রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম হোসেন। জন্মগতভাবে যিনি একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। অথচ দৃষ্টিহীন হয়েও তিনি দেখতে পান এমন এক স্বপ্ন—যা অনেক সক্ষম মানুষও দেখার সাহস পায় না। সেই স্বপ্ন হলো পরিবর্তনের। আর এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার। ‘সহকারী পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক’ পদে জমা দেন মনোনয়ন পত্র। প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকায়ও তার নাম এসেছে। তার এই যাত্রায় অনুপ্রেরণা হিসেবে হাজির হয়েছে তার বন্ধুরাসহ অনেকেই। সকলের কথা বলতে গিয়ে নাঈম বললেন, ‘আমার বন্ধুরা বলেছে তুমি পারবে। তুমি সেই ব্যক্তি যার দ্বারা কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব।’
নাঈম ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি লক্ষীপুর জেলার সদরে। জন্ম থেকেই চোখে আলো না পাওয়া এই তরুণের পৃথিবী আর আট-দশ জন তরুণের মতো নয়। সম্পূর্ণ আলাদা। ছোট থেকে লড়াই সংগ্রামে মাঝে ভর্তি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে।বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে, শত প্রতিকূলতার মাঝেও, তিনি যা ভাবেন, তা হয়তো আর আট-দশ জন ভাবতে পান না। শিক্ষার্থী হয়ে নাঈমের মতো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীদের মতো সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। লাইব্রেরির মতো প্রতিষ্ঠানেও তাদের জন্য নেই কোনো বিকল্প ব্যবস্থা। যে সমস্যা নিয়ে নাঈম কতৃপক্ষকে বার বার বলতে গেলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।
বেশ আক্ষেপ নিয়ে নাঈম বললেন, ‘অন্ধত্বের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে আমার অ্যাক্সেস (প্রবেশাধিকার) নেই। প্রশাসনকে অনেকবার এ কথা জানিয়েছি। কিন্তু তারা আমার কথা আমলে নেননি।’ কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করলেন, ‘আমি কোনো লিগ্যাল অথোরিটি (বৈধ কতৃপক্ষ) ছিলাম না। রাকসুতে যদি একজন প্রার্থী হিসেবে আসতে পারি, তবে কিছু বলার অধিকার পাবো।’
দীর্ঘ তিনযুগ পর ক্যাম্পাস জুড়ে রাকসু নির্বাচনের আমেজ, ক্লাসরুম থেকে চায়ের দোকান—সর্বত্র প্যানেল-প্রার্থীদের নিয়ে চলছে সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ। এই সময়ে প্রার্থীরাও যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মন জয়ে ব্যস্ত; তখন নাঈমদের মতো এসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাববার যেন কেউ নেই। অথচ এই শিক্ষার্থীদের নিয়েই ভাবতে চান নাঈম হোসেন। আবার শুধু যে এই শিক্ষার্থী তাও নয়, কাজ করতে চান ক্যাম্পাসের সকলের জন্য। এই তরুণ ভাঙতে চান সমাজের প্রচলিত ধারণা। সেই লক্ষ্যেই নির্বাচনে প্রার্থীতা ঘোষণা করা বলে জানিয়েছেন তিনি।
অদম্য এই নাঈম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (পিডিএফ)-এর একজন সদস্য। বুধবার নাঈম হোসেনের সঙ্গে এই প্রতিবেদক কথা বলেন।
নির্বাচনে আসার পেছনে কোনো বিশেষ কোনো ঘটনা বা অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান এই প্রতিবেদক। নাঈম বললেন, ‘ক্যাম্পাসে কাটানো তিন বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমি এটুকুই বুঝেছি যে, আমাদের ক্যাম্পাসের যে পরিবেশ তা মানুষের জন্য খুবই নিম্ন মানের। আমার মনে হলো, এই অবস্থার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। আমি এই অবস্থার পরিবর্তনে কাজ করতে চাই।’
তবে এই কাজ সবার জন্য বলে জানালেন নাঈম। তিনি বললেন, ‘ক্যাম্পাসের ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (পিডিএফ) সদস্যরা আমার পরিবারের মতো। তাদের জন্য কাজ করা আমার দায়িত্ব। তবে আমি শুধু তাদের নয়, সব শিক্ষার্থীর জন্যই একটি সুন্দর ক্যাম্পাস গড়তে চাই।’
এই কঠিন পথে চলার সাহস তিনি পেয়েছেন বন্ধু ও পিডিএফ-এর সদস্যদের কাছ থেকে। তাদের অনুপ্রেরণাতেই নাঈম আজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন। নির্বাচনে জয়-পরাজয় নিয়ে তিনি চিন্তিত নন, বরং আত্মবিশ্বাসী। একটি কথা তিনি বার বার বললেন, ‘আমি বদলাতে চাই, আমি পরিবর্তন চাই।’
নাঈম বললেন, ‘বন্ধুরাসহ আমার পিডিএফ পরিবার বলেছে তুমি সেই ব্যক্তি যার দ্বারা কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব। আমি সর্বোপরি সবার জন্য, যারা ক্যাম্পাসে ভুগছে, তাদের জন্য হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে কাজ করতে চাই। আমি সম্পূর্ণ ক্যাম্পাস নিয়ে কাজ করতে চাই।’
নাঈমের এই লড়াই কেবল একটি নির্বাচনে জেতার জন্য নয়, বরং সমাজের গভীরে থাকা একটি ধারণা ভাঙার লড়াই। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের জন্য কিছু করতে পারে না। আমি এই ধারণা ভেঙে দিতে চাই।’
নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী বলে জানান নাঈম। তিনি বলেন, ‘আমি নির্বাচনে জয়-পরাজয় নিয়ে চিন্তিত নই। কিন্তু আমি আত্মবিশ্বাসী যে, ইনশাআল্লাহ পারব। সকলের কাছে বার্তা থাকবে যে, আমি বদলাতে চাই। আমি পরিবর্তন করতে চাই। এটাই আমার বার্তা। এখন পর্যন্ত সবার থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি।’
নির্বাচনের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তে কোনো নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যখনই প্রার্থীতার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তখন থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নেতিবাচক মন্তব্য পাইনি। তবে ভবিষ্যতের কথা বললে পারছি না। আর অন্যান্য ক্যাম্পাসে দেখেছি যে, ডিজএবল শিক্ষর্থীদের নিয়ে অনেক কথা উঠছে।’
