গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যার পর ধারণা করা হয়েছিল তেহরান দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলায় পর্যুদস্ত হওয়ার বদলে পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার এই দেশটি এখন সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
কৌশলগত জুয়া ও অনিশ্চিত জয়
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের ‘কৌশলগত জুয়া’ খেলেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষক ঈশান থারুরের মতে, শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার মাধ্যমে আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি হলেও এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল আদৌ জয়ী হতে পারবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তেহরান সরাসরি জয়ী হতে না পারলেও এই সংঘাতের যন্ত্রণা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
ইরানের ‘দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়’ কৌশল
প্রথাগত যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চেয়ে ইরান এখন প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্লান্ত করার কৌশল নিয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ হলো:
ড্রোন ও মিসাইল হামলা: ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরান নিরবচ্ছিন্নভাবে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালাচ্ছে।
মনস্তাত্ত্বিক চাপ: নিখুঁত নিশানার চেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় বাঙ্কারে থাকতে বাধ্য করা ইরানের অন্যতম লক্ষ্য।
অস্ত্রভাণ্ডার: ধারণা করা হয় ইরানের কাছে ২,৫০০টির বেশি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৮০ হাজারের বেশি ড্রোন রয়েছে, যার খুব সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব: হরমুজ প্রণালি সংকট
সামরিক লড়াইয়ের বাইরে ইরান অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে ইরান। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চড়তে শুরু করেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
এই যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বনেতাদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দিয়েছে:
ডোনাল্ড ট্রাম্প: ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে তিনি আলোচনার পথ বন্ধ ঘোষণা করেছেন।
স্পেন ও জার্মানি: স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মেৎস ইরানি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছেন।
আঞ্চলিক মিত্র: হুতি, হিজবুল্লাহ এবং হামাসের মতো অভিজ্ঞ মিত্রগোষ্ঠীগুলো ইরানের পক্ষে এই লড়াইয়ে সক্রিয় রয়েছে।
সারকথা: বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেবল একটি ধর্মীয় শাসনের কাঠামো দিয়ে বিচার করা ওয়াশিংটনের ভুল ছিল। জাতীয়তাবাদী ও উপনিবেশবিরোধী আদর্শে বলীয়ান এই জাতি এখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সুসংগঠিত সামরিক প্রতিরোধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে পশ্চিমা শক্তিকে। এই যুদ্ধের রাজনৈতিক বৈধতা না থাকায় শেষ পর্যন্ত এটি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিপজ্জনক অভিযানে পরিণত হতে পারে।