মো.সাকিব মল্লিক
নীলা এবং রাতুল। ওরা দুই বছরের ছোট-বড়। মানে নীলা রাতুলের চেয়ে দুই বছরের ছোট এবং রাতুল নীলার চেয়ে দুই বছরের বড়। নীলা উচ্চতায় মাঝারি। গত নভেম্বরে তার বয়স পনেরো পেরিয়ে ষোলোতে পড়লো। কানে সবসময় সে দুল পরে। তার চোখের মনি সাধারণের তুলনায় একটু বেশি কালো, গায়ের রং ফর্সা, চুল হালকা কোঁকড়ানো। রাতুল আবার অতটা ফর্সা নয়, তবে অনেকটা লম্বা। আর দশটা ছেলের মতোই রাতুল।তবে অন্যদের থেকে রাতুল অনেক ভালো শ্রোতা। কেউ যখন কিছু বলে তখন রাতুল সেটা মন দিয়ে শুনতে পছন্দ করে এবং অল্পতে রেগে যাওয়ার স্বভাব তার নেই। এটাকে অন্যরা গুণ ভাবে কি না সে জানে না, তবে রাতুল ভাবে এটাই তার বড় গুণ।
রাতুল ও নীলা দুজন দুজনকে চেনে ছোটবেলা থেকেই। তারা ছোট থেকেই একই পাড়ায় থাকে। তাই সম্পর্কে তারা পাড়ার চাচতো ভাইবোনই বলা চলে। নীলা বয়সে ছোট হওয়ায় কখনো রাতুলের সাথে নিজে থেকে কথা বলার সাহস পেত না। রাতুল মাধ্যমিক পাস করে স্থানীয় একটা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ালেখা করছে৷ ছাত্র হিসেবে খুব একটা খারাপও না, আবার খুব একটা ভালোও না।
কৃষক বাবার ছেলে, বাবাকে সে অনেক ভালোবাসে।বাবার কাজে সে সবসময় সাহায্য করে। বাবাও ছেলের লেখাপড়ার খরচ দিতে কখনো পিছিয়ে যান না। এভাবেই রাতুল চালিয়ে যাচ্ছে তার পড়ালেখা। তার সাথের অনেকেই পড়ালেখা ছেড়ে এখন কাজ করে সংসারে অবদান রাখার চেষ্টা করছে। অনেকে তো মনেই করেন গ্রামে থেকে লেখাপড়া শিখলেও পরে ভালো কিছু করা সম্ভব না। রাতুল এসব কথায় বিশ্বাস করে না। সে তার পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে নিজ ইচ্ছাতেই৷
নীলার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা। মোটা বেতন পান। নিয়মিত তাকে শহরে যাওয়া-আসা করতে হয়। শহর দুই ঘন্টার পথ৷ নীলা সামনের বার এসএসসি দিবে। পড়ালেখায় সে বেশ ভালো। স্কুলেও সে যায় নিয়মিত। স্কুলে যাওয়ার সময় রাতুলের সাথে তার প্রতিদিনই দেখা হয়। রাতুল ওই রাস্তা দিয়েই চলাফেরা করে। তবে কখনো তাদের মধ্যে কথা হয়না। অবশ্য কথা হবেই বা কেন, সবাই তার নিজ কাজে ব্যস্ত। নীলা যায় স্কুলে, অন্যদিকে রাতুল যায় কলেজে বা তার বাবার সাথে দেখা করতে; স্কুলের সামনের মাঠে।
একদিন রাতুল কলেজের উদ্দেশ্যে বার হলো। অবশ্য এটা তার প্রতিদিনের কাজেরই অংশ। রাস্তা বেশ ফাঁকা। কিছুটা সামনে এসে একটা মোড়৷ ওই মোড়ে চায়ের দোকান। ওখানে স্থানীয় ছেলেরা-বড়রা আড্ডা দেয়। কী যেন বাড়ি ভুলে রেখে আসায় রাতুল ওই দিন কলেজ থেকে বাড়ির দিকে ফিরে আসছিল। সে বেশ ব্যস্ত। কারণ তাকে আবার কলেজে ফিরতে হবে। হঠাৎ সে রাস্তায় একটা জটলা মতো দেখলো। কৌতুহলী হয়ে সে কাছে যেতেই দেখে নীলা চায়ের দোকানের ছেলেদের সাথে চেচিয়ে কি যেন বলছে।
রাতুল এগিয়ে গেলো। নীলা রাতুলকে বললো আমি স্কুলে যাওয়ার সময় এরা আমাকে দেখে আজেবাজে কথা বলছে এবং কয়েকদিন থেকেই এমন করছে। আজ সে বিরক্ত হয়ে এদের যেই বলতে যাচ্ছে এমন যেন না করে, তখন ছেলেগুলো উল্টা তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। রাতুল বেশ ঠান্ডা ও ভদ্র স্বভাবের ছেলে। সে মেয়েদের অনেক সম্মান করে। সে লক্ষ করে দেখলো নীলাকে বিরক্ত করা ছেলেগুলো তার কলেজের। সবাই ফার্স্ট ইয়ারের।
রাতুল তাদের বললো তোমরা কলেজে না যেয়ে রাস্তায় মেয়েদের সাথে এমন করো কেন? আরও অনেক কথাই রাতুল ওদের বুঝিয়ে বললো। তবে কলেজের বড়ভাই হওয়ায় ওই ছেলেগুলো তখন রাতুলকে কোনো কিছু বলে নাই এটা রাতুল ওদের হাবভাব দেখে ঠিকই বুঝে গেল।
