঞতার অভাবকে সামনে নিয়ে আসছে।

সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির এক চূড়ান্ত পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। বিএনপি তাদের বিশাল জনসমর্থন ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর ভর করে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের নিভৃত ও গভীর কৌশলের মাধ্যমে বড় ধরনের চমক দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রিয়তায় বিএনপি এগিয়ে থাকলেও জামায়াতের কৌশলী প্রচারণা এবং তৃণমূলের সাথে তাদের নিবিড় যোগাযোগ নির্বাচনের ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কি রাজপথের জনজোয়ারকে প্রাধান্য দেবেন, নাকি জামায়াতের ঘরের ভেতরের প্রচারণায় সাড়া দেবেন, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত। তবে বিশ্লেষকরা এটা নিশ্চিতভাবে বলেছেন—এবারের নির্বাচন কেবল জয়-পরাজয়ের নয়, বরং কৌশল ও জনপ্রিয়তার এক অনন্য লড়াই হতে যাচ্ছে।

সুত্র: বাংলা নিউজ টোয়েন্টি ফোর

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top1

জামায়াত এমপি গোলাম রসুলের বাড়ি ঘেরাও

Published

on

By

যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলের বাসভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় শত শত মানুষ।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তার বাড়িতে হামলার অভিযোগও উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নীলগঞ্জ এলাকার আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ ও সংশ্লিষ্ট মসজিদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এর জের ধরে মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য গোলাম রসুল ও তার মেয়ে অনন্যার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার এক শিশু শিক্ষার্থী আয়ান এবং রেক্সনা নামে এক নারীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, ওই হামলায় রেক্সনার মাথায় আঘাত লাগে।

জানা গেছে, এ বিরোধ নিয়ে আগের রাতে দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলেও মঙ্গলবার সকালে মাদ্রাসা খুললে তা বন্ধ রাখতে বলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পরই স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সকাল ১০টার দিকে তারা এমপির বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। একই সঙ্গে তাদের অভিযোগ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে এমপি গোলাম রসুল ও তার মেয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে আসছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিষয়টি মীমাংসার উদ্দেশ্যে গোলাম রসুলের এক স্বজন ঘটনাস্থলে এলে বিক্ষুব্ধ জনতার একাংশ তাকে মারধর করে। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে বিক্ষোভকারীরা যশোর-নড়াইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং এমপি ও তার মেয়ের বিচারের দাবি জানান।

এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে গোলাম রসুলের স্ত্রী শারমিন ভিনা বলেন, তাদের মেয়ে অনন্যা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তার দাবি, মাদ্রাসা বন্ধ থাকার পরও কিছু শিশু সেখানে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিল। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হচ্ছে এবং বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে।

খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।

পুলিশ জানিয়েছে, উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন।

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এমপির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল।

Continue Reading

top1

ইনকিলাব মঞ্চের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা, মুখপাত্র হলেন ওসমান হাদি

Published

on

By

নিজস্ব প্রতিবেদক

সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে ইনকিলাব মঞ্চের নতুন আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে সংগঠনের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ৮ সদস্যের একটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি শহীদ শারিক ওসমান হাদিকে আজীবনের জন্য সংগঠনটির মুখপাত্র ঘোষণা করা হয়েছে।

রোববার (২৭ জুলাই) সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সংগঠনটির সাধারণ সভায় প্রত্যক্ষ ভোটে আহ্বায়ক হিসেবে আব্দুল্লাহ আল জাবের এবং সদস্য সচিব হিসেবে ফাতিমা তাসনিম জুমা নির্বাচিত হন। পরে নবনির্বাচিত নেতৃত্ব আংশিক কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন।

নতুন কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন রকিবুল ইসলাম (রোকসান রাকিব), সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শোয়াইব বিন আহসান সিয়াম, দপ্তর সম্পাদক রায়হান আহমেদ, অর্থ সম্পাদক মুহাম্মদ ওমর, মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক নাঈম ইবনে জাহির এবং সহ-মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক হাবিবুল্লাহ মিশবাহ।

এ ছাড়া সংগঠনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং যোগ্য ও সিনিয়র সদস্যদের মূল্যায়নের লক্ষ্যে একটি সার্চ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এতে জি এস সাবিরকে আহ্বায়ক এবং মামুনুর রহমান আদনানকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন আসাদুজ্জামান আসাদ, হিশাম ইব্রাহিম, শান্ত আক্তার ও শাকিব সারওয়ার।

সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন নেতৃত্ব একটি আদর্শিক, গণমুখী ও কার্যকর সংগঠন গড়ে তুলতে কাজ করবে। একই সঙ্গে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং ঘোষিত আদর্শ বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নবনির্বাচিত নেতারা।

Continue Reading

top1

মির্জা ফখরুলই হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি, জোর আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে

Published

on

By

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে। আলোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলীয় ও রাজনৈতিক বিভিন্ন সূত্রের দাবি, অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনা করা হচ্ছে।

গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় এলেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে মির্জা ফখরুল সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন। তবে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের বিষয়ে এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করতে চাইবে, যিনি জাতীয় সংকট মোকাবিলায় অভিজ্ঞ এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্য। সে বিবেচনায় মির্জা ফখরুলের নাম গুরুত্ব পাচ্ছে।

২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি।

এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আজ ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার। বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণাসহ পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। নির্বাচন কমিশন সংসদ সচিবালয় থেকে ভোটার তালিকা পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করবে।

Continue Reading

Trending