নির্বাচনী প্রচারণা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমি একজন মানুষের ভোট নিচ্ছি, মানে আমি তার দায়িত্ব নিচ্ছি। তাই সবার আগে আমার দায়িত্ব তাকে বোঝানো, আমাকে কেন ভোট দেবে। এক্ষেত্রে আমি সরাসরি সাক্ষাৎকে বেশি উৎসাহিত করবো। এটা আমার ব্যক্তিগত কৌশল হবে।’
ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন নাঈম। তিনি বলেন, ‘কেবল চাকরির পেছনে ছোটা আমার লক্ষ্য নয়। আমি স্বাধীনভাবে সমাজের জন্য এমন কিছু করতে চাই, যা মানুষের উপকারে আসবে।’
“যদি করি স্বেচ্ছায় রক্তদান, বাঁচবে জীবন বাঁচবে প্রাণ” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) একমাত্র স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠন ‘বন্ধু, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়’-এর উদ্যোগে সপ্তাহব্যাপী বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা (ব্লাড গ্রুপিং) এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। রবিবার (২৬ জুলাই) সকাল ১০ টায় ব্যাডমিন্টন কোর্টে সপ্তাহব্যাপী এই আয়োজনের উদ্ভোদন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদল কুবি শাখার সদস্য সচিব আবুল বাশার, বন্ধু, কুবির সাংগঠনিক সম্পাদক নাঈম ভুঁইয়াসহ বন্ধু’র অন্যান্য সদস্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। জানা যায়, বন্ধু’র এই বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা (ব্লাড গ্রুপিং) এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ ক্যাম্পেইন ব্যাডমিন্টন কোর্টে ২৬ জুলাই থেকে আগামী ৩০ জুলাই (রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে। উদ্বোধনের পর থেকেই ব্যাডমিন্টন কোর্টে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়। বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা এখানে এসে তাঁদের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করছেন এবং অনেকেই স্বেচ্ছায় রক্তদানে আগ্রহ প্রকাশ করে সংগঠনের নতুন সদস্য হিসেবে ফরম পূরণ করছেন। ক্যাম্পেইনে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করাতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবসার উদ্দিন বলেন, “বন্ধু, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এই ফ্রি ব্লাড ক্যাম্পেইনে এসে আমি আজ বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করেছি। এখানে কোনো খরচ ছাড়াই সবাই রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করাতে পারছেন এবং একই সাথে রক্তদানে সবাইকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে এমন সুন্দর আয়োজনের জন্য আমি আয়োজক সংগঠন ‘বন্ধু’কে আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাই।” সংগঠনের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম নিয়ে বন্ধু’র সাংগঠনিক সম্পাদক ও উক্ত ক্যাম্পেইন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক নাঈম ভুঁইয়া বলেন, “কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফ্রিতে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই আমাদের এই সপ্তাহব্যাপী আয়োজন। প্রথম দিন থেকেই আমরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দারুণ সাড়া পাচ্ছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, জরুরি প্রয়োজনে রক্ত সরবরাহ করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য বিষয়ক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারীর নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘রিমেম্বারিং জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
রোববার (২৬ জুলাই) দুপুর ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শাখা জাতীয় ছাত্রশক্তির উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারীর নেতারা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে শাখা জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ফুয়াদ হাসানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এবং যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ড. মাহমুদা আলম মিতু এমপিসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এছাড়া অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান।
শাখা জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ফুয়াদ হাসান বলেন, জুলাই আন্দোলন কারো একার ছিল না। ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক সবাই মিলে আন্দোলন করেছিল। তাই জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে সকল রাজনৈতিক দল মিলে ভূমিকা রাখতে হবে।”
জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান বলেন, “নতুন ছাত্র রাজনীতি তৈরির জন্যই আমরা জাতীয় ছাত্রশক্তি নিয়ে এগোচ্ছি। তবে পুরো রাজনৈতিক কালচারের অনেক কিছুই ছাত্রশক্তিতে রয়েছে। আমরা এক রাতে সেটা চেঞ্জ করতে পারছি না। তবে ধীরে ধীরে চেঞ্জ করছি।”
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, “আমাদের সমাজে এখনো ভয়ের রাজনীতি বিদ্যমান। আখতার, নাহিদসহ জুলাইয়ের পরিচিত মুখগুলোকে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের লোকেরাও ইতিবাচকভাবে দেখেন। কিন্তু আমরা যারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা কথা বললেই রাজনৈতিক ট্যাগ পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আমরা এই ভয়ের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাইয়ে গুম, খুন এবং লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনা আমরা সবাই দেখেছি। এসব ঘটনার পর রাজনীতি করার ইচ্ছা ছিল না। তবে নিজের ক্যারিয়ার ঠিক রেখেই রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছি। তাই আমি শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে ছাত্রীদের বলব—গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে শুধু চাকরির কথা নয়, চেয়ারম্যান, মেম্বার কিংবা এমপি হওয়ার লক্ষ্যও রাখুন। এখানে উপস্থিত অনেকেরই সেই যোগ্যতা রয়েছে।”