ছেলেগুলো সরে গেল সেখান থেকে ঠিকই কিন্তু রাতুল বুঝলো নীলাকে তারা একা পেলে পরে কিছু বলতে পারে। রাতুল ভাবলো ছেলেগুলোকে পরে ডেকে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলবে। সেদিন রাতুল নীলাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। রাস্তায় রাতুল ও নীলা কেউ কারো সাথে কোনো কথা বলে নি। বাড়ির সামনে এসে নীলা শুধু বললো আপনি আমাকে কয়েকটা দিন স্কুলে যাওয়া ও আসার সময় সাথে করে পৌঁছে দেবেন। রাতুল ভাবলো ওই ছেলেগুলো আবার কোনো ঝামেলা করতে পারে। তখন সে মুখে কিছু না বলে, নীলার কথায় সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো।
নীলা বললো কাউকে যেন রাস্তায় ঘটে যাওয়া আজকের বিষয়টি না বলে রাতুল। নীলা সেদিন ক্লাস করে নি, রাস্তার ওইখান থেকে বাড়ি চলে আসছে। বাড়িতে মা শুনলে বলেছে আজ ক্লাস হবে না, তাই চলে এসেছি। পরের দিন থেকে রাতুল নীলাকে স্কুলে এগিয়ে দেয় এবং আসার সময় বাড়ির গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেয়৷ এভাবে রাতুল ও নীলা রাস্তায় অল্প অল্প করে দুজন দুজনের সাথে কথা বলা শুরু করে। দুজনেই বেশ লাজুক প্রকৃতির। দুজনেই চায় একে অন্যের সাথে কথা বলতে কিন্তু কোন বিষয় দিয়ে কথা বলা শুরু করবে তা খুঁজে পায় না।
তাই বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক কথা দিয়েই তাদের প্রতিদিনের কথা শুরু হতো। আস্তে আস্তে দিনে দিনে দুজনের মাঝের জড়তা দূর হয়ে যেতে থাকে। একদিন নীলা রাতুলকে বলে আপনিও তো ওইসব ছেলেদের মতো আমাকে বাজে কথা বলতে পারতেন, কিন্তু আপনি তো ওদের মতো না। কেন? নীলার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না রাতুল। নীলা এভাবে প্রায় প্রত্যেকদিনই নানা রকম প্রশ্ন করে রাতুলকে। রাতুল সব মনোযোগ দিয়ে শোনে। মাঝে মাঝে উত্তর দেয়, মাঝে মাঝে দেয় না।
এতো এতো কথা বলার পরও যে রাতুল বিরক্ত হয় না, এ বিষয়টা নীলার খুবই ভালো লাগে। কয়েকদিন পরই নীলার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে, রাতুল নীলাকে ভালোভাবে পরীক্ষা দেওয়ার কথা বলে। নীলা বলে আমি ভালোভাবে পরীক্ষা না দিলে আপনার কী? কথাটা রাতুলের মনে কষ্ট দেয়। রাতুল নিজেও বুঝতে পারে না নীলার এই কথায় তার কেন মনের ভিতর খারাপ লাগলো। নীলার পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট বের হওয়ার তারিখ ঠিক হয়ে যায়। পরীক্ষার সময়ও রাতুলের সাথে রাস্তায় নীলার দেখা হতো। তবে তখন খুব বেশি একটা কথা হতো না।
রেজাল্ট দেওয়ার দুইদিন আগে নীলা একদিন হঠাৎ রাস্তায় রাতুলকে বলে কাল আপনি বিকালে একবার আমার সাথে দেখা করতে পারবেন? রাতুল প্রথমে বলে আমাদের তো রাস্তায় নিয়মিতই দেখা হয়, কথাও হয়; তাহলে আবার বিকালে কেন? কিন্তু নীলার জোরাজোরিতে রাতুল রাজি হয়। কাল নীলা ডেকেছে, কেন ডাকলো, কিছু কি বলবে আমাকে? বললেও কী বলবে? এসব নানা রকম ভাবতে ভাবতে সেই রাতে রাতুলের ঘুমাতে দেরি হয়ে গেল।
রাতুলের মনে হচ্ছিল নীলাকে কেন জানি সে ভালোবাসে ফেলেছে এবং কাল দেখা হলে তখন সে নীলাকে বলবে কথাটা৷ ঘুমের মধ্যেও রাতুল নীলাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলো। ঘুম ভাঙলো সকাল নয়টায়। চায়ের দোকানে যেয়ে চায়ে চুমুক দিতেই সে শুনতে পেল সবাই কী নিয়ে যেন কথা বলছে। খেয়াল করে শুনে দেখলো একজন নীলাদের গ্রাম থেকে আজ সকালে শহরে চলে যাওয়ার কথা বলছে। তারা বলাবলি করছে নীলার বাবা নীলাকে শহরের ভালো কলেজে পড়াবে বলে অনেক আগে থেকেই গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার চিন্তা করে রেখেছিল। রাতুল ভাবলো নীলা কী জানতো যে তারা চলে যাবে?
আর যদি জানতোই তাহলে তাকে আগে কেন বলেনি। না কি দেখা করতে চেয়েছিল এইটা বলার জন্যই। একথাতো সেদিন রাস্তায় বললেই পারতো। তাহলে কি নীলা আমাকে ভালোবাসতো; একথা বলার জন্য ডেকেছিল। কী বলতে চেয়েছিল নীলা?
এখন কি নীলার আমার কথা মনে পড়ছে, ভাবতে ভাবতে রাতুলের চোখের জল মুখ বেয়ে পড়তে লাগলো।
লেখা: মো. সাকিব মল্লিক, শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়