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি বলেন, “আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, তখন দেশে ভয়ের রাজনীতি ও ফ্যাসিবাদী পরিবেশ ছিল। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ছিল জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার শামিল। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর কখনো হল দখল, নির্যাতন, বাক্স্বাধীনতা হরণ বা ভয়ের সংস্কৃতি ফিরে না আসুক।”
তিনি বলেন, “যে-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, কোনো ছাত্রসংগঠনই যেন ছাত্রলীগের মতো ক্যাম্পাস দখলের সংস্কৃতি তৈরি না করে। জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ সব ছাত্রসংগঠনকে এ বিষয়ে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’-এর মধ্যে থেকে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও ক্যাম্পাসের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়; এখান থেকেই সম্প্রীতি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও নেতৃত্বের শিক্ষা নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের দেশের অসংগতি, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করতে হবে।”
সাজিদ আব্দুল্লাহর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা।”
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণের বাইরে থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা গবেষণা, সংস্কৃতি ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবে।”
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আবাসিক শিক্ষার্থীদের জরুরি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিজয়-২৪ হলে ‘শহীদ আব্দুল কাইয়ুম স্মৃতি মেডিকেল বক্স’ স্থাপন করেছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী সহজলভ্য করার লক্ষ্যে নেওয়া এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা।
শনিবার (২৫ জুলাই) বিকাল সাড়ে ৫টায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি ফয়জুল করিম মেডিকেল বক্সটি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করেন। এ সময় সংগঠনের নেতাকর্মী ও বিজয়-২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
মেডিকেল বক্সে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নাপা, প্যারাসিটামল, ফ্লাজিল, অমিডন, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ওষুধ। এছাড়া থার্মোমিটার, ব্যান্ডেজ, তুলা, হেক্সিসলসহ প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বিজয়-২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. সাকিব হোসেন বলেন, “ইসলামী ছাত্র আন্দোলনকে ধন্যবাদ এমন একটি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। ফার্স্ট এইড বক্স শুধু একটি হলে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হল ও বিভাগে থাকা প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক কোনো দুর্ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে এটি খুবই উপকারী হবে, যা এতদিন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন ছিল। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের নীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বক্সে দলের নাম উল্লেখ না করে জুলাই আন্দোলনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শহীদ আব্দুল কাইয়ুমের নামে এটি স্থাপন করেছে। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে এ ধরনের উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুসরণীয় হতে পারে।”
এ বিষয়ে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আফসার উদ্দিন ইফতি বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শহীদ ছিলেন আব্দুল কাইয়ুম। তাঁর আত্মত্যাগ ও আদর্শকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে বিজয়-২৪ হলের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘শহীদ আব্দুল কাইয়ুম স্মৃতি মেডিকেল বক্স’ স্থাপন করেছি।
তিনি আরো বলেন, “আমরা লক্ষ্য করেছি, হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা হঠাৎ অসুস্থ হলে বা জরুরি মুহূর্তে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহের জন্য অনেক দূরে যেতে হয়। অনেক সময় রাতের বেলায় ফার্মেসি বা মেডিকেল সেন্টার বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েন। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় সম্পূর্ণ মানবিক ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে এই মেডিকেল বক্স স্থাপন করা হয়েছে। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও জরুরি ওষুধ নিয়মিত সংরক্ষণ করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা দ্রুত প্রাথমিক সেবা নিতে পারেন। ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে এ ধরনের সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।”
এ উদ্যোগে ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে এ ধরনের মেডিকেল বক্স স্থাপন শিক্ষার্থীদